মঙ্গলবার ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ০৭ জুলাই ২০২০ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

সাহিত্যের নতুন সীমানা ॥ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

  • হাসান আজিজুল হক

অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে একটা বিচিত্র, আচমকা, অচেনা সাহিত্য সৃষ্টি করে অকালে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রস্থান করেছেন। এই ছোট প্রবন্ধে আমি তার উপন্যাস নিয়ে কোন আলোচনা করব না। তার ছোটগল্প সম্পর্কে দু-একটি কথা বলার শুধু চেষ্টা করব।

‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ গল্প সঙ্কলনে ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ একটিমাত্র গল্প যেটিকে বলা চলে তার হাত-মকশোর কালে লেখা। সাধারণভাবে বলতে পারি তার এই গল্পটিও পুরোপুরি তৈরি গল্প ইলিয়াসের লেখা বাকি সমস্ত গল্পের দিকে চেয়েই কেবল বলা যায়, তুলনায় ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পটি লেখকের প্রস্তুতি পর্বের গল্প। মধ্য ষাটে এ রকম সামান্য কাঁচা দু’চারটি গল্প, তিনি লিখেছিলেন। সেগুলোর সব প্রকাশিত হয়েছিল কিনা জানি না। কয়েকটি যে হয়েছিল তা আমরা জানি, তার মধ্যে একটি গল্প ইলিয়াসের মৃত্যুর পরে ‘ভোরের কাগজ’-এ বেরিয়ে ছিল। সে যাই হোক, ইলিয়াসের হাত-মকশোর গল্প বেশি নেই এবং যা বা ছিল সেগুলো এমন সব ছোট কাগজে প্রকাশিত হয়েছিল যে পাঠকরা দেখার তেমন সুযোগ পাননি। এই কারণেই বলছি, ওই যে ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ একটু-আধটু তৈরি হওয়ার কালের গল্প, তারপর থেকেই ইলিয়াস সম্পূর্ণ প্রস্তুত পরিণত গল্প লেখক। ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ এর বাকি গল্পগুলোতে তার প্রমাণ দেয়া আছে।

জীবনের শেষ গল্পের শেষ বাক্যে কলম থামার আগে পর্যন্ত তিনি সর্বাংশে প্রস্তুত পরিণত এবং অমোঘ একটি কলমের অধিকারী ছিলেন। আমার এই বক্তব্য থেকে এমন মনে হতে পারে, ইলিয়াসের লেখক জীবনে আদি অন্ত মধ্য বলতে কিছু নেই, ক্রমপরিণতি বা হয়ে ওঠা বলতে কিছু নেই। তার মানে, রোয়া-ওঠা একটা শব্দ ব্যবহার করে বলা যায় তার লেখায় বিবর্তন নেই। গল্পগুলো যেন তার মাথায় কঠিন ঢালাই হয়েছিল, সেইগুলো তিনি আস্ত মাথা থেকে বের করে কাগজের উপর বসিয়ে দিয়েছিলেন। না, এ রকম কথা আমি বলব না। আমরা জানি, পরিবর্তন এবং পরিবর্তনশীলতা এক সঙ্গে ঢের চলতে পারে, অন্তত ধারণা হিসেবে, এই দুইয়ের মধ্যে আত্যন্তিক বিরোধ নেই। তা না হলে পরিবর্তনের টানা প্রবাহের মধ্যে স্ব-স্থিতি থাকে কেমন করে? ইলিয়াসের লেখাতেও এমন ঘটেছিল, অন্যদের মতোই, কিন্তু স্ব-স্থিতির একটা কঠিন রূপ তিনি তার লেখায় একেবারে প্রথম থেকে বেঁধে দিতে পেরেছিলেন। এ জন্যই তিনি বাক্য নিক্ষেপে অর্জুনের সিদ্ধি ও নৈপুণ্য অর্জন করতে পেরেছিলেন।

