সোমবার ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৫ মে ২০২০ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

নজরুলের গানে নস্টালজিয়া

নজরুলের গানে নস্টালজিয়া
  • সাদিক ইসলাম

নজরুল ইসলামের গানের বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যে বহুমুখী। প্রেম, বিপ্লব, বিদ্রোহ, দেশ প্রেম নিয়ে যেমন তিনি গান রচনা করেছেন তেমনি ধর্মীয় বাণীকে ধারণ করেছে তার অমর গানগুলো। তার গানের বৈচিত্র্যের একটি দিক হচ্ছে নস্টালজিয়া। নস্টালজিয়া মানে স্মৃতিকাতরতা, গৃহ কাতরতা, অতীতে ফিরে যাওয়া, অতীতের সমৃদ্ধ পরিবেশ থেকে বর্তমানের না পাওয়ার বেদনাকে শিথিল করা। যদিও প্রেম তাকে বিরহ দিয়ে গিয়েছে সুখের চেয়ে বেশি। নজরুল বঞ্চিত হয়ে কখনো অভিশাপ দেননি তার প্রেমিকাকে তার কোন লেখায়। নস্টালজিয়া শুরু হয় এই প্রেম থেকেই, বিরহ কাতরতা থেকেই:

‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই, কেন মনে রাখ তারে, ভুলে যাও তারে ভুলে যাও, একেবারে।’

অনেকের মতে, নজরুলের জীবনে প্রেম মূলত তিনবার এসেছিল। প্রথম প্রেম নার্গিস, দ্বিতীয় স্ত্রী প্রমীলা দেবী এবং তৃতীয় বেগম ফজিলাতুন্নেসা। তাদের সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসা সম্পর্ক গড়ে উঠলেও সেসব প্রেম-ভালোবাসা পূর্ণতা লাভ করেনি। আর তা থেকেই প্রেম-ভালোবাসার কবিতা ও গানে আনন্দ, আকাক্সক্ষা, বিরহ, বেদনার সৃষ্টি ঘটিয়েছেন। প্রেম হারানো অতীতের স্মৃতি ভেসে আসে নস্টালজিকভাবে তার রঞ্জিত হৃদয়ে:

‘মনে পড়ে আজ সে কোন জনমে বিদায় সন্ধ্যা বেলা, আমি দাঁড়ায়ে রহিনু এপারে, তুমি ওপারে ভাসালে ভেলা।’

নজরুল ইসলাম শুধু পারস্যের মহাকবি হাফিজই নন, অন্যান্য কবির অমর কাব্যমহিমা দ্বারাও বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তার অমর দৃষ্টান্ত নজরুলের ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম।

কবি জন কিটস যেমন অতীত খুঁজতে চলে যান গ্রিসের সাহিত্য, সংস্কৃতি আর শিল্পের সমৃদ্ধ জগতে, ডব্লিউ বি ইয়েটস যেমন কল্পনায় ভ্রমণ করেন বাইজেনটাইনের নিখাঁদ সভ্যতায়, স্পেনসার আশ্রয় নেয় আর্কেডিয়াতে, রবীন্দ্রনাথ নীপবনে, তপবন এ বা মায়া মনে বিহার করেন কিংবা নিজেই তৈরি করে নেন শান্তিনিকেতন। নজরুলও তেমনি তার গানে ফেলে আসা অতীত, হারিয়ে যাওয়া মধুর স্মৃতি, প্রতিটি না পাওয়ার গভীর বেদনা নস্টালজিক ভাবে প্রকাশ করেন প্রকৃতি আশ্রয়ে কিংবা ইরান সাহিত্যে ইতিহাসে অবগাহন করে। প্রেমের বিরহ বার বার তাকে নিয়ে চলে যায় বর্তমান থেকে অতীতের মোহনীয় জগতে। এই অবিস্মরণীয় কথাগুলো তার গানের মূল বিষয়বস্তু হয়ে থাকে:

‘কেউ ভুলে না কেউ ভুলে

অতীত দিনের স্মৃতি

কেউ দুঃখ লয়ে কাঁদে

কেউ ভুলিতে গায় গীতি।’

‘দূর দ্বীপবাসীনি’ গানটিতে কুহক পারের অতীতের কথা এসেছে পরাবাস্তব চেতনায়। কবি এখানে জন কিটসের মতো অতীত চারিতার মোহনীয় আবেশে ইন্দ্রীয়কে জাগ্রত করেন:

‘দূর দ্বীপবাসিনী,

চিনি তোমারে চিনি

দারুচিনিরও দেশে, তুমি বিদেশিনী গো

সুমন্দ ভাষিনী।’

কবির গান আমাদের বাস্তব থেকে স্বপ্নের জগতে নিয়ে যায়:

