ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

জামায়াত নিবন্ধন বাতিলের প্রজ্ঞাপন অতঃপর...

প্রকাশিত: ০৬:০৬, ৩১ অক্টোবর ২০১৮

জামায়াত নিবন্ধন বাতিলের প্রজ্ঞাপন অতঃপর...

বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধিতাকারী ও ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচনের ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করার পাঁচ বছর পর নিবন্ধন বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। এ খবরটি জামায়াত-শিবিরের জন্য কষ্টের এবং প্রজ্ঞাপনের দিনটিও তাদের জন্য হতাশার। কারণ, তারা দল হিসেবে জামায়াত ইসলাম আর দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে বাংলাদেশে আর কোন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। অন্যদিকে, জামায়াত-শিবিরবিরোধী মহল এটাকে ইতিবাচক হিসেবে মনে করলেও আমি দেখছি একটু অন্যভাবে। কারণ, জামায়াত ইসলাম দল হিসেবে শুধু নির্বাচনের অযোগ্যই নয় কিংবা দলের নিবন্ধন বাতিলই নয়, দল হিসেবে নিষিদ্ধ হয়েও বার বার ফিরে এসেছে নিজেদের আপন নামে। জন্মলগ্ন থেকে বার বার নিষিদ্ধের সেই ‘লাল ক্রস’ থেকে তারা উঠে এসেছে এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের রাজনীতি ও রাজনৈতিক কর্মকা- সমানভাবে আজও করে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির তৃতীয় বিশ্বের এই সময়ে জামায়াত ইসলাম বসে আছে, তাদের রাজনৈতিক কর্মকা- ঘুছিয়ে নিয়েছে কিংবা কমিয়েছে অথবা বন্ধ করে দিয়েছে- এমনটা আমি ভাবতে রাজি নই। কারণ, বর্তমান ১৪ দল সরকারের ক্ষমতায় থাকার পরেও, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তাদের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি কার্যকরের পরও রাজনৈতিকভাবে তাদের কোণঠাসা কিংবা প্রকাশ্যে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করতে না দেয়ার পরওÑ তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন যা বিশ্বের তৃতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পরিচিত ‘ছাত্রশিবির’ অনলাইনের মাধ্যমে তাদের কাউন্সিল সফল করেছে, সম্পন্ন করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামের কী ভূমিকা ছিল, রাজাকার, আলবদর, আল শামসসহ শান্তি কমিটি গঠন এবং তখনকার সময়ে সংখ্যলঘু বিশেষ করে হিন্দুদের ধরে ধরে হত্যা করা, গণহত্যার বর্বর ইতিহাস রচনা করা, জোর করে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করা, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং সর্বোপরি পাকিস্তান রক্ষায় বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ষড়যন্ত্র নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জনকণ্ঠের এই ছোট্ট লেখায় সম্ভব নয়। তবে আমি বিশ্বাস করি, এ জাতির কাছে জামায়াতে ইসলাম ও তাদের নেতাদের কার কী ভূমিকা- এটা অনেকটা স্পষ্ট। যদিও একুশ বছরের বিকৃত ইতিহাসের বিভ্রান্ত জনগোষ্ঠীর অনেকের কাছে পুরোপুরি অজানা আছে বলেই কেউ কেউ টি-শার্টে কিংবা গালে টাচু এঁকে ‘আমি রাজাকার’ বলে নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরতে ঔদ্ধত্য দেখিয়ে থাকে। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেই আমাদের কাজ শেষ বলে মনে করলে হবে না। আমি আগেও বলেছি, ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনবার নিষিদ্ধ হয় জামায়াত। এর মধ্যে ১৯৫৯ ও ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানে এবং ১৯৭২ সালে। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা পরে মেজর জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় সাত বছর পর ১৯৭৯ সালের ২৫ মে আবার প্রকাশ্য রাজনীতি করার সুযোগ পায় জামায়াত। তাই বলছি, সামনেও যে আবার ফিরে আসবে না- এমন গ্যারান্টি বা নিশ্চিত মনে করে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে জামায়াতকে নিবন্ধন দেয়ার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই রিটের জারি করা রুলের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতের নিবন্ধন ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে। আর তখন থেকেই জামায়াত ইসলাম ভিন্ন নামে নিজেদের সংগঠিত করতে থাকে। তখন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) নাম দিয়ে পুরনো বোতলে নতুন লেবেল লাগানোর মতোই তারা তাদের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মকা- ভেতরে ভেতরে অব্যাহত রেখেছিল। শুধু তাই নয়, জামায়াতে ইসলাম নিষিদ্ধ হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে তখন ‘বিডিপি’ নামের নিজেদের কীভাবে সংগঠিত করতে হবে তার একটি রূপরেখাও তৈরি করেছে। আবার সিনিয়র নেতাদের নেতৃত্বে ‘জামায়াত ইসলাম’কে তাদের ফাদার সংগঠন হিসেবেও রাখার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। একটি কথা এখানে না বলে পারছি না, জামায়াত সম্পর্কে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হচ্ছে, আমরা একে রাজনৈতিক দল মনে করি। আর এই ভুল ধারণা বা চিন্তাধারা থেকে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাও তাদের রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, এই জামায়াতীদের থানা কিংবা পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে আনতে কিংবা তাদের পক্ষে সুপারিশ করতে দলীয় প্যাডও ব্যবহার করেছে। আবার দুঃখজনক হলেও সত্য, স্থানীয় নির্বাচনে বহু জামায়াতীদের নৌকা প্রতীক তুলে দিয়ে শুধু দলীয় আদর্শকেই ব্যক্তিগতভাবে ধ্বংস করেনি, দেশ ও জনগণের দুর্ভাগ্য ডেকে আনতে সহায়তা করেছে এমন খবরও মিডিয়ায় এসেছে। আর বিগত ছাত্রলীগ কমিটিতে কী পরিমাণ ছাত্রশিবিরকর্মীকে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে- যার হস্তক্ষেপ স্বয়ং শেখ হাসিনাকেই করতে হয়েছে। অন্যদিকে সরকারী, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে মিডিয়ায় চাকরির সুযোগ-সুবিধা দিয়ে শুধু নিজের জায়গাটাই হালকা করেননি, বরং পুরো জাতির ভবিষ্যত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাই আজ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, মিডিয়ায় উদ্দেশ্যপ্রোণোদিত সংবাদ প্রকাশ এবং অন্যদিকে সাংবাদিক সংগঠনগুলোসহ জাতীয় প্রেসক্লাবে রীতিমতো স্বাধীনতার পক্ষে একাই যেন যুদ্ধ করছে মুহম্মদ শফিকুর রহমান। আর সাম্প্রতিক এই জামায়াত-শিবিরের ৫০ হাজার নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলেও জামায়াতের সিনিয়র নেতাদের মুখে শোনা যায়। এটি শোনা কথা হলেও তার পরিকল্পনা কিন্তু অনেকদিন আগের। আমাদের জানা উচিত জামায়াতের ‘টার্গেট ২০২০’ মহাপরিকল্পনার বিষয়বস্তু। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর প্রায় সাড়ে তিন বছর আত্মগোপনে থাকা রাজাকাররা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। যার সর্বাধিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছিল মেজর জিয়াউর রহমান। আর ১৯৭৮ সালে রাজাকারের শিরোমণি গোলাম আযমের নেতৃত্বে পরিকল্পনামাফিক একটি দীর্ঘমেয়াদী জামায়াতী রোডম্যাপ প্রণয়ন করে। জামায়াতের উদ্দেশ্য ছিল, ২০২০ সালের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা। সে অনুযায়ী সেনাবাহিনীতে নিজের ছেলে, দলীয় অনুসারী, পুলিশ, আনসার, বিডিআর, সাংবাদিক, পেশাজীবী থেকে শুরু করে রাষ্ট্র যন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দলীয় আদর্শের পরীক্ষিত ব্যক্তি ও মহলকে অধিষ্ঠিত করা। আর সেটার সফলতা তারা পেয়েছে বিএনপির সঙ্গে জোটগত সরকার গঠন করে। শুধু তাই নয়, তাদের সফলতম অধ্যায়ও