মঙ্গলবার ৪ কার্তিক ১৪২৮, ১৯ অক্টোবর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

দিনযাপনের শাঁখের করাত

  • হাসান আজিজুল হক

স্বাধীনতার পর সাড়ে চার দশক অতিবাহিত হয়েছে। দেশের চড়াই-উতরাই তো কম হলো না! শুধু দেশইবা বলা কেন- দেশের জনগণ তথা জাতির ললাটেও সেসবের দাগ রয়েছে। এই সাড়ে চার দশক কিন্তু কম সময় নয়। এর মধ্যে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর বিস্তর সুযোগ আমরা পেয়েছি। বলতে চাচ্ছি সুপরিণতির কথা। সুপরিণতি লাভ নয়, অর্জনের ব্যাপার। অবশ্য সেই অর্জন থেকে অনেক দূরে আছি সে কথা বলা যাবে না। আবার পূর্ণতা পেয়েছি তাও বলা যাচ্ছে না। বাস্তবতা বলে দিচ্ছে সুপরিণতি কি অধরাই থেকে যাবে? কেন যেন সন্দেহ উঁকি দেয়, আমরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব কি না!

সন্দেহ অমূলক হয় না যখন দেখি সুশিক্ষার চেয়ে শিক্ষার হার বেশি। অন্যদিকে তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষার বাস্তবতা দেখে না বলে পারা যায় না- এত এত প্রকাশনা কার বা কাদের জন্য? সংবাদপত্রইবা কোন শ্রেণীকে করছে উদ্দিষ্ট? সংবাদপত্র তো অবশ্যই শিক্ষিত সমাজের জন্য, সচেতন মানুষের জন্য। মিডিয়ার ইতিবাচক সেবা যারা নেয় তারা সমাজের চোখ কান খোলা মানুষ। মিডিয়ার প্রকারভেদের জন্যই হোক আর মনস্তাত্ত্বিক কারণেই হোক মানুষ বেশিই কর্ণগোচরের চেয়ে স্বচক্ষে দেখাকেই গুরুত্ব দেয়, আস্থা রাখে। এজন্য আমরা সংবাদপত্রের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

মানুষ চায় সত্যকে জানতে। সংবাদপত্রই সত্যকে তুলে ধরতে চায়। ধ্রুবসত্য বলে কি কিছু আছে? অথচ সত্যান্বেষী মানুষের দুর্বলতা সেদিকেই। সংবাদপত্রের পাঠক সমাজের উঁচু শ্রেণীতে বাস করেন। আর এই পাঠকের সংখ্যা সীমিত। কিন্তু দেশে যে বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে যারা নানাদিক দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত। যাদের আমরা গরিব, দরিদ্র, নিম্নবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত বলছি। তারা এই ‘সত্য’ পাঠ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংবাদপত্র প্রতিদিন ১০ লাখ যদি প্রকাশিত হয় তবে ১৬ কোটি মানুষ কি পাঠ আনন্দে শরিক হতে পারছে? বেশিরভাগ মানুষই এর বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়- এ আয়োজন কার উদ্দেশ্যে? সমাজে উঁচু স্তরের কথা উঁচু স্তরের মানুষ উঁচু স্তরের মাধ্যমেই প্রকাশ করছে। নিম্নস্তরের মানুষ তা হয়ত পুরোপুরি জানতে পারছে না। আরেক ধাপ এগিয়ে বলা যায় নিম্নস্তরের মানুষের কথা বলা হচ্ছে না; যেভাবে আশা করা হয়। মোদ্দাকথা, সংবাদপত্রের প্রভাব সমস্ত জনগণের খুব ছোট একটা অংশে পড়ছে।

