সোমবার ১২ আশ্বিন ১৪২৭, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ ॥ অভিন্ন হৃদয়

  • লে. কর্নেল মহিউদ্দিন সেরনিয়াবাত (অব.)

বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম নবীন দেশ। এর পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তরে ভারত, দক্ষিণ ও পূর্বের কিয়দংশ মিয়ানমার এবং দক্ষিণে উন্মুক্ত বঙ্গোপসাগর। আয়তনে দেশটি এতই ক্ষুদ্র যে পূর্ব ধারণা না থাকলে বা পরিচিত না হলে বিশ^ মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে তার চেয়েও কঠিন ছিল ১৯৭১ সালে এই ছোট্ট ভূ-খ-টিকে বিশ^ মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের স্থান করে নিতে। তাই তো বলা হয়ে থাকে রক্তই যদি স্বাধীনতার মূল্য হয়, তবে বাংলাদেশ দিয়েছে অনেক বেশি এবং বোধ করি সর্বোচ্চ। পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ^ যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোন যুদ্ধে এত রক্তক্ষয় হয়নি এটি যেমন সত্য, তেমনি পাকিস্তানের তিরানব্বই হাজার পরাজিত সৈন্য দলের নতজানু হয়ে আত্মসমর্পণের নজির আর একটিও নেই। ফলে সারা বিশে^র কাছে বাঙালী বীরের জাতি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই বীর জাতির পিতার স্বীকৃতি লাভ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই বাঙালী জাতির। যে মহান নেতার জন্ম না হলে এই বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো না, সেই বাংলাদেশের স্রষ্টাকে মাত্র সাড়ে তিন বছর পরে গুটিকয়েক ক্ষমতালোভী, বিকারগ্রস্ত উন্মাদেরা বাঁচতে দিল না। শুধু কি স্বাধীনতার স্থপতিকে? দুই কন্যা বিদেশে থাকায় ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেলেও পরিবারের অন্য সব সদস্য এমনকি দশ বছরের শিশু পুত্র রাসেল অনেক অনুনয় বিনয় করেও বাঁচতে পারেনি। এখানেই শেষ নয়Ñ নিকটাত্মীয় হওয়ার অপরাধে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার দশ বছরের পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, বারো বছরের কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত, মাত্র ছয় বছরের দৌহিত্র শুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাত, জ্যেষ্ঠ কন্যা আরজু মনি-জামাতা শেখ মণি, ভাতিজা শহীদ সেরনিয়াবাতসহ সর্বমোট ঊনত্রিশজন নর- নারীকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে খুন করা হয়।

১৯৯৬ সাল থেকে (২০০১-২০০৮ সময় ব্যতীত) আওয়ামী লীগের শাসনামলে পনেরো আগস্ট জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত কৃতজ্ঞ বাংলাদেশী বাঙালী মাত্রেই শ্রদ্ধা-ভালবাসায় স্মরণ করে হাজার বছরের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে, যার জন্ম ও রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস অভিন্নভাবে জড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের ওপর কিছু লিখতে গিয়ে ১৯৭৪ সালে যুব লীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর একটি মন্তব্য মনে পড়ছে। স্বাধীনতার ইতিহাস প্রসঙ্গে তার বক্তব্যটি হুবহু তুলে ধরছি- ‘স্বাধীনতা মানে বদমায়েশি নয়, স্বাধীনতা মানে গু-ামি নয়। এই স্বাধীনতার পেছনে যে কত আত্মত্যাগ, কত কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তা তোমরা জান না। ভবিষ্যত প্রজন্মের সেই ইতিহাস জানা দরকার এবং তাদের জন্য সেই ইতিহাস লেখা হবে, যাতে তারা বুঝতে পারে স্বাধীনতা অত সহজে আসে নাই। আর এই ইতিহাস আমাকেই লিখতে হবে।’ কিন্তু দুর্ভাগ্য। বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ইতিহাস লিখতে দেয়নি ঘাতকেরা। জানতে দেয়নি স্বাধীনতার বিস্তারিত ইতিহাস। এর বছরখানেক পরই খুনীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। এমনকি সেই ইতিহাসের সাক্ষী মুক্তিযুদ্ধের চার সিপাহসালারকে জেলখানার মতো নিরাপদ স্থানে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসের খুঁটিনাটি অনেক কিছু না জানার আফসোস আমাদের থেকেই যাবে। তার পরও বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি সম্পর্কে জানতে পারলে অন্তত মিথ্যা ইতিহাসের দ্বারা ভবিষ্যত প্রজন্ম আক্রান্ত কিংবা বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ কম থাকবে। কেননা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির নির্যাস থেকেই সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন। তাই বঙ্গবন্ধুর জীবনের চুম্বক অংশ ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য তুলে ধরলাম।

