মনে দোলাচল থাকলেও কাজে ফেরার চেষ্টা করছে মানুষ।
কত কী যে ঘটে গেল দেশে! একেবারে উলটপালট হয়ে গেল। অল্প সময়ের মধ্যে অযুত ঘটনা। দুর্ঘটনা। একেকটি একেকভাবে ক্রিয়া করছে মানুষের মনে। কিছু পরিবর্তন, হ্যাঁ, কাক্সিক্ষত ছিল। আবার বাড়াবাড়িও কম হয়নি। ফলে জাতীয় জীবনে এক ধরনের দোলাচল লক্ষ্য করা গেছে এতদিন।
বর্তমানে সব ঠিকঠাকÑ এমন নয়। বরং কেউ বেজায় খুশি। কেউ হতাশ। কেউ বিক্ষুব্ধ। কেউবা আশাবাদী। তবে ট্রমা কাটিয়ে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার চেষ্টা করছেন সবাই।
এর আগে দেশজুড়েই বড়সড় আন্দোলন হয়েছে। কোটা সংস্কারের দাবি সামনে এসেছিল প্রথমে। পরে মূল দাবিটি। মানে, সরকার পরিবর্তনের এক দফা। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বহুবিধ কর্মসূচি পালন করছিলেন আন্দোলনকারীরা। ক্রমে সহিংস হয়ে ওঠে পরিবেশ। ছাত্র হত্যার মতো নির্মম ঘটনা ঘটতে থাকে। এইটুকুন বাচ্চার বুকে গুলি, রক্তাক্ত ইউনিফর্ম।
মায়ের কান্না। এসব আর নেওয়া যাচ্ছিল না। সময় সুযোগ বুঝে নেমে পড়েছিল দুর্বৃত্তরাও। রাজনীতিবিদদের ঘোলা জলে মাছ শিকারের চেষ্টা শতভাগ সফল হয়েছে। সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পরও অব্যাহত ছিল হত্যা খুন নির্যাতন। বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। থানা আক্রমণ করে জঙ্গি কায়দায় পিটিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে পুলিশ। এভাবে মৃত্যুর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি ছড়িয়ে পড়েছে কান্না। এত রক্ত, এত কান্না কে কবে দেখেছিল?
ক্ষমতাচ্যুতদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, আগুন দেওয়া, লুটপাটের ঘটনাও জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষও আক্রান্ত হয়েছেন। ৩২ নম্বরে আগুন এবং বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙতে দেখে আহত হয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়িতেও সেই সনাতনী কায়দায় হামলা করা হয়। মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়। প্রাণ বাঁচাতে দল বেঁধে সীমান্তের পানে ছুটে যান তারা। এইসব দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী মানুষকে বেদনাদাহত করেছে।
সরকারি-বেসরকারি অফিসেও অচলাবস্থা চলছিল। নতুন নতুন অফিস আদেশের পাশাপাশি চেয়ার দখল, চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটছিল প্রতিদিন। টানা-হেঁচড়া থেকে বাদ যাননি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যকার সম্পর্ক, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যকার সম্পর্ক ভেঙে পড়ছিল কাচের টুকরোর মতো।
এদিকে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি প্রত্যাশাও অনেক। বিভিন্ন গোষ্ঠী বিগত সরকারের সময় বঞ্চিত হয়েছেন দাবি করে মাঠে গরম করে রেখেছে। কখনো আনসাররা, কখনো মেট্রোরেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, কখনো আউট সোর্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা প্রতিকারের আশায় বিক্ষোভ করছেন। আরও নানা ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত।
এসবের প্রভাব পড়লেও জীবন থেমে নেই। থেমে থাকে না। রাজধানীবাসী জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার চেষ্টা করছে। এরই মাঝে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। সরকারি-বেসরকারি সব অফিস-আদালত খোলা আছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে বেড়েছে উপদেষ্টার সংখ্যাও। ফলে সচিবালয়ের কাজে নতুন গতি এসেছে। মন্ত্রণালয়গুলো পরিচালনার দায়িত্ব যারা পেয়েছেন তাদের অধিকাংশের ওপর জনগণের আস্থা আছে। ফলে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছে মানুষ।
রাজধানীর অধিকাংশ দোকানপাট শপিংমল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শিল্প কারখানা এখন চালু আছে। সব ধরনের যানবাহন চলাচল করছে রাস্তায়। অপেক্ষা শুধু মেট্রোরেলের। মেট্রো চালু হয়ে গেলে শহরে যাতায়াত আরও সহজ ও স্বাভাবিক হবে বলেই আশা।
অবশ্য আন্দোলনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। সরকার পরিবর্তনের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়া হয়েছিল। এখন ক্লাস এবং পরীক্ষা শুরু করা গেলে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে ক্যাম্পাস। গুচ্ছভুক্ত সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের ক্লাস আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে।
সারাদেশের স্কুল কলেজও আজ রবিবার থেকে খুলে দেওয়া হচ্ছে। গত ১৭ জুলাই থেকে ক্লাস এবং পরীক্ষা বন্ধ ছিল। আজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম যথারীতি চলবে। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে পারবে এখন, যা খুব জরুরি।
মূলত শিক্ষার্থী এবং সরকার এই দুই অংশের ওপর নির্ভর করছে সামনের দিনগুলোতে কতটা স্বাভাবিক হবে জীবন। কারণ এখনো যারা ভয়ভীতির মধ্যে রয়েছেন তাদের আস্থায় ফেরানোর দায় এবং দায়িত্ব সরকার এবং শিক্ষার্থীদের ওপরই বর্তাবে। এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা গেলে অকারণ ভীতি দূর হবে। শান্তি ফিরবে দেশে। পুরোপুরি ছন্দে ফিরবে জীবন।