‘বাজাও কি বনো সুর পাহাড়ি বাঁশিতে

বনান্ত ছেয়ে যায় বাসন্তী হাসিতে

তব কবরী মূলে, নব এলাচেরও ফুল

দোলে কুসুম বিলাসিনী।’

কবিরা তাদের তৃষ্ণা মেটাতে বর্তমান থেকে অতীতে যেমন চলে যান তেমনি কোলাহলপূর্ণ জীবন থেকে চলে যান দূর বনে, সাগর তীরে, নদীর পাড়ে কিংবা নির্জন মরুভূমিতে। এটাও একটি নস্টালজিক আচ্ছন্নতা। নজরুলের অনেক গানে এই বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়।

‘পরদেশী মেঘ যাওরে ফিরে’ মধুর এই গানটিতে কবি ‘লেডি অফ শ্যালট’ কবিতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কোন দূর অজানা তীরে লেডি অফ শালটের নির্বাসন হয় যেখানে পৌরানিক একটি মায়া খুঁজে পাওয়া যায়। পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের মেঘদূতের সাথেও মিল পাওয়া যায় গানটির ভাবনায়। পরদেশি কথাটা নস্টালজিক আবহ তৈরি করে:

‘পরদেশী মেঘ যাও রে ফিরে।

বলিও আমার পরদেশী রে।

সে দেশে যবে বাদল ঝরে

কাঁদে না কি প্রাণ একেলা ঘরে,

বিরহ-ব্যথা নাহি কি সেথা

বাজে না বাঁশী নদীর তীরে।

বাদল রাতে ডাকিলে ‘পিয়া পিয়া পাপিয়া’

বেদনায় ভথরে ওঠে না কি রে কাহারো হিয়া?’

‘হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে’ গানটিতে কবি কে মনে হয় যেন হৃদয় গহনে নেশাগ্রস্ত হয়ে অজানা কোন নির্জন, একাকী বনপথে তার ফিরে আসা অতীতকে অদ্ভুত বনরাজির মাঝে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন। গানটিতে কিটসের একটি কবিতার সঙ্গে সাযুজ্য পাওয়া যায়। কিটসের একটি কুহকী কবিতা ‘লা বেল ডেম স মারসি’ এর সঙ্গে যদিও ভাবগত মিল নেই কিন্তু অবস্থানগত একটা চমৎকার মিল পাওয়া যায়:

‘হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে

কুড়াই ঝরা ফুল একেলা আমি

তুমি কেন হায় আসিলে হেথায়

সুখের সরব বইতে নারি।

চারিপাশে মোর উড়িছে কেবল

শুকানো পাতা মলিন ফুলদল।’

‘বুলবুলি নিরব নার্গিস বনে’ গানটিতে গথিক বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। এ গানটিতেও কিটসের ‘ওড টু নাইটিংগেল’ কবিতার মিল আছে। অর্ধ আলোকিত, অন্ধকারাচ্ছন্ন এক বনে কিটস যেমন কল্পনার অতলে ধীরে ধীরে মাতাল হয়ে তলিয়ে যান আর পৃথিবীর ব্যথা, জীর্ণতা, মলিনতা, ক্ষয় ভুলতে চান; নজরুল তেমনি চলে যান আবার সেই হাফিজের দেশে। গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নাইটিঙ্গেল কবিতাতে যেমন কবরের কথা বলা আছে এখানেও হাফিজের কবরের পাশে নজরুলের অদৃশ্য আত্মা গিয়ে বিলাপ করে; হাফিজের আধ্যাত্মবাদ এর সঙ্গে এক হয়ে যায়:

‘বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে

ঝরা বন গোলাপের বিলাপ শুনে।

শিরাজের নওরোজে ফাল্গুন মাসে

যেন তার প্রিয়ার সমাধির পাশে

তরুণ ইরান কবি কাঁদে নিরজনে।’

এক জীবনের ঠুনকো ভালবাসা নজরুলকে হাজার জীবনের বেদনা দিয়ে যায়। কবি কাতর সজল অতীতের বেদনায়:

‘এমনি বরষা ছিল সেদিন

শিয়রে প্রদীপ ছিল মলিন

তব হাতে ছিল অলস বীন

মনে কি পড়ে প্রিয়।’

সুন্দরের প্রকাশ সৃষ্টিকর্তার প্রতিটি সৃষ্টিতে। সৃষ্টিকর্তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানব আর মানবের জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন পুরো বিশ্ব জগত। মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন মানসিক প্রশান্তির অনেক গুপ্তধন। কবির মনে নস্টালজিয়া অসীমের প্রকাশ দেখে কখনো কাব্যে, কখনো ছন্দে, কখনো ফুলের মোহনীয় রূপে। কবি খুঁজে ফেরেন কবি হাফিজের মতো সুন্দরের সুদূর সৃষ্টিকর্তাকে:

‘আমি যার নূপুরের ছন্দ

বেণুকার সুর

কে সেই সুন্দর, কে?

