ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১

নটিং হিল থেকে ওরাকান্দি

ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

প্রকাশিত: ২০:৩৮, ৩১ মার্চ ২০২৩; আপডেট: ২০:৩৯, ৩১ মার্চ ২০২৩

নটিং হিল থেকে ওরাকান্দি

.

বহু বছর আগে লন্ডনে কাজ করার সময় নটিং হিল কার্নিভাল দেখার সুযোগ হয়েছিল। পরে ইতিহাস ঘেঁটে জেনেছি এই কার্নিভালটির শুরু সত্তরের দশকের শুরুর দিকে। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ঐতিহ্যবাহী লিনটেন উৎসবের আদলে লন্ডনের এই কার্নিভালটি শুরু।

লন্ডনের ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত অধিবাসীরা মূলত এতে অংশ নেন। ক্যারিবীয় অঞ্চলে উৎসবটি ফেব্রুয়ারিতে উদযাপিত হলেও লন্ডনে এর সময়টা সেপ্টেম্বর, কারণ, ওই সময়টাতে লন্ডনে রোদের কিছুটা দেখা মেলে যা ফেব্রুয়ারিতে চিন্তাও করা যায় না। লন্ডনের রোদেলা সকালে হাজারো ক্যারিবীয় নারী-পুরুষ লাউড মিউজিকের তালে তালে নেচে গেয়ে মাতিয়ে তোলে লন্ডনের কয়েক কিলোমিটার রাজপথ। আর সেই আনন্দে শামিল হতে যোগ দেন নানা দেশের আর নানা বর্ণের আরও লাখো মানুষ। মূলত কালো মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্তির এই যে মহাউদযাপন। আমার এই জীবনে এর চেয়ে উৎসবমুখর কোনো উদযাপন দেখার সৌভাগ্য হয়নি, আর হবে বলেও কখনো ধারণা করিনি। কবিগুরুর, ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’ এই আপত্য বাণীটির মর্মটা হাড়ে-হাড়ে টের পেলাম মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে গোপালগঞ্জে গিয়ে। তাও কোনোদিন হয়ে উঠতো কি-না জানি না। হলো দুটো কারণে, প্রথমটি পদ্মা সেতু আর দ্বিতীয়টি সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের মতুয়া সম্প্রদায় সম্বন্ধে আমার সত্যি বলতে কি তেমন কোনো ধারণাই ছিল না, যেমনটি ছিল না বাংলাদেশের আমার মতো আরও অনেক মানুষেরই। বাংলাদেশে তার সর্বশেষ সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদি গোপালগঞ্জে কাশিয়ানীর ওরাকান্দিতে ঠাকুরবাড়ির মন্দিরে পূজা করতে হাজির হলে প্রথম সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল হরিচাঁদ ঠাকুরের ওরাকান্দির দিকে। সে সময়টায় বারুনী স্নানের কথাও শুনেছিলাম, কিন্তু এর বেশি কিছু না।

বাংলাদেশের অনেক মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন বাংলাদেশ মতুয়া মহাসংঘের সঙ্গে আমার পরিচয় সম্প্রীতি বাংলাদেশের সদস্য সচিব হওয়ার কল্যাণে। একাত্তরের চেতনায়, বাহাত্তরের সংবিধানের আলোকে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য আমাদের সরকারপ্রধানের যে অবিরাম প্রয়াস, আমাদের এই সংগঠনটির সীমিত সামর্থ্যরে জায়গাটা থেকে আমরা তার সেই মহতী উদ্যোগে সহায়ক হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করি। আর এই সুবাদে সারা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আমাদের যে ছুটে চলা, তার একটা বড় প্রাপ্তিযোগ হচ্ছে দেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে যারা ধারণ করেন এমনি মানুষগুলোর সঙ্গে আমাদের কিভাবে যেন একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। এমনই দুজন মানুষ সুব্রত ঠাকুর আর সাগর ঠাকুর। দুজনই হরিচাঁদ ঠাকুরের বংশধর এবং যথাক্রমে বাংলাদেশ মতুয়া মহাসংঘের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এ দুটো মানুষ যখন চেম্বারে এসে বারুনী স্নান ও মতুয়া মহাসম্মেলন উপলক্ষে ওরাকান্দির ঠাকুরবাড়িতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন তখন তাতে সম্মতি দিতে আমার একের বেশি দুটো সেকেন্ডের প্রয়োজন পড়েনি। কারণ তারা এমন একজন মহামানবের উত্তরসূরি যিনি ধর্মের জাত-পাত প্রথার বিরুদ্ধে মানবতার জয়গান গেয়েছিলেন। মতুয়া দর্শনের মূল প্রতিপাদ্যই হচ্ছেÑ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’। পাশাপাশি হরিচাঁদ ঠাকুর আর তার ছেলে গুরুচাঁদ ঠাকুর মিলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিন সহস্রাধিক পাঠশালা আর বিদ্যালয়। হরিচাঁদ ঠাকুর নামের এই যে মহামানব তার ২১২তম জন্মদিনে এবারের বারুনী স্নান।

