ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

পরিকল্পনা ছাড়াই শুরুর অভিযোগ

সরকারি হাসপাতালেই ‘চেম্বার’ কার্যক্রম কাল থেকে

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: ০০:০৩, ২৯ মার্চ ২০২৩

সরকারি হাসপাতালেই ‘চেম্বার’ কার্যক্রম কাল থেকে

সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযোগ

সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযোগ তারা হাসপাতালের চাইতে ব্যক্তিগত চেম্বারে বেশি সময় দেন। সরকারের নানামুখি পদক্ষেপেও এই অভিযোগ কমার কোনো নাম নেই। এতে করে নানামুখী ভোগান্তির শিকার হতে হয় রোগীদেরও। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে চিকিৎসকদের নিজ প্রতিষ্ঠানে বৈকালিক চেম্বার চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। চলতি মাসের ১ তারিখ থেকেই চালু হওয়ায় কথা ছিল এই প্রাতিষ্ঠানিক চেম্বারের। কিন্তু নানামুখী চাপে তা বাস্তবায়ন না হলেও কাল বৃহস্পতিবার থেকে পাইলটিং আকারে প্রাতিষ্ঠানিক চেম্বার চালু করা হচ্ছে। 
তবে এ বিষয়ে কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই পাইলটিং শুরু করার অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে বৈকালিক চেম্বারে রোগীরা এলে তাদের বসার জায়গা দেয়া হবে কোথায়, তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে কি না বা ঠিক কতটা হাসপাতালে এবং কোন কোন হাসপাতালে এই কার্যক্রম চালু হবে তা স্পষ্ট করেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ফলে পুরো কার্যক্রমে একটি হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। 
এর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল, মার্চ মাসের ১ তারিখ থেকে সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট অফিস সময়ের বাইরের সময়ে সরকারি হাসপাতালেই চেম্বারের মাধ্যমে রোগী দেখবেন। পর্যায়ক্রমে এ সংক্রান্ত পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে ৫০ উপজেলা, ২০ জেলা ও ৫ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শুরু হবে এ কার্যক্রম।

তবে সোমবার এ সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলা ও ২০টি উপজেলায় পাইলটিংভাবে এ চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হবে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ৫০০টি উপজেলায় শুরু হবে এ কার্যক্রম। এই প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ একজন অধ্যাপকের ফি ধরা হয়েছে ৫০০ টাকা আর সর্বনি¤œ এমবিবিএস/বিডিএস ও সমমানের চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২০০ টাকা। 
এ বিষয়ে জাহিদ মালেক বলেন, চিকিৎসকদের ডিউটি সময়ের বাইরে বিভিন্ন ক্লিনিক বা ফার্মেসিতে যেভাবে চেম্বার খুলে রোগী দেখতে হতো, সরকারি এই বিশেষ সুবিধার জন্য নিজ নিজ কর্মস্থলেই সেই সুযোগ পাচ্ছেন তারা। এ বিষয়ে চিকিৎসক নেতাসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলের মতামত নিয়েছে সরকার। এই কাজটি শুরু করতে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তাদের মতামত অনুসারে দেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত জনকল্যাণকর এই মহানুভব কাজের শুরু করতে যাচ্ছি আমরা।