আমি যার বিলাস যমুনা

বিরহ বিধুর

কে সেই সুন্দর, কে?

যাহার গলে আমি বনমালা

আমি যার কথার কুসুমডালা

না দেখা সুদূর

কে সেই সুন্দরও কে?’

নস্টালজিয়া যেমন প্রেমের মাধ্যমে প্রকাশ পায় তেমনি প্রকৃতির আশ্রয় লাভ নজরুলের একটি অনিবার্য অনুষঙ্গ। প্রিয়তমাকে প্রকৃতির আভরণ দিয়ে সাজান তিনি অবিরত। তাই বনফুল আভরণ, দূর মরু, বিদেশিনী, মোমের পুতুল, মোমের দেশ, শুকনো পাতার নূপুর পায়, চাপা রঙ্গের শাড়ি, হরিণ- আঁখি, পলাশ রং শাড়ি, বাবলা ফুল, আমের মুকুল, কুসমী রং শাড়ী চুড়ি বেলোয়ারি, এই চমৎকার শব্দচয়নগুলো তার গানকে আরও বেশি স্বপ্নীল ও নস্টালজিক করে তুলে। মানব, প্রকৃতি, অতীত আর অলৌকিক কল্পনা একাকার হয়ে যায় কবি মানসে।

নজরুলের আমরণ সাধনা ছিল মানব জীবনের সমস্ত সুখ, দুঃখ, বেদনা, চাওয়া-পাওয়া, হতাশার প্রকাশ এবং না পাওয়াকে পাওয়ার নিরন্তন অনুসন্ধানে। নজরুলের জীবনে হতাশ এসেছে, পরাজয় এসেছে, কারাভোগ এসেছে কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি শুধু প্রেমের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিপ্লবের, বঞ্চনার আর মুক্তিলাভের প্রেরণাদায়ী কবি। কিন্তু যেটা আগে বলা হয়েছে তার মাঝে কল্পলোকের সান্নিধ্য লাভ, অতিতের হারানো গৌরব ফিরে পাবার আকুতি তাকে নস্টালজিক করে তোলে অবিরাম। তাই তার কাতরতা কখনো শেষ হয় না, নস্টালজিয়া তার গানে বার বার ঘুরেফিরে আসে। সুদূরের টান তার হৃদয়ের গভীরে সব সময় নাড়া দিয়ে যায়:

‘তুমি আসিবে বলে সুদূর অতিথি

জাগে চাঁদের তৃষা লয়ে কৃষ্ণা তিথি,

কভু ঘরে আসি কভু বাহিরে চাই।

আজি আকাশে বাতাসে কানাকানি,

জাগে বনে বনে নব ফুলের বাণী,

আজি আমার কথা যেন বলিতে পাই।’

শীর্ষ সংবাদ:
শেখ হাসিনাকে ঈদের শুভেচ্ছা জানালেন মোদী         কিটের পরীক্ষা নিয়ে খবর সঠিকভাবে আসেনি : গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র         গাজীপুরে ঝুট গুদামের আগুন নিয়ন্ত্রণে         যুক্তরাষ্ট্রে দেড় লাখ পিপিই রফতানি করেছে বাংলাদেশ         দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯৭৫ জন করোনা আক্রান্ত, মৃত্যু ২১         গণমাধ্যমকর্মীদের চাকরিচ্যুত না করার আহ্বান ডিইউজের         ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন মেয়র আতিক         ঈদ সবার মধ্যে গড়ে তুলুক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধন ॥ রাষ্ট্রপতি         চীনে তৈরি করোনার টিকা নিরাপদ ও কার্যকর দাবি         আগামীকাল থেকে (বিএসএমএমইউ) বেতার ভবনে স্থাপিত ফিভার ক্লিনিক খোলা         বিটিভিসহ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে নজরুল জন্মবার্ষিকী উদযাপিত         সম্মিলিত প্রচেষ্টায় করোনাকালও একদিন শেষ হবে ॥ আইজিপি         জাপানে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার         কুমিল্লার তিতাসে আওয়ামী লীগ নেতাকে গলা কেটে হত্যা         যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের মিষ্টি ও ফল উপহার পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী         ঈদের নামাজ শেষে ফেরার পথে ইউপি সদস্যকে গুলি করে হত্যা         কোলাকুলিবিহীন অন্য রকম এক ঈদ উদযাপন         এ বছরের ঈদটি অনেক কঠিন ॥ ড. মোমেন         বায়তুল মোকাররমে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত         আজ জাতীয় কবির ১২১তম জন্মজয়ন্তী        
//--BID Records