ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২

অপরাজিতা

উদ্যমী ও পরিশ্রমী হোসনে আরা

রাজু মোস্তাফিজ

প্রকাশিত: ১৭:৪৫, ১২ মার্চ ২০২৬

উদ্যমী ও পরিশ্রমী  হোসনে আরা

যারা উদ্যমী ও পরিশ্রমী কোনো বাধা-বিপত্তিই তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত প্রতিবন্ধী দশম শ্রেণির ছাত্রী হোসনে আরা। সেই ছোট বেলা থেকেই মেধাবী সে। নানা সংগ্রাম আর দারিদ্রতার কাছে হার না মেনে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সে স্বপ্ন দেখে একদিন উচ্চ শিক্ষিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে। দেশের প্রতিবন্ধী মানুষসহ গরিব আর অসহায় মানুষের জন্য কাজ করবে। কিন্তু তার এই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দরিদ্রতা। আদৌ কি তার এই স্বপ্ন পূরণ হবে? এমন চিন্তায় দিন কাটছে তার এবং তার পরিবারের মানুষদের।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মহিধর গ্রামের কিশোরী হোসেনে আরা। জন্ম থেকেই দুই পা ও একটি হাত অচল নিয়েই বেড়ে উঠেছে। তবু থেমে যায়নি তার স্বপ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে অন্যদের আলোর পথ দেখাতে চায় সে। আর সেই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে নিজের জীবনের সবকিছু প্রায় ত্যাগ করেছেন তার বাবা দিনমজুর হোসেন আলী। শুধু সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ও তার চিকিৎসার জন্য বাড়ি-ভিটার ১৬ শতক জমি বিক্রি করেছেন। তিল তিল করে গড়ে তুলছেন মেয়ে হোসনে আরাকে। নিজের কাজের ক্ষতি করে প্রতিদিন বাইসাইকেলের পেছনে বসিয়ে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মেয়েকে তিন কিলোমিটার দূরের স্কুলে নিয়ে যান এবং নিয়ে আসেন। হোসনে আরার শরীরের  একপাশে অচল। কেবল বাম পাশ এবং  হাতটিই তার একমাত্র ভরসা। জন্মের পর থেকেই দারিদ্র্যতার মধ্যে কাটালেও তার সুস্থতার জন্য বাবা-মা শহর গ্রাম ও রংপুর মেডিকেলের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছিলেন। কিন্তু এত চিকিৎসায় ফেরেনি তার শারীরিক সক্ষমতা। তবুও হোসনে আরা ও তার পরিবার থেমে থাকেনি। ছোট বেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ হোসেনে আরার। প্রতিটি ক্লাসেই মেধার স্বাক্ষর রাখতো। সন্তানের পড়াশোনার আগ্রহ দেখে বাবা তাকে তিন কিলোমিটার দূরের সিংগীমারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। সেখানেই প্রতি ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করে আসছে। বর্তমানে হোসনে আরা সিংহীমারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে বাবা মো. হোসেন আলী নিজের জীবিকাও বিসর্জন দিয়েছেন। আগে ভ্যান চালালেও মেয়েকে বারবার স্কুলে ও প্রাইভেটে আনা-নেওয়া করার প্রয়োজনে তাও ছেড়ে দিয়েছেন। এখন অন্যের জমিতে বর্গাচাষ ও দিন মজুরি করেই চলে তাদের সংসার।
 এলাকাবাসীরা জানায়, ছোটবেলা থেকেই হোসনে আরাকে দেখি সে অসুস্থ। আমরা চাই সবাই যেন তাকে সহযোগিতা করে। সে যেন লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। নিজের কাজ নিজে করতে পারে। তার সহপাঠীরা বলেন, হোসনে আরা আমাদের বান্ধবী। সে যে প্রতিবন্ধী তাকে আমরা কখনোই বুঝতে দেই না। তার সঙ্গে আমরা হাসিখুশি চলাফেরা করি। স্কুলের কেউ তাকে খারাপ চোখে দেখে না।
বাবা হোসেন আলী মা-আলুপা বেগম জানায় মেয়ের জন্য বাইরে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পাই না। ওকে বার বার আনা-নেওয়া করতে হয়। সংসার চালানো এখন খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার থেকে যদি কোনো সহায়তা পাওয়া যায় তাহলে খুব উপকার হতো।
শিক্ষার্থী হোসনে আরা জানায়, আমি বড় হয়ে শিক্ষক হতে চাই। আমার পড়াশোনা করতে ভালো লাগে। একটি অটোমেটেড (মোটরচালিত) হুইলচেয়ার থাকলে নিজেই স্কুলে যাতায়াত করতে পারতাম। বাবার কষ্টটা একটু কমতো।
সিংহীমারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চালোক্য রায় জানায় হোসনে আরা একজন মেধাবী ছাত্রী। প্রতিবন্ধী হলেও তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আছে। তার বাবা অনেক কষ্ট করে মেয়েকে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসিয়ে স্কুলে নিয়ে আসে। আমরা চেষ্টা করছি সে যেন আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান জানায় হোসনে আরা আমাদের স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল ৪ বছর আগে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সে হাঁটতে পারে না। ক্লাসের সহপাঠীরা তাকে সহযোগিতা করে। স্কুল থেকে তাকে সব রকম সহযোগিতা দেওয়া হয়। 

প্যানেল/মো.

×