১০ মার্চ ’৬৯ বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত শেখ মুজিবুর রহমান পিন্ডির গোল টেবিলে হাজির হয়ে তার ছয় দফার সঙ্গে ছাত্রদের এগারো দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। কিন্তু পূর্বের ন্যায় শাষক গোষ্ঠী তা অগ্রাহ্য করে। আগের যে কোন সময়ের চেয়ে আরও বেশি আত্মবিশ^াসী ও আত্মপ্রত্যয়ী মুজিব ঢাকায় ফেরার পরদিন থেকেই বড় শহরগুলোতে যেখানেই সভা সমাবেশ করেন, সেখানে মানুষের স্রোত দেখে সরকার বিচলিত হয়ে যায়। ২৫ মার্চ তারিখে আইয়ুব খান ক্ষমতা থেকে বিদায় ও ইয়াহিয়া খানের আগমন ঘটে। তিনি সামরিক আইন জারি করেন। ফলে রাজনীতি আবারও অনিশ্চয়তার গহ্বরে নিপতিত হয়। বঙ্গবন্ধু বাঙালীর নাড়ীর স্পন্দন বুঝতে পারেন। তিনি উপলব্ধি করতে পারেন যে, হাজার বছরের ঘুমন্ত জাতি এবার জেগে উঠেছে এবং তারা তার পেছনে আছে। তার প্রতি বাঙালীদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। কিন্তু তার স্বপ্ন পূরণের জন্য এখন বাঙালীদের সাংবিধানিক ম্যান্ডেট প্রয়োজন। অতঃপর তিনি নতুন সামরিক সরকারের কাছে এক ব্যক্তির এক ভোটের নির্বাচন দাবি করেন।

১৯৭০ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি পুনর্নির্বাচিত হন। ডিসেম্বরে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। ৭ জুন ’৭০ মনু মিঞার চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে রেসকোর্সে ছয় দফাকেই নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু করেন। নির্বাচনী প্রচারাভিযান কালে পূর্ব পাকিস্তানের এমন কোন মহকুমা, থানা বাদ যায়নি যেখানে সশরীরে উপস্থিত হয়ে মুজিব ছয় দফা ও নৌকার পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেননি। ওই বয়সে এমন অক্লান্ত পরিশ্রম করার মতো শারীরিক শক্তি কেবলমাত্র নৈতিক মনোবল এবং লক্ষ্য পূরণের সঙ্কল্প ছিল বলেই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। ১২ নবেম্বর ’৭০ উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর দিয়ে ইতিহাসের ভয়াবহ এক জলোচ্ছ্বাস বয়ে গেলে লাখো মানুষ প্রাণ হারায়। শাসক গোষ্ঠীর কাছ থেকে সাহায্য তো দূরের কথা, সামান্য সহানুভূতিটুকু না পাওয়ায় মুজিব ক্ষুব্ধ হন। নির্বাচনী প্রচারাভিযান বাতিল করে তিনি দুর্গত এলাকায় ছুটে যান। বিশ^বাসীকে এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। এদিকে পাকিস্তানের যে সব দল পরাজয়ের ব্যাপারে আগেই শতভাগ নিশ্চিত হয়ে ছিল, তারা এই সুযোগে নির্বাচন বাতিলের দাবি জানাতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধু বাঙালীর এই ইস্পাত কঠিন ঐক্যে শৈথিল্য ও ভাঙ্গন সৃষ্টির ষড়যন্ত্র বুঝতে পারেন। যে কোন মূল্যে তিনি নির্বাচন বাতিল না করার পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন। এমতাবস্থায় ইয়াহিয়া খান খামোখা নির্বাচনের বিপক্ষে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি হলেন না। কেননা আওয়ামী লীগের পক্ষে যতই গণজোয়ার দেখা যাক না কেন, তার গোয়েন্দা রিপোর্টে আওয়ামী লীগ কোন মতেই পঞ্চাশ টির বেশি আসন পাবে না। তাই নির্বাচন দিতে বাধা কিসের? এরপর ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর ’৭০ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু তাদের সব রিপোর্ট ভুল প্রমাণিত হলো। জাতীয় ও প্রাদেশিক উভয় পরিষদে যথাক্রমে ১৬২ ও ২৬৪ আসন নিয়ে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পেয়ে যায়। নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে ইয়াহিয়া খান বিজয়ী নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবকে ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিনন্দন ও ০৩ মার্চ ’৭১ তারিখে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেন। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে আনন্দের বাতাস বইতে থাকে। এই প্রথম বাঙালীরা দেশ শাসনের অধিকার পেতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা ও সরকার গঠনের প্রস্তুতি শুরু করে।

