শনিবার ২৭ আষাঢ় ১৪২৭, ১১ জুলাই ২০২০ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

আলো

  • আবু নাসের চৌধুরী

আকাশের কোথাও এক টুকরো মেঘ নেই, যেন শরতের নির্মলতার ভেতর ডুবে আছে। সকালের ঝলমল রোদ ক‘দিনের মেঘ-বৃষ্টি কোথায় যেন লুকিয়ে রেখেছে। একটানা বর্ষণে মনটা ভারি হলেও অনেকের শঙ্কিত ভাবনার মাঝে ছেদ পড়েছে খানিকটা । শহরের অলি গলি সূর্যের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তবু সবার মনে থেকে যায় অন্ধকারের ভয়। শহরে আসার পর থেকে আশরাফের ভয়টা আরও বেড়েছে । বৃষ্টির ভেতর গত দুদিন অফিসে যায়নি, ঘরের ভেতর বসে থেকেছে। রান্না করে খেয়েছে চাল আর ডাল মিশিয়ে খিচুড়ি । রেডিওটা কানের সঙ্গে লাগিয়ে বিবিসির সংবাদ শুনেছে।

মেঘ না থাকলেও আশরাফ ছাতা নিয়ে বের হয়। রাস্তায় খালি রিক্সা পাওয়া যায় না, দু’একটা পাওয়া গেলেও নিউমার্কেট এলাকায় যেতে চায় না। তবুও রাস্তার মোড়ে এসে কয়েক মিনিট দাঁড়ায়, হাঁটতে হাঁটতে রিক্সা খোঁজ করে। কখনও রিক্সা পেয়ে যায়, আবার কখনও হেঁটে অফিসে যেতে হয়। বাসা থেকে বেরিয়ে কিছু দূর আসতেই পেছন থেকে বেল বাজিয়ে রিক্সাচালক বলে যাবেন স্যার? সে কিছু না বলে উঠে পড়ে। চালক পেছনে তাকাতে বলে, নিউমার্কেট।

ওই এলাকায় তো যাওন যাইব না মনে হয়। চালক পেছন ফিরে বলে।

কেন, কি হয়েছে ওখানে?

গতকাইল বৃষ্টির সময় খুব গোলাগুলি হইছে। মুক্তিরা নাকি শহরে ঢুইকা পইড়ছে।

তুমি কি করে জানলে?

