ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১

পার্বত্য চট্টগ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টি নিরাপত্তার তাগিদ

প্রকাশিত: ১৯:৫৯, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

পার্বত্য চট্টগ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টি নিরাপত্তার তাগিদ

গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

  • খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের গোলটেবিল বৈঠক  

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠী যারা অপুষ্টিতে ভুগছে তাদের জন্য পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।  এলক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ ও টেকসই পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে, বিশেষ করে মা ও শিশুর যথাযথ পুষ্টি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এছাড়া ওই অঞ্চলের ক্ষুদ্র কৃষকের উন্নতি সাধনে বৃহৎ, ছোট এবং মাঝারি উদ্যোগ গ্রহণ, উদ্ভাবনী চাহিদা সৃষ্টি, বহুমুখী ব্যবহার, অপুষ্টি রোধে সক্রিয়তা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পার্বত্যবাসীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও নতুন নতুন কর্মসূচি ও পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ এবং ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন গেইন’ এর সহ-আয়োজনে অনু্িষ্ঠত গোলটেবিল বৈঠকে অংশনিয়ে বক্তরা এসব কথা বলেন। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনের এটিএম শামসুল হক অডিটোরিয়ামে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক এবং লিন প্রকল্পের সহ-আয়োজনে ‘এডভান্সিং নিউট্রিশন কমিটমেন্ট ফর চিটাগং হিল ট্র্যাক্ট এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। খাদ্যঅধিকার বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক এবং ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী’র সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মশিউর রহমান এনডিসি,  সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থি ছিলেন চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় ও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংসুই প্রু চৌধুরী। 

গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. মো. রুহুল আমিন তালুকদার। গোলটেবিল বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন গেইন এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. রুদাবা খন্দকার এবং সঞ্চালনা করেন খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সমন্বয়কারী ও ওয়েভ ফাউন্ডেশন এর সুশাসন, অধিকার ও ন্যায্যতা কর্মসূচির উপ-পরিচালক কানিজ ফাতেমা। এছাড়াও নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিবৃন্দ এতে অংশগ্রহণ করেন। সভাপতির বক্তব্যে মহসিন আলী বলেন, পরিবেশসম্মত কৃষি উৎপাদন না হলে নিরাপদ খাদ্য হবে না। আর নিরাপদ খাদ্য না হলে সকলের পুষ্টি নিশ্চিত হবে না। তাই পুষ্টি বিষয়ক আলোচনা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্যদেরকেও এতে সম্পৃক্ত করতে হবে। সকলের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করেই স্মার্ট বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে মো. মশিউর রহমান এনডিসি বলেন, ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তির আগে যেখানে আমরা পার্বত্য অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারতাম না সেখানে এখন সরকারের সহায়তায় প্রচুর উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। 

খাদ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটেছে। শুধু ভাতা বা খাদ্য সহায়তা দিয়ে পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়, দরকার মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। শুঁটকি যদি পুষ্টির অন্যতম উপকরণ হয়, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় গবেষণার মাধ্যমে পুষ্টি নিশ্চিতকরণে সরকার কাজ করবে। চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বলেন, পার্বত্যাঞ্চলের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস বহুমাত্রিকভাবে চিহ্নিত করে বাস্তাবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সকল জেলা, উপজেলা, মৌজায় সমন্বয়ের মাধ্যমে পুষ্টি কার্যক্রম বাস্তবায়ন হলে তা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে। অংসুই প্রু চৌধুরী বলেন, পাহাড়ি এলাকায় পরিবর্তন আনয়নে ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় সচেতনতামূলক বার্তাগুলো ঘরে ঘরে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেই সরকারের লক্ষিত ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব। আর স্মার্ট নাগরিক তৈরিতে আমাদের পুষ্টিসমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. জাকির হোসেন আকন্দ বলেন, পার্বত্য এলাকার পুষ্টির অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হলে এখানকার জনগণকে শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে হবে। স্বাগত বক্তব্যে ড. রুদাবা খন্দকার বলেন, জাতীয় জীবন থেকে অপুষ্টি দূর করতে চাইলে এমন একটি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার যা টেকসই হবে। আগামীর বাংলাদেশকে আমাদের সকলের হাতে হাত রেখে উদ্যোগ নিতে হবে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. মো. রুহুল আমিন তালুকদার বলেন, গত ২০ বছরে পুষ্টির দিক থেকে বিশেষ করে বাংলাদেশ শিশু পুষ্টির উন্নতিতে বেশ অগ্রগতি লাভ করেছে। তা সত্ত্বেও জাতীয় ও বিভাগীয় অবস্থার তুলনা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিশুদের পুষ্টির অবস্থা তুলনামূলকভাবে খারাপ। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য এবং পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবহারের সচেতনতার অভাবের কারণে শিশুর শারীরিক বিকাশ নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপুষ্টিজনিত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল বিশেষ করে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার শিশুদের বয়স অনুযায়ী যে উচ্চতা ও ওজন থাকার কথা সে অনুযায়ী কম আছে। বয়স অনুযায়ী শিশুদের যে উচ্চতা থাকার কথা তা জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে আছে ১০ শতাংশ সেখানে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আছে যথাক্রমে মাত্র ৯  এবং ৪ ভাগ। জাতীয় ও বিভাগীয় জেলাগুলোতে নিরাপদ খাবার পানি পাচ্ছে যথাক্রমে ৯৯ এবং ও ৯৭ ভাগ জনগণ। এক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলা যথাক্রমে মাত্র ৫৯ এবং ও ৫৭ ভাগ।

পুষ্টির জন্য জাতীয় কর্ম-পরিকল্পনা (২০১৬-২০২৫) অনুযায়ী, বাংলাদেশ শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানের ক্ষেত্রে ৯৮ ভাগ সফলতা অর্জন করেছে। তিনি লিন প্রকল্পের বেশকিছু অর্জন সম্পর্কে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে পুষ্টি-সংবেদনশীল প্রোগ্রামিংয়ে ক্ষমতা এবং আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় শক্তিশালী হয়েছে।  স্থানীয় জনগণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন ও বাজার সংযোগের বিষয়ে প্রশিক্ষিত হয়েছেন। জেলা ও ১৮টি উপজেলা পুষ্টি সমন্বয় কমিটি এখন পরিকল্পনা, পুষ্টি কার্যক্রম বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়েছে ইত্যাদি। গোলটেবিল বৈঠক থেকে যেসব চ্যালেঞ্জ উঠে আসে, তার মধ্যে রয়েছে-পার্বত্যাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্য অপচয়, আমিষের অভাব, জন্মগতভাবে কম ওজন, অপুষ্টিজনিত রক্তশূন্যতা, আয়োডিনের অভা, ভিটামিনের অভাব, সংকটকালীন (কোভিড মহামারী, ইউক্রেন যুদ্ধ), মূল্যবৃদ্ধির কারণে খাদ্যের অপ্রতুলতা,  নারীর স্বাস্থ্য রক্ষায় বয়ঃসন্ধি ও যুবসহ সব বয়সে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত না করার কারণে নারীর পুষ্টিহীনতার হার হ্রাস আশাব্যঞ্জক নয়,  গ্রামীণ এলাকায় কৃষি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনে অবকাঠামোগত (যোগাযোগ, বাজার) অপর্যাপ্ততা, জলবায়ু বিপর্যয়,  কৃষকদের জন্য ন্যায্যমূল্য এবং নারী-পুরুষ মজুরি সমতা নিশ্চিত না করা প্রভৃতি।

এম শাহজাহান

×