কিন্তু পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের রাজনীতি সর্বদা প্রাসাদ ষড়যন্ত্র তথা সামরিক ছাউনি থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছিল। এবারও তার ব্যতিক্রম হয় কিভাবে? বাঙালীরা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে, কিন্তু তাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করতে শাষক গোষ্ঠী বদ্ধপরিকর থাকে। জানুয়ারী মাসে পিন্ডি ও লারকানায় ইয়াহিয়া, ভুট্টো, মুসলিম লীগ প্রধান কাইউম খাঁন এবং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারগণ সিরিজ বৈঠকে মিলিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত সকলের আশঙ্কা যে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে মুজিব যে, পথে হেঁটে চলেছেন সেই পথ হয়ত শেষ হয়ে এসেছে। আর এই পথের চূড়ান্ত পরিণতি পাকিস্তানকে দ্বিখ-িত করন। আপাতত শেখ মুজিব পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হবেন ঠিকই, কিন্তু তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে পূর্বাঞ্চলকে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী করা। স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। শেখ মুজিবের দীর্ঘদিনের লালিত এই স্বপ্ন কোন মতেই বাস্তবায়িত হতে দেয়া যাবে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সমসাময়িককালে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া প্রভৃতি অনেক রাষ্ট্র যেমন জ¦লেছে, প্রয়োজনে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলও আরও ভয়াবহভাবে জ্বলবে। অতএব এখন থেকে প্রস্তুতি ও মার্চের শেষ নাগাদ পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু এবং এপ্রিলেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার পরিকল্পনা ও চেক লিস্ট গৃহীত হয়। তাদের পরিকল্পনার ভেতর ছিল প্রথমেই শেখ মুজিবকে আটক ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ফাঁসিতে ঝোলানো। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের গ্রেফতার ও হত্যা। আন্দোলন ও সংগ্রামের সকল উৎসসমূহ একেবারে দমিয়ে দেয়া এবং তা অত্যন্ত বর্বরভাবে। ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী সমাজ বলতে যা বোঝায়, এদের অস্তিত্ব উপরে ফেলতে হবে। যেন আগামী দুই-চার দশকে কেউ মাথা তোলার সাহস না পায়।

গত চব্বিশ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে সশস্ত্র বাহিনী, ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীতে চাকরিরত বাঙালীরা উচ্চতায় কিছুটা বেঁটে ও হাল্কা পাতলা হলেও পশ্চিম পাকিস্তানীদের অপেক্ষা বুদ্ধিমান, সাহসী, কৌশলী। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যথেষ্ট রাজনীতি সচেতন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে বিশেষত ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের পর থেকেই এরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের প্রতি ক্ষুব্ধ। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব কর্তৃক ছয় দফা উত্থাপিত হলে এদের চোখ খুলে যায়। একই বাহিনীতে একই ইউনিফর্ম পরিধান করলেও পশ্চিমাদের প্রতি এদের ক্ষোভ ও ঘৃণা আরও প্রকট ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সর্বশেষ, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় এই ইউনিফর্মধারী বাঙালীদের আরও আত্মবিশ^াসী, স্বাধীনচেতা এবং ভিন্ন জাতি সত্তার অনুভূতি এনে দিয়েছে। তাই পূর্ব পাকিস্তানে এদের আপনজনদের ওপর দমন নীতি চালালে বাহিনীসমূহের বাঙালী সদস্যরা দুগ্ধপোষ্য শিশুর ন্যয় হাত পা ছুড়ে মায়ের জন্য কেবল কাঁদবে, এমনটি ভাবা ভুল হবে। ইতোমধ্যে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাহিনীসমূহের বাঙালী কোন কোন সদস্যের প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে আওয়ামী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের খবর। এমতাবস্থায় বাহিনীর বাঙালীরা সময়মতো ব্যারেল ঘুড়িয়ে দিলে উভয় পক্ষে প্রচুর হতাহত হতে বাধ্য। পূর্ব পাকিস্তানকে কলোনি অব্যাহত রাখতে বাঙালীর যতই রক্ত ঝড়ুক কিন্তু নিজ ভাই/সন্তান খোয়া গেলে পশ্চিম পাকিস্তানেও বিস্ফোরণ ঘটবে এবং উভয় অঞ্চলের আগুন সামাল দেয়া তখন অসম্ভব হয়ে পরবে। অতএব নিজ পক্ষকে (পশ্চিম পাকিস্তানী) নিরাপদ রাখতে শাসকরা বাঙালী সামরিক, ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় ও নিশ্চিহ্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। ফেব্রুয়ারির শেষ ও মার্চের প্রথম দিকে বেঙ্গল রেজিমেন্টসমূহকে জরুরী পরিস্থিতির অজুহাতে কোম্পানি এমনকি তার চেয়ে ক্ষুদ্র গ্রুপে বিভক্ত করে সেনানিবাসের বাইরে বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয়। উদ্দেশ্য- ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করার ফলে এরা ঐক্যবদ্ধ থাকছে না। এদের যুদ্ধের ক্ষমতা সঙ্কুুচিত হয়ে যাবে। যেহেতু ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে, তাই এদের ওপর হামলা ও ধ্বংস করা সহজ হবে। বাঙালীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের যে জাল বিস্তার করা হচ্ছে, তা প্রয়োগ না করা পর্যন্ত গোপন রাখা সম্ভব হবে। মোদ্দাকথা হলো, একটি যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ। অবশ্য তা বৈদেশিক শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, একান্ত নিজ দেশের নাগরিক যাদের এতদিন ক্রীতদাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আজ তারা যেহেতু আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য ঐক্যবদ্ধ, অতএব তাদের নিশ্চিহ্ন করতে হবে। সামরিক যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে আগে থেকে নির্দিষ্ট স্থানসমূহে সেনা, অস্ত্র, গোলা-বারুদ ও যুদ্ধের অন্যান্য সরঞ্জাম মজুদ পূর্ব শর্ত। সেভাবেই জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ’৭১ থেকেই রাতের আঁধারে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জল ও আকাশপথে গোপনে সব সরবরাহ আসতে থাকে। অর্থাৎ একদিকে বাঙালীদের ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতি, অন্যদিকে এই বাঙালীদের ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায়।