লোকজন বলাবলি করতাছে, আর ওই এলাকা নাকি মিলিটারিরা ঘেরাও কইরা রাইখছে।

তার ভয় আরও বেড়ে যায়। সে চালককে বলে, তাহলে ওইদিকে না যাওয়াই ভাল হবে।

হেইডা আপনার বিবেচনা।

তখন পাশ দিয়ে শো শো করে এগিয়ে যায় আর্মির দুখানি জীপ । এই সময়ে রিক্সা পেছনে ঘুরানো ঠিক হবে না ভেবে সে চুপচাপ বসে থাকে। রিক্সা জামালখান পার হয়ে চেরাগী পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পশ্চিম দিকে মোড় নেয়। আমেরিকান সেন্টারের সামনে থেকে তিনজন সৈনিক কয়েক কদম এগিয়ে রিক্সা থামায়। আশরাফ তখন ভয়ে কাঠ, রিক্সা থেকে নেমে দাঁড়ায়। সারাশরীর সার্চ করে প্যান্টের পকেটে খুঁজে পায় একটা ব্যাগ । ব্যাগের চেন টানানো, খোলের ভেতর কি আছে দেখানোর সুযোগ দেয় না। ছাতা আর ব্যাগটি থেকে যায় হাতে। তাকে সেন্টারের বাইরে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখে। রিক্সাচালককেও। সকাল থেকে আরও কয়েকজনকে আটকে রেখেছে এভাবে। সূর্যের তেজ ক্রমশ বাড়তে থাকে। ভাদ্র মাসের মতো মেঘ ভাঙা রোদে সারাশরীরের রক্ত চিন চিন করে উঠছে। চুলের গোড়ায় বিন্দু বিন্দু ঘাম। মাথার ভেতর যেন আগুনের বাষ্প ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে থাকে অনেকটা স্থির হয়ে। মাঝে মাঝে গালের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া ঘাম মুছে পকেট থেকে রুমাল বের করে। রুমালটা একবার মাথায় পেঁচিয়ে রেখেছিল কিছুক্ষণ। তাতে রোদের তেজ বিন্দুমাত্রও বাধা পায়নি, তাই আবার খুলে কিছুক্ষণ পরপর ঘাম মুছতে শুরু করে। রোদের তেজ যতই বাড়তে থাকে আটক লোকজনের সংখ্যাও বেড়ে যায়। প্রায় সবই অফিসগামী লোকজন। কয়দিন থেকে রেডিওতে অনবরত প্রচার শুনে কাজে যোগ দিতে এসেছে চাকরি হারানোর ভয়ে। হঠাৎ আর্মির গাড়ির হর্ন শুনে সবাই চমকে ওঠে। বসায় যারা ছিল, উঠে দাঁড়ায়। ছাউনি দেয়া আর্মির ট্রাকটিতে একের পর এক সবাইকে উঠতে হয়। গাড়িটি বৌদ্ধ মন্দিরের মোড় থেকে কিছু আটক লোকজন তুলে লাভলেইন হয়ে পি.আই.এ অফিসের সামনে দিয়ে স্টেডিয়ামের মোড় থেকে আরও কয়েকজনকে তুলে লালখান বাজারের মোড়ে গিয়ে পড়ে। টহলদার সৈনিকের সঙ্গে কয়েকজন পথচারীর নির্ভয়ে কথোপকথন দেখে হাবিলদার ওদের গাড়িতে তুলে নেয়। গাড়ি সোজা ওয়াসা হয়ে এসে ঢোকে দামপাড়া পুলিশ লাইনে । গাড়ি থেকে নামিয়ে সবাইকে নিয়ে যায় লম্বা এক হল ঘরের দিকে । রাস্তার ওপর রোদে দাঁড়িয়ে থাকার পর গাড়িতে উঠে ভয় লাগলেও শরীরটা কেমন যেন শীতল হয়ে উঠছিল। কিন্তু হল ঘরটিতে ঢোকার পর মনে হলো কবরের অন্ধকার এখানে এসে ভর করেছে। চারদিক এমনভাবে আঁটা কোন দরজা-জানালা আছে বলে মনে হয় না। আশরাফ আর দাঁড়াতে পারে না, দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে। ঝিমুনির মতো আসে। সারা শরীরটা যেন ক্লান্তিতে ঢলে পড়তে চায়। এভাবে যে এত সহজে এমন বিপদের ভেতর জড়িয়ে পড়ল ভাবতে অবাক লাগছে। এরকম জানলে সে কখনও গ্রাম ছেড়ে আসত না। চাকরির জন্য এত কষ্ট, এত অপমান আর সহ্য করা যায় না। মানুষকে পথ থেকে তুলে এনে গরু-ছাগলের মতো আটকে রাখতে পারে তা ভাবেনি আগে। দেয়ালের সঙ্গে পিঠ লাগিয়ে মাথা স্থির করে রাখে। তন্দ্রার মতো আসে, একবার মনে হয় চারদিকে সব কুয়াশা, আবার মনে হয় সবকিছু যেন অন্ধকারে ডুবে আছে। অন্ধকারের ভেতরও তার চোখের ওপর ভেসে ওঠে ছেলে-মেয়েদের মুখাবয়ব। বড় মেয়ে আনিকা এবার কলেজে ভর্তি হয়েছে, ছোট মেয়ে ক্লাস এইটে আর ছেলেটি ক্লাস নাইনে। মেয়েটি কলেজে ভর্তি হয়েছে ঠিকই কিন্তু একদিনও ক্লাস করতে পারেনি। ধর্মঘট লেগেই ছিল কয়েক মাস। তারপর তো আর শহরে থাকতে পারেনি। গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে হয়েছে। ওদিকটা মোটামুটি শান্ত। রাস্তাঘাট না থাকায় ওই গ্রামে হানাদার বাহিনী পৌঁছতে পারেনি। আশরাফ গ্রামে যেত কালে ভদ্রে। ছেলেমেয়েরা আগে তেমন একটা যায়নি। কিন্তু গাঁয়ে যাওয়ার পর দুঃসময়ের ভেতরও ওরা আনন্দে ঘুরে বেড়ায়। পুকুরপাড়ে জাম গাছের নিচে বসে বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে শহরের গল্প গুজবে মেতে থাকে সারাক্ষণ। কখনও বা বিলের ধারে পাটি বনের ভেতর লুকোচুরি খেলায় হারিয়ে যায়। আনিকার সমবয়সী পড়শী মেয়েরা দল বেঁধে এসে ওর থেকে জেনে নেয় খোঁপা বাঁধার নানা রকম নিয়ম। চুলের বেণীতে কিভাবে বেলী ফুলের মালা জড়ালে আর শিউলী, বকুল, জবা ফুল খোঁপায় গাঁথলে বুনোফুলের মতো দেখাবে তা জেনে নেয়। মেয়েগুলো কখনও খালি হাতে আসে না, নিয়ে আসে ওর জন্য নানা রকম ফুল। কেউ আবার গাছের পেয়ারা, কমলালেবু, কলা, আমলকী কেউবা আবার হাতে বানানো পিঠা নিয়ে আসে শহরের বন্ধুর জন্য।