পাকিস্তান আমলে ৪/৫টি দৈনিক পত্রিকা ছিল এ অঞ্চলে। বেশকিছু সাপ্তাহিকও ছিল। স্বাধীনতার পর আজতক সংবাদপত্রের সংখ্যা বেড়েছে অনেক। এটা একটা শুভ লক্ষণ। এর সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার মানুষের জীবিকার প্রশ্ন। মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথার প্রসঙ্গে না হয় পরে আসা যাবে। এই মাধ্যমটির শিল্প হয়ে ওঠার সব সম্ভাবনা থাকলেও তা এখনও হয়ে ওঠেনি। এটা অনেক বড় আয়োজন। এর প্রক্রিয়া ব্যয় অনেক কিন্তু ওঠে আসে সামান্য। এরপরও সংবাদপত্র বের হচ্ছে। নতুন নতুন প্রকাশনা আমরা দেখতে পাচ্ছি। বহির্বিশ্বে এমন অনেক দেশ আছে যেখানে সংবাদপত্র ফ্রি বিতরণ করা হয়। সেখানে রয়েছে সরকারী-বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতা। অবশ্য সবখানেই নির্ভর করতে হয় বিজ্ঞাপনের ওপর। এই বিজ্ঞাপন নির্ভরশীলতায় আবার মুশকিল আছে। অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের মানের চেয়ে বেশি বলা হয় বিজ্ঞাপনে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সমাজে, অর্থনীতিতে। একশ্রেণীর ব্যবসায়ীর আর্থিক লাভ হয় অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হন ভোক্তা সাধারণ। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার সমস্যাও কম নয়। যদি গণতান্ত্রিক, উদারনৈতিক সরকার ও রাষ্ট্র কাঠামো না হয় তবে সরকার চাইবে তার ‘নিজস্ব বিজ্ঞাপন’ প্রকাশ করতে।

আবার একটু ফিরে যাই পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গে। শুধু পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য যদি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় অর্থাৎ বিজ্ঞাপননির্ভর পত্রিকা হয় তবে দেখা যাবে সংবাদপত্রের পৃথিবী না হয়ে বিজ্ঞাপনের পৃথিবী হয়ে পড়বে। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একসময় পণ্যের পৃথিবীও হয়ে যেতে পারে। সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরী। সারাবিশ্বে তো বটেই এদেশের পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীকে আকছার ব্যবহার করা হচ্ছে। একজন নারীকে ২ মিনিটের বিজ্ঞাপনেও কয়েক সেকেন্ড পর পর নানাভাবে উপস্থাপন করা হয়। বিভিন্ন রঙে-ঢঙে নারীকে এভাবে উপস্থাপন মানেই নারীর ব্যক্তিত্বের বিকাশের অন্তরায়। নারীকে মানুষ নয় যেন বিশেষ মূর্তিতে আবদ্ধ করার প্রচেষ্টা। এতে স্পষ্ট হয় পুরুষতান্ত্রিকতার দম্ভ ও দর্প।

গণতন্ত্র যে কটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সংবাদপত্র তার অন্যতম। কেননা ব্যক্তির মত প্রকাশ না হলে যে গণতন্ত্রে চিড় ধরে। ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্র বা সরকারের যোগসূত্র। মেলবন্ধন ঘটাতে সংবাদপত্রের ভূমিকাই মুখ্য। এক্ষেত্রে সংবাদপত্রকে সাহসী ভূমিকা রাখতেই হয়। কেননা সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে একটি ভুবন সৃষ্টি করে। গণতন্ত্র বিকাশ ও প্রতিষ্ঠায় এ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এর চলার পথও বড় পিচ্ছিল। একবার পিছলে পড়লে পাঠক-গ্রাহক হয়ত বলে উঠবেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায়Ñ ‘ওরে ভীরু তোমার হাতে নাই ভুবনের ভার।’...