উভয় পক্ষের ভিন্নমুখী প্রস্তুতির ভেতরেই ক্যালেন্ডারের পাতা ফেব্রুয়ারি মাসকে বিদায় দিয়ে মার্চ মাস এসে হাজির হয়। ইতোমধ্যে অধিবেশনে যোগ দিতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিভিন্ন দলের ৩৫ জন নির্বাচিত সদস্য ঢাকায় উপস্থিত হন। সেদিন ছিল ১ মার্চ। সংসদ অধিবেশনকে সামনে রেখে হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগের সভা চলছিল। ঢাকা স্টেডিয়ামে ছিল একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। এমন সময় বেলা একটায় দাবানলের মতো যে খবরটি ছড়িয়ে পড়ল তা হলো- ইয়াহিয়া খান কর্তৃক ৩ মার্চ ’৭১- এর সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা। আর যায় কোথায়? ক্ষুব্ধ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। তারা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। বাঙালীর এই চেহারা, অগ্নিমূর্তি এতদিন কোথায় ছিল? ঢাকার রাজপথে যেন আগুন জ্বলে উঠল। এমনকি অনেক স্থানে তারা পাকিস্তানের জাতির পিতা জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো এবং জাতীয় পতাকায় আগুন ধরিয়ে দিল। এরপর জনগণ ছুটল মতিঝিলের উদ্দেশ্যে যেখানে পূর্বাণী হোটেলে তাদের নেতা শেখ মুজিব আছেন। বঙ্গবন্ধু ইতোমধ্যে এই দুঃসংবাদ অবগত হয়েছেন এবং বুঝতে পারলেন, পশ্চিমা শাষকগোষ্ঠী বাঙালীদের ক্ষমতার বাইরে রাখতে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তিনি সভা থেকে বাইরে এসে সমবেত জনতাকে ধৈর্য ধারণ ও শান্ত থেকে বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বিকেলে আওয়ামী লীগের সভা শেষে সাংবাদিকদের মাধ্যমে জনগণকে ৩ মার্চ সারাদেশে হরতাল ও ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় উপস্থিত হয়ে পরবর্তী কর্মসূচী জেনে আসার আহ্বান জানান। এর পরও ১ ও ২ মার্চ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইপিআর ও পুলিশের সঙ্গে নিরস্ত্র ও বিক্ষুব্ধ মানুষের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে বেশ প্রাণহানি ঘটে। ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে নজিরবিহীন হরতাল পালিত হয়। ৪, ৫ ও ৬ মার্চ তারিখে সুন্দরবন যেন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রসারিত হওয়ায় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন স্পষ্টতই বাংলাদেশব্যাপী শোনা যাচ্ছিল। ৭ মার্চকে সামনে রেখে মানুষ ঢাকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করে।