যারা ইলিয়াসের তন্বিষ্ঠ পাঠক, তারা লক্ষ্য না করে পারেন না যে, নিজেদের সঙ্গে একটু জোর জবরদস্তি করে ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ বাদ দিলে ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’-এর গল্পগুলোর ভাষার সঙ্গে ‘খোঁয়ারি’, ‘দুধভাতে উৎপাত’, ‘দোজখের ওম’, ‘জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল’-এর ২০/২২টি গল্পের ভাষারও তেমন তফাত করা যায় না; স্বরের ওঠানামা, আবেগ চিন্তার উচ্চাবচ অবস্থা, শ্লেষ বিদ্রুপের তীব্রতা তীক্ষ্নতা যদি হিসেবের মধ্যে না ধরা যায়, তা হলে ইলিয়াসের বিশ বছরের গল্প সবই তার গান্ডীব থেকে নিক্ষিপ্ত একই রকম ক্ষুরধার শিল্পিত বাণ।

তবু সত্য এই যে ইলিয়াস বদলেছেন। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’-এর পর থেকে তার ভাষাও, ভাষার অভ্যন্তরে যে সূক্ষ্ম স্নায়ু তন্তুজাল আছে, সেখানে বদলে গেছে। বহু স্নায়ু ও হাল্কা পেশী তিনি ছিড়ে ফেলেছেন, সেখানে প্রতিস্থাপন করেছেন নমনীয় কিন্তু অচ্ছেদ্য নতুন পেশীতন্তু এবং এই বদল বা ভাংচুর খোঁয়ারি (১৯৮২), দুধভাতে উৎপাত (১৯৮৫), দোজখের ওম (১৯৮৯), গল্প সঙ্কলনগুলোর ভেতর দিয়ে জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল (১৯৯৭)-এ পৌঁছেছে। আমার কোন সন্দেহ নেই- ইলিয়াস জীবিত থাকলে এই ভাংচুর বা বদল তার সব লেখাতেই অব্যাহত থেকে যেত।

একজন লেখকের লিখনভঙ্গি বা ভাষার পরিবর্তন কি সব সময়েই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে? কোন কোন লেখকের জন্য পরিবর্তন নিঃসাড়ে হতে পারে, তিনি তা টেরও পান না, হাত থেকে লাটাই ছুটে গেলে ঘুড়ির যে দশা হয় তেমনি। কোন লেখক ভাষা নিয়ে লেখা করতে পারেন। উৎস শুকিয়ে গিয়ে কোন লেখকের ভাষা থেকে নুড়িপাথর লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে আসতে পারে। কিন্তু কোন কোন লেখকের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের গুরুত্বটাই প্রধান বিচার্য বিষয় হতে পারে কারণ এই পরিবর্তন কোনমতেই ভাষার মধ্যে সীমিত নয়। আমার ধারণা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পের ভাষা বাইরের দিক থেকে তেমন একটা না বদলালেও, গল্প থেকে গল্পে ভাষার ভেতরের চেহারায় তিনি যে সূক্ষ্ম অথচ ভীষণ একটা পরিবর্তন ঘটাচ্ছিলেন, তার মধ্যেই থেকে গেছে তার সৃষ্টির ভেতরে ঢোকার চাবিকাঠি। শেষের দিকে তার ভাষা হয়ে উঠেছিল এক রকম আগ্নেয় তরল। অসম্ভব তাজা রগরগে, ভীষণ টককো, টান টান এমনিই বাঁধা যে মৃদুতম স্পর্শেও তীব্রতম আওয়াজ ফিরিয়ে দিতে পারে। ভাষা সম্বন্ধে যে সমস্ত বিশেষণ সচরাচর ব্যবহৃত হয়ে থাকে- যেমন স্বচ্ছ, ঝরঝরে, প্রাঞ্জল, ধীর, সংযত, সহজবোধ্য, ধ্বনিবহুল, সুষমাম-িত এ রকম কোন বিশেষণ ইলিয়াসের গল্পের ভাষার বেলায় প্রয়োগ করতে যাওয়া হাস্যকর মূঢ়তা। এদের জায়গায় বরং শ্লেষতিক্ত, বিষদিগ্ধ, অশ্লীল অস্বস্তিকর, কলুষ-প্রাণ ইত্যাদি বিশেষণ একটু লাগসই লাগে।

