ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

প্রকৃতির অবারিত দান বিপর্যয়ও কম নয়

প্রকাশিত: ০৮:৫০, ৩১ জুলাই ২০১৯

প্রকৃতির অবারিত দান বিপর্যয়ও কম নয়

শ্যামল বাংলায় প্রকৃতির রুদ্ররোষ আবহমানকালের এক বিক্ষুব্ধ আবহ। নৈসর্গিক ভাব সম্পদে লালিত মানুষ প্রতিনিয়তই বিরূপ পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে। সেই সভ্যতা বিবর্জিত অধ্যায় থেকে আজ অবধি সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রকৃতির অবারিত সম্পদ যেমন ভরিয়ে দেয় পাশাপাশি এর বিপরীত বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়াগুলোও সংশ্লিষ্টদের অসহায় করে তোলে। বন্য এবং বর্বর দশায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দাপটে চারপাশের নির্ভরশীল মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্দশার ইতিবৃত্ত যাযাবর জীবনের বিপন্ন অধ্যায়। ক্রমান্বয়ে তেমন দুঃসময় কাটতে আদিম মানুষকে বহু বছর অপেক্ষা করতে হয়। মানুষের অভাবনীয় বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি তার সঙ্গে বিজ্ঞানের অবিস্মরণীয় বিজয় রথ দুরন্ত প্রকৃতিকে বশীভূতকরণে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখে। বন্য থেকে বর্বর মানুষরা কিছুটা বিরূপ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য লাভে সমর্থ হলেও তাকে জয় করার ইতিহাস আরও পরের। সভ্যতা সূর্য যখন তার শুভ প্রভাতের রশ্মি বিকিরণ করতে শুরু করে তখন প্রাচীন মানুষদের জীবনেও ঘটে যায় এক অবিশ্বাস্য রূপান্তর। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদ-নদীর অববাহিকায় কৃষি সভ্যতার যে বীজ উপ্ত হয় সেটাই বিশ্ব ইতিহাসের এক বড় ধরনের প্রাপ্তি যুগ। যে যুগ ক্রমান্বয়ে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি জগতের অভাবনীয় সম্পদকে বাস্তবের জীবন প্রক্রিয়ায় সন্নিবেশিত করে প্রকৃতির ওপর প্রভুত্ব বিস্তারের নতুন অধ্যায় সূচিত করে। প্রকৃতিকে আয়ত্তে এনে সভ্য মানুষের যে শুভযাত্রা সেটা আজ মধ্যগগনের আলোকিত বিশ্ব। আমাদের এই ক্ষুদ্র ভূখ-ও ক্রমান্বয়ে সুবিশাল পথপরিক্রমায় যেভাবে সময়ের জয়গানে উদীপ্ত হয়েছে তাও এদেশের সাধারণ গোষ্ঠীর এক অভাবনীয় প্রত্যয় আর অন্তর্নিহিত শক্তি ও বোধ। নদী তীরের পলিমাটির বিশুদ্ধ আবহে গড়ে ওঠা ভারতীয় সভ্যতার অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল আমাদের এই শ্যামল বাংলা। সুজলা, সুফলটা, শস্য শ্যামলা নদী বিধৌত বাংলা তার চিরায়ত ভাব সম্পদ নিয়ে এ দেশের মানুষের যাপিত জীবনের অংশীদার হয়েছে। প্রকৃতির সুরম্য লীলা নিকেতন বাংলা যে মাত্রায় তার রূপসম্ভার অকাতরে দান করেছে সেখানে কঠিন রুদ্র মূর্তিও কোলের সন্তানদের সামলাতে হয়েছে। ষড়ঋতুর বিচিত্র নৈসর্গিক সত্তা নিয়ে গড়া বাংলার হরেক রকমের মাধুর্য আর বিপর্যয়ও চারপাশের মানুষদের মুগ্ধই শুধু নয় হতবাকও করে দেয়। প্রকৃতি ও জীব বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী নিসর্গ আর জীববৈচিত্র্য নিজস্ব নিয়মে গড়ে ওঠে এবং তার ভাঙ্গা-গড়াও হয় এক অনিবার্য পরিণতিতে। পারিপার্শিক মানুষরা সেই উত্থান পতনের অনুষঙ্গ হয়ে প্রকৃতির অবারিত দান এবং বিপন্ন পরিস্থিতিকে সামলাতে সচেষ্ট হয়। তবে আধুনিক সময়ের যান্ত্রিক কলাকৌশলের অবধারিত অগ্রগতিতে প্রকৃতি তার আপন নিয়মে আবর্তিত হয় কিনা সেটাও বিবেচনার বিষয়। বাংলার চির সবুজ প্রান্তর তার শ্যামল অবয়বে অবিকৃত অবস্থায় দৃশ্যমান কিনা তাও আলোচনার দাবি রাখে। সমুদ্র, নদী, পাহাড়, বনের অপরূপ মিলন শোভায় সুশোভিত বাংলা আজ কোন্ অবস্থানে তাও খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। সবচেয়ে দৃশ্যমান যা সারি সারি সবুজ গাছ পরিবেষ্টিত শ্যামল বাংলা আজ অনেকটাই আধুনিক নাগরিক সভ্যতা তৈরির নির্মম কষাঘাতে পিষ্ট। অবকাঠামোগত উন্নয়নে বহুতল ভবন নির্মাণ, সড়ক-মহাসড়কের যাত্রাপথের আধুনিকায়ন, শিল্প-কারখানার বর্জ্য পদার্থে নদী ও পরিবেশ দূষণ সব মিলিয়ে নগর সভ্যতার বিকাশমান ধারায় নদ-নদী তার নাব্য তা হারাচ্ছে, সবুজ বাংলা জৌলুস হারিয়ে এক ধূসর প্রকৃতিকে বরণ করে নিয়েছে। বন-সম্পদের যে নির্মাল্যের ডালি বাংলাকে অপরূপ সাজে সজ্জিত করে সেই চমৎকার দৃশ্যও আজ অপসৃয়মান। বনের পর বন যে মাত্রায় উজাড় হয়ে স্বার্থান্বেষী মহলের রোষানলে বিদ্ধ হচ্ছে তাও বাংলার সবুজ প্রকৃতিতে এক ধরনের আত্মহননের পর্যায়। প্রকৃতির অবারিত দানে এক প্রকার জবরদস্তি অযাচিত মরণ কামড়। আর পাহাড় ঘেরা বাংলার নয়নাভিরাম সুদৃশ্য এক সময় সংশ্লিষ্ট মানুষদের উপভোগের বিষয় ছিল আজ তা করুন, ইতিহাসের ধারাল অস্ত্রে মরণাভিযানে অবতীর্ণ হয়। পাহাড় কাটার যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে তাও ন্যক্কারজনকভাবে সবার সামনে উন্মোচিত হয়। পাহাড় কেটে আধুনিকতার গোড়া পত্তন তাও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মর্মান্তিক বিপর্যয়। পাহাড় কর্তনে সড়ক-মহাসড়কের নতুন মাত্রা দেয়া সেও তো পরিবেশ বিজ্ঞানীদের পরামর্শ সাপেক্ষে করা উচিত ছিল। অবৈজ্ঞানিক উপায়ে পাহাড় কাটার যে ধুম তা শুধু যে পরিবেশকে বিপন্ন করেছে তা নয়, তার সহজাত শক্তি হারিয়ে চার পাশের মানুষদের জীবনকেও বীভৎস করে দিতে সময় নেয়নি। সামান্য বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল এখন নিত্য নৈমিক্তিক ব্যাপার যা নিয়তই এলাকার সাধারণ মানুষের জীবনকে সর্বস্বান্ত করে দিতে সময় নিচ্ছে না। নদীমাতৃক আর বৃষ্টিস্নাত বাংলাদেশে বন সম্পদ আর পাহাড় এক অকৃত্রিম সম্ভার। যা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে চার পাশে সুরক্ষিত প্রাচীর গড়ে তোলে। প্রকৃতির স্নেহদানে তার কোলে লালিত সন্তানদের জীবনকেও নিরাপদ এবং নির্বিঘœ করে। বাংলাদেশে নগর সভ্যতার আধুনিকায়নে বহুতল ভবন তৈরি, উন্নত সড়ক নির্মাণ, সেতু, উড়াল সড়ক প্রস্তুতÑ সব মিলিয়ে আশপাশের প্রকৃতির ওপর চলে বিরূপ আচরণ, এক