ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

লালমনিরহাট রেল বিভাগ

দেশে প্রথম টার্ন টেবিল নির্মাণ

মাহফুজার রহমান, লালমনিরহাট

প্রকাশিত: ০০:৩৭, ১৯ মে ২০২৪

দেশে প্রথম টার্ন টেবিল নির্মাণ

প্রথম টার্ন টেবিল নির্মাণ করল লালমনিরহাট রেল বিভাগ

ব্রিটিশ আমলের প্রযুক্তি সরিয়ে দেশের প্রথম টার্ন টেবিল নির্মাণ করল লালমনিরহাট রেল বিভাগ, ইঞ্জিন বা কোচ ঘোরানোর জন্য আর ঢাকায় যেতে হবে না। লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশনের সিক লাইন এলাকায় প্রস্তুত এ টার্ন টেবিলটি উদ্বোধন হলে সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে।  রেলের ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর জন্য লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের ব্রিটিশ আমলের নির্মিত টার্ন টেবিলটি পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ায় উল্টা দিকেই গাড়ি চালাতে হয় চালকদের।

এতে করে একদিকে চলার কারণে চাকার ক্ষয় হচ্ছে। আর চালকও  পেছনে বসে ট্রেন চালাতে হয়, এ কারণে অনেক সময় ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রায় তিন দশক আগে লালমনিরহাটের টার্ন টেবিলটি বিকল হওয়ার পর পশ্চিমাঞ্চলের রেলের ইঞ্জিন ও কোচগুলো কয়েক মাস পর পর ঢাকা থেকে ঘুরিয়ে আনা হয়। লালমনিরহাটের টার্ন টেবিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার  দীর্ঘ ৩০ বছর পর লালমনিরহাট রেলওয়ে যন্ত্র প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে  টার্ন টেবিলটি নির্মাণ করা হয়েছে।

লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশনের আধা কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে সিক লাইন এলাকায় নয় শতক জমির ওপর টার্ন টেবিলটির অবস্থান। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, লালমনিরহাটে প্রথমবারের মতো, দেশে টার্ন টেবিল নির্মাণ করা হয়েছে। টার্ন টেবিলে ১৪ টন ওজনের একটি ব্রিজ রয়েছে। এটি এই যন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর ওপরে ইঞ্জিন ও কোচ তুলে ঘোরানো হয়। স্থাপনাটির তিন ধাপে পাকা দেওয়ালের সীমানাপ্রাচীর যা সুরক্ষাপ্রাচীর ও লাইন দেওয়াল নামে পরিচিত। এর মেঝে আরসিসি ঢালাই দেওয়া, পানি জমলে রয়েছে পাম্প দিয়ে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। 
রেলওয়ে সত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ আমল ১৮৬২ সালে লালমনিরহাটে নির্মিত হয় টার্ন টেবিল, যা দীর্ঘ সময় সচল ছিল। রেলের ইঞ্জিন ও কোচ ঘুরানোর জন্য লালমনিরহাটের টার্ন টেবিলটি ১৯৯৩ সালে বিকল হয়। ব্রিটিশরা এটির নকশা ও নির্মাণ কৌশল সরিয়ে ফেলায় বাংলাদেশে আর কোনো টার্ন টেবিল নির্মিত হয়নি। দীর্ঘ ৩০ বছর পর লালমনিরহাট রেলওয়ে যন্ত্র প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে টার্ন টেবিলটি নির্মাণ করা হয়েছে।

টার্ন টেবিল না থাকায় ইঞ্জিন ঘোরাতে না পেরে উল্টাভাবে চালকে পেছনে বসে চালাতে হয়, চালক ইঞ্জিনের পেছনের দিকে বসায় আঁকাবাঁকা রেললাইনে চালকদের দেখতে অসুবিধা হয়, এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। তা ছাড়াও একদিকে চলাচলের কারণে ঘর্ষণে ক্ষয় হচ্ছে চাকাগুলো। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনা। তাই এ সমস্যা সমাধানে দেশের এই  প্রথম লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগ নিজ প্রযুক্তিতে স্বল্প খরচে রেলের অব্যবহৃত যন্ত্রাংশ দিয়ে নির্মাণ করেছে  টার্ন টেবিল। এখন শুধু রেললাইন সংযোগের অপেক্ষা।

এটি চালু হলে দেশের মধ্যে হবে এই প্রথম নির্মিত টার্ন টেবিল। বিভাগীয় রেলওয়ে দপ্তরের প্রকৌশলী (ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন) তাসরুজ্জামান বাবু  জানান, দীর্ঘদিন ধরে লালমনিরহাটে টার্ন টেবিল না থাকায় মিটারগেজে চলমান ইঞ্জিন ও কোচ কয়েক মাস পর পর ঢাকার কমলাপুরের টার্ন টেবিলের মাধ্যমে ঘুরিয়ে নিয়ে আসা হতো। এটি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।

২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপকের (পশ্চিম) কার্যালয় থেকে লালমনিরহাটে টার্ন টেবিল নির্মাণের প্রশাসনিক অনুমোদনের চিঠি দেওয়া হয়। যার নির্মাণকাজ চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে, শেষ হয়েছে গত মার্চে। এতে ব্যয় হয়েছে ২৫ লাখ টাকা।
টার্ন টেবিল কেন দরকার এমন প্রশ্নে তিনি জানান, একটি কোচ বা ইঞ্জিনকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর টার্ন টেবিলের ওপর রেখে ঘোরানো হয়। এতে বাঁ দিকের চাকা ডান দিকে, ডান দিকের চাকা বাঁ দিকে চলে যায়। ফলে দুই পাশের চাকা সমানভাবে ক্ষয় হয়। এতে চাকার স্থায়িত্ব বাড়ে। চালক যদি ইঞ্জিনের পেছনে বসেন, তাহলে রেললাইনের সংকেত (সিগন্যাল) দেখতে অসুবিধা হয়। এতে ট্রেনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ের ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আবদুস সালাম বলেন, সম্পূর্ণ দেশি প্রযুক্তিতে স্বল্প সময়ের মধ্যে স্বল্প টাকা ব্যয়ে টার্ন টেবিলটি নির্মিত হয়েছে। এতে অব্যবহৃত লাইন, চাকাসহ অন্য লৌহজাত নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। রেলের কর্মকর্তারা সব সময় নিজেদের মেধা দিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন। এটি তার একটি উদাহরণ।

×