ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

ভারত হয়ে যায় ইউরোপ আমেরিকায়

দেশী-বিদেশী চক্র কোকেন পাচারে জড়িত

​​​​​​​শংকর কুমার দে

প্রকাশিত: ২২:১৯, ১৯ মে ২০২৪

দেশী-বিদেশী চক্র কোকেন পাচারে জড়িত

.

দেশে কোকেনের সবচেয়ে বড় চালান উদ্ধারের ঘটনায় দেশী-বিদেশী চক্র জড়িত বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। শতাধিক কোটি টাকা মূল্যের এই কোকেনের চালানের সঙ্গে জড়িত এক বাংলাদেশীকে খুঁজছেন গোয়েন্দারা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উদ্ধার হওয়া কোকেনের চালান দেশ থেকে ভারত হয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় পাচার করার তথ্য জানানো হয়েছে গ্রেপ্তারদের বরাতে। দেশের সবচেয়ে বড় কোকেনের চালানটি গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের গডফাদার ডন উইজলি অবস্থান করছিল ভারতে। মাদকের চালানটি ভারতে পাচার হওয়ার আগেই বাংলাদেশে ধরা পড়ে যায়। কোকেন চালানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের আর্থিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানতে পেরেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি দেশে সবচেয়ে বড় মাদক কোকেনের চালান ঢাকার  হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধরা পড়েছে যার মূল্য শত কোটি টাকা। প্রায় সাড়ে আট কেজি কোকেনের গন্তব্য ছিল ভারত। ভারত হয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় পাচার হওয়ার কথা ছিল কোকেনের চালানটি। কোকেনের চালান গ্রহণের জন্য ভারতে অবস্থান করছিল মাদকের গডফাদার ডন উইজলি। শত কোটি টাকা মূল্যের কোকেন চালানের সঙ্গে জড়িত আটজনকে পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। বাংলাদেশে কারা তাদের আশ্রয়দাতা এবং কাদের ইন্ধন সহযোগিতায় ধরনের মাদকের চালান আনা হয়েছে সে বিষয়টি এখনো পুরেপুরি তদন্তে সামনে আসেনি। তবে দেশে কোকেনের সবচেয়ে বড় চালান জব্দের ঘটনায় জড়িত আন্তর্জাতিক চক্রের আর্থিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানতে পেরেছে ডিএনসি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কোকেনের চালানের বিষয়ে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে, নাইজিরিয়া থেকে পাঠানো অর্থ কয়েক হাত ঘুরে আসত বাংলাদেশে। পরে স্থানীয় মুদ্রা থেকে সেই অর্থ কনভার্ট করা হতো ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। আন্তর্জাতিক এই মাদক চক্রটির বাংলাদেশী এক সদস্যের খোঁজে নেমেছে ডিএনসি, যার মাধ্যমে মূলত অর্থ স্থানান্তর হতো। নাইজিরিয়ান নাগরিক ডন ফ্রাঙ্কি আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের গডফাদার। গত ২৪ জানুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আট কেজি ৩০০ গ্রাম কোকেনসহ মালাবির নাগরিক নোমথান্দাজো তাওয়েরা সোকোকে গ্রেপ্তার করা হয়। এটি এখন পর্যন্ত দেশে জব্দকৃত কোকেনের সবচেয়ে বড় চালান। যার বাজারমূল্য শতকোটি টাকা।

ডন ফ্রাঙ্কি নাইজিরিয়ান মাদক চক্রটির হোতা। ঢাকার বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী চিদারা। বর্তমানে নাইজিরিয়ায় অবস্থানরত ফ্রাঙ্কি সেখানকার মুদ্রা নাইরা তুলে দিতন চিদারার মা ক্যারোলিনা ওকোরি এবং প্রেমিকা মনিকার কাছে। মনিকা একজন বাইন্যান্স ডিলার। সে সেই মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বদলে চিদারার বাইন্যান্স ওয়ালেটে পাঠাত। নাইজিরিয়ায় থাকা অবস্থায় চিদারা তার বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট খোলেন। দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে থাকায় তার হিসাবটি স্থগিত করে বাইন্যান্স কর্তৃপক্ষ। তখন থেকে চক্রের বাংলাদেশী এক সদস্যের ওয়ালেটে টাকা আসতে থাকে। এই সদস্যদের নাম পরিচয় পেয়েছে ডিএনসির তদন্ত কর্তৃপক্ষ।

সূত্র জানায়, দেশের সবচেয়ে বড় কোকেনের চালানের জন্য কাকে কত টাকা দিতে হবে, সেই তালিকা নাইজিরিয়া থেকে অস্কারের কাছে পাঠাত ফ্রাঙ্কি। অস্কার সেই তালিকা দিত চিদারাকে। চিদারা সেই তালিকা দিত বাংলাদেশী একজনকে। সেই বাংলাদেশীর খোঁজ করছেন গোয়েন্দারা।

