ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৯ মে ২০২৪, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পে জটিলতা

পাবনার গর্ব সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালার জীর্ণদশা

সমুদ্র হক

প্রকাশিত: ০০:০৩, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩

পাবনার গর্ব সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালার জীর্ণদশা

পাবনায় সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালার প্রবেশপথে ও ভেতরে দর্শনার্থী

‘অনেক পূজার অঞ্জলি আজ তব সিংহাসনেরও তলে সেথায় একটি প্রণাম লুকিয়ে আছে নীরব প্রেমের ছলে...’ পাবনার সেই বাড়িতে প্রবেশের পর সুচিত্রাপ্রেমীদের হৃদয়ে এই সুরটিই ভেসে আসে। যেমন দর্শনার্থী পূর্ণিমা ইসলাম (যার কণ্ঠ অনেকটা সুচিত্রা সেনের মতো) সুচিত্রা-উত্তম জুটির ‘পথে হলো দেরি’ ছবির একটি সংলাপ নিজের কণ্ঠে ধারণ করে বললেন- সুচিত্রা সেন এই বাড়িতে নেই। সেই মায়াবি ভরা চাঁদ, সেই ক্ষণ, সেই মিলনতিথি আজ আর নেই, তবে সেই লগনগুলো ধরে রেখেছে এই বাড়ির অদৃশ্য সিংহাসন। বাংলাদেশের গর্ব কিংবদন্তির নায়িকা সুচিত্রা সেনের বাড়ি উত্তরাঞ্চলের পাবনা নগরীর গোপালপুরে। যেখানে সুচিত্রা সেনের যৌবনের দিনগুলো কেটেছে। সুচিত্রা সেনের পারিবারিক নাম রমা সেনগুপ্ত।
পাবনা নগরীর গোপালপুরের হেমসাগর লেনে অবস্থিত পুরনো দিনের আদলে গড়া বাড়ির দেওয়ালের পলেস্তরা খসে পড়েছে। কোথাও ইট বের হয়েছে। কাঠের পাল্লায় জং ধরা শিকের জানালাও নড়বড়ে। গোলাকৃতি পিলারে বাড়ির সম্মুখের বারান্দার সম্মুখে দুই ধারে দুয়ার। প্রবেশের পর চারটি ঘর। বাইরের দিকের ঘরটিতে সুচিত্রা সেন থাকতেন। পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি লেখাপড়া করেছেন।  ভেতরের আঙিনার এক কোণায় দোতলায় ওঠার সিঁড়ি ছিল। ছিল রান্নাঘর। পরে এই অংশ ভেঙে ফেলা হয়। গত শতকের পঞ্চাশ দশকের শেষভাগ পর্যন্ত সুচিত্রা সেনের বাবা করুণাময় দাশগুপ্তের দখলে ছিল। এরপর তিনি ভারতে চলে যান। দেশ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর এই বাড়িটিতে হাতবদলের পালা চলে। ১৯৮৩ সালে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত বাড়িটি দখল করে নেয়। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন প্রশাসকের কাছে থেকে জামায়াত ৯৯ বছরের ইজারা নেয়। সেখানে গড়ে তোলে একটি স্কুল।  
সুচিত্রা সেনের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িটি দখলমুক্ত করতে ২০০৮ সালে পাবনার সুধীজন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। যার ধারবাহিকতায় গঠিত হয় সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ। পরিষদ কয়েক দফায় জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে স্মারকলিপি দেয়। এভাবে আন্দোলনের মাত্রা বেড়ে গেলে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে একপর্যায়ে জামায়াতের দখলমুক্ত হয় সুচিত্রা সেনের স্মৃতির এই বাড়ি। ভঙ্গুর অবকাঠামোর মধ্যে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে ‘কিংবদন্তি মহানয়িকা সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা’।
পাবনার সুধীজন ও দেশের গুণীজনের দাবি, অমূল্য সম্পদ এই বাড়িটিকে ঘিরে নির্মিত হোক একটি আর্কাইভ (মহাফেজখানা)। গড়ে উঠতে পারে ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও গবেষণাগার, যাতে করে সুচিত্রা সেনের বর্ণাঢ্য জীবনের অনেক কিছুই জানতে পারে বর্তমান প্রজন্ম। পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত সুচিত্রা সেন বাংলা চলচ্চিত্রকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি কয়েকটি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন। এই মহানায়িকা প্রমাণ করে দিয়েছেন বাস্তবতার সুনিপুণ রেখায় কিভাবে শিল্পীর ছাপ রাখা যায়। টালিগঞ্জে ও মুম্বাইতে অনেক নায়কের বিপরীতে তিনি জুটি বেঁধেছেন। এর মধ্যে সফল জুটি হিসেবে ‘সুচিত্রা-উত্তম’ ইতিহাসের পাতায় চিরন্তন হয়ে আছে এবং থাকবে।