সময় সড়কের দু’পাশে যে সবুজ বৃক্ষরাজির সমারোহ ছিল ক্রমান্বয়ে সড়ক উন্নয়নের গতিধারায় সে সব গাছের শ্যামল ছায়া আজ আর দেখা যায় না। প্রকৃতি শুধু ক্ষুব্ধই হচ্ছে না তার নিয়ম-বিধিরও ব্যত্যয় ঘটিয়ে প্রতিদিনের আবহাওয়াকেও করছে ভিন্ন মাত্রার। নির্মল বাতাস আজ সেই সুশীতল ছায়ায় কাছে-ধারের মানুষকে স্নিগ্ধতার প্রলেপ বুলিয়ে দিতে পারে না। সবুজ বৃক্ষের শান্ত পরশ শুধু নয় ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত পথিক কোন এক কালে গাছের ফল আহার করেও তার ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণ করত। যা আজ দূর অতীতের সুবর্ণ অধ্যায়। বর্ষার মৌসুমে যেখানে অনেক গাছ লাগানোর কথা সেখানে আধুনিক নগরী তৈরিতে বৃক্ষ সম্পদ নিধন তাও প্রকৃতির ওপর অযাচিত নিপীড়ন। গত বছরই প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে ৩০ লাখ শহীদানকে স্মরণ করে ৩০ লাখ গাছের চারা রোপণ করেছিলেন। এমন অভাবনীয় দৃষ্টান্ত কেন আমরা হরহামেশাই নিতে পারি না। গাছ কেটে ফেলা, বনজ সম্পদ উজাড় করে দেয়া, পাহাড়ের নিষ্ঠুর কর্তন অভিযান এবং নদীদূষণ, দখলীকরণ, নাব্য ধ্বংসই শুধু নয় উর্বর পলিমাটির ওপরও অযাচিত হস্তক্ষেপ প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে নানামাত্রিকে উস্কে দিচ্ছে। প্রকৃতি রুষ্ট হচ্ছে, চারপাশের মানুষরা আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং অস্থিরতা প্রতিনিয়তই সংশ্লিষ্টদের জীবনকে অসহনীয় করে তুলছে। এই মুহূর্তে দেশের উত্তরাঞ্চল বন্যার পানিতে ভাসছে। বানভাসি দুর্গত মানুষরা আশপাশের আশ্রয় কেন্দ্রে সরে আসলেও বিপন্ন অবস্থা থেকে মুক্ত হতে পারছে না। অতিবৃষ্টি আর বিপদসীমা অতিক্রম করা নদীর পানিতে বন্যার যে দুঃসহ বিপন্ন যাত্রা তার সঙ্গে মিলেছে পাহাড়ি ঢলও। এসব দুর্গত এলাকায় সাধারণ মানুষের জীবন নাভিশ্বাস হওয়ার উপক্রম। বন্যা পরিস্থিতি আর খারাপের পর্যায়ে যাচ্ছে না ঠিক তবে গণমানুষের নিত্য নৈমিত্তিক অবস্থার বিপত্তিও যে খুব কমেছে তা কিন্তু নয়। পানির নিচে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ফসলী জমিও তলিয়ে গেছে। গৃহছাড়া মানুষরা ঘরে ফিরতে এখনও সময় লাগছে। বন্যার পানিতে আর এক বিপর্যয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পানিবাহিত রোগের বিস্তার, দুর্গত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। নদীর তীরের মানুষের বিপর্যস্ত জীবন নতুন কিছু নয়। বিরূপ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে তারা বেঁচে থাকে। বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি হরেক রকম প্রকৃতির বিরূপ আবহকে সামলিয়ে তারা নিত্য দিনের জীবনকে এগিয়ে নেয়। সুতরাং অনিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক অনেক দুর্যোগ সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু যেসব প্রকৃতির সম্পদ মানুষের আয়ত্তের মধ্যে তাকে সুরক্ষা দেয়া