ডিএনসির অতিরিক্ত মহাপরিচালক তানভীর মমতাজ বলেন, গ্রেপ্তার সবাই ডন ফ্রাঙ্কির কাছের লোক। তারা বাংলাদেশে এটি ছড়িয়ে দিতে চায়। আর চোরাচালানের এই টাকার কিছু বাংলাদেশে থেকে যায়, আর কিছু বাইরে চলে যায়। ইতোমধ্যে মানিলন্ডারিং নিয়েও তদন্ত শুরু করেছে ডিএনসি। কোকেনের চালান মূলত ডন ফ্রাঙ্কি এবং তার ভাই ডন উইজলির। উইজলি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ হয়ে কোকেনের প্রাথমিক গন্তব্য ছিল ভারত। সেখান থেকে ইউরোপ-আমেরিকার কোনো দেশ।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ কোকেনের বড় বাজার। ফলে কোকেনের এক পুরিয়া বা দুই পুরিয়া করে আমরা ধরতে পারি। কারণ, উচ্চবিত্তের কাছে এই কোকেনের একটা বড় চাহিদা আছে। আর এর দামও অনেক বেশি। কিন্তু সাড়ে আট কেজি কোকেন বাংলাদেশে খাওয়ার মতো বা রাখার মতো কেউ নেই। ফলে আমরা ধারণা করছি, এই কোকেনের গন্তব্য ছিল ভারত, সেখান থেকে ইউরোপ-আমেরিকার কোনো দেশ। ফ্রাঙ্কি এর আগেও ইউরোপ-আমেরিকায় কোকেন পাচার করেছে বলে তদন্তে বেরিয়ে আসছে।

ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি কোকেনের চালান ধরা পড়ে। জব্দ হওয়া ওইসব কোকেন এসেছিল ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জন্য। বাংলাদেশকে শুধু মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা হয়েছিল। যা পরবর্তীতে তদন্তে বেরিয়ে আসে। ছাড়া বাংলাদেশের কোনো মাদক মাফিয়া এর সঙ্গে জড়িত কি-না সেটিও জানতে সম্মিলিতভাবে অনুসন্ধান অব্যাহত আছে।

গত বছরের ১০ জুন শাহজালালে প্রায় দুই কেজি কোকেনসহ গ্রেপ্তার হয় মরক্কো থেকে আসা ভারতীয় নারী সালোমি লালরামধারি। জব্দ কোকেনের গন্তব্য ছিল নয়াদিল্লি। ২০১৩ সালের ১১ জুন ঢাকার কাওরান বাজারের হোটেল লা ভিঞ্চি থেকে প্রায় তিন কেজি কোকেনসহ গ্রেপ্তার হয় পেরুর নাগরিক হুয়ান পাবলো রাফায়েল জাগাজিটা। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রায় আড়াই কেজি কোকেনসহ গ্রেপ্তার হয় পেরুর আরেক নাগরিক জেইম বার্গলে গোমেজ। ২০১৫ সালের জুনে চট্টগ্রাম বন্দরে বলিভিয়া থেকে আসা সূর্যমুখী তেলের ড্রামে ভরা তরল কোকেন ধরা পড়ে। জাহাজে একটি কনটেনারে আসা ১০৭টি তেলের ড্রামের মধ্যে একটিতে কোকেন পাওয়া যায়। ড্রামটিতে প্রায় ১৮৫ কেজি সানফ্লাওয়ার তেলের পরিবর্তে ছিল তরল কোকেন। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ২৭০ কেজি হেরোইন পাঁচ কেজি ৩০০ গ্রাম কোকেনসহ বাংলাদেশী নাগরিক দেওয়ান রাফিউল ইসলাম হিরো জামাল উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে শ্রীলঙ্কান পুলিশ। ছাড়া ডিবি পুলিশ গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেল থেকে এক আফ্রিকান নারীকে প্রায় পাঁচ কেজি কোকেনসহ গ্রেপ্তার করে। তিনি খেয়ে পেটের ভেতরে কোকেনগুলো নিয়ে এসেছিলেন। পরবর্তীতে তার পেটা ব্যথা শুরু হলে হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবিজিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে জীবন বাঁচাতে ওই আফ্রিকান নারী জানান তার পেটে কোকেন রয়েছে। যা তিনি খেয়ে এনেছেন। নির্ধারিত সময়ে একজন ব্যক্তির বিশেষ ট্যাবলেট নিয়ে তার কাছে আসার কথা ছিল। কিন্তু তিনি আসেননি। পরবর্তীতে ডিবি পুলিশ তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে পেট ওয়াশ করে কোকেনগুলো বের করে। মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় তাকে। সব ঘটনায় বাহক ধরা পড়লেও এর পেছনের কারিগররা আড়ালেই থেকে গেছেন।

ডিএনসির দেওয়া তথ্যমতে, কাটআউট পদ্ধতিতে মাদকের এই বড় চালানটি পাচার করা হচ্ছিল। এর আগেও ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এখানে হাত বদল হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ কাউকে চেনে না। দেশের বাইরে বসে এসব হাত বদলের প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাহক নির্দেশ মতো হাতবদল করে থাকেন। ক্ষেত্রে সাংকেতিক কোড অথবা ড্রেস কোড ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ডিএনসির মহাপরিচালক মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকী বলেছেন, যাত্রীবাহী ফ্লাইটগুলোতে যাত্রীদের মালপত্রের মধ্যে মাদক পাচার করে আসছিল একটি চক্র। চক্রের হোতা ডন ফ্রাঙ্কির মূল নাম জ্যাকব ফ্রাঙ্কি। সেবিগ বসহিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে নাইজিরিয়ান কমিউনিটির প্রেসিডেন্টও সে। গত বছর ধরে বাংলাদেশে থাকলেও মাস আগেই দেশ ছাড়ে সে। এখন নাইজিরিয়ায় বসেই বিভিন্ন দেশের মাদক বহনকারীদের সমন্বয় করে।

বিদেশি মাদক মাফিয়াদের সঙ্গে বাংলাদেশী মাদক মাফিয়াদের জব্দ হওয়া কোকেনের বিষয়ে কোনো যোগসূত্র বা যোগাযোগ আছে কি-না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তদন্ত চলছে।

×