ক্যালেন্ডারের পাতায় চেপে হাজির হয় ৭ মার্চ। এ যেন সমগ্র বাংলাদেশ চলমান। যোগাযোগ ব্যবস্থা সেই সময়ে তুলনামূলকভাবে বেশ খারাপ। চারদিকে টান টান উত্তেজনা। তাতে কি! বাস-ট্রাক-প্রাইভেট কার, ট্রেন-স্টিমার-লঞ্চ- নৌকা সব রকমের বাহন যেখানে পূর্ণ, সেখানে হেঁটে বাঁশের লাঠি, রড হাতে ঢাকার দিকে ছুটছে মানুষ। ঢাকা শহরে প্রবেশের সকল পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ক্ষুব্ধ মানুষের মিছিল আর মিছিল। পুরো ঢাকা শহর কাঁপছে মিছিলের পদভারে। এমন দৃশ্য কোন জনমেই কেউ দেখেনি আর। সব মিছিলের লক্ষ্যস্থল ঢাকার রেসকোর্স ময়দান। যেখানে লিখিত হতে যাচ্ছে একটি জাতির ভবিষ্যত, একটি ইতিহাস। এরা সবাই সাক্ষী হতে যাচ্ছে সেই ইতিহাসের। সেখানে পঠিত হবে একটি কবিতা, হাজার বছর যাবত যে কবিতার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিল এই জনপদের পূর্ব-পুরুষেরা। আজ সেই কবিতা শোনার সৌভাগ্য হবে তাদের উত্তরাধিকারের। দুপুরের অনেক আগেই রেসকোর্সের বিশাল প্রান্তর ছাপিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকার সব অলিগলিতে মানুষ স্থান করে নিয়েছে। এই জনসমুদ্রের শুরু ও শেষ কোথায় তা খালি চোখে তো নয়ই, বোধহয় কোন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রেও তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বিকেল ৩টার কিছু পর স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় ভিড় ঠেলে মঞ্চে উঠে এলেন সুঠাম দেহের অধিকারী, সবচেয়ে আত্মপ্রত্যয়ী, সাহসী, আপদমস্তক খাঁটি বাঙালী পুরুষ। যার ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছিল পূর্বপুরুষ বাগদাদ থেকে আগত শেখ বোরহান উদ্দিনের উত্তরাধিকারের রক্ত- নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তারুণ্যের সেই সময় থেকে সমুদ্রের সকল ঝড় ঝাপটা, উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে তিনি আজ উপকূলে উপস্থিত। তার ডাকেই এবং একমাত্র তারই প্রেরণায় টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, জকিগঞ্জ-গোয়াইঘাট থেকে শ্যামনগর, কলাপাড়া অবধি আছড়ে পড়ছে আওয়াজ ‘জয় বাংলা-জয় বাংলা, স্বাধীনতা, বাংলার স্বাধীনতা চাই।’ শেখ মুজিবের পথ ধর- বাংলাদেশ স্বাধীন কর। মুজিব ভাইয়ের পথ ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর। রেসকোর্স, ঢাকার অলিগলিতে সমবেত হয়েছে ধর্ম-বর্ণ, ভেদাভেদহীন নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবা, কিশোর, কৃষক-শ্রমিক-ড্রাইভার-রিক্সা চালক-ছাত্র-শিক্ষক-হকার-ভবঘুরে সব রকমের বয়স, পেশা ও পথের মানুষ। শুধু তাই নয়, ইউনিফর্মধারী পেশার বাঙালী সদস্যরাও বেসামরিক পোশাকে মিশে গেছে সকলের সঙ্গে। এরা সবাই নিজ কণ্ঠে শুনতে চায় তাদের নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের পরবর্তী সিদ্ধান্ত, তার নির্দেশনা। কেননা তিনিই তাদের নেতা, তাদের পথপ্রদর্শক। আজ তিনি যে ক্রসরোডে এসে দাঁড়িয়েছেন, সেই ক্রসরোড থেকে তিনি কোন্ পথে পা বাড়াবেন? তার যে কোন হঠকারী সিদ্ধান্ত স্বাধীনতার জন্য পাগল এই জাতির স্বপ্নকে আজীবনের জন্য না হলেও শত বছরের জন্য পিছিয়ে দিতে পারে। আবার দুর্বলতা প্রদর্শন তাদের মনোবল ও ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কোন প্রকার কাগজি সহায়তা ছাড়া স্বভাবসুলভ, সহজ ও সকলের বোধগম্য চলিত ভাষায় আঠারো মিনিটের যে বক্তৃতা তিনি দিলেন, তা বাংলাদেশে আর একটিও নয়, সারা বিশে^র হাতেগোনা দু-চারটি শ্রেষ্ঠ এবং ঐতিহাসিক ভাষণের মাঝে স্থান করে নিল। এ কেবল রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নয়, রীতিমতো যুদ্ধের অর্ডার। এতদিন যাকে আপোসহীন, দৃঢ়চেতা এক সাহসী নেতা হিসেবে সকলে জেনে আসছে, আজ তিনি গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞ সেনাপতি হিসেবে আবির্ভূত হলেন। নাতিদীর্ঘ এই বক্তৃতার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য, কণ্ঠের উত্থানপতন সবই ছিল চুম্বকের ন্যায় আকর্ষণীয়, মন্ত্রমুগ্ধকর এবং সর্বোপরি সময়োপযোগী। রাজনৈতিক পটভূমি দিয়ে শুরু হয়েছিল। তার আশঙ্কার কথাও অব্যক্ত রাখেননি এবং চূড়ান্ত আঘাত এলে করণীয় কি তাও কৌশলে জানিয়ে দিলেন। আর তাই তো শাসক গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র নিয়ে শঙ্কিত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতা উল্লেখ করেন ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, রাস্তাঘাট যা কিছু আছে তোমরা সব বন্ধ করে দেবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম- স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’

মাত্র আঠারো মিনিট শুধুমাত্র সমবেত লাখ লাখ মানুষের সম্মুখে নয়, সমগ্র জাতির উদ্দেশে তিনি দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন। অত্যন্ত শ্রুতিমধুর অথচ বন্দুকের নল থেকে এইমাত্র বেরিয়ে যাওয়া বুলেটের মতো তপ্ত ভাষণ, যা শুনলে পঁয়তাল্লিশ বছর পরে আজও বৃদ্ধের রক্তে আগুনের উত্তাপ ছড়ায়।

