ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ জুলাই ২০২৪, ৫ শ্রাবণ ১৪৩১

আবাসন শিল্পে সংকট তৈরি হবে

মো: ইকবাল হোসাইন চৌধুরী

প্রকাশিত: ১৮:১৩, ৪ জুন ২০২৩

আবাসন শিল্পে সংকট তৈরি হবে

.

আগামী অর্থবছরের (২০২৩-২০২৪) প্রস্তাবিত বাজেটে নির্মান সামগ্রীর উপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করার ফলে ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে আরেক দফা। এসব পণ্যের দাম সহনশীল না রাখলে আবাসন শিল্পে সংকট তৈরি হবে। ফ্ল্যাট কেনার সক্ষমতা হারাবেন অনেকে। 

একটি দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে আবাসন শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। আবাসন ব্যবসায়ীদের কার্যকর ভূমিকায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে এখাত। জীবন-যাপন হয়েছে উন্নত। শুধু তাই নয়, দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি গৃহায়ন খাতের লিংকেজ শিল্প বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করে চলেছে ডেভেলপাররা। দেশের ভেতর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হওয়ায় অনেক লিংকেজ শিল্প প্রতিষ্ঠান ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশেই পর্যাপ্ত পণ্য উৎপাদন করছে। আমদানী নির্ভরতা কমিয়ে দিয়ে ক্ষেত্র বিশেষ কোন কোন লিংকেজ শিল্প রপ্তানিও করছে। রং, রড, ইট, সিমেন্ট টাইলস সহ বিভিন্ন লিংকেজ শিল্পে কর্মসংস্থান হয়েছে ৪০লক্ষ নাগরিকের। বিগত কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে জিডিপিতে আবাসন শিল্পের মূল্য সংযোজন যেমন বেড়েছে, তেমনি জিডিপিতে অবদানও বেড়েছে।

গত ১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ করা আগামী অর্থবছরের বাজেটে নির্মান শিল্পে ব্যবহৃত সামগ্রীতে শুল্ক বাড়নোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। নতুন আরোপিত শুল্কহার কার্যকর করা হলে তার প্রভাব পড়বে ভোক্তা ও আবাসন ব্যবসায়। নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা ফ্ল্যাট কেনার সক্ষমতা হারাবেন এবং ক্রেতা হারাবে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা। এতে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের আবাসন ব্যবস্থা আরও কঠিন হবে। ভাড়া বাড়ির চাহিদা ও ভাড়া বাড়বে। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোর স্বল্প আয়ের কষ্ট আরো বাড়বে। সবার জন্য আবাসন স্বপ্নই রয়ে যাবে।
“গত ২ জুনের প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন থেকে ফ্ল্যাট-প্লট কিনলে খরচ বাড়বে। কারণ, সরকার বাজেটে নিবন্ধন খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে জমি নিবন্ধনে চুক্তিমূল্যের ৪ শতাংশ কর দিতে হয়। বাজেটে তা বাড়িয়ে ৮ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। 

অর্থমন্ত্রী তাঁর প্রস্তাবে এলাকাভিত্তিক কাঠাপ্রতি ন্যূনতম করও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যেমন গুলশান, বনানী, মতিঝিল, দিলকুশা, নর্থ সাউথ রোড, মহাখালী এলাকায় জমির নিবন্ধন করা হলে চুক্তিমূল্য বা বিক্রয়মূল্যের ৮ শতাংশ কিংবা কাঠাপ্রতি ২০ লাখ টাকার মধ্যে যেটি বেশি হবে, ওই পরিমাণ কর দিতে হবে। এর মানে হলো, ওই সব এলাকায় প্রতি কাঠায় ২০ লাখ টাকা কর দিতেই হবে। “ 
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সিমেন্ট, পাথর, টাইলস, লিফট, সিরামিক, গ্লাস, সুইচ-সকেট, ক্যাবল, কিচেনওয়্যারসহ কমপক্ষে ১০-১২টি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব পণ্যের দাম বেড়ে গেলে ফ্ল্যাটের দাম বেড়ে যাবে। চাহিদা কমে যাবে এবং আবাসন শিল্পে সংকট তৈরি হবে। 

