সমতাভিত্তিক সমাজের উন্নয়ন, এগিয়ে যাওয়া সর্বস্তরের মানুষের এক অবারিত যাত্রাপথ। সমাজ-সভ্যতা সঠিক পথ নির্মাণে প্রত্যেকের অংশগ্রহণের মধ্যেই অবারিত যাত্রায় এগিয়ে চলেছে। যে কোনো অংশ পিছিয়ে পড়লে সমাজ কাঠামোর যথার্থ পথ নির্ণীত হয় না। সৃষ্টির ঊষাকাল থেকেই। সভ্যতা সূর্যের উদয়ের প্রারম্ভিক পর্যায়ে নারীর অবস্থা ছিল গৌরবময় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ও অভাবনীয় যাত্রাপথ। সঙ্গত কারণে সর্বংসহা জননীই ছিলেন শুধু মাতৃত্বের আবরণে নয় বরং সভ্যতার বীজ বপনের এক অবিস্মরণীয় অংশীদারিত্বে। এক সময় পরিবারহীন আর পিতৃত্বের পরিচয় আড়ালে থাকলেও যেমন কাঠামো গতিশীল হয়েছিল তাও নাকি নারীর হাত ধরেই। বিয়ে নামক সামাজিক প্রতিষ্ঠানটির জন্ম তো আরও পরের বিষয় অবাধ স্বেচ্ছাচার আর দলগত বিয়েতে বাবার কোনো চিহ্ন ছিল না বলে নৃতাত্ত্বিকদের বদ্ধমূল ধারণা। মায়ের গর্ভ থেকে সন্তান আসতো বলে মাকেই চেনা যেত। শুধু কি তাই? কৃষি সভ্যতার বীজ রোপণেও নারীদের অবস্থান ছিল ঐতিহাসিক, সামাজিক আর পারিবারিক বন্ধনের মিলন গ্রন্থি। আদিম সমাজের বন্যদশায় পুরুষরা ঘুরে বেড়াতো খাদ্য সংগ্রহ অর্থনীতির চাকা সচল করতে। ফলমূল হাতে করে নিয়ে আসতো। তেমন ফলমূলের বীজ থেকে খাদ্য উৎপাদন অর্থনীতি নারীদের অভাবনীয় কৃতিত্ব বলে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠিত। মাতৃত্ব আর কৃষি সভ্যতার বীজ বপন নারী সমাজকে যে উচ্চতর আসনে অভিষিক্ত করে সেটাই আদিম বন্য দশার পরম শক্তি আর সৌন্দর্য। তাই ঐতিহাসিক ধারায় নারীর যে প্রাসঙ্গিক এবং যৌক্তিক ভূমিকা তা আজও বহাল তবিয়তে টিকে আছে সন্দেহ নেই। কিন্তু সভ্যতা যত এগিয়েছে, সম্পদ ঐশ্বর্য যতই বাড় বাড়ন্ত হয়েছে সমাজ সংস্কার আধুনিক হলেও অপেক্ষাকৃত শারীরিকভাবে দুর্বল ও কোমল নারীদের অবস্থা উন্নত হলেও পুরুষের তুলনায় অনেকটা পেছানো। আর অধিকার, স্বাধীনতা খর্ব হওয়ারও চরম দুঃসময়। আধুনিক শিল্প প্রযুক্তি আমাদের প্রতিনিয়ত দুরন্ত গতিতে এগিয়ে নিলেও নারীরা কিন্তু বিভিন্নভাবে অবহেলিত আর পিছিয়ে পড়ার দৃশ্য উন্নয়নের ক্ষতচিহ্ন সমাজ ও নৃবিজ্ঞানীরা ধারণা দিচ্ছেন। আমরা এখন একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের অন্তিম প্রান্তে। সেখানে নারীর অবস্থানও চমকপ্রদ। নারী শিক্ষার হার বেড়েছে। কর্মজীবী নারীর সংখ্যকও হাতে গোনার জায়গায় নেই। একজন নারী গৃহিণী একই সঙ্গে যখন কর্মজীবীর অবস্থানে চলে যান তখন তার সন্তানের দেখভালের বিষয়টি সবার আগে উঠে আসে। যন্ত্র সভ্যতা যেমন অনেক উপহার দিয়েছে- বিপরীত প্রদাহ হিসেবে ঐতিহ্যিক প্রথা, বন্ধন, পারস্পরিক সম্পর্ক সৌহার্দ্য থেকেও পিছু হটেছে। এক সময়ের যৌথ পরিবার এখন এবার অবস্থানে ভিত্তি মজবুত করাও সমাজ সংস্কারের চলমান গতি। একক পরিবার শান্তি, স্বস্তি থাকলেও কত দুঃসময় মোকাবিলা করা যেন হিতে বিপরীতের চরম দাবানল। একজন কর্মজীবী মা যখন একক পরিবারের হাল ধরেন তখন তার কোলের সন্তানটিকে কোথায় রেখে নিশ্চিতে তিনি কাজে মন দেবেন? সমস্ত বিভাগীয় শহরের এমন দুরবস্থা। সেখানে বাসার রাতদিনের সাহায্যকারী অবস্থান দৃশ্যমান হলেও বিপদে বিপত্তি পিছু লেগে থাকে। পরম নিশ্চিন্তে, নির্দ্বিধায় কর্মক্ষেত্রে