বঙ্গবন্ধু তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে সবুজ সঙ্কেত দিয়ে দিলেন। তাদের হৃৎপি-ে, তাদের মস্তিষ্কে, তাদের প্রতিটি রক্ত কণিকায় তিনি বিস্ফোরণের জন্য তৈরি- এমন বারুদ ছড়িয়ে দিলেন। একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতার পক্ষে কৌশলে অথচ এর চেয়ে প্রকাশ্যে আর কিভাবে স্বাধীনতার ডাক দেয়া সম্ভব? ৮ মার্চ ১৯৭১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত কাগজ কলমে সমগ্র পাকিস্তানের সরকার প্রধান হিসেবে ইয়াহিয়া খান থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানের সকল ক্ষমতা ছিল এক ব্যক্তির হাতে, আর তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। তার নির্দেশ বাঙালীরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শান্তিপূর্ণভাবে একদিকে চলেছে অসহযোগ আন্দোলন, অন্যদিকে প্রতিটি জেলা, মহকুমা, থানা ও গ্রামে গ্রামে প্রকাশ্যে চলেছে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি। উন্মুক্ত মাঠে সারাদিন এমনকি কাজ শেষে ক্লান্ত দেহে কাঠের ডামি রাইফেল নিয়ে মানুষ স্বেচ্ছায় ও স্বপ্রণোদিত হয়ে এই ট্রেনিং-এ অংশ নিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত এমনকি ছুটিতে থাকা সেনা, ইপিআর কিংবা পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ছিল তাদের প্রশিক্ষক। মাত্র ১৫১৬ দিনেই সারা দেশে কয়েক লাখ কিশোর, তরুণ, যুবা এমনকি ষাট বছরের বৃদ্ধও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে লড়াইয়ের জন্য মোটামুটি প্রস্তুত হয়ে যায়। এর পেছনে তাদের যে শক্তি ও উৎসাহ তা হচ্ছে মুজিবের ডাক এবং বুক ভরা দেশপ্রেম। এরা সকলেই মুজিবরের নেতৃত্বে মাতৃভূমির স্বাধীনতার লড়াইয়ে শামিল হতে চায়।

এই দৃশ্যের বিপরীতে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী বাঙালীদের চিরদিনের জন্য নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার সর্বাত্মক প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। নৌ ও আকাশ পথে পাকিস্তান ও চীন থেকে সরাসরি অস্ত্র গোলাবারুদ ও যুদ্ধের সরঞ্জাম আসা প্রায় সম্পূর্ণ। বেসামরিক পোশাকে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সেনানিবাস ও অবাঙালী অধ্যুষিত এলাকায় জড়ো করা প্রায় শেষ। বাঙালীদের বিরুদ্ধে তাদের প্রস্তুতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে সমম্বয় করতে এখন আর অল্প কিছু সময় প্রয়োজন এবং এই সময়টুকু অর্জন করতে তারা বাঙালীর দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ফেরাতে চায়। সেই উদ্দেশ্যেই ১৫ মার্চ তারিখে রাষ্ট্রের অভিভাবক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্বয়ং পিন্ডি থেকে ঢাকায় উড়ে এলেন। ১৬ মার্চ ক্ষমতা হস্তান্তর ও সাংবিধানিক খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ভাবি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা শুরু করলেন। ১৬ থেকে ২০ মার্চ তাদের মধ্যে সিরিজ বৈঠক চললেও বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধুর চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। কণ্টকাকীর্ণ দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দেয়া মুজিব প্রতিপক্ষের শুধু মুখচ্ছবি নয়, মনের সম্পূর্ণ চিত্রই পড়তে পারছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে আলোচনার নামে এরা ভাঁওতাবাজি করছে। কিন্তু ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত বাঙালী জাতির নেতা হিসেবে আলোচনার দরজা বন্ধ করে দেয়ার মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারেন না। ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাহলে তাকে ভবিষ্যতে দাঁড়াতে হতে পারে। তাই আলোচনা অব্যাহত থাকে। তবে প্রতিদিনই সংবাদ সম্মেলন, প্রেস রিলিজের মাধ্যমে নিজে, দলীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ অথবা ছাত্র নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং জাতিকে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তিনি প্রস্তুত রাখছিলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু সর্বদাই উচ্চারণ করেন ‘আমি সর্বোৎকৃষ্টটি আশা করি কিন্তু নিকৃষ্টটির জন্য তৈরি আছি।’ এই উক্তি নিছক প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য নয়। তার দৃঢ় বিশ^াস ছিল বাঙালী জাতিকে তিনি যে অবস্থানে নিয়ে এসেছেন, তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ও যে ঐক্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন- পৃথিবীর কোন শক্তি নেই এই জাতিকে আর পেছনে হঠাতে পারে। তবে তিনি সন্দিহান ছিলেন যে তাকে গ্রেফতার কিংবা হত্যা করা হতে পারে। মৃত্যুতে তার কখনও ভয় নেই, কিন্তু সেরূপ পরিস্থিতিতে জাতির জন্য তার সর্বশেষ নির্দেশনা তিনি প্রস্তুত করে যেতে চান। এই চিন্তা থেকেই ১৯-২০ মার্চ তারিখে তিনি তার খুবই বিশ^স্ত একাধিক বেতার প্রকৌশলীকে ৩২ ধানম-িতে ডেকে পাঠান। পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে গেলে এবং তাকে ও তার সহকর্মীদের গ্রেফতার কিংবা হত্যা করা হলে জাতির করণীয় কি, তা নিয়ে তিনি তাদের সঙ্গে বিষদ আলোচনা করেন। তার অনুপস্থিতিতে এই ঐক্যবদ্ধ বাঙালী জাতি যেন কোন মতেই অনৈক্যের ফাঁদে পা না দেয় কিংবা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি না হয়, সেই উদ্দেশ্যে তিনি নিজ কণ্ঠে জাতির জন্য পরবর্তী কিছু নির্দেশনা ধারণ এবং তা যথা সময়ে ও সঠিক মুহূর্তে সমগ্র জাতির মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার মতো কারিগরি প্রস্তুতি নেয়ার জন্য তাদের নির্দেশ দেন। বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতার কাছ থেকে এমন নির্দেশ নিয়ে প্রকৌশলীগন ৩২ নং ত্যাগ এবং সেদিন থেকে প্রস্তুতি শুরু করেন।