সংবাদপত্রের ক্ষমতাও অসীম। এ ক্ষমতার সদ্ব্যবহারে ব্যক্তি, রাষ্ট্র, সমাজ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আবার অপব্যবহারে নেতিবাচক প্রভাবও পড়ে। সংবাদপত্র পারে ব্যক্তির মাথা ঘুরিয়ে দিতে। মাথা যদি পুবে থাকে তাকে নিমিষেই পশ্চিমে ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে এর। প্রয়োজনে আকৃতি দেয়ার জন্যও অনেক ক্ষেত্রে, নিজের স্বার্থে বিকৃতিও ঘটিয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে সেই খেয়ালি নিষ্ঠুর দস্যুর গল্প মনে পড়ে। প্রতিদিন এই দস্যু একজন মানুষ অপহরণ করে নিজের বিছানায় শোয়াত। যদি বিছানার চেয়ে বড় হতো তবে হাত-পা বা মাথার অংশ কেটে ফেলে বিছানার সমান করত। সংবাদপত্রের কাছে এমন আচরণ কেউ আশা করে না।

সংবাদপত্রের কাছে মানুষ মূলত সংবাদই বেশি আশা করে। সেই সংবাদ শুধু খবর অর্থে নয়। সত্য হতে হবে। সত্য জানার আগ্রহ নিয়েই মানুষ এ বস্তুটি সকাল বেলা হাতে নেয়। এ অঞ্চলে এক সময় একটি নির্ভরশীলতার নাম ছিল স্টেটসম্যান। শিক্ষিত সমাজে ‘ধ্রুবসত্য’ খুঁজতে নির্ভর করত এই স্টেটসম্যানের ওপর। যদিও ধ্রুবসত্য বলতে কিছু নেই। তেমনি ধ্রুবসত্যের কাগজ বলেও কিছু নেই।

আধুনিক বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী মাধ্যম বা প্রতিষ্ঠান মিডিয়া। এটা বোধ করি অত্যুক্তি হলো না। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের ফলে সংবাদপত্রেও যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। আশির দশকের পর দেখতে দেখতে এক ধরনের বিপ্লব ঘটেছে। এখন ঢাকার কোন দৈনিক পত্রিকার বিভিন্ন আঞ্চলিক বা বিভাগীয় সংস্করণ একই সঙ্গে স্বল্প সময়ে প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে। একদিনে ২৪ পৃষ্ঠার পত্রিকা বের হচ্ছে। ৪০ পৃষ্ঠাও সম্ভব। যা আগে আমরা ভাবতে পারতাম না। এটা একদিক দিয়ে ইতিবাচক দিক। প্রযুক্তি নিয়ে দুটি কথা বলা যায়। প্রযুক্তির প্রভাবে মানুষের ব্যক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সময়ের আগ্রাসন যাচ্ছে বেড়ে। কথায় আছে ‘আহার নিদ্রা মৈথুন/ এই হলো জীবের গুণ।’ প্রযুক্তির এমন উন্নতি হচ্ছে যে, আগামীতে খাদ্যেরই হয়তো প্রয়োজন পড়বে না। শুধু একটি ট্যাবলেট খেলেই সারাদিনের ক্ষুধা থাকবে না। প্রয়োজন হবে না আহারের। আলব্যেয়র কামু কি এই ভেবে বলেছিলেন, এক সময় মানুষের পরিচয় হবে সঙ্গম ও সংবাদপত্রভিত্তিক। প্রযুক্তি জীবনের সুখ কেড়ে নিয়েছে, বাড়িয়েছে আয়ু। এমনভাবে চলতে থাকলে এক সময় মানুষ মৃত্যুর জন্য ঠোকাঠুকি করবে। চলবে প্রতিযোগিতা, বলবে আমি আগে মরতে চাই।