সেই সুচিত্রা সেনের বাড়িকে ঘিরে অনেক কিছুই করা যায়Ñ এমনটিই ভাবনায় এনেছেন সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. রামদুলাল ভৌমিক জানালেন, বাড়ির নক্সা অবিকল রেখে নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তা হয়নি। সেখানে একটি আর্কাইভ ও ইনস্টিটিউট গড়ার প্রস্তাবও আছে। তাও থিতিয়ে পড়েছে। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. নরেশ মধু জানালেন, কোভিড-১৯ এর আগে তিনবার সুচিত্রা সেন চলচ্চিত্র উৎসব হয়েছে। এরপর আর হয়নি। তার ইচ্ছাÑ সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তিনি সুচিত্রা সেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব করবেন। তবে তার আগে দরকার এই বাড়িটির সংস্কার এবং একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ।
সংগ্রহশালায় বাড়ির প্রতিটি ঘরের দেওয়ালে সুচিত্রা সেন অভিনীত সিনেমার স্থিরচিত্র টাঙ্গানো আছে। সুচিত্রা সেনের কিছু সংলাপ লিখিত আকারে আছে। আলমারি ও একটি টেলিভিশন আছে। কোনো পাঠাগার নেই।
মাল্টিমিডিয়ায় ছবি প্রদর্শনের ব্যবস্থা নেই। প্রবেশপথে একটি ভাস্কর্য, যা সুচিত্রা সেনের অবয়বের সঙ্গে মিল নেই। শুক্রবার ছাড়া বাকি দিনগুলোতে দশ টাকা দর্শনীয় বিনিময়ে দর্শকরা জীর্ণদশার সেই বাড়িতে প্রবেশ করতে পারেন। বাড়ির সামনে ও পশ্চিম দিকে কিছু জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। উঠানে বাগান করা হয়েছে। বাড়িটি দেখাশোনার করার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে একজন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ বলতে এই পর্যন্তই।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপচিালক লিয়াকত আলী লাকি এই বাড়িটিকে ঘিরে কমপ্লেক্স নির্মাণের একটি পরিকল্পনা করেছেন। তাও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্যে পড়েছে। এই বিষয়ে শিল্পকলা একাডেমির নির্বাহী প্রকৌশলী সুখদেব জানান, সুচিত্রা সেন স্মৃতি রক্ষার প্রকল্পটি প্যাকেজের মধ্যে পড়েছে। যেখানে সুচিত্রা সেনসহ দেশের ২১ জন গুণী শিল্পী-সাহিতিক ও অন্যান্য গুণী ব্যক্তির নামে কমপ্লেক্স হবে। বর্তমানে সুচিত্রা সেন স্মৃতি রক্ষার ফিজিবল স্টাডি হয়ে তা গণপূর্ত বিভাগে গেছে। সেখান থেকে এস্টিমেট হয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যাবে। তারপর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোপোজাল হয়ে প্ল্যানিং কমিশনে যাবে। তারপর করতে কতদিন সময় লাগবে- তা কেউ বলতে পারছেন না। এদিকে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. নরেশ মধু জানালেন তিনি কলকতায় গিয়ে সুচিত্রা সেনের একমাত্র কন্যা মুনমুন সেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি পাবনায় তার মায়ের স্মৃতির কথা শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে পাবনায় আসার আশা ব্যক্ত করেন।
কলকতায় যে ঘরে সুচিত্রা সেন বাস করতেন, সেই ঘরে টাঙ্গানো তার (সুচিত্রা) ছবি সুচিত্রা সেনের একটি শাড়ি ও রামকৃষ্ণ মিশনের কয়েকটি বই দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালে সুচিত্রা সেন লোকচক্ষুর অন্তরালে যাওয়ার পর রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
গত ১৭ জানুয়ারি সুচিত্রা সেনের প্রয়াণ দিবসের অনুষ্ঠানে সেই বাড়িতে যান রাজশাহীতে অবস্থিত ভারতীয় উপ-হাইকমিশনের সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার। তিনি সুচিত্রা সেনের ভক্ত। তিনি অতিথিদের কথা শুনে তার বক্তব্যে বলেন, এই বাড়িতে বড় কিছু করা যায়। সংস্কারে ও উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার এগিয়ে এলে ভারত যাতে সহযোগিতা করে, সেই বিষয়ে তিনি তার সরকারকে (ভারত) জানাবেন। দেশে সুচিত্রা সেনের অনেক ভক্ত আছেন। বর্তমান প্রজন্ম সুচিত্রা সেন সম্পর্কে ততটা জানে না।
আগামীর প্রজন্মের কাছে কিংবদন্তি মহানায়িকা সম্পর্কে জানাতে অমূল্য সম্পদ এই বাড়িটিকে ঘিরে বড় কিছু করা দরকার। সুচিত্রা সেন অভিনীত সাগরিকা ছবির একটি গানের শেষ কয়েকটি কথা ছিল এ রকম ‘সীমার বাঁধনে আমারে বাঁধিতে চাও, যত ব্যথা মোর নীরবে সহিতে দাও, ধূলির যা আছে ধুলিতেই থাক পড়ে, ঝরা মালা শুধু দিয়ে গেনু তবু পায়ে।’ সীমার বাঁধনে সুচিত্রা সেনের স্মৃতিকে বাঁধতে এগিয়ে আসার দরকার।

 

 

×