খুব অবাক লাগে এদের সরলতা দেখে। এত সহজে কিভাবে একজন অপরিচিত মানুষকে ওরা আপন করে নিতে পারে গ্রামে না এলে সে বুঝতেই পারত না। মা প্রথম প্রথম একটু বারণ করত, পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে এত মাখামাখি কিসের?

মাকে অনুনয়ের সুরে বলত, আমি তো ওদের কাছে যাইনি মা। ওরাই তো নিজ থেকে আমার কাছে এসেছে।

এটা গ্রাম, তোমরা গ্রাম সম্পর্কে অনেক কিছু জান না, মা জোর দিয়ে বলতেন।

কই মা এদের মাঝে তো কোন রকম খারাপ কিছু দেখি না। ওরা আমার বয়সী হলেও কেউ আমাকে নাম ধরে ডাকে না। সবাই আপা ডাকে। যথেষ্ট সম্মান করে কথা বলে। প্রথম দিনেই আমাকে আপন করে নিয়েছে।

এই জন্য তো ভয়, আবার কোন্দিকে কোথায় আটকে ফেলে।

সেই ভয় তোমাকে করতে হবে না মা। আমি এমন কোন কাজ করব না যাতে তোমাদের সম্মান হানি হয়।

তোর বাবা বলেছে পরিস্থিতি একটু ভাল হলে শহরে যাবে। কয়টা দিন কোনমতে কাটাতে পারলেই হয়। সে তো অন্য কথা মা। শহরের পরিস্থিতি বেশ খারাপ। প্রতিদিন রাস্তা-ঘাটে মানুষের লাশ পড়ে থাকে এখনও। বিবিসির খবর তো আর মিথ্যা না।

ওরা তো পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চাইছে। অফিস-আদালত কল-কারখানায় সবাইকে কাজে যোগ দিতে বলা হচ্ছে।

আশরাফ বাইর থেকে এসে বারান্দায় দাঁড়ায়। মা-মেয়ের কথোপকথন শুনে ভাবনায় পড়ে যায়। কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। জমানো টাকা-পয়সা প্রায় শেষ। ভাই স্কুলে শিক্ষকতা করেন, কত টাকা বেতন পান? তবুও এতদিন রক্ষা পেয়েছে চাল ঘরে ছিল বলে। কিন্তু এখন তো তাও শেষের দিকে। দুই পরিবার এক সঙ্গে হওয়ার ছয় মাসের খোরাকি তিন মাসে শেষ হয়ে গেছে। ভাই-ভাবী কোনদিন মুখে কিছু বলবে না। তবুও তো কিছু একটা ব্যবস্থা করা উচিত। আশরাফ ভাবতে ভাবতে বারান্দা থেকে ভেতরের রুমে ঢুকে। স্ত্রী যেন ঠিক সময়ে পেয়ে যায়, শুনেছ অফিস-আদালত আবার সব চালু হচ্ছে।

সে মাথা নেড়ে জওয়াব দেয়, হু শুনেছি।

স্ত্রী প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলে, আচ্ছা তুমি আসার পথে আনিকা আর সামুকে দেখেছ?