মিডিয়ার কথা হচ্ছিল। চ্যানেলে যে সিরিয়ালটা চলে বা চলছে তা বিজ্ঞাপননির্ভর। সিরিয়ালের ব্যাপ্তিও নির্ভর করছে এই বিজ্ঞাপনের ওপর। চ্যানেলও টিকে আছে ওভাবেই। ওই বিজ্ঞাপনের প্রভাব ঘরে ঘরে পড়ছে। এমনি করেই সংবাদপত্র এগিয়ে চলেছে। সংবাদপত্র নিয়ে যে যাই বলুক না কেন এটি এখন শিক্ষিত ভদ্র সমাজের জন্য এক অপরিহার্য নিত্য-নৈমিত্তিক। যদিও এর মধ্যে কথা উঠেছে সংবাদপত্রের প্রিন্টিং ভার্সনের ভবিষ্যত নিয়ে। ইন্টারনেটভিত্তিক নিউজপোর্টালের দাপটে ছাপা সংবাদপত্র কোণঠাসা হয়ে পড়বে বলেই মনে হচ্ছে।

বিদেশে মানুষ ঘুম থেকে ওঠার আগে খবরের কাগজ পায়। বেড-টির আগে তারা সংবাদপত্রে চোখ বুলিয়ে নেয়। আমাদের সংস্কৃতিতেও সংবাদপত্রের এমন ভূমিকা প্রবেশ করেছে। সকালে উঠে দৈনিক পত্রিকার মুখখানা না দেখলে যেন দিনটি পানসে হয়ে যায়। একেবারে দিনযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। শিক্ষিত সমাজের কেউ যখন বলে উঠবে ‘আজকের পত্রিকাটা দেখেছেন?’ তখন সংবাদপত্রের দ্বারস্থ না হয়ে উপায় কী? এখন এই জ্ঞানের ভা-ার নামের বস্তুটি শিক্ষিত হওয়ার অন্যতম পরিচায়ক, স্মারকও বলতে পারি। এটা শাঁখের করাত, আসতে কাটে যেতেও কাটে। জীবনের নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু হয়ে জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। সংবাদপত্র ছাড়া একদিনও চলে না। জয় হোক সৎ সংবাদপত্রের!

Rasel
করোনাভাইরাস আপডেট
বিশ্বব্যাপী
বাংলাদেশ
আক্রান্ত
২৪২০২২২১৪
আক্রান্ত
১৫৬৬২৯৬
সুস্থ
২১৯৩৩৭৫০৪
সুস্থ
১৫২৯০৬৮
শীর্ষ সংবাদ:
পীরগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একশ বান্ডিল টিন ও নগদ অর্থ বরাদ্দ         প্রতিমাসে তিন কোটি ডোজ টিকা দেওয়া হবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী         করোনা : গত ২৪ ঘন্টায় মৃত্যু ৭         অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ         সয়াবিন তেলের দাম লিটারে বাড়লো ৭ টাকা         অপরাধের ধরন-মাধ্যম প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে : এনটিএমসি পরিচালক         হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলায় বহিরাগতরাও অংশ নিয়েছিল ॥ স্পিকার         মেয়র আতিকের বিরুদ্ধে করা মামলার আবেদন খারিজ         ব্যাক্তির অপরাধে কোন সম্প্রদায়কে দায়ী করা যাবে না ॥ শিক্ষামন্ত্রী         কুমিল্লার ঘটনার মুলহোতা পলাতক, শিগগিরই গ্রেফতার ॥ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী         পা থেকে মাথা পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূল্যবোধে সজ্জিত হতে হবে ॥ ইনু         দুর্নীতির মামলার ভয় দেখিয়ে চিকিৎসকের ৯৫ লাখ টাকা আত্মসাত ॥ গ্রেফতার ২         ‘কুমিল্লার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত খুঁজে বের করা হবে’         অপরাধী শনাক্তে সক্ষমতা বাড়ল র‍্যাবের         যবিপ্রবিতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসায় রোবোটিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার শীর্ষক সেমিনার         সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখে দেওয়ার প্রত্যয় আ.লীগের         হামলাকারীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ         হাজারো রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিল মিয়ানমারের সামরিক জান্তা         সিরাজগঞ্জে ৬ ডাকাত গ্রেফতার ॥ গুলিসহ ২ রিভালবার উদ্ধার         দেশে বসেই বিদেশিদের পাসপোর্ট করতেন তিনি