ইলিয়াসের শেষদিকের ভাষা পড়ে আমি বিভ্রান্ত বিমূঢ় হয়ে পড়তাম। কখনও মনে হতো এই ভাষা অতিবিশুদ্ধ ও সর্বোৎকৃষ্ট চোলাই, জিভ ঠেকানো মাত্র মগজ নড়ে ওঠে। বাংলা ভাষার যাবতীয় শব্দ পচিয়ে তৈরি হয়েছে এক রকম রৌদ্র-পক্ক আরক। টলটলে ফটিকের মতো রং তার, ঝকঝকে ছুরির মতো ধার। কখনও মনে হতো এই ভাষা অতি উচ্চ শক্তিসম্পন্ন খোলা বৈদ্যুতিক তার। কখনও বা অদ্ভুতভাবে মনে হতো এই ভাষা...

বাস্তবের গায়ে ঠেকানো মাত্র তা বাস্তবকে সঙ্গে সঙ্গে শুষে নেয়ার ক্ষমতা রাখে। ... ভাষা কেমন, পরিবর্তিত হতে হতে কেমন বা পরিবর্তিত হওয়ার পর কেমন তা বোঝাতে আমি একগাদা উপমা ব্যবহার করেছি যদিও ভাল করেই জানি বড় বড় উপমায় তেমন কিছু বোঝানো যায় না। নেহাত আমি পছন্দ করি না তাই, তা না হলে এই খানে তাঁর গল্প থেকে লম্বা লম্বা উদ্ধৃতি তুলে দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা যেত কেমন দাঁড়িয়েছিল তাঁর ভাষাটা। এখানে সে কষ্ট না করে পাঠকরা বরং সরাসরি তাঁর গল্পের মধ্যে ঢুকলেই লাভবান হবেন অনেক বেশি। আমি নিজে এই জটিল অরণ্যের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে গোটা বাংলা সাহিত্য খুঁজে বেড়াই। ভাল-মন্দের প্রশ্ন নয়, পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে বোঝার জন্য মাপকগোছের কিছু একটা পাওয়া প্রয়োজন।

ইলিয়াসের লেখা পড়তে পড়তে কোন বিনোদন হয় না, কোন রস-সঞ্চার হয় না, ‘সংস্কৃতির দুধ ও মিষ্টান্ন’ মেলে না, উদার মানবতার সহানুভূতি মমতা করুণা অনুভব করা যায় না, চোখ বাষ্পকুল হয় না, উল্টো স্বাদ মেলে কষা, অপ্রাণিত হৃদয় মন অসন্তোষে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শুধু মনে হয়, কঠিন চাবুক দিয়ে শারীরিকভাবে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে, আমাদের দেহের একটি ইঞ্চিও বাদ পড়েনি চাবুকের আঘাত থেকে। বাংলা সাহিত্যের আর কার লেখা পড়ে এ রকম অসম্ভব অভিজ্ঞতা হয়? একটি-দুটি নাম মনে পড়তে পারে : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত বা জ্যোতিন্দ্রিয় নন্দী। বাংলা কথাসাহিত্যের বিখ্যাত লেখকদের কথা এই প্রসঙ্গে বলা চলে না। তাঁদের প্রত্যেকের কলম থেকে ক্বচিৎ কখনও বিষয় চুইয়ে পড়লেও অমৃতক্ষরণই হয়েছে বেশি বেং তাকেই আমরা প্রকৃত সাহিত্য, মহৎ সাহিত্য বলতে শিখেছি। অমৃতের অভাব ঘটলেই আমাদের চিৎকার, সাহিত্য আমাদের ছোট করে ফেলছে, বাস্তব আমাদের যেখানেই ঠেলে ফেলুক না, সাহিত্য যেন আমাদের বড় করে দেখায়, বড় করে তোলে। বহুদিন ধরে চাইতে চাইতে সাহিত্যের কাছে মুদ্রাদোষের মতো এই হচ্ছে আমাদের আদর্শ প্রত্যাশা।