না তো।

ওরা যে সারাদিন কোথায় চলে যায়, কেউ একটু খবর রাখে না। খাওয়ার সময়ও আমি ওদের খুঁজে পাই না। এখানকার সবকিছু ওদের অপরিচিত। কোনদিন যে কি অঘটন ঘটে যায় আমি জানি না।

তুমি অহেতুক দুর্ভাবনা করছ। ওরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটাচ্ছে। খোলা মাঠ, দীঘিরপাড়, বাঁশ ঝাড়, বেত বনে কখনও ঘোরার সুযোগ পায়নি। শহর থেকে এসে এখানকার ছেলে- মেয়ের সঙ্গে দেখ না কিভাবে মিশে গেছে।

সারাদিন রোদে দৌড়ে অসুখ-বিসুখ বাধালে ডাক্তার পাবে কোথায়? এখানে তো ওষুধও পাওয়া যায় না।

এত ভাবনা কিসের? এখানকার ছেলে-মেয়েরা এসবের ভেতর বড় হচ্ছে না? স্ত্রী আর কথায় পেরে উঠে না। তবুও কয়দিন এদের ওপর ছেলে-মেয়ে নিয়ে পড়ে থাকা যায়। তাই ফিরে আসা।

একজনের পর একজনকে মেজরের সামনে নিয়ে দাঁড় করাণো হচ্ছে। মেজর আপাদমস্তক দেখে কাউকে দু’একটা প্রশ্ন করে ছেড়ে দিচ্ছে আবার অনেককে আটক রাখার নির্দেশ দিচ্ছে। কর্তব্যরত সৈনিক আটক লোকদের আলাদা করে দিচ্ছে। মেজর উর্দুতে প্রশ্ন করলেও কারও বুঝতে খুব অসুবিধা হচ্ছে না। উর্দুতে জওয়াব দেয়া কারও পক্ষে সম্ভব না হলেও প্রায় সবাই চেষ্টা করছে বাংলার সঙ্গে দু’একটা উর্দু শব্দ মিশিয়ে জবাব দেয়ার । আশরাফের ভীষণ ঘেন্না হচ্ছে মেজরের সঙ্গে কথা বলতে। সে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মেজর সিগারেট জ্বালিয়ে প্রথম টানের ধোঁয়া সব আশরাফের মুখের দিকে ছুড়ে দেয়। সে আসামির মতো ভয়ে ভয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে, কোন দিকে তাকায় না। মেজর উর্দুতে জানতে চায়, আপকা নাম কিয়া হ্যায়?

আশরাফ পরিষ্কার বাংলায় বলে, আশরাফুল আলম।

আপা কিয়া করতা হ্যায়?

আমি চাকরি করি।

মেজর সিগারেটে আবার টান দিয়ে বলে, আপ কিস ডিপার্টমেন্ট কা হ্যায়?

ব্যাংকের ম্যানেজার।

ব্যাংক কা ম্যানেজার হু! আশ্চর্য হয়ে মেজর পুনরায় উচ্চারণ করে।

জি স্যার।

মেজর একটু চিন্তিত হয়ে জানতে চাইল, আপকো কিসনে পাকড়া! আপকো মুক্তিকে সাথ জান পাহছান হ্যায়?

জি না স্যার। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আমি ব্যাংকে যাচ্ছিলাম কাজ করতে।পথমধ্যে জামাল খানের মোড়ে রিক্সা থেকে নামিয়ে আমার বডি সার্চ করে কিছু পায়নি।

মেজর সাহেব কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল।

আশরাফ এবার ব্যাগটা দেখিয়ে বলল, এই ব্যাগটা আমার হাতে ছিল।

ব্যাগমে কেয়া হ্যায়?

ব্যাংকের ভোল্টের চাবি।

পাশে দাঁড়ানো সৈনিককে ইশারা করতে সে ব্যাগটির চেন খুলে মেজরের সামনে ধরল। দুটি বেশ বড় লম্বা চাবি। মেজর সিগারেটের শেষ টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে কিঞ্চিত হেসে বলে ওসকো ছোড় দো।