প্রত্যেকের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। এখন বর্ষাকাল। বৃক্ষ রোপণের সুবর্ণ সময়। গাছের নির্মল ছায়ায় অকৃত্রিম ছাদ যেন মাথার ওপর থেকে চলে না যায় তেমন অবস্থাও হাতের নাগালের মধ্যেই আছে। নদ-নদী বিধৌত বাংলার নদী-সম্পদ এই ভূখ-ে যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্য। তাকেও আজ আমরা হারাতে বসেছি। নগর পরিকল্পনায় শিল্প-কারখানা তৈরি করা আধুনিকায়নের পূর্বশর্ত হলেও নদীর ওপর তার বিরূপ প্রভাব বিপদ ডেকে আনতেও সময় লাগে না। শিল্প-কারখানার চারপাশে গড়ে ওঠা বস্তি ও পরিবেশ বিপর্যয়কে বিভিন্নভাবে উদ্বিগ্ন অবস্থায় নিয়ে যায়। আর কাছে-ধারের নদী-নালা নর্দমায় শিল্প পণ্যের বর্জিত অংশ যে ভয়ঙ্কর অবস্থা তৈরি করে তাতে নদীর পানি দূষিত হয়ে স্বচ্ছতা ও নাব্য হারাতেও সময় নেয় না। নদী তার আপন বৈশিষ্ট্য আর মর্যাদাকে ধরেও রাখতে পারে না। তার ওপর আছে নদী খনন, ভরাট এবং জবরদখলের মতো নিয়মবিধিবহির্ভূত কার্যক্রম। যা বিভিন্নভাবে আশপাশের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে বিঘিœত করে। ছোট এই ভূখ-টি অধিক জনসংখ্যার ভারে অসহায়। তার ওপর প্রকৃতির অবারিত দানে ভরপুর সামগ্রিক সম্পদের যে পরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় তাতে সাধারণ জনগোষ্ঠীই হয় সব থেকে বেশি আক্রান্ত। এমন বিপজ্জনক প্রতিবেশকে সামলাতে গেলে জীব ও প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের পরামর্শ, উপদেশ গ্রহণ আবশ্যক। শুধু তাই নয় ব্যক্তিক সচেতনতা এবং দায়বদ্ধতা প্রকৃতিকে সুরক্ষা দিতেও নিয়ামক শক্তি। প্রকৃতি যেমন তার নিরন্তর কর্মযোগে তার পাশের পরিবেশকে নির্মল আর বাসযোগ্য করে তোলে পাশাপাশি তার বিপরীত প্রতিক্রিয়াগুলোও মানুষকেই সামলিয়ে চলতে হয়। তেমন ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের কোন ব্যত্যয় ঘটালে তার অনিবার্য দুর্ভোগগুলোও মানুষের ওপরই বর্তায়। নিজেকেসহ পুরো পরিবেশকে নিরাপদ এবং নির্বিঘেœ এগিয়ে নিতে হলে নৈসর্গিক সম্পদকে বিভিন্ন উপায়ে রক্ষা করা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প পথ থাকেও না। সে কারণে সারাদেশের সাজানো গোছানো প্রাকৃতিক বৈভবকে নষ্ট করা যাবে না। প্রকৃতির সীমাহীন দানে বাংলাদেশের যে সমৃদ্ধ আয়োজন তা কতিপয় স্বার্থান্বেষী চক্র এবং ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর অর্থলিপ্সার সঙ্গে আরও কিছু মহলের কারসাজি কিনা তাও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন। দেশটা সবার। ফলে কোন দুর্যোগ কিংবা বিরূপ পরিবেশ তৈরি হলে ফলভোগ করতে হবে প্রত্যেককেই। সেই দুর্ভোগ থেকে কেউই রেহাই পাবে না। এমনকি ষড়যন্ত্রকারীরাও নয়। সাজানো গোছানো নিসর্গ সেই আবহমানকাল থেকেই তার সুনিবিড় স্নিগ্ধ পরশে বাংলার মানুষদের প্রতিদিনের জীবনে যে স্নেহ সুধা বর্ষণ করে যাচ্ছে তাকে আর হেলায় হারালে সামনে আরও সমূহ বিপর্যয়কে সামলাতে হবে। লেখক : সাংবাদিক