কর্কশ সত্য হচ্ছে : অনৃতভাষণের সঙ্গে অনতভাষণের তেমন কোন তফাত নেই এবং সত্যকে লুকোতে চায় যে সাহিত্য সে সাহিত্য আবর্জনা ছাড়া আর কিছু নয়। বাঙালীর মানসগঠনে এক ধরনের রূপকথা- লোলুপতা আছে, বাস্তবে সে নোংরার সঙ্গে লেপ্টালেপ্টি করে ঘর করতে পছন্দ করে, অতি ক্ষুদ্র ও ভীষণ দুর্গন্ধযুক্ত বিষয়বুদ্ধির চর্চা করে সে, কিন্তু সাহিত্যে চায় সে পলায়ন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তা করতে অস্বীকার করেছিলেন প্রায় স্থূলভাবে; অশিষ্ট, অস্বস্তিকর নোংরা শব্দে তাঁর নিজের সাহিত্যকে ভরে দিয়েছিলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা সে জন্য আনন্দদায়ক নয়, বেশিরভাগ সময়েই তা তিক্ত, ফাঁস-লাগানো, কিছুতেই তাতে মহৎ হৃদয়বৃত্তির স্থান সঙ্কুলান হতে চায় না। এমন যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লেখার পাশে ইলিয়াসের লেখা দাঁড় করালে ইলিয়াসকে মধ্যবিত্তের চোখ থেকে আরও অশালীন, অভদ্র, দাপুটে বলে মনে হয়। আরও ভীষণ কাপালিক।

প্রথম অনুপ্রেরণা যাঁর কাছ থেকে, তাঁকে ছাড়িয়ে গেছেন ইলিয়াস। ছাড়িয়ে গেছেন কিসে? এক কথায় মধ্যবিত্তের রুচি থেকে। ইলিয়াস ঠিক করেছিলেন মধ্যবিত্তের রুচি ভাঙবেন, মধ্যবিত্তের সাহিত্যবৃত্ত ভাঙবেন। তিনি সচেতনভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন কিনা জানি না। জানার প্রয়োজনও নেই, তাঁর সাহিত্য আমাদের সরাসরি হাতেনাতে দেখিয়ে দিচ্ছে মধ্যবিত্তের সাহিত্যবৃত্ত তিনি ভেঙে ফেলেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যয় বা ইলিয়াসের মধ্যে ছোবল মারার যে মনোভাব আছে, যাকে তীব্র ‘আনপ্লিজেন্টনেস’ বলা যায়, শুধু সেটুকু বিবেচনা করলে জগদীশ গুপ্ত বা ‘বারো ঘর এক উঠোন’- এর লেখক জোতিরিন্দ্র নন্দীর লেখা সম্বন্ধে সে কথা বলা যায়, তবে জগদীশ গুপ্তের লেখা অব্যাখ্যেয়, প্রায় অর্থহীন, ব্যঞ্জনা-সত্য শূন্য আনপ্লেজান্টনেস- এই শেষ হয়, মানবচরিত্র বা মানব সংসারের দিকে আর তেমন এগোতে পারে না, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর লেখা তেমন নয় বটে, গলায় ফাঁস হয়ে চেপে বসে। কিন্তু জ্যোতিরিন্দ্র তো কোথাও মধ্যবিত্তের ভাষা ত্যাগ করেন না, একটি অশিষ্ট, অভদ্র এবং মধ্যবিত্ত যাকে নোংরা বলে, তেমন শব্দ ভুলেও ব্যবহার করেন না। না, এঁদের সঙ্গে ইলিয়াসের তুলনা চলবে না, আমি মনে করি সমস্ত বাংলা সাহিত্যে কারও তুলনা চলবে না। পাঠক মনে করে দেখতে পারেন ‘হুতোম’ চলবে কি, কিংবা একটু-আধটু প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’? এসব সাহিত্য আঁতুড়েই ধ্বংস হয়ে যায় দিগন্তপ্লাবী নিবিড়ঘনকৃষ্ণ কোলাহল নিয়ে দুর্গেশনন্দিনী দুন্দুভিনিনাদ করতে করতে বাংলাসাহিত্য প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে। বাকি থাকলেন আবার সেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। ব্যক্তিগত জীবনে কি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মধ্যবিত্তের সংসার সীমানা ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন কিনা সে প্রশ্নকে আমি নানা কারণেই তেমন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি না, তুলনায় বরং মানিককেই চলে আসতে হয়েছিল একেবারে প্রান্তে, বৃত্তের বাইরে প্রায়, কিন্তু একটা অদ্ভুত প্রতিহিংসাবৃত্তিতেই যেন মধ্যবিত্ত-বৃত্ত মানিকের সাহিত্যকে ভেতর থেকে অল্পবিস্তর নিয়ন্ত্রিত করেই যায়। পুতুলনাচের ইতিকথার সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখা মেলে গ্রামীণ মাঝারি জমি-ব্যবসাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত মানুষের, হোক উপন্যাসের বিষয় জটিল পথে মানবমনের চলাফেরা, শশীর মধ্যবিত্ত মানসিকতা এতই স্পষ্ট যে এ নিয়ে তর্ক করা বৃথা। এমনকি ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে কুবের-কপিলার সম্পর্ক বর্ণনাতেও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যবিত্ত সাংস্কৃতিক মানসিকতার কোন প্রভাব নেই এ কথা বলা চলে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পরবর্তীকালে তাঁর অবস্থান জনগণের পক্ষে দৃঢ় ও সুনির্দিষ্ট করে নিলেও মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি তাঁকে কোনদিনই একেবারে ছেড়ে যায়নি।