১ মার্চ না হলেও স্বাধীনতার মাসেই আমরা কার্যক্রম শুরু করছি। এই কাজটি শুরু হলে দেশের লাখ লাখ মানুষ বিভিন্ন ক্লিনিক, ফার্মেসিতে ডাক্তার দেখানোর ভোগান্তি থেকে রেহাই পাবেন। পর্যায়ক্রমে আমাদের এ সংক্রান্ত পাইলট প্রজেক্ট বাস্তবায়ন শুরু হবে। এটি একেবারে ছোট না। এর মাধ্যমে জনগণ আরেকটু ভালো স্বাস্থ্যসেবা পাবেন উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালে গিয়ে তারা চিকিৎসক পাবেন। যারা ভর্তি আছেন, তারাও চিকিৎসা পাবেন। একসঙ্গে অনেক ডাক্তার পাওয়া যাবে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষারও ব্যবস্থা থাকবে। 
এটি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব কিছু নয় দাবি করে মন্ত্রী বলেন, প্রাইভেট প্র্যাকটিস নতুন কনসেপ্ট নয়। শুরু করতে গাইডলাইন লাগবে, সেখানে সময়, অর্থ সব নিয়ে কাজ শুরু করব। কাজ করার মধ্যে যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয়, সেটি সমাধান করব। 
এতসব পরিকল্পনার কথা বললেও ডাক্তাররা বৈকালিক চেম্বারে হাসপাতালে কোথায় বসবেন, কতক্ষণ রোগী দেখবেন এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি। এ বিষয়ে গঠিত একটি টিমের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের সরকারি হাসপাতালে এমনিতেই যথেষ্ট জনবল নেই। সম্প্রতি কয়েকটা জেলা-উপজেলার স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এই গবেষণায় আমরা দেখেছি জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক সংকটের করুণ চিত্র। শুধু চিকিৎসকই নয় বেশিরভাগ হাসপাতালেরই নেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি। এমনকি যথেষ্ট আয়া পর্যন্তও নেই কোথাও কোথাও। 
এমন অবস্থায় সরকারি হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে রোগী দেখার সময় ডাক্তার অন্যদের কাছ থেকে কতটা সাহায্য পাবেন তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বৈকালিক সময়ে যেসব রোগী চিকিৎসা নিতে আসবেন তারা কোথায় বসবেন, তাদের সিরিয়াল কিভাবে মেইনটেইন হবে বা ফি যেটা নির্ধারণ করা হয়েছে তা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে তৈরি হয়েছে দ্বিধা। আবার বলা হয়েছে বৈকালিক চেম্বারের পরও চিকিৎসকরা ব্যক্তিগত চেম্বার করতে পারবেন। এই অবস্থায় একজন চিকিৎসক আসলে চিকিৎসা সেবাটা কতটুকু আন্তরিকতার সঙ্গে করতে পারবে? এতে না হিতে বিপরীত অবস্থা তৈরি হয়ে যায়।
স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে এই প্রথমবারের মতো ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের বিষয়ে বলা হলেও রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) ২০১১ সাল থেকেই রোগীদের বৈকালিক সেবা দেয়া হচ্ছে। এখানে হাসপাতালের কর্মঘণ্টা শেষে  ২৬টি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা শুক্র ও শনিবার বাদে বাকি পাঁচদিন ২০০ টাকা ভিজিটে রোগী দেখেন। এই প্র্যাকটিস চলে বিকেল পর্যন্ত। এজন্য বেলা আড়াইটা থেকে বহির্বিভাগের বিশেষ সেবার টিকিট বিক্রি শুরু হয়। 
এই অবকাঠামো বা সুবিধা অন্যান্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই দাবি করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, বিএসএমএমইউতে যখন এই সেবাটা চালু হয় তখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সিনিয়র অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক সবারই প্রচুর আগ্রহ ছিল। রোগীরাও যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এক্ষেত্রে সবার আগ্রহে ভাটা পরে।

গতানুগতিকভাবে সিনিয়র অধ্যাপকরা জুনিয়র মেডিক্যাল অফিসারদের বসিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত চেম্বারে চলে যান। এটার তদারকিতে আর কেউ থাকেন না। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি এমন অবস্থা হয় তাহলে সরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্র কেমন হবে? ওখানে তো মেডিক্যাল অফিসারও থাকবেন না। পরে ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের বিষয়টি শুধু কাগজে কলমেই রয়ে যাবে। 
তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই কল্যাণমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের হার কমিয়ে আনা হবে। বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ছয় হাজার চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। এরপরও প্রতিবছর অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নেন।
এর অন্যতম কারণ চিকিৎসকদের প্রতি আস্থাহীনতা উল্লেখ করে ভারতের চেন্নাইতে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে যাওয়া হৃদরোগে আক্রান্ত শিলা দেবী বলেন, আমার ছোট ছেলেটার হঠাৎ করে কানে তীব্র ব্যথা উঠল। নিয়ে গেলাম নামকরা একজন নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে। ছেলের আমার ডান কানে ব্যথা করে তিনি তাড়াহুড়ায় বাম কান দেখে একগাদা পরীক্ষাসহ এন্টিবায়োটিক দিয়ে দিলেন। ছেলে চেম্বার থেকে বের হয়ে হাউ মাউ করে কান্না।

