ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৪ মার্চ ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২

মাদক-নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আইজিপির কঠোর বার্তা

মাজহারুল ইসলাম (কাঞ্চন), গাজীপুর

প্রকাশিত: ২০:৩৭, ১৪ মার্চ ২০২৬

মাদক-নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আইজিপির কঠোর বার্তা

দেশের তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব চরম সংকটে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেছেন, মাদক কেবল ব্যক্তি বা পরিবার নয়, একটি জাতির ভবিষ্যৎকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। তাই মাদক নির্মূলে বাংলাদেশ পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে এবং এ ক্ষেত্রে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে শ্রমিক অসন্তোষের নামে সড়ক অবরোধসহ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করা হবে না বলেও তিনি কঠোর বার্তা দেন।

শনিবার (১৪ মার্চ) বিকেলে গাজীপুর জেলা পুলিশ লাইন্স মাঠে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উদ্যোগে আয়োজিত সুধী সমাবেশ ও ইফতার মাহফিলে  তিনি এসব কথা বলেন। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে বিকাল ৪টায় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনি।

আইজিপি বলেন, মাদক তরুণ সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং এর ফলে দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, তরুণদের একটি অংশ অতিরিক্তভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আসক্ত হয়ে পড়ছে, যার ফলে তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাচ্ছে এবং এটি ভবিষ্যতে সামাজিক ও জাতীয় জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের শ্রমিক পরিস্থিতি নিয়ে আইজিপি বলেন, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। এসব উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করা গেলে শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি সড়ক অবরোধসহ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান এবং গার্মেন্টস মালিকদের উদ্দেশে বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন-ভাতা সময়মতো পরিশোধ করলে অনেক সমস্যাই এড়ানো সম্ভব।

আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদারের কথাও জানান আইজিপি। তিনি বলেন, ঈদকে সামনে রেখে দেশের সব মহাসড়ক ও থানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারে।
মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ভেতরেও কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। আইজিপি বলেন, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তাকে আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, অন্যায় ও অনিয়মের তথ্য তুলে ধরলে পুলিশ তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।

অনুষ্ঠানে গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। কোনো রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী মাদক কিংবা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।

সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মো. হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে অপরাধ দমন আরও সহজ হবে।

সভায় স্বাগত বক্তব্যে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার বলেন, রাজধানীর পাশের শিল্পনগরী গাজীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন দেশের বৃহত্তম সিটি করপোরেশনগুলোর একটি। এখানে অসংখ্য শিল্প-কারখানা, শ্রমিক কলোনি ও বস্তিতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ বসবাস করে। এত বড় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত চার শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে পুলিশের জনবল সংকট, অনেক থানার নিজস্ব ভবন না থাকা এবং পর্যাপ্ত যানবাহনের অভাব কার্যক্রম পরিচালনায় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

অনুষ্ঠানে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক, গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দিন, জেলা প্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক আহমেদ হোসেন ভূঁইয়া, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ডা. মাজহারুল আলম, শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সভাপতি সালাহ উদ্দিন সরকার, গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমীর অধ্যাপক জামাল উদ্দিন, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ব্যারিস্টার ইসরাক আহমেদ সিদ্দিকীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে বক্তারা শহরের যানজট নিরসন, টঙ্গী এলাকায় ছিনতাই দমন, মাদক নির্মূল, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন।

সমাবেশ শেষে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয় এবং উপস্থিত অতিথিদের সম্মানে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের সুধী সমাবেশ পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রাজু

×