ইলিয়াস, বাস্তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত হয়েও আর মধ্যবিত্তের চোখ দিয়ে জনগণকে দেখতে চাইলেন না, তিনি নেমে গেলেন জনগণেরই মধ্যে যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের দেখায়। এই দেখানোয় যত রকম প্রতিবন্ধক, সাধারণ কথায় সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধক- ইলিয়াসের বিশেষ কাজের ক্ষেত্রে সে প্রতিন্ধক হয়ে দাঁড়ায় বাংলা সাহিত্যের বাস্তব বিবরণের প্রচলিত কৌশল, ভাষার ব্যবহার, মানসিকতার ধরন। এসব প্রতিবন্ধক অতিক্রম করার মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে মধ্যবিত্ত রচিত সাহিত্যের প্রচলিত কৌশলের একটিও আর ব্যবহার না করা। এ জন্য আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রথমেই ভুলতে চাইলেন মধ্যবিত্তের সাহিত্যভাষা এবং অন্যান্য সামাজিক আচার-আচরণ। তাঁর ভাষা যে আমাদের কাছে কখনও কখনও অশিষ্ট, অশ্লীল, অপরিশীলিত অথচ অহস্য, আঘাতক্ষম বলে মনে হয় তার কারণ প্রচলিত সাহিত্য ভাষা তিনি ত্যাগ করেছিলেন। সরাসরি গ্রহণ করেছিলেন তাদেরই ভাষা যারা নিজেরাই নিজেদের দেখানোর দায়িত্ব নিচ্ছে, যারা মধ্যবিত্তের সমস্ত সংস্কৃতি থেকে দূরে এবং হাত তুলে নিরেট অবজ্ঞার সঙ্গে সেই সংস্কৃতিকে ‘তফাত থাক’ বলে কাপড় তুলে জননাঙ্গ দেখিয়ে দিচ্ছে। এভাবে না দেখলে আমি তো ইলিয়াসের গদ্যে এত সø্যাং, এত চলতি দেহাতি শব্দ, এতসব মারাত্মক আঞ্চলিক বা শহুরে পাড়া বা গলির লব্জ, এত বুকনি, এত অদ্ভুত গালিগালাজ, মুদ্রাদোষে এত সহজভাবে অনুচ্চার্য নোংরা শব্দের ব্যবহার কিছুতেই ব্যাখ্যা করতে পারি না। অথচ এই জগত শিষ্ট না অশিষ্ট, এ জগত ভাল না মন্দ, এসব ভাষা গ্লানিকর, নেতিবাচক, আপত্তিজনক না স্বাভাবিক এসব প্রশ্ন নিয়ে একটু ও জজিয়তি করতে ইচ্ছে করে না। করে না, তার কারণ জগতটা কেমন তাই দেখানো হচ্ছে, ভাল না মন্দ রায় দেয়ার জন্য পাঠককে ডাকা হচ্ছে না। ইলিয়াসের পক্ষে এমন করে যে দেখানো সম্ভব হয়েছে তার কারণ তিনি এই জগত নিয়ে লেখার সময় মধ্যবিত্তের সংস্কৃতির একটি ও অনুষঙ্গ সেখানে নিয়ে যাননি। ভাষাটিও ছেড়ে গেছেন, বলতে গেলে বাংলা শব্দ ভান্ডারটিকেই ভুলে গেছেন, তাঁর আশা এই, বাংলাদেশের নিম্ন কোটির মানুষদের জগত থেকেই মুখের কথা গ্রহণ করে নতুন ভাষা তৈরি করে নেবেন ওদেরই- আচার আচরণকে অবলম্বন করে চরিত্র এবং তাদের জাগতিক কাজকর্ম বর্ণনা করে যাবেন যেন তিনি নিজে এ কাজ করছেন না, করছেন তারাই যাদের নিয়ে তিনি সাহিত্য সৃষ্টি করতে চাইছেন। অনেকটা ‘এপিক থিয়েটার’-এ ব্রেখট যা করতে চান, কৃত্রিমভাবে জগত বানিয়ে তোলা এবং থিয়েটারের দর্শকদের সে কথা জানিয়েই অভিনেতারা যাতে নিজেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্মিত চরিত্রের অভিনয় করে যান সেটা নিশ্চিত করা। ইলিয়াাসের সৃষ্ট জগতটা ভাল না মন্দ, তার সাংস্কৃতিক মান টা উঁচু না নিচু এসব প্রশ্ন পাঠকের কাছে অবান্তর মনে হবে, তবে তার মধ্যবিত্ত মানসিকতা বার বার ঘা খাবে, সঙ্কুচিত হয়ে উঠবে, চাবুক খেয়ে কেউ কেউ করে চেঁচাবে- কিন্তু আলগা মৌখিক সমবেদনা জানানোর কিংবা এক-আধটু দয়াধর্ম প্রদর্শনের কোন জায়গা থাকবে না। বদলাতে চাইলে আগাপাস্তলা বদলাও এবং তার নাম বিপ্লব দেবে কি দেবে না তা নিয়ে যত খুশি চিন্তা-ভাবনা (?) করোগে।

