ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২০ মে ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

সংস্কৃতি সংবাদ

অহিংসার বারতায় নৃত্যনাট্য চ-ালিকা পরিবেশন

সংস্কৃতি প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০০:৪৩, ৩ অক্টোবর ২০২৩

অহিংসার বারতায় নৃত্যনাট্য চ-ালিকা পরিবেশন

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে সোমবার পরিবেশিত চন্ডালিকা গীতি নৃত্যনাট্যের একটি দৃশ্য

সোমবার ছিল বিশ্ব অহিংসা দিবস। প্রতিবছর ২ অক্টোবর  মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে পৃথিবীজুড়ে দিবসটি উদ্যাপিত হয়। বিশ্বব্যাপী হানাহানি ও সহিংসতার বিপরীতে গাওয়া হয় মানবতার জয়গান। সন্ত্রাস, অসহিষ্ণুতা ও বিদ্বেষের বিপরীতে উচ্চারিত হয় শান্তি ও সম্প্রীতির বারতা। সেই স্রোতধারায়  বিগত বছরের ধারাবাহিকতায়  এদিন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আয়োজনে উদ্যাপিত হয়েছে দিবসটি। গানের সুর আশ্রিত নৃত্যের ছন্দে সজ্জিত ছিল সে আয়োজন। নৃত্যশিল্পীর মুদ্রার সঙ্গে অভিব্যক্তির সম্মিলনে পরিবেশিত হয়েছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত অহিংসার বার্তাবহ নৃত্যনাট্য চন্ডালিকা। দর্শকের নয়নজুড়ানো নৃত্য পরিবেশনার সঙ্গে ছিল দিবসনির্ভর আলোচনাসভা।
মহাত্মা গান্ধীর ১৫৪তম জন্মবার্ষিকী ও বিশ্ব অহিংসা দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। সূচনা বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন জাদুঘরের সদস্য সচিব সারা যাকের। অনুষ্ঠানে বংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার বাণী পাঠ করেন ডেপুটি হাইকমিশনার বিনয় জর্জ। 

আলোচনায় বক্তারা বলেন, মহাত্মা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দুজনই ধর্ম-বর্ণ-জাতি-ভাষা-অঞ্চল নির্বিশেষে মানুষের কল্যাণের জন্য বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। যারা ধর্মের নামে সহিংসতাকে বৈধতা দেয় তারা দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই মহান নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। তারা ভেবেছিল ব্যক্তি গান্ধী বা মুজিবকে হত্যা করলে তাঁদের মানবপ্রেমের দর্শনের আলো নিভে যাবে, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতা জয়ী হবে। কিছু সময়ের জন্য অন্ধকারের অপশক্তি কিছু অঞ্চলে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে পারে বটে, তবে সত্য ও মানবতারই জয় হয়। ইতিহাসের এই সত্যই মানব সভ্যতার চালিকা শক্তি।
আলোচনা শেষে অনীক বসুর পরিচালনায় নৃত্যনাট্য চ-ালিকা মঞ্চস্থ করে নৃত্যদল স্পন্দন। বৌদ্ধ সাহিত্যের কাহিনী থেকে চ-ালিকার মূল ভাবটি গ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রভু বুদ্ধের প্রিয় শিষ্য আনন্দ এক গ্রীষ্মের প্রখর দুপুরে বিহারে ফিরে যাওয়ার সময় তৃষ্ণা বোধ করেন। তিনি দেখতে পেলেন একজন তরুণী কুয়ো থেকে জল তুলছে। সে এক চ-ালকন্যা, তার নাম প্রকৃতি। তার কাছে জল চাইলেন আনন্দ। কিন্তু তাকে তো সবাই চ-ালকন্যা বলে অস্পৃশ্য মনে করে। তাই সংকোচভরে প্রকৃতি আনন্দকে বলে যে, সে চ-ালকন্যা আর তার কুয়োর জল অশুচি। আনন্দ তাকে বলেন যে, তিনি যে মানুষ, প্রকৃতিও সেই মানুষ। সব জলই তীর্থজল, যা তৃষ্ণার্তকে তৃপ্ত করে, স্নিগ্ধ করে। আনন্দের এই ব্যবহারে, সেইসঙ্গে তার রূপে মুগ্ধ হলো প্রকৃতি। নিজের জীবন সম্পর্কে ভাবনা বদলে গেল তার। এ যেন তার নতুন জন্ম। তার হাতের এক গ-ুষ জল গ্রহণ করে আনন্দ তার জীবনের সমস্ত অপমান ধুয়ে দিয়ে গেছেন।
নাম থেকে বোঝা যায়, চ-ালিকা হলো নিম্নতম অস্পৃশ্য বর্ণের একটি চ-াল মেয়ের গল্প যে তাকে কিছু জল দেওয়ার পরে একজন সুন্দর সন্ন্যাসীর প্রেমে পড়ে। চন্ডালিকা আত্ম-চেতনার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার ট্র্যাজেডি। আত্ম-চেতনা, একটি বিন্দু পর্যন্ত, আত্ম-বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয়; কারণ, নিজের ভূমিকা বা কাজের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতনতা না থাকলে, কেউ বিশ্বকে নিজের সেরাটা দিতে পারে না।
নৃত্যনাট্যের বিভিন্ন চরিত্রে  রূপ দিয়েছেন কস্তুরী মুখার্জি, স্মিতা দে ঘোষ, গোলাম মোস্তফা ববি, শহীদুল ইসলাম বাবু, তোফায়েল আহম্মেদ ও অনিক বোস।

×