এর আরেকটা কারণ পদ্মা সেতু। শেখ হাসিনার কল্যাণে আজ আমরা ‘পদ্মা জয়ী’ জাতি। আমার মনে আছে নব্বইয়ের দশকে আমার প্রয়াত বাবা ইঞ্জিনিয়ার মাহতাব উদ্দিন আহমেদ যখন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের খুলনা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন তখন সড়ক ও জনপথের কর্মকর্তাদের দ্রুত পদ্মা পাড়ি দেওয়ার জন্য অধিদপ্তরটির একটা স্পিডবোট ছিল। এই স্পিডবোটে পদ্মা পাড়ি দিতেও ঘড়ির কাঁটায় ঘণ্টা পেরিয়ে যেত আর বিশেষ করে বর্ষায় প্রমত্তা পদ্মা যখন স্পিডবোটটাকে নিয়ে ছেলে খেলায় মাততো, তখন ভয় আর থ্রিল মেশানো যে এক অভিজ্ঞতা, তার বর্ণনা দেওয়ার মতো কলমের জোর আমার অন্তত নেই। আজ অবশ্য সেসব শুধুই রূপকথা। এখন ব্রিজে ওঠার আগে বা পরে পদ্মাপাড়ের রেস্তরাঁগুলোয় চমৎকার ইলিশ ভাজা আর ইলিশের লেজের ভর্তা খেয়ে পদ্মা পাড়ি দিতে তার সিকিভাগ সময়েরও প্রয়োজন পড়ে না। কাজেই ১৯ মার্চ সাতসকালে ঠিকঠাক মতোই বেরিয়ে পড়লাম ওরাকান্দির পথে।

সাগর ঠাকুর আগেভাগেই বলে রেখেছিলেন আর যাই করি পৌঁছাতে যেন বারোটা না বাজাই, নচেৎ বারোটা বেজে যেতে পারে। কারণ লোকসমাগমটা ওই সময়টাতেই বাড়তে শুরু করে। কাজেই বারোটার পর ঠাকুরবাড়ি পৌঁছানোটা কঠিন হতে পারে। সাগর ঠাকুরের পরামর্শটা গ্রহণ করেছিলাম ঠিকই, কিন্তু লোকসমাগমের যে সংজ্ঞা আমার এতদিনের জানা, তা যে এভাবে খোল-নালচে পাল্টে যাবে তেমন কোনো ধারণাই আমার কস্মিনকালেও ছিল না। যেদিকে চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ, যাকে বলে মানুষের ঢল। দলে দলে হাঁটছে-নাচছে মানুষ আর প্রতিটা দলের সঙ্গে অনেকগুলো করে ঢাক। সেই ঢাকের শব্দে কাঁপছে বিশ^ ব্রহ্মা- আর তার তালে তালে নেচে-গেয়ে এগিয়ে চলেছে মানুষের ঢল। কিসের নটিং হিল কার্নিভাল, কিসের কি? ওসবতো ওরাকান্দির কাছে নস্যি! প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ হেঁটে আর ব্যাটারিচালিত ইলেট্রিক বাহনে চেপে অগত্যা যখন ওরাকান্দির ঠাকুরবাড়ির দরজায় পৌঁছলাম, সেখানে হাজির সাগর ঠাকুর। সদলবলে, সাড়ম্বরে বরণ করে ঘুরিয়ে দেখাল ঠাকুরবাড়ির আনাচে-কানাচে। স্বাগত জানাতে এগিয়ে এসেছেন সুব্রত ঠাকুরও। আর ঠাকুর যাকে বরণ করে নেন সেই অতিথির যে কি সমাদর, তা সে অভিজ্ঞতা যার হয়নি সেকি জানবে? ঠাকুরবাড়ির ভেতরেই বিরাট দীঘি। তাতে স্নান করে পুণ্য অর্জন করছেন লাখো ভক্ত। দীঘির পাড়েই পরিবর্তন করছেন ভেজা পোশাক। এই যে এত লাখ মানুষ, কোথাও কোনো ইভটিজিং তো দূরে থাক, শৃঙ্খলার এতটুকুও ব্যত্যয়ের লেশটুকুও নেই। ইন্টারনেট ঘেঁটে জানছি নটিং হিল কার্নিভালে যোগ দেন প্রায় দুই লাখ মানুষ আর ১৯ মার্চ ওরাকান্দিতে সমবেত হয়েছিলেন চল্লিশ লাখ নর-নারী!