বলে এমন পচা ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছি যে তিনি আমার ঠিক কোন কানে ব্যথা তাই জিজ্ঞেস করার সময় পাননি। এখন ব্যক্তিগত চেম্বারেই যদি তার এই অবস্থা হয় তাহলে সরকারি হাসপাতালে যদি চেম্বার করেন তাহলে কি হবে? এখানে তো আমি তার ফি বাবদ ১০০০ টাকা দিয়েছি। ২০০ টাকার বিনিময়ে এই চিকিৎসক তো রুমে না ঢুকিয়েই রোগীকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে দেবেন। 
আবার অনেক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালে না গিয়ে শুধু বেসরকারি চেম্বারে রোগী দেখেন অনেকে। এমন অবস্থায় সরকারি হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিস চালু হলে অনেক চিকিৎসক এর সুযোগ নিতে পারেন এবং তেমনটা হলে সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা আরও প্রশ্নের মুখে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কথা স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি হাসপাতালের এক সহযোগী অধ্যাপক জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারি খাতে যখন সেবা দেয়া হবে তখন চিকিৎসকের ভিজিট ফি এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ ইত্যাদি সরকারি অর্থে করার ব্যবস্থা করতে হবে।

একইসঙ্গে চিকিৎসকদের যেন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে না সেই বিষয়টি নজরে নিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো তাদের যে পরিমাণ বেতন দেয় সরকারের উচিত হবে সে পরিমাণ বেতন চিকিৎসকদের দেয়া। এতে করে রোগীদের সেবায় তারা অধিকতর মনোযোগী হবে। একজন চিকিৎসক আর ব্যক্তিগতভাবে চেম্বার করার কথা ভাববেন না। 
তবে সব প্রতিকূলতা পেরিয়েই রোগীদের সরকারি হাসপাতালেই বেসরকারি চেম্বারের মতো চিকিৎসা দেয়া হবে বলে দাবি করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে জনগণ আরেকটু ভালো স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। হাসপাতালে গিয়ে তারা চিকিৎসক পাবেন। যারা ভর্তি আছেন, তারাও চিকিৎসা পাবেন। একসঙ্গে অনেক ডাক্তার পাওয়া যাবে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষারও ব্যবস্থা থাকবে। 
মন্ত্রী জানান, সরকারি ইনস্টিটিউটে প্র্যাকটিসের কথা বলা হয়েছে, তারা যাতে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে প্র্যাকটিস করতে পারেন। কারা, কতক্ষণ, কিভাবে প্র্যাকটিস করবেন, সেটি বাস্তবায়নে একটি টিম গঠন করেছি। তারা আমাদের অবহিত করবেন। 
তবে বিষয়টি হুট করে একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করে বরং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের তাগিদ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, এতবড় কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য অবকাঠামোর যেমন প্রয়োজন রয়েছে তেমনি প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবলের। শূন্য পদগুলোতে নিয়োগদান, চিকিৎসকদের বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত রোগী দেখার জন্য রোস্টার তৈরির পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত চেম্বার করারও সুযোগ দিতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বৈকালিক চেম্বারকে মডেল হিসেবে ধরে প্রয়োজনে আরও এক বছর সময় নিয়ে এটি চালু করা যেতে পারে বলে আমি মনে করি। 
তবে কষ্ট হলেও জনস্বার্থে চিকিৎসকরা এই কাজে এগিয়ে আসবে বলে মনে করেন এই কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে গঠিত কমিটির সদস্য ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি ডা. মো. জামাল উদ্দিন চৌধুরী। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক চেম্বার ধারণাটি আসলে অনেক পুরোনো। এটির বাস্তবায়নে নানা সময়ে নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান সরকার যেহেতু অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এটিকে বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছেন তাহলে আমি মনে করি নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চিকিৎসক সমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাগে এটি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে।

×