উত্তাল মার্চ। স্বাধীনতার মাস। বছর ঘুরে এ মাস এলেই দলে দলে মহান মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও অংশগ্রহণের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠে। আরও ভেসে উঠে পাকি হায়েনা দলের এবং তাদের সহায়তাকারী আলবদর আল সামস ও রাজাকার বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্মম বর্বরতা দৃশ্য। দলে দলে ভীত সন্ত্রস্ত নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ বনিতা ও শিশুরা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সেই দৃশ্য এখনো যাটোর্ধ্ব বয়সী মানুষের চোখের সামনে ভেসে উঠে। বিশেষ করে সেই সময়ে শিশু ও নারী এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের কষ্ট ছিল সবচেয়ে বেশি। ইতিহাসের নৃশংসতম এ গণহত্যা, নারী নির্যাতন এবং জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে বাংলার জমিন ছারখাড় করে দেওয়া স্বাধীন বাংলাদেশে অভ্যুদয়ের সাক্ষী।
উত্তাল মার্চের এই দিনে মনে পড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাফিনা লোহানীর কথা। একাত্তরের মার্চে তিনি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। তিনি জীবদ্দশায় রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে পাকি হায়েনা দলের লালসা ও লাঞ্ছনার শিকার নারীদের একত্রিত করে সামাজিকভাবে এবং মমতাময়ী মায়ের দরদে লালন পালন করেছেন। স্বাধীনতার চার দশক পরেও সমাজে তার ছিলেন যেন অবাঞ্ছিত। লাঞ্ছনা, ধিক্কার ও তিরস্কার ছিল তাঁদের অনেকের নিত্যসঙ্গী। এসব নারী ছিলেন সমাজে চরম অসহায় অবস্থায়। তাদের মধ্যে রাহেলা বেগম, হাজেরা বেগম, কমলা বানু, হামিদা বেগমসহ প্রায় ১৫ জন নারী যারা স্বাধীনতার পর সমাজে কোথাও ঠাঁই পায়নি। স্বামী কিংবা বাবা-মা কেউ তাদের ঘরে তুলে নেয়নি। অন্যের বাড়ি কাজ করে খাবেন, তা-ও সম্ভব হয়নি, কেউ কাজও দিতে চায়নি তখন। তারা নিজ এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দূরে। ঠাঁই নিয়েছিলেন রেললাইন কিংবা ওয়াপদা বাঁধের পাশের সরকারি জায়গায়। ছোট একটি কুঁড়েঘরে থেকেছেন অনেক দিন। খুব কষ্টে কাটছিল দিন।
সদ্য স্বাধীন দেশে তারা নিজেদের লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। এজন্য তাদের চরম আর্থিক কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। কখনো কখনো উপোষ করতে হয়েছে।
কয়েক বছর পর হঠাৎ করেই সাফিনা লোহানী খুঁজে বের করেন তাদের। এই চরম দুঃসময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাফিনা লোহানী তাদের পাশে এসে দাঁড়ান। খুঁজে খুঁজে বের করেন ১৫ জন নারীকে। তিনি মায়ের স্নেহ দিয়ে বুকে তুলে নেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে তাদের পরিচয় করিয়ে দেন। অভাব দূর করতে বিভিন্নভাবে টাকা সংগ্রহ করে তাদের মধ্যে বিতরণ করেছেন তিনি। তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেন। আর্থিক সাহায্য করে তাদের স্ব-স্ব মর্যাদায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীতে তাদের বীরঙ্গনা নারী হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারা পরিচয় পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। সেই মমতাময়ী সাফিনা লোহানী, যিনি তালিকাভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, তার স্মৃতির প্রতি অতল শ্রদ্ধা এই উত্তাল মার্চে।
তিনি উত্তরণ মহিলা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। ছিলেন নারী নেত্রী। নারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য, অসাধারণ। তাঁর প্রধান কাজ ছিল প্রতিষ্ঠানে নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। তিনি করেছেনও। শিক্ষিত অথচ বেকার এবং অসহায় নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য তিনি কাজ করেছেন। অদম্য সাহসী এই নারী জীবন চলার পথে নানা ঘাত-প্রতিঘাতসহ্য করেছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মনোবল না হারিয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন। তিনি উন্নয়ন কর্মী হিসেবে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একাধিক সম্মাননা এবং পুরস্কার পেয়েছেন।
তাঁর স্বামী ছিলেন সিরাজগঞ্জ তথা উত্তারঞ্চলের প্রখ্যাত সাংবাদিক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম চৌধুরী। আমিনুল ইসলাম চৌধুরী তৎকালীন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্রনেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের মধ্যে তরুণ সংগঠক। একাত্তরের ৭ মার্চের পর আমিনুল ইসলাম চৌধুরী সিরাজগঞ্জে ফিরে এসে সাংগঠনিক কাজ শেষ করে চূড়ান্ত মুহূর্তে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে চলে যান গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকায়। দুস্তর রাস্তায় গরু গাড়ি ছিল একমাত্র বাহন। সেখানে স্ত্রীকে রেখে তিনি যান মুক্তিযুদ্ধে। সিরাজগঞ্জের ভাটপিয়ারির যুদ্ধে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় বাড়ি ফেরেন। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী তাকে সেবা দেন এবং ক্রমান্বয়ে সুস্থ হয়ে উঠেন। সাফিনা লোহানী শুধু স্বামীকেই নয় রণাঙ্গনে ক্লান্ত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় এবং সেবা দিয়েছেন।
তিনি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার খান সোনতলা গ্রামের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ফতেহ লোহানী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানের খ্যাতনামা পরিচালক টিভি ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী এবং সাংবাদিক নেতা ও কলামিস্ট কামাল লোহানী পরিবারের সন্তান।
প্যানেল/মো.