আশরাফের ছাড়া পেতে বিকেল গড়িয়ে যায়। সে পুলিশ লাইন থেকে বের হয়ে রাস্তার পাশ ধরে হাঁটতে থাকে। মনটা এখনও হালকা হয়নি, ভয়টাও কাটেনি পুরোপুরি । তবে ওখানে সে দম আটকা অবস্থায় পড়েছিল তার থেকে মুক্ত হলেও শঙ্কিত ভাবটা কাটাতে পারছে না। গাড়ি দেখলেই মনে হচ্ছে এখনি আবার ধরে নিয়ে যাবে। অযথা নানা রকম প্রশ্ন করে বিব্রত করবে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলে তো কথাই নেই। শারীরিক নির্যাতন থেকে শুরু করে যে কোন অত্যাচারের জন্য তৈরি থাকতে হবে। ইচ্ছা হলে যে কোন মুহূর্তে হত্যাও করতে পারে। অবশ্য তা এখনও পারে, গাড়ি থেকে যদি গুলি ছোড়ে। কিংবা দাঁড় করিয়ে সামনা সামনি গুলি করলে বা বেয়নেট চার্জে হত্যা করলেও কেউ জানতে চাইবে না। সারাশরীরের লোমগুলো আবার খাড়া হয়ে যায়। একবার ভাবে দৌড়ে মেইন রোড পাড়ি দিয়ে অলিগলিতে ঢুকে পড়লে ভাল হবে। পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত পাল্টায়, দৌড়ালে সন্দেহ বেড়ে যাবে, তখন হয়ত চলন্ত জীপ থেকে গুলি করে থামিয়ে দিতে পারে।

আশরাফ না দৌড়ালেও পা এত দ্রুত গতিতে ফেলে যায়, মনে হয় না লোকটি সকাল থেকে এমন বিপদে ছিল যেখানে বাঁচা-মরা লটারির মতো। এই সময়ে একটা সিদ্ধান্তও নিতে পারে, সে আর শহরে থাকবে না। চাকরি চলে গেলে যাবে, তবুও সে কাল ভোরে বাড়ির দিকে রওনা দেবে। প্রয়োজন হলে গ্রামে ভাইয়ের সঙ্গে নতুন করে চাষবাস শুরু করবে। এই শহরে আর আসবে না।

আঁকাবাঁকা গলি পথে বাসায় পৌঁছতে রাত প্রায় ৮টা বাজে। সারাদিন ক্লান্তিতে কাহিল হলেও ক্ষিদেটা খুব অনুভূত হয়নি। বাসায় ফেরার পর ক্ষিদে এমন তীব্র হয় রান্না করার তর সইতে পারছে না। বাসায় পুরনো সব টিন একের পর এক ঢাকনা খুলে দেখে, একটিতে কিছু চিড়া তলায় পড়ে আছে, বড়জোর দুই মুঠো হবে। সে আর দেরি করে না, পানিতে ভিজিয়ে একটু লবণ দিয়ে খেয়ে নেয়। পর পর দুই গ্লাস পানি খেয়ে পেট ভর্তি করার চেষ্টা করে। কিন্তু ক্ষিদে মরে না। রাত কাটবে না ভেবে চাল-ডাল, আলু এক সঙ্গে মিশিয়ে চুলাতে চড়িয়ে অপেক্ষা করে।

রান্না শেষে পেট ভর্তি করে খেয়ে শুয়ে পড়ে। শরীরটা ক্লান্তির অবসাদে যেন লেগে যাচ্ছে বিছানার সঙ্গে। তবুও ঘুম আসে না গভীরভাবে। হালকা তন্দ্রার মতো আসে আবার একটু পরে জেগে যায়। সারাদিনের ঘটনা চোখের ওপর থেকে মুহূর্তের জন্যও সরাতে পারে না। তরুণ ছেলেটির শরীরে মেজরের জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দেয়ার বীভৎস দৃশ্যটি বার বার ভেসে উঠে। ছেলেটি মেজরের কথার জবাব দিবেতো দূরের কথা, একবার মেজরের চোখের দিকেও তাকায়নি। আর এক মুহূর্তের জন্য ছেলেটিকে অসহায় মনে হয়নি। কোন কথা বের করতে না পেরে মেজর ছেলেটিকে বুট দিয়ে লাথি মেরে পেছনে দিকে ফেলে দেয়। পাশে দাঁড়ানো সৈনিক ছেলেটির দু’হাত ধরে টেনে তুলে, তারপর আলাদা করে রাখে। ছেলেটির ভাগ্যে কি ঘটতে পারে তা আশরাফকে বেশ ভাবিয়ে তোলে। মৃত্যু ঘটবেই। তবে অত্যাচার আর নির্যাতনের কোনটাই বাকি রাখবে না। তবুও ছেলেটি মুখ খুলবে না, তার চেহারায় এক ধরনের শপথ আর দৃঢ়তার ছায়া। শত নির্যাতনের পরও স্থির হয়ে আছে। একটু ভয়ও ছেলেটিকে স্পর্শ করতে পারেনি। অথচ অন্যদের প্রায় সবার ভয়ে হাঁটু কাঁপছিল, কথা বলতে পারেনি। কেউ কেউ হাউ মাউ করে কেঁদেছে। খুব অবাক লাগে ছেলেটির তেজী এবং দৃঢ় মনের কথা ভেবে। এত সাহসী হয় কিভাবে ছেলেরা সে ভেবে কুল পায় না। ছেলেটির বয়সে সে নিজে কখনও স্কুল আর বাড়ি ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারত না। পুলিশ শুনলেই ভয়ে কাঠ হয়ে যেত।