যুদ্ধাপরাধী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদকে চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রী করা। রাজনৈতিকভাবে তারা সফল হয়েছে ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে স্কুল পর্যায় থেকে ধর্ম প্রচারের নামে সদস্য তৈরি করে। তাদের ব্রেন ওয়াশ করার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে মওদুদীর রচিত বিভিন্ন বই বিনামূল্যে উপহার দেয়া এবং কৌশলে এসব বই পড়ানোর জন্য পরবর্তীতে এটা নিয়ে আলোচনা করা। একেবারে ব্যবসায়িক চিন্তা বা গবেষণা করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যখাতসহ পাঁচটি লাভজনক ও গ্রহণযোগ্যখাতে অর্থ বিনিয়োগ করা। একটু চোখ ঘুরালেই দেখতে পাবেন যেখানে-সেখানে কিন্ডার গার্টেনের নামে, কোচিং সেন্টারের নামে, হাসপাতালের নামে, পরিবহনসহ ব্যবসাও তাদের সফলতম বিনিয়োগের স্থান। ইসলামী ব্যাংক, ইবনেসিনা হাসপাতাল আর রেটিনা কোচিং সেন্টার সবার মুখে মুখে থাকার কথা। আর এখন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামি হানিফ পরিবহনও পাঠকের মনে থাকার কথা। অন্যদিকে সরকারী চাকরিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ, দলীয় লোকদের সংশ্লিষ্ট সেক্টরে অন্তর্ভুক্ত করা, প্রমোশনসহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার পাশাপাশি নিজেদের গড়া ব্যবসা বাণিজ্যে ও প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকদের চাকরি দেয়ার পরিস্থিতি নিশ্চিত করা। কেউ চাইলেই হঠাৎ করে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে না। এই সুযোগ তারা রাখেনি। এখানে জামায়াতের বিশেষ করে মওদুদী বিশ্বাসের আস্থা অর্জন করে বিশ্বস্ত হিসেবে গণ্য হলেও হবে না; কলেমা পড়ে এবং পবিত্র কোরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ গ্রহণ করতে হবে। আর আপনি তাদের পরীক্ষিত বিশ্বস্ত হতে পারলেই তখন দলীয় সকল গোপন বিষয়গুলো সম্পর্কে আপনাকে অবগত করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নিজেদের আয়ত্তকরণ করতে সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। আর সেখানে ধর্মীয় আচার-আচরণ ও সুন্দর-সুন্দর স্বপ্ন দেখিয়ে প্রথমত ভক্তকুল তৈরি করে। আরেকটা ব্যাপার, যেটা আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির রাজনীতিতে দেখা যায় না, জামায়াত-শিবিরি করে থাকে, তারা দলের প্রতি আদর্শিক বা অনুগত মনস্তাত্ত্বিক মনোভাব প্রভাবিত করতে শিবিরের ক্ষেত্রে মাসিক চাঁদা, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়িকদের ক্ষেত্রে বেতন বা লাভের ১০% থেকে ১৫% দলীয় ফান্ডের নামে বায়তুল মাল সংগ্রহ করে থাকে। গোলাম আযম তার ‘টার্গেট ২০২০’ তাকিয়া নামক একটি মওদুদী কৌশলও অন্তর্ভুক্ত করেন। এখানে, জীবন বাঁচাতে কিংবা বিশেষ প্রয়োজনে ধর্মান্তরিত হওয়ার শিয়া সম্প্রদায়ের মতবাদের নাম হচ্ছে তাকিয়া। আর মওদুদীর এই কৌশলে জামায়াত-শিবিরের সদস্যরা দলের স্বার্থ রক্ষায় অন্য দলে অন্তর্ভুক্ত হবে, নিজের প্রভাব বলয় তৈরি করবে। জামায়াত-শিবির বিশ্বাস করে, মওদুদী মতবাদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করার নাম হচ্ছে ইসলাম। আর এই ইসলামের নাম ব্যবহার করে দল ও ব্যক্তির স্বার্থে সব অপকর্ম ও মিথ্যাচার করা হালাল! মওদুদী মতবাদ জামায়াত সদস্যদের শুরুতেই নয়, প্রকৃত মতবাদ বুঝে গেলে জামায়াত-শিবির থেকে দূরে সরে যাবে- এমন চিন্তাধারা থেকে ধীরে ধীরে দলীয় সদস্যের মন-মর্জি বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রকাশ করে থাকে। আর তাই দলীয় সদস্য হিসেবে টার্গেট করা হয় কিশোর-তরুণদের। মওদুদী বলেছিল, ‘গণতন্ত্র বিষাক্ত দুধের মাখনের মতো’ (সিয়াসি কসমকস, তৃতীয় খ-, পৃষ্ঠা-১৭৭) আবার অন্য আরেকটি বইয়ে তার মতবাদে উল্লেখ করেন, ‘গণতন্ত্রের