২১ মার্চ পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জেড এ ভুট্টো ঢাকায় আসেন। ঢাকায় পৌঁছে ঐদিনই তিনি ইয়াহিয়ার সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনা এবং সর্বশেষ পরিস্থিতি অবগত হন। ২২ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকে ভুট্টোও যোগ দেন। এদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও ইপিআরের সঙ্গে সংঘর্ষে অনেক মানুষ মারা যায়। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস। ইতোমধ্যে নেতার সঙ্গে আলোচনা ও তার সম্মতিক্রমে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র খচিত নতুন পতাকা প্রকাশ করলে তা বিপুল জনসমর্থন পায়। ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে সেনানিবাস ব্যতীত কোথাও চাঁদতারা পতাকার দেখা পাওয়া যায়নি। অথচ ভাবি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনসহ বাংলাদেশের সর্বত্র নতুন পতাকা উড়িয়ে বাঙালীরা আনন্দ উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে যা ইতোপূর্বে কখনও দেখা যায়নি। পূর্ব রাতে বিভিন্ন স্থানে ইপিআর ও পুলিশের গুলিতে হতাহতের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু এইদিন তার গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করতে যান। সেনা ছাউনিগুলোতে প্রীতি ভোজের আয়োজন হলেও ব্যস্ততার অজুহাতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও ভুট্টো সকল অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকেন। ঢাকার পল্টন ময়দানে নতুন পতাকা ও কাঠের ডামি রাইফেল হাতে প্রাক্তন সৈনিক ও একদল ছাত্রছাত্রীর কুচকাওয়াজে বিপুল জনসমাগম হয়। এরূপ পরিবেশে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে বাঙালীদের স্বাধীনতার ব্যাকুলতা ওই মুহূর্তে যেন তীব্রতর হয়েছে। ২৪ মার্চ বিভিন্ন সেনানিবাসে অবাঙালী অফিসারদের তৎপরতা ছিল লক্ষণীয়। শীর্ষ কমান্ডারগণ হেলিকপ্টারে বিভিন্ন সেনানিবাস সফর করেন। বিকেলে প্রেসিডেন্টের কয়েক উপদেষ্টা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। আলোচ্যসূচী খোলাসা না করলেও বঙ্গবন্ধু বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন যে, শাসক গোষ্ঠীর কোন ষড়যন্ত্রই সফল হবে না। আমরা এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বই। রাতে তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বাঙালীদের যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। রাতের বেলা সেনানিবাসের ট্যাঙ্কলরিসমূহে গোলা বারুদ ও জ্বালানি তেল ভরা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী ইউনিটগুলোকে ইতোমধ্যে বাইরে পাঠান হয়েছিল। অবশিষ্ট কয়েক যারা ছিল তাদেরও বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত রাখা হয়। চারদিকে যুদ্ধ যুদ্ধ পরিবেশ।

২৫ মার্চ সকালে সেনানিবাসের তৎপরতার সংবাদ বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌঁছানো হয়। এ সবের উদ্দেশ্য কি জানতে তিনি একাধিকবার প্রেসিডেন্টকে ফোন করেন। কিন্তু বার বার বলা হয় তিনি মিটিংয়ে আছেন এবং ফ্রি হওয়া মাত্র প্রেসিডেন্টই তার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট আর কখনোই ফোন করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি। দুপুরেই খবর রটে যায় মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টোর বৈঠক ভেস্তে গেছে। কোন কোন বৈঠক সফল, আবার কোনটি ব্যর্থ হতেই পারে। কিন্ত এই বৈঠকের সময় পর্দার অন্তরালে যে কি ভয়াবহ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি চলছিল তা বোধ করি কোন সুস্থ মস্তিস্ক ও বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের চিন্তায়ও ছিল না। যারা রাজনীতি সচেতন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান রাখেন, তাদের চিন্তায় ছিল বড় জোর একটি আইউব ধাঁচের কঠিন মার্শাল ‘ল এবং বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অন্তত এক দশক হাজতবাস। শুধু ইয়াহিয়া-ভুট্টো গংদের মাথায় ছিল মুজিব ও তার অনুসারী আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ কয়েক লাখ তরুণ যুবাসহ বাঙালী সামরিক, আধা সামরিক, পুলিশ বাহিনীর লোককে হত্যার মাধ্যমে এই বাঙালী জাতিকে অন্তত কয়েক দশক গোলাম করে রাখার সংকল্প। তাদের আত্মবিশ^াস ছিল যে এপ্রিল মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।