আমার খুব কৌতূহল হয়- ইলিয়াস সাহিত্যের সীমানাটাকে ডিঙ্গিয়ে এই যে নতুন একটা সীমানা টানার কাজ হাতে নিলেন, তা করতে গিয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রার পর থেকে বাকি সমস্ত গল্পের ভাষা কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, ভাংচুর হয়েছে, তার একটা জরিপ হোক। দেখা হোক তৎসম শব্দের ব্যবহার কিভাবে কমে এসেছে, সংলাপের অসম্ভব বৈচিত্র্যের মধ্যে মুখের ভাষার সীমানা কোথা গিয়ে পৌঁছেছে, এমনকি বর্ণনাংশেও ইলিয়াসের ভাষা কত ধরনের শব্দধারণ করেছে, তৎসম শব্দ বন্ধকে কি নির্মমভাবে উদম করে ফেলা হয়েছে, প্রচলিত কৌশলগুলোর বদলে ইলিয়াস সৃষ্টির জন্য কত ধরনের নতুন কৌশল অবলম্বন করেছেন এসব খুঁটিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। ইলিয়াস তাঁর সাহিত্যে এই অসাধ্য সাধন করতে অনেকটা কৃতকার্য হয়েছিলেন। সে জন্য আমাদের দেশের সাধারণ মানুষদের মানবেতর জীবন, তাঁদের আশাহীন, ভরসাহীন ভবিষ্যত, তাদের অকিঞ্চিতকর জীবন-ভাবনা, তাদের অতিনিকৃষ্ট সাংস্কৃতিক মান, তাদের দৈনন্দিনের নোংরা অশিষ্ট, অশ্লীল ভাষা এবং সেই ভাষার সাযুজ্যে জীবনযাপন অবলীলাক্রমে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন এবং বিপ্লবীর মতো তাঁকে মাঝে মধ্যে-বিপ্লবের হুঙ্কারও ছাড়তে হয়নি। বিপ্লব যে সহানুভূতি, করুণার কাজ নয়, বৈপ্লবিক বাকোয়াজির কাজও নয়, জনগণকে আদর্শ বিপ্লবী বানানোর কাজও নয়- সেটা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস খুব সাদা চোখে দেখতে পেয়েছিলেন। কোন জিনিসটাকে বদলানো দরকার তা তিনি সরাসরি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন।