মাধ্যমে কোন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ইসলাম অনুযায়ী হারাম’! (রাসায়েল ও মাসায়েল, প্রথম সংস্ককরণ, পৃষ্ঠা-৪৫০) পাঠক! এবার আপনি নিজেই একটু পেছনে ফিরে তাকালে বুঝে যাবেন, মওদুদীবাদ কতটা প্রতারণার ফাঁদ এবং জামায়াত-শিবির মুখে কিংবা মতবাদে এক হলেও কর্মকাণ্ডে হারামকেও হালাল বানিয়ে জায়েজ করতে চেষ্টা করে। এই যেমন- জামায়াতে ইসলামের সর্বশেষ চারদলীয় জোট নির্বাচনও কিন্তু গণতান্ত্রিক বিধিবিধানের মাঝে হয়েছিল। অথচ, তাদের পীর মওদুদী গণতন্ত্রের নামে কী বলেছে? ভারতবর্ষের কমিউনিস্টবিরোধী শক্তি হিসেবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের আশ্রয়ে ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট ‘জামায়াতে ইসলাম হিন্দ’ নামে দলটি গঠিত হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধিতা করে। তখনও মওদুদী ফতোয়া দেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি করা সবাই, মুসলিম লীগ, জিন্নাহ- এঁরা কেউই খাঁটি মুসলিম না’! ঠিক এই ধরনের কথাও গোলাম আযমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় বলেছিল। আর এই ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করে এদেশের বুদ্ধিজীবীসহ ৩০ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং চার লাখেরও বেশি নারীর সম্ভ্রমহানি করে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সফলতার গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে- বঙ্গবন্ধুর এই উক্তিটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুধু রাজাকার, আলবদর, আলশামস, যুদ্ধাপরাধী কারা, কী তাদের বর্বরোচিত ইতিহাস এবং সর্বোপরি জামায়াতে ইসলাম একটি যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠন- এটি দেশ ও জাতির সামনে পরিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। শেখ হাসিনার একক চেষ্টায় আজ জামায়াতে ইসলামের মতো ভণ্ড ও সন্ত্রাসী সংগঠনের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে, প্রজ্ঞাপনও প্রকাশিত হয়েছে। এতে আমাদের আনন্দে আত্মহারা হলে চলবে না। বাকি কাজটুকু আমাদেরই করতে হবে। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে জামায়াতের ধর্ম ব্যবসা এবং সন্ত্রাসী সকল কর্মকাণ্ড সহ চিরতরে ধ্বংস করতে সবার এগিয়ে আসতে হবে। চারপাশ থেকে জামায়াতকে চেপে ধরতে হবে। কারণ, ভুলে গেলে চলবে না জামায়াতের হাতে আছে প্রচুর অর্থ-সম্পদ। আর এটা ব্যবহার করতে পারে দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে। সে ব্যবহার করার সুযোগ ও তাদের অর্থ-সম্পদ সংকুচিত করতে দেশপ্রেমিকদের উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যক্তি থেকে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে আমাদের পরিকল্পনা করেই কাজ করতে হবে। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফাঁসির রায় ঘোষণা করার পর দেশের অন্তত ৩৪টি জেলায় জামায়াত ব্যাপক নাশকতা চালায়। পরে অবশ্য আপিলে সাঈদীকে মৃত্যুদ-ের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়। মীর কাশেম আলীর নেতৃত্বে জামায়াত তখন প্রচুর অর্থ খরচ করে বিচার বন্ধ এবং জামায়াত নেতাদের রক্ষায় আন্তর্জাতিক ‘লবিস্ট’ নিয়োগ করে। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন হওয়ার পর, যুদ্ধাপরাধের বিচার বানাচালে প্রচারণা এবং বাংলাদেশ সরকারের ওপর বিচার বন্ধে চাপ সৃষ্টি করতে ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের লবিস্ট ফার্ম ‘কেসিডি এ্যান্ড এ্যাসোসিয়েট’-এর সঙ্গে চুক্তি করে। আর তখন ওই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং প্রধান নির্বাহী সাবেক মার্কিন কংগ্রেসম্যান ছিলেন মার্টিন রুশো। চুক্তিপত্রে জামায়াতের পক্ষে মীর কাশেম আলী নিজে এবং লবিস্ট ফার্মের পক্ষে জেনারেল কাউন্সেল জে ক্যামেরুজ স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ সালের ৬ অক্টোবর থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৫ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৬ মাস প্রচারণা চালায়। চুক্তি করার এক মাসের মধ্যেই ২০১০ সালের ১৭ জুন গ্রেফতার করা হয় মীর কাশেম আলীকে। প্রচারণার কাজ অব্যাহত থাকে এবং পরে এই চুক্তি আবার নবায়নও করা হয়। সিটি ব্যাংক এনের মাধ্যমে ‘ইলেক্ট্রোনিক মানি ট্রান্সফার’ করে চুক্তির প্রথম ছয় মাসের আড়াই কোটি মার্কিন ডলার ফার্মটিকে পাঠানো হয়- এই কথাটি বলার অর্থ, মীর কাশেম আলী গ্রেফতার হলেও জামায়াতের অপতৎপরতা বন্ধ হয়নি এবং এখনও নয়। তাই শুধু নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য দলের নিবন্ধন বাতিলের পাশাপাশি জামায়াতের বিরুদ্ধে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। সরকার চাইলে যে কোন সময় জামায়াতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করতে পারবে। ট্রাইব্যুনালের একাধিক রায়ে জামায়াতকে ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী সংগঠন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সরকার সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এখন চাইলেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা যায়। কিন্তু দলীয় ব্যক্তিদের কী করবে? তারা বিভিন্ন দলে প্রবেশ করবে। আর যেহেতু বিএনপির আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং দলীয় জোটে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়ও অধিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের প্রথম পছন্দও বিএনপি হতে পারে। যদিও অতীতে বিএনপি-জামায়াতের ছাত্র সংগঠনকে একই মায়ের দুটো সন্তান বলে নিজেরাও স্বীকার করে। আবার তারা নতুন নামেও আসতে পারে। প্রকাশ্যে একটা আর গোপনে আরেকটা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই প্রকাশিত বা সমালোচিত হয়েছে- ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন জামায়াতের পক্ষে তথাকথিত ঐক্যফ্রন্টে প্রতিনিধিত্ব করছে। সে কবে, কখন ছাত্রশিবিরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে নিজের আনুগত্য প্রকাশ করেছে-এটিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। জামায়াতে ইসলাম নিবন্ধন ছাড়াও যে ভেতরে ভেতরে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে- এটিও এখন আর গোপন নয়। তারা দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও বিভিন্ন দলে ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করে ওই দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে- এই ধরনের পরিকল্পনা নিয়েই এগুচ্ছে। জামায়াত-শিবিরের নতুন সদস্য আত্মগোপনে গেলেও সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি এখনও দৃশ্যমান। রাষ্ট্র সংগঠনের নিবন্ধন বাতিল করলেও জনগণের উচিত হবে- সামাজিক, ব্যবসায়িক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা। আর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সরকারী ও রাজনৈতিক উদ্যোগে জেলা-উপজেলা, পাড়া-মহল্লার প্রতিটি জামায়াত-শিবিরকর্মীদের চিহ্নিত করে স্থানীয় থেকে জাতীয়ভাবে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে তাদের পরিচিতি তুলে ধরা, জনগণকে সচেতন করা। আমি মনে করি, মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের সকল অপকর্ম বার বার তুলে ধরার মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করে গড়ে তোলাই হবে- জামায়াত-শিবির ধ্বংসের মূল পরিকল্পনা। লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম বোয়াফ [email protected]