১৯৫৩ সালের ৪ মার্চ জন্ম নেওয়া সালেহা বেগম বেড়ে উঠেছিলেন এক সাধারণ পরিবারে। তাঁর বাবা মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার এবং মা মমতাজ আরা বেগম। ছাত্রজীবনেই তিনি ছিলেন সাহসী, সচেতন ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় তিনি যশোর মহিলা কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কিন্তু ইতিহাসের ডাকে সাড়া দিতে তিনি কেবল একজন ছাত্রী হয়ে থাকেননি তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক সাহসী যোদ্ধা।
১৯৬৯ সালে যে ‘নিউক্লিয়াস’ গঠিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন, সমাজতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত ও সাম্রাজ্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সালেহা বেগম ছিলেন তার একজন সক্রিয় সদস্য। স্বাধীনতার স্বপ্ন তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়নি, কিন্তু তরুণ প্রজন্মের অন্তরে স্বাধীনতার আগুন জ্বলে উঠেছিল। সংগঠিত হওয়ার লক্ষ্যে তারা গড়ে তোলেন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর থেকে সেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। প্রায় ২০০ জন ছেলে এবং মাত্র পাঁচজন মেয়েকে দেওয়া হয় অস্ত্র চালনা, বোমা তৈরি ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণের মতো কঠোর প্রশিক্ষণ। সেই পাঁচজন নারীর একজন ছিলেন সালেহা।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি আর পিছু হটেননি। প্রাণ বাজি রেখে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যশোরের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি অংশ নেন একাধিক যুদ্ধে। কেবল গোপন হামলা, গোয়েন্দাগিরি বা অস্ত্র সরবরাহের কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; নিয়মিত বাহিনীর সদস্য হিসেবে লড়েছেন সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধে। খুব কাছ থেকে শত্রুপক্ষের ওপর আক্রমণ চালিয়েছেন। বহু ক্ষেত্রে পাক সেনাদের গুলি করে হত্যা করেছেন। তবে একবার ছাড়া পাক সেনাদের জীবিত ধরে আনার সুযোগ হয়নি। কারণ অধিকাংশ সময় শত্রুরা নিজেদের নিহত সদস্যদের লাশ নিয়ে পালিয়ে যেত।
যুদ্ধের এক ভয়ংকর দিনের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে সালেহা জানান যশোর সদরের বাহাদুরপুর অঞ্চলের একটি ঘটনার কথা। তিনি সেদিন যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বাহিনীর সবাই বিভিন্ন স্থান থেকে এসে একত্র হয়েছে। এমন সময় তাঁর হাতে পৌঁছে একটি ছোট চিরকুট নির্দেশ ছিল, ‘আমরা না বলা পর্যন্ত আপনি বেরুবেন না।’ এটি ছিল থানা কমান্ডের নির্দেশ। তিনি ভাবলেন, নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু ঘটেছে। নির্দেশ মেনে তিনি আর বের হননি। পরে জানতে পারেন, সেদিন তাদের সহযোদ্ধারা পাক সেনাদের ঘেরাওয়ে পড়ে প্রবল যুদ্ধে লিপ্ত হন। মাত্র পাঁচ-ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করে শহীদ হন। সালেহা বলেন, সেদিন তিনি সেখানে গেলে হয়তো তিনিও শহীদ হতেন। সেই চিরকুট যেন ছিল তার জীবনের মোড় ঘোরানো বার্তা।
আরেকটি ঘটনার কথা বলতে গিয়ে তিনি স্মরণ করেন যুদ্ধের শুরুর দিকের এক অভিজ্ঞতা। যশোর শহরের বারান্দিপাড়ায় তারা অবস্থান নিয়েছিলেন। ট্রেঞ্চ খুঁড়ে সেখানে শুয়ে গুলি চালানোর প্রস্তুতি ছিল। সবাই সমানভাবে প্রশিক্ষিত বা অভিজ্ঞ না হওয়ায় কিছুটা বিশৃঙ্খলা ছিল। গোলাগুলি শুরু হতেই হঠাৎ পেছন দিক থেকে গুলি এসে তাদের কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। সবাই হতবাক শত্রু তো সামনে, পেছনে নয়! পরে জানা যায়, ভুলবশত তাদের নিজেদের একজন যোদ্ধা পেছন থেকে গুলি ছুড়েছিলেন। দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। ভাগ্য ভালো, সেদিন কেউ আহত হননি। যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও এমন অভিজ্ঞতা তাদের আরও সতর্ক ও সংগঠিত করে তোলে। সালেহা বেগম শুধু একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু তাঁর তিনি সাহস, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক। সমাজের প্রচলিত ধারণাকে অতিক্রম করে তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশপ্রেমের প্রশ্নে নারী-পুরুষের ভেদরেখা অর্থহীন। সম্মুখযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণ, কঠোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং সহযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাঁকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
স্বাধীনতার পেছনে অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত বীরের অবদান রয়েছে। সালেহা বেগম তাঁদেরই একজন, যাঁর জীবনকথা আমাদের নতুন প্রজন্মকে সাহস, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের শিক্ষা দেয়। তাঁর মতো সাহসী নারীদের ত্যাগের ফলেই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। তাঁদের স্মরণ করা মানে কেবল অতীতকে স্মরণ করা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা সংগ্রহ করা। সাহসী এই মুক্তিযোদ্ধা এক পুত্র সন্তানের জননী। যশোরে এখন আইন পেশার সাথে যুক্ত আছেন।
প্যানেল/মো.