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, অ্যালুমিনিয়াম ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি কিচেন বা অন্যান্য গৃহস্থালী তৈজসপত্র, স্যানিটারিওয়্যার এবং যন্ত্রাংশের মূল্য সংযোজন করহার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। বহুতল বিপণি বিতানে চলন্ত সিঁড়ি স্থাপনের খরচও বেড়ে যাবে। কারণ এটি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে বাজেটে। 
এছাড়াও নতুন ড্যাপের ‘ফার’ হ্রাসসহ নানা কারণে সমগ্র গৃহায়ন খাতে আবাসন নির্মাণ এবং বিক্রয় পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনাপ্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়নি। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বিনাপ্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ থাকায় ২০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা অর্থনীতির মূল ধারায় এসেছে। সরকার ২ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পেয়েছে। 
৩ জুন একটি গণমাধ্যমে বলা হয়েছে এক বছর আগেও দেশে প্রতি টন রডের দাম ছিল ৭৮ হাজার টাকা। বর্তমানে সেটি বেড়ে লাখ টাকার ঘরে। আবার এক বছরের ব্যবধানে প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের দাম ৪৩০ টাকা বেড়ে ৫৩০ টাকা হয়েছে। একইভাবে ইট, পাথর, বালু, বৈদ্যুতিক তার, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যারসহ সব ধরনের নির্মাণসামগ্রীর দামই বেড়েছে। তাতে কমবেশি সব আবাসন প্রতিষ্ঠানই ফ্ল্যাটের দাম ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানিতে টনপ্রতি শুল্ক ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া তৈরি সাধারণ ইটে প্রতি হাজারে কর ৪৫০ থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকার প্রস্তাব দিয়েছেন। এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশি লিফটের সরঞ্জামের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। 

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বলেন, জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনে ন্যূনতম যে কর আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাতে সরকার বেশি রাজস্ব পাবে না। কারণ, উচ্চ করের ফলে জমি ও ফ্ল্যাটের নিবন্ধন কমে যাবে। তিনি আরও বলেন, ডলার-সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে আবাসন খাতের ব্যবসা ভালো অবস্থায় নেই। নতুন ড্যাপে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধের পর এখন আবার বাজেটে বাড়তি কর আরোপ করায় আবাসন খাত নতুন করে সংকটে পড়বে। 

এবার বাজেটে অনেক এলাকায় ২০ লক্ষ টাকা প্রতি কাঠা সরকারি ট্যাক্স ধরা হয়েছে। অথবা চুক্তি মূল্যের ৮ শতাংশ। এটা আগে ৪ শতাংশ ছিল। আবার শর্ত আছে যেটা বেশি হবে সেটা দিতে হবে। তার মানে কমপক্ষে কাঠা প্রতি ২০ লক্ষ টাকা ট্যাক্স। ক্ষেত্রে বিশেষ এটা আরো বেশি দিতে হবে। এটা গেলো জমির ক্ষেত্রে। ফ্ল্যাট এর ক্ষেত্রে আগে ১০-১২.৫ শতাংশ ট্যাক্স ছিল এটা এবার হবে ১৪-১৬.৫ শতাংশ। আমরা এই ট্যাক্স ৭ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যম এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানানো হয়েছে। একটা সময় ১৫ শতাংশ ট্যাক্স ছিল তখন জমি–ফ্ল্যাট বিক্রি অনেক হ্রাস পেয়েছিল। চার বছর আগে কিছুটা হ্রাস করার পর এই ট্যাক্স ছিল ১০-১২.৫% পর্যন্ত। নতুন করে ৪ শতাংশ ট্যাক্স বৃদ্ধিতে এই খাতে স্থবিরতা নেমে আসবে। অধিক ট্যাক্স কালেকশন করতে গিয়ে উল্টো ট্যাক্স কমবে বলে আমাদের শংকা। নীতি সহায়তার অভাবে ক্রমে দেশের আবাসন খাত মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পতিত হয়েছে। অতিরিক্ত কর আরোপের কারণে অনেকেই আবার দেশের বাহিরে আবাসন খাতে বিনিয়োগ করবেন। 

আমরা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া জানালেও প্রস্তাবিত বাজেটে তার কোনো প্রতিফলন হয়নি। অপ্রদর্শিত অর্থের বিনিয়োগ, ফ্ল্যাটের সেকেন্ডারি বাজার ব্যবস্থা চাঙা করতে পুরাতন ফ্ল্যাটে নিবন্ধন ব্যয় কমানো, বিশেষ তহবিল গঠনসহ কোনো দাবির প্রতিফলন হয়নি।
এই অবস্থায় আশু পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই সংকট উত্তরণ অসম্ভব। এই মুহূর্তে নতুন করে নানা পণ্যের কর বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে এর একটা বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে আমাদের শংকা। আবাসন খাত মানে শুধু আবাসন খাত নয়। এর সাথে ৪ শতাধিক লিংকেজ শিল্প জড়িত এবং যাহা জিডিপির অন্যতম সুচক। আবাসন খাতে সংকট মানে এই সব উপখাতে সংকট। আবাসন খাতে ৪০ লক্ষ নাগরিকের কর্মস্থান। এই খাতের সংকট অর্থনীতিতে সংকট তৈরি করবে আমার শংকা। কাজেই বাজেট পাশের আগে এই দিকে নজর দেওয়ার আহবান জানাচ্ছি।

এমডি, জেসিএক্স ডেভেলোপমেন্টস লিমিটেড ও পরিচালক এফবিসিসিআই

 

 

আর এস

×