সংস্কৃৃতির সীমানা পেরুনো এবং মধ্যবিত্ত লেখকের সাহিত্য ভাষা পরিত্যাগ করার ওপর যে জোর আমি দিয়েছি তা অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু যদি কথাটাকে এভাবে বলা যায় যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ পর্ব থেকেই লেখক হিসেবে তাঁর অবস্থান বদলাতে শুরু করেছিলেন এবং ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’- এ তাঁর অবস্থানের অসম্পূর্ণতা ও অনিশ্চয়তার জন্য যেটুকু বা অনাবশ্যক নিষ্ঠুরতা, উদ্দেশ্যহীনতা এবং নৈরাজ্য সৃষ্টি করে ফেলেছিলেন, মধ্যবিত্ত বৃত্তের বাইরে দৃঢ়তার অবস্থান নেয়ার ফলে তাঁর পরবর্তী গল্পগুলো এসব কিছু থেকে মুক্ত হয়ে যায় এবং বাংলা সাহিত্যের সীমানাটিকে প্রসারিত করে তার ক্ষেত্রটিকেও প্রসারিত করে দেয়, তাহলে বোধহয় আমার বক্তব্যটিকে সংশোধিত করার প্রয়োজন হবে না।

শীর্ষ সংবাদ:
রিজেন্ট হাসপাতাল সিলগালা         সংসদের মুলতবি অধিবেশন বসছে বুধবার         এক কোটি দুস্থ ১০ কেজি করে চাল পাবেন         কুরবানির পশু পরিবহন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে : রেলমন্ত্রী         লঞ্চ দুর্ঘটনা : হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হলে ‘হত্যা মামলা’ হবে : নৌপ্রতিমন্ত্রী         বিজিবির ১১৯ মুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিলের প্রজ্ঞাপন স্থগিত         করোনা ভাইরাস ॥ ব্রাজিলে মৃত্যু ৬৫ হাজার ছাড়াল         দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মৃত্যু ৫৫ জনের, নতুন শনাক্ত ৩০২৭         শুল্ক কমিয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত         করোনা ভাইরাস ॥ চিকিৎসক নিয়োগে আসছে বিশেষ বিসিএস         পাপুলকাণ্ডে রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে ॥ পররাষ্ট্রমন্ত্রী         উপনির্বাচন পেছানোর সুযোগ নেই ॥ ইসি সচিব         বান্দরবানে জনসংহতির সংস্কারপন্থি ছয়জনকে গুলি করে হত্যা         দাউদকান্দিতে প্রাইভেটকার খাদে পড়ে একই পরিবারের ৩ জন নিহত         এবার মাশরাফির স্ত্রীও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত         জাতীয় পার্টিতে নতুন দুই উপদেষ্টা         দুই আসনের উপনির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য বলল বিএনপি         কিশোরগঞ্জে শোক-শ্রদ্ধায় শোলাকিয়ায় জঙ্গী হামলায় নিহতদের স্মরণ         করোনা ভাইরাসে ভারতে মৃত্যু ছাড়াল ২০ হাজার         টেকনাফে বন্দুকযুদ্ধে দুই ইয়াবা কারবারি নিহত        
//--BID Records