ভোর হতে না হতে আশরাফের ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিছুতেই আর ঘুম আসে না। তবুও শুয়ে থাকে। শহর থেকে আবার গ্রামে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়। সপ্তাহখানেক পর মাস শেষ হয়ে যাবে। এই কয়দিন অফিসে উপস্থিত হতে পারলে মাস শেষে বেতনটা নিয়ে গ্রামে চলে যাওয়া যেত। কিন্তু ওরা যদি রাস্তা থেকে আবার ধরে নিয়ে যায়? কোন কারণে সন্দেহ এসে গেলে যদি আর না ছাড়ে, উগ্র অফিসারের হাতে পড়লে তো আর রক্ষা নেই। গুলি করে হত্যা করতেও এক মুহূর্ত চিন্তা করবে না। তখন কি হবে? ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যত কে দেখবে? না, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চাকরি করা যায় না। সে পূর্ব সিদ্ধান্তে আবার স্থির হয়ে যায়। সকাল সকাল রওনা দিবে কিন্তু খুব ভোরে রাস্তায় বের হওয়া বিপজ্জনক। রাতে ডিউটিরত জোয়ানরা ব্যারাকে ফিরার প্রস্তুতি নেয় আর দিনের শিফটের সৈনিকরা এসে ডিউটিতে যোগ দেয়। তখন খুব ভয় হয়। কয়েক কদম এগুতে এক এক দলের সম্মুখীন হতে হয়। প্রশ্ন না করলেও এমনভাবে তাকায় যেন মুহূর্তে পিষে রাস্তার সঙ্গে মিশে ফেলবে। আশরাফ ঘর থেকে বের হতে বেলা উঠে যায়। খুব ঝলমলে রোদ উঠে যেন শরতের সূর্য চারদিকটা উজ্জ্বল করে দিয়েছে। বাসা থেকে বের হয়ে সে গলিপথে চকবাজার এসে এদিক-ওদিক দেখে। খালি রিক্সা একটি বেল বাজিয়ে কলেজ রোডের দিকে চলে যায়। সে অলি খাঁ মসজিদ বরাবর হাঁটতে থাকে। মোড়ে ডিউটিরত সৈনিকের দিকে চোখ পড়তে মাথা নিচু করে- হেঁটে যায় পাঁচলাইশের দিকে। পথে কয়েকজন লোকের সঙ্গে দেখা হয়। কেউ পরিচিত নয়, তবুও অপরিচিত মনে হচ্ছে না, সবার চোখে মুখে ভয়ের চিহ্ন লেগে আছে, কেমন যেন অসহায়ের মতো পথ চলছে। পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় একজন অপরজনের দিকে এমনভাবে তাকায় যেন একে অপরকে চিনে এবং উভয়ে একই বিপদের মুখোমুখি। আশরাফ পাঁচলাইশের মোড় পেরিয়ে মুরাদপুর এসে পৌঁছে। হঠাৎ বোমা ফাটার শব্দে আতঙ্কিত লোকজন এদিক সেদিক দৌড়াতে শুরু“ করে। টহলদার সৈনিকের গাড়ি মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। বাঙ্কার আর তিন তলার ওপর পজেশন নেয়া সৈনিকরা সতর্ক অবস্থান নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে এলাকাটিতে পিপড়ার মতো সৈনিকদের মাথার ক্যাপ দেখা যায়। যে কজন লোক এদিক সেদিক প্রাণের ভয়ে পালাতে চেষ্টা করে, প্রায় সবাইকে আটক করল। আশরাফ এই যাত্রা বেঁচে গেল, দ্রুত গলির ভেতরে ঢুকে পড়ায়। প্রথমে পেছনে ফিরে কয়েকবার তাকাল তারপর দৌড়াতে দৌড়াতে বহদ্দারহাটের কাছে চলে এলো। এখানেও সৈনিকরা তল্লাশি চালাচ্ছে, কালুঘাট থেকে আসা একটি বাসে দশ বারজন যাত্রী ছিল, সবাইকে আটক করে রেখেছে। আশরাফ আর মেইন রোডের দিকে পা বাড়ায় না। ভেতরের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে হাঁটতে থাকে। লোকজন তেমন দেখা যায় না, বাড়ি ঘর সব ফাঁকা, কয়েক মাসে যেন পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। কোন মসজিদ কিংবা পুরনো বড় বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দু’একজন বয়স্ক লোকের দেখা হয়। তাদের কাছে পথের দিক জেনে নিতে চেষ্টা করে। কারও কথায় মনে সাহস আসে, আবার অনেকে হতাশ করে দেয়। কবে বাড়ি পৌঁছতে পারবে বুঝতে পারে না। শহরতলী পার হতে হতে দুপুর গড়িয়ে যায়। গ্রামের মেঠো টেকবাঁক পার হয়ে মদনহাট পৌঁছতে আসরের আজান কানে আসে। ওখানে খবর পায় হাটহাজারী থেকে নাজিরহাট পর্যন্ত জীপ চলছে। একজন সহযাত্রীও পেয়ে যায়। আশরাফ আর দেরি করে না। লোকটির সঙ্গে হাটহাজারী বাসস্টেশনে চলে আসে। গাড়িতে তখন কয়েকজন যাত্রী বসা, আশরাফ ও লোকটি উঠে বসে। গাড়ি ছাড়তে প্রায় সন্ধ্যা নেমে আসে। জীপ হাটহাজারীর সামনে এসে আর এগোয় না। সৈনিকরা গাড়ির গতিরোধ করে। আইডেন্টিটি কার্ড বের করতে বলে। যাত্রীদের তিনজন কার্ড বের করে দেখায়। আশরাফ পাশের লোকটির কার্ডটি দেখে, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর রয়েছে। তিন যাত্রী নিয়ে গাড়ি চলে যায়। অন্যদের রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে নানা রকম প্রশ্ন করে। একজনকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে পেটে গুতা মারে। আরেকজনকে ঘাড় ধরে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। উর্দুতে কি যেন বলে আশরাফের বাম গালে কষে এক চড় লাগিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে মাথা ভোঁ ভোঁ করে চক্কর মেরে উঠে। সে রাস্তা ছেড়ে আবার কোনাকুনি হাঁটতে থাকে। গালের বাম পাশটায় ছুঁয়ে দেখে, কোন অনুভূতি নেই যেন বেছোৎ হয়ে আছে। জায়গাটা ক্রমশ ফুলে উঠছে। সে দিকে এই মুহূর্তে কোন খেয়াল নেই, হাঁটার গতি ধীরে ধীরে দৌড়ের মতো হয়ে যায়। অন্ধকারের ভেতর সে দিকহীনভাবে দৌড়াতে থাকে। দৌড়াতে দৌড়াতে এক দীঘির পাড়ে এসে থামে। দীঘিটি বেশ বড়, পাশ দিয়ে গ্রামের রাস্তা চলে গেছে। সে দীঘির পাড়ে বসে বড় বড় নিশ্বাস ফেলে। দেহটা নিজের মনে হয় না, যেন অন্যের দেহ তাকে বহন করতে হচ্ছে এই দুঃসময়ে। মৃত দেহের মতো ভারি ঠেকছে নিজের শরীরটাকে। শৈশব-কৈশোরের বালক বয়সের স্বপ্নরা একের পর এক হারিয়ে গেছে সংসার জীবনের বাস্তবতার ভেতর। তবুও গ্রামের স্মৃতিময় অতীত বড় আপ্লুত করে তুলত। কিন্তু এই মুহূর্তে সবকিছু যেন মেঘের কান্নার ভেতর ডুবে আছে। কোথাও এক টুকরো আলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও একখণ্ড স্বপ্ন আর জেগে নেই। কিন্তু ওই ছেলেটি, তার মুখে যেন এক ঝলক আলো দেখা গিয়েছিল।

অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না, দীঘির পানিও আঁধারের সঙ্গে মিশে কালো হয়ে আছে। আশরাফ আকাশের দিকে তাকায়। মেঘের ফাঁকে তারা দেখা যায়। পৃথিবীর কালো এই অংশটির দিকে অন্ধকারের ভেতর তারাগুলোর দৃষ্টি এত উজ্জ্বল কেন ভেবে পায় না সে। তখন হঠাৎ বাতাস কেঁপে ওঠে, কতিপয় তরুণের পদধ্বনি কানে আসে। কিছু সাংকেতিক কণ্ঠধ্বনিও। আশরাফের ভয় কোথায় যেন নিমিষে মিলিয়ে যায়। ভারি শরীরটা মুহূর্তে হালকা হয়ে যায়। সে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকায়, না ওদিকে কিছু দেখা যায় না। মিনিটের মধ্যে সে টের পায় দীঘির উত্তর পাড় ঘেঁষে দশ-বারো যুবক বিলের পথ ধরে বড় রাস্তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। খা খা মেঘের ভেতর লুকানো চাঁদের আলোতে সে দেখতে পায়, যুবকদের কারও হাতে রাইফেল, কারও কাঁধে স্টেনগান আবার কারও কাছে গ্রেনেড। সে একবার আকাশের দিকে তাকায় আবার তরুণদের দিকে। আবছা আলোতেও দেখতে পায় প্রত্যেকের চোখে মুখে তারার জ্যোতি। ওই ছেলেটির মতো দীপ্তি আর প্রত্যয়ের অসীম অদম্য সাহস তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে। যেন আকাশের তারা হেঁটে যাচ্ছে এক টুকরো আলো নিয়ে। আশরাফ অতীতের সব ভয় ভীতিকে এই মুহূর্তে অতিক্রম করতে পারে। তার ভেতরটা চেতনার আগুনে কৃষ্ণচূড়ার মতো লাল হয়ে যায়। সেও অচেনা যুবকদের সঙ্গে সমান তালে পা ফেলে আলোর পথে এগিয়ে যায়।