ওরাকান্দিতে বসে বিটিভিতে আর মতুয়াদের নিজস্ব অনলাইন নিউজ চ্যানেল জাগো মুতয়ায় সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে আর ফিরতি যাত্রায় গাড়িতে বসে ভাবছিলাম সারাদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে। বরং বলা ভালো ধাতস্ত হওয়ার পাশাপাশি নিজে নিজেই ব্যবচ্ছেদ করছিলাম বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ এই উদযাপনটির। আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলেন, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। প্রধানমন্ত্রীর এই স্বপ্নের উদযাপন আমি দেখে এলাম গোপালগঞ্জের ওরাকান্দিতে। মতুয়া সম্প্রদায়ের লাখো মানুষ যখন তাদের ধর্মীয় আচার পালন করছেন, তখন তাদের সঙ্গে সেই উৎসবে শরিক বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানুষও। ঠাকুরবাড়িকে কেন্দ্র্র করে যে বিশাল মেলা তাতে হিন্দু ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আছেন মুসলমানরাও। আমিই তো যে দোকানগুলো থেকে কিনে খেলাম হাতে ভাজা চানাচুর, চালতার আচার কিংবা গরম-গরম কয়লায় ছেঁকা ভুট্টা, তার প্রতিটির মালিকই তো কোনো কলিমুদ্দি বা সলিমুদ্দির মতো মুসলমান। যে মানুষগুলো বাংলাদেশটা সাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে বলে গলা ফাটাচ্ছেন কিংবা যারা এদেশটাকে ‘টেকব্যাক’ স্লোগান জপে তাদের পাক প্রভুদের কাছে আবারও ফিরিয়ে দিতে চাইছেন, তাদের জন্য জোরে চপেটাঘাত ওরাকান্দির এই বারুনী স্নান।

ফিরতি পথে সাম্পান হাইওয়ে ইনে বসে ফুরফুরে মেজাজে গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে মনটা অবশ্য একটু খারাপ হয়ে গেল। নেট ঘেঁটে দেখছি নটিং হিল কার্নিভালে যোগ দেন হাজার দশেক কালো মানুষ আর তাদের সেই উৎসবের আনন্দটা ভাগাভাগি করে নিতে জড়ো হন আরও প্রায় দুলাখ পর্যটক। নটিং হিল কার্নিভাল আর ওরাকান্দির বারুনী স্নানের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি বাজি ধরে বলতে পারি, ঠিকমতো জানান দেওয়া গেলে ওরাকান্দিতে দেশী-বিদেশী পর্যকটদের জায়গা দিতে ঠাকুরবাড়িরও নাভিশ্বাস উঠবে। অথচ নটিং হিলে যেখানে দশ হাজারের আনন্দ ভাগ করতে উপস্থিতি দু লাখ, সেখানে ওরাকান্দিতে চল্লিশ লাখের বিপরীতে চার হাজারও যান কি-না কে জানে?

ওরাকান্দির এই যে বিশাল আয়োজন তাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আছে যথেষ্টই। সামান্য কিছুটা হেরিং বোন বাদ দিলে মূল মহাসড়ক থেকে ঠাকুরবাড়ি পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই পিচঢালা, ঝকঝকে, তকতকে। কন্ট্রোলরুমে আর ঠাকুরবাড়িতে পুলিশি উপস্থিতি চোখে পড়েছে, ছিল র‌্যাবের টহলও। এই ঠাকুরবাড়িরই একজন সদস্য উপজেলার নির্বাচিত চেয়ারম্যান। এলাকার প্রতিটি বাড়িতে সরকারি উদ্যোগে স্থাপন করা হয়েছে দুটো করে স্যানিটারি ল্যাট্রিন। সারা বছর নিজেরা ব্যবহার করলেও বারুনী  স্নানের কয়েকটা দিন ছাড়াও প্রতি শুক্র ও মঙ্গলবার যখন ঠাকুরবাড়িতে সমবেত হন গড়ে হাজার পনেরো ভক্ত, তখন এলাকাবাসী এই ল্যাট্রিনগুলোই উন্মুক্ত করে দেন তাদের ব্যবহারের জন্য। শেখ হাসিনার কল্যাণে এ দেশের হাজারো গ্রামের মতো ওরাকান্দিতেও লেগেছে শহুরে ছোঁয়া, তারপরও আমার মনে হয়েছে ওরাকান্দির এই মহাযজ্ঞের জন্য আরও কিছু অবকাঠামোর প্রয়োজন আছে, দরকার আছে আরেকটু সরকারি সহানুভূতির।

সকাল ৬টায় রওনা হয়ে ঢাকায় যখন ফিরলাম, ঘড়ির কাঁটা বলছে আমাদের পুরো যাত্রায় সময় লেগেছে ৯ ঘণ্টা। এর মধ্যে ঘণ্টা চারেক কেটেছে ওরাকান্দিতে। এমন একটা দারুণ অভিজ্ঞতার জন্য মনে মনে প্রধানমন্ত্রীর আর ঠাকুরবাড়ির ঠাকুরদের অজস্র ধন্যবাদ দিতে দিতে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোলপ্লাজায় এ যাত্রার শেষ টোলটি দিয়ে তাই পরম প্রশান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, টেরই পাইনি।

লেখক : অধ্যাপক, ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

 

×