মনোনিবেশ করা সেটা কর্মজীবী নারীর প্রতিমুহূর্তের এক অসহনীয় সময় কাল। সঙ্গত কারণে তাকে মুষ্টিমেয় কয়েকটি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের জিম্মায় রেখে দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়। আলোচনা করতে চাই মূলত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র নিয়ে। সব কর্মক্ষেত্রে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র নেই। মুষ্টিমেয় হাতে মালা কয়েকটি। ঢাকা শহরে বাংলাদেশ ব্যাংকও সচিবালয়ে সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র হিসেবে ‘শিশু-দিবা যত্ন কেন্দ্র আছে। আরও কিছু কেন্দ্র থাকলেও অবস্থা এত নিম্নমানের উল্লেখ করার মতোই নয়।
শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্রে কিছু বৈশিষ্ট্য নীতিমালা, করণীয় বিষয় নির্ধারণ করা থাকে। কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্য যেমন জরুরি একইভাবে তাদের মনোশক্তি বিকাশও অবধারিত এক পর্যায়। প্রতিষ্ঠান সমূহ সব ধরনের নীতিমালা যথার্থভাবে পালন করে তাও কিন্তু নয়। অনেক সংকট শিশুদের যত্নের প্রতি অবহেলা এমনকি তাদের নিয়মমাফিক খাবারের ওপরও তেমন সযত্ন পরিচর্যা হয় না বলে হরেক তথ্য উপাত্ত দৃশ্যমান হয়। তাদের জন্য বরাদ্দ পুষ্টিকর খাদ্য থেকে বঞ্চিত করা ছাড়াও তাদের শারীরিক, মানসিক বিষয়টাও নজরে রাখা হয় না আর যত্ন আত্তির? বিশুদ্ধ পরিবেশও যে বাচ্চাদের নাগালের বাইরে চলে যায় সেটাও ভিন্নমাত্রা বৈপরীত্য। জোর জবরদস্তিতে বাচ্চার শরীর মনের ওপর যে বিপরীত প্রভাব পড়ে তাতেও কোমলমতি শিশুটি কোনোভাবেই ভালো থাকে না। স্বাস্থ্য না মানসিক বিকাশে। মহিলা অধিদপ্তরের সরকারি প্রতিবেদনেও এমন সব অসহনীয় তথ্য গণমাধ্যমের পাতাকে ভারী করছে। শিশুর সংখ্যার চাইতে খাবারের বিল করা হয় অনেক বেশি। ৪৫ জনের বিপরীতে বিল উপস্থাপন করা ৫৭ জনের। এমন সব আর্থিক অসংগতি নিয়েই নাকি বিভিন্ন দিবাযত্ন কেন্দ্র ঢিলেঢালা অবস্থায় চালানো হচ্ছে। অসহায় মাও মনোযোগ দিয়ে তার দাপ্তরিক কর্মযোগ যথার্থভাবে পালন করতে কিছুটা পিছু হটে তো বটেই। যার কারণে বিভিন্ন সচিত্র প্রতিবেদনে কর্মজীবী মায়েদের পেশাগত অবস্থান নাকি তার পুরুষ সহকর্মীর চাইতে খানিকটা পিছিয়ে। শারীরিকভাবে তিনি অফিসে থাকলেও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্নতায় ভুগেন। ফলে কর্মক্ষেত্রেও যথেষ্ট মনোসংযোগ বিঘ্নিত হয়। মহিলা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রাসঙ্গিক বিধিমালা প্রণীত থাকলেও বাস্তবে তার কোনো যথার্থ প্রযোগ এতই বিচ্ছিন্ন আর বিপদাপন্ন ধারণা করা যায় না। এমনিতে কর্মজীবী নারীর কাজের প্রতি অনীহা বিষয় নানাভাবে উঠে আসে। আবার শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্রের হরেক দুর্ভোগ, দুঃসময়ও সংশ্লিষ্টদের নানামাত্রিক ভোগান্তির শিকার করে। সমস্যা শুধু ক্ষুদ্র বাংলাদেশের নয় বিশ্বময় এমন অপদৃশ্য মা ও শিশুকে বিপন্ন বিপাকে ফেলে পরিবার থেকে কর্মক্ষেত্র পরবর্তীতে যার ছাপ পড়ে পুরো সমাজ ব্যবস্থার বলয়ে। পরিত্রাণের উপায় বের করা নাকাল পরিস্থিতির চাইতে ততোধিক অসহনীয় ঘেরাটোপ।
প্যানেল/মো.