শীর্ষ সংবাদ:
বাংলাদেশ থেকে আসা ৭০ শতাংশ যাত্রীর করোনা পজিটিভ : ইতালির প্রধানমন্ত্রী         কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে ডিএনসিসিতে পশুর তিন হাট         করোনায়ও স্বাস্থ্যখাতের সকল সেবা অব্যাহত রাখতে হবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী         ৮৬টি প্রতিষ্ঠানকে ৩ লক্ষাধিক টাকা জরিমানা         প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমিরাত         সাগরপথে ইতালি উপকূলে ভিড়লেন ৩৬২ বাংলাদেশি         ডিজিটাল পশুর হাট নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে ॥ স্থানীয় সরকার মন্ত্রী         দাম্মাম থেকে ফিরলেন ৪১২ বাংলাদেশি         করোনা ভাইরাসে আরও ৩০ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ২৬৮৬         অনলাইনে কোরবানির গরু কেনার কথা জানালেন বাণিজ্যমন্ত্রী         নেপালে ভূমিধসে ২২ জনের প্রাণহানি         সাহারা খাতুন ছিলেন একজন সংগ্রামী নেতা ॥ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী         স্বাস্থ্য মন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজির অপসারণের দাবিতে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের ৭২ ঘন্টার আলটিমেটাম         করোনা ভাইরাস ॥ ভারতে শনাক্ত ৮ লাখ ও মৃত্যু ২২ হাজার ছাড়াল         বাবার মৃত্যুর পরও লাপাত্তা সাহেদ         চিরনিদ্রায় শায়িত সাহারা খাতুন         আরও দুই ধাপ পেছাল বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান         নোয়াখালীতে ধর্ষণ মামলার আসামি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত         আড়াই লাখের বেশি বাংলাদেশীকে ফেরত পাঠাতে পারে কুয়েত        
//--BID Records