২৫ মার্চ দুুপুরের পর থেকেই বিভিন্ন স্তরের মানুষ ৩২ নম্বর ধানম-ির বাইরে উপস্থিত হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ ও স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিল। বাড়ির ভেতরে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এমনকি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সংসদে যোগ দিতে আসা বেশ ক’জন শীর্ষ নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তার প্রতি সমর্থন জানান। বঙ্গবন্ধুর কাছে আরও খবর আসে যে সামান্য কিছু পাহারায় রেখে অধিকাংশ ইউনিটে সৈনিকদের দুপুর থেকে বাধ্যতামূলক বিশ্রামে পাঠানো হয়েছে। এইরূপ বিভ্রান্তি ও আতঙ্কজনক খবরে ড্রইং রুমে পাঁয়চারিরত বঙ্গবন্ধু নিকটজনের কাছে অস্বস্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। যে সকল বেতার প্রকৌশলীদের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বিকেলে তাদের ডেকে পাঠানো হয়। তারা প্রস্তুত এমন তথ্যে বঙ্গবন্ধু সন্তোষ প্রকাশ ও তাদের ধন্যবাদ জানান। প্রকৌশলীদের সঙ্গে নিয়ে আসা একটি টেপ রেকর্ডার নিয়ে তারা বঙ্গবন্ধুর শোবার ঘরে যান। সেখানেই খুব সতর্কতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কন্ঠে ধারণ করা হয়- সংক্ষিপ্তাকারের স্বাধীনতার ঘোষণা।

জীবনের বিভিন্ন সময়ে জেল খেটে অভ্যস্থ, রাষ্ট্রদ্রোহ আগরতলা মামলার অভিজ্ঞ আসামি শেখ মুজিবুর রহমান আজ খুব বেশি সতর্ক। তার চেয়েও বেশি সাবধান। তাই ঐ প্রকৌশলীদের তার এই বার্তা বহন, সংরক্ষণ, প্রচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষার নির্দেশ দেন। আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে এই বার্তাটি প্রকাশ পেলে পরিণতি হবে ভয়াবহ জেনেই তিনি সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করেন। সন্ধ্যার আধার প্রকৃতিকে গ্রাস করার কিছু পরই বঙ্গবন্ধু জানতে পারেন যে প্রেসিডেন্ট গোপনে ঢাকা ছেড়েছেন। এমন সংবাদে তিনি নিশ্চিত হন যে তার অনুমান সত্য হলো। আলোচনার নামে এতদিন ইয়াহিয়া-ভুট্টো সময়ক্ষেপণ ও রাজনৈতিক ভাঁওতাবাজি চালিয়েছে। যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়ে তিনি ৩২ নম্বর ধানম-িতে উপস্থিত শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ব্যতীত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের অন্যান্য নেতাদের গুপ্তাশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বিদায় করেন। এরপরই তড়িঘড়ি করে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কতখানি সত্য তা প্রমাণিত হয়নি এবং বঙ্গবন্ধু তার জীবদ্দশায় কখনও তা প্রকাশ করেননি। কিন্তু ২৫ মার্চ রাতে সর্বশেষ ঐ বৈঠকে বঙ্গবন্ধু মুজিব তার সহকর্মীদের খুব দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া, আক্রান্ত হলে তাদেরকে সীমান্ত অতিক্রম এবং ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার বিস্তারিত দিক নির্দেশনা দেন। উপস্থিত নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুকেও তাদের সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য অনেক অনুনয় বিনয় করেন। কিন্তু বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তিনি ৩২ নম্বরেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। (এরপর চতুরঙ্গ পৃষ্ঠায়)

শীর্ষ সংবাদ:
উন্নয়নের কান্ডারি শেখ হাসিনার জন্মদিন আজ         এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আর নেই         শেখ হাসিনার জীবন সংগ্রামের ॥ তথ্যমন্ত্রী         স্বামীর জন্য রক্ত জোগাড়ের কথা বলে ধর্ষণ, দুজন রিমান্ডে         ডোপ টেস্টে আরও ১৪ পুলিশ শনাক্ত         চীনা ভ্যাকসিনের ঢাকা ট্রায়াল নিয়ে সংশয়         দেয়াল চাপায় সাত জনের মৃত্যু         করোনায় মৃত্যু কমলেও বেড়েছে নতুন রোগী         অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক         অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আর নেই         উন্নয়নে প্রতিবেশীদের সঙ্গে আরও দৃঢ় সহযোগিতায় জোর প্রধানমন্ত্রীর         সিলেটের ঘটনায় সরকার কঠোর অবস্থানে আছে ॥ কাদের         ভার্চুয়াল কোর্টেকে আরো সাফল্য মন্ডিত করতে বিচারক ও আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন ॥ আইনমন্ত্রী         নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণ ॥ নিহত ও আহত ৩৮ পরিবারের মাঝে ৫ লাখ টাকা করে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান বিতরণ         স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি ॥ বন্ধ করতে দুদকের ২৫ সুপারিশ বাস্তবায়নে রিট         ‘অক্সফোর্ডের বাংলাদেশে পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হয়েছে’         এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূর আদালতে জবানবন্দি         এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ ॥ সাইফুরের পর অর্জুন গ্রেফতার         করোনা ভাইরাস ॥ ভারতে সংক্রমণ ৬০ লাখ ছুঁই ছুঁই         ধর্ষনের ঘটনায় ভিপি নূরসহ সকল আসামী ঢাবিতে অবাঞ্চিত