ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২২ জুলাই ২০২৪, ৬ শ্রাবণ ১৪৩১

আশ্বাস দিয়েই চলছে ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম

চট্টগ্রামে পাহাড় দখল, কর্তন থামছেই না

নয়ন চক্রবর্ত্তী, চট্টগ্রাম অফিস

প্রকাশিত: ০০:১৮, ২১ জুন ২০২৪

চট্টগ্রামে পাহাড় দখল, কর্তন থামছেই না

চট্টগ্রামে বায়েজিদ এলাকার মাঝেরঘোনায় এভাবেই কেটে ফেলা হয়েছে পাহাড়

প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা অব্যাহত রয়েছে। এর পাশাপাশি পাহাড়খেকোরা অবৈধ পথে পাহাড় দখল করেই চলেছে। দীর্ঘ সময় ধরে এ অবৈধ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পাহাড় ধ্বংস করছে চিহ্নিত একটি চক্র। এদের কখনো আইনের আওতায় আনার ঘটনা নেই। মাঝেমধ্যে পাহাড় কাটা শ্রমিকদের গ্রেপ্তার করার ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যায়। কিন্তু নেপথ্যের কুশীলবরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। 
প্রতি বছর বর্ষা শুরুর পর পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়। কমিটির সভাপতি সে সভায় বিভিন্ন হুঁশিয়ারি ও সিদ্ধান্ত দেয়। কিন্তু বছর ঘুরতে কয়েকটি হাতেগোনা অভিযান ছাড়া আর কোনো কিছুই বাস্তবতা মেলে না। শুধু তাই নয়, বিপুল অর্থের বিনিময়ে পাহাড়ে অবৈধভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগদানে সহায়তাকারী কর্মকর্তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে’ একইভাবে দখলকারীরাও থাকে নির্বিঘেœ।

ফলে বছরের পর বছর পাহাড় কাটা ও বসতি স্থাপন চলমান। সচেতন নাগরিক ও পরিবেশবিদরা বলছেন, ক্রমান্বয়ে পাহাড় ধ্বংস করা হচ্ছে। ফলে প্রাণহানি বাড়লেও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন তদারকি সংস্থা পাহাড় দখলকারীদের বিচারের আওতায় আনছে না। তারা পাহাড় রক্ষায় সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
চট্টগ্রামে গত দুদিন ধরে থেমে থেমে বর্ষণ চলছে। গত বুধবার আবহাওয়া অধিদপ্তর ভূমিধস ও জলোচ্ছ্বাসের সম্ভাবনা রয়েছে জানিয়ে সর্তকবার্তা দেয়।

এর পরই মূলত চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ঘুম ভাঙে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) জনসংযোগ শাখা জানায়, তাদের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের সরে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে একইদিন জেলা প্রশাসন তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে, পাহাড় ধস রোধে একাধিক টিম মহানগরসহ উপজেলাগুলোতে কাজ করছে।

নগরীর আকবর শাহ, বিজয়নগর, ১নং ঝিল, টাংকির পাহাড়, আমিন জুট মিল এলাকা, পাহাড়িকা, সমবায় আবাসিক, মিয়ার পাহাড়, মুরাদপুর রেল স্টেশন সংলগ্ন রেলওয়ের পাহাড়, আকমল আলী ঘাট, লালখান বাজারের পোড়া কলোনি বস্তি এলাকা, ডেবারপাড়, মতিঝর্ণা, বাটালি হিলসহ সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দুপুরের পর থেকে মাইকিং করা হয়েছে। সমন্বয়ের জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। এরপর পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাও আহ্বান করার কথা জানায় বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়।
বৃহস্পতিবার বিকালে ২৮তম সভায় সভাপতিত্ব করেন বিভাগীয় কমিশনার মো. তোফায়েল ইসলাম। গত বছরও প্রবল বৃষ্টিপাত শুরু হওয়া দুদিন পর ৮ আগস্ট পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ২৭তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায়ও বর্তমান বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন। সভাপতি তখন পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীদের পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অবৈধ সংযোগদানে সহায়তাকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি মামলা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। একই সঙ্গে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করে স্থায়ীভাবে সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা হবে বলেও মন্তব্য করেছিলেন বিভাগীয় কমিমণার। এ জন্য সিটি করপোরেশন, রেলওয়ে ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে আন্তঃদপ্তর আলোচনা করে উচ্ছেদ-পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
কিন্তু কয়েকটি অভিযান ছাড়া আর কোনো কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি পাহাড় রক্ষায় সুপারিশও উপেক্ষিত। ২৭তম সভায় বিভাগীয় কমিশনার বলেছিলেন, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে হবে। অবৈধ দখলদারদের তালিকা করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন ও অবৈধ বসতি উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। অথচ পাহাড়ে বসবাসকারীরা দিব্যি সকল সেবা সংস্থার সংযোগ নিয়ে নিত্যনতুন স্থাপনাও গড়ে তুলেছে। যার ফলে সভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এ কমিটি।
পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগে সহায়তারকারী বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি মামলা দায়ের করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। সভায় গেল বছর জানানো হয়েছিল রেলওয়ের সাতটি পাহাড়ে ৫ হাজার ৩৩২টি অবৈধ পরিবারের বসতি রয়েছে। অথচ বর্ষা ও ঘূর্ণিঝড় শুরু হলে এখনো পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরানোর জন্য চলে মাইকিং। মহানগরীর সরকারি সংস্থার পাহাড়েই গ্যাস পানি বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরও কোনো ধরনের বড় অভিযান করতে পারেনি এক বছরে। যার ফলে ক্ষুব্ধ পরিবেশবাদীরা।
১১ জুনকে পাহাড় রক্ষা দিবস ঘোষণার দাবি জানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কর্মসূচি ও সমাবেশ পালন করছে পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েস। গত ১১ জুন সন্ধ্যায় নগরীর চেরাগী পাহাড় মোড়ে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও তারা নাগরিক সমাবেশ করে। পাহাড় রক্ষায় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নীরব ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তারা।
পিপলস ভয়েস সভাপতি শরীফ চৌহান বলেন, প্রশাসন পাহাড়খেকোদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছে। আমরা বলতে চাই আর একটিও পাহাড় কাটা হলে আমরা এবার থেকে সেই পাহাড়ের সামনে গিয়ে প্রতিবাদ করব।

আমাদের কেটে তারপর পাহাড় কাটতে হবে। এভাবে প্রতিবাদ না করলে পাহাড় বাঁচবে না। সেদিন নাগরিক সমাবেশে সাংবাদিক জসিম চৌধুরী সবুজ বলেন, প্রতি বছর বলছি পাহাড় কাটা বন্ধ করা হোক, কিন্তু হচ্ছে না। আরও বাড়ছে। আমরা এখনো একটি পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। নাম চেরাগী পাহাড় কিন্তু পাহাড়ের অস্তিত্ব নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু তাদের কাজ কী?

×