ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

টিকিটের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসাতে চায় এনবিআর

সামর্থ্যরে বাইরে চলে যাবে মেট্রোরেল

ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ

প্রকাশিত: ০০:০৯, ১৮ এপ্রিল ২০২৪

সামর্থ্যরে বাইরে চলে যাবে মেট্রোরেল

মেট্রোরেলের টিকিটে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসানো হলে

মেট্রোরেলের টিকিটে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসানো হলে যাত্রীদের ওপর বাড়তি ভাড়ার চাপ বাড়বে এবং কমে যেতে পারে যাত্রীর সংখ্যা। এ ছাড়া বর্তমানে দৈনিক লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম আয় হচ্ছে। এর ওপর আবার ভ্যাট আরোপ করা হলে লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে পড়বে মেট্রোরেল। ভ্যাট আরোপ করলে স্বল্প আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তের অনেকেরই জন্য মেট্রোরেলের নিয়মিত ব্যবহার সাধ্যের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই মেট্রোরেলে ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি নগর বিশেষজ্ঞদের। 
এ ছাড়া দাতা সংস্থার আর্থিক সহায়তা গৃহীত প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই মেট্রোরেলের ওপর ভ্যাট আরোপ করা অযৌক্তিক বলে মনে করে সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রায় ২৬ বছর আগে চালু হওয়ার মেট্রোরেলে এখনো কর আরোপ করা হয়নি। সেবামূলক গণপরিবহন হিসেবে এ খাতে আরও ভর্তুকি দেয় সরকার। তাই মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ না করার দাবি জানায় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক জনকণ্ঠকে বলেন, ‘মেট্রোরেল আইন ২০১৫ এর ধারা-১৮ এর উপধারা-২ অনুযায়ী সরকার কর্তৃক গঠিত কমিটির মাধ্যমে জনসাধারণের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ভাড়া এই রুটে চলাচলকারী বাস ভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মেট্রোরেলে চলাচল করা সর্বোচ্চ ৩ (তিন) ফিট উচ্চতা সম্পন্ন শিশু বিনা ভাড়ায় অভিভাবকের সঙ্গে মেট্রোরেলে ভ্রমণ করতে পারে। যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধারা পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে বিনা ভাড়ায় মেট্রোরেলে যাতায়াত করতে পারেন। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তি পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে ভাড়ার ওপর ১৫ শতাংশ ছাড় পেয়ে থাকেন এবং এমআরটি বা র‌্যাপিড পাস ব্যবহারকারীগণ ১০ শতাংশ ডিসকাউন্টে মেট্রোরেল ভ্রমণ করতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘মেট্রোরেলে কোনো ক্লাস বা শ্রেণি নেই। সকল যাত্রী একই ভাড়ায় একই সুবিধাতে আসা-যাওয়া করতে পারেন। সবার জন্য মেট্রোরেল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা তাপানুকূল রেলওয়ে সেবার ওপর যে যৌক্তিকতায় মূসক আরোপ করা হয়েছে, সেই যৌক্তিকতায় মেট্রোরেলের সেবার ওপর কোনো ধরনের মূসক প্রযোজ্য নয়। মেট্রোরেলের আংশিক বাণিজ্যিক চলাচল শুরুর পর বিদ্যুতের মূল্য একাধিকবার বৃদ্ধি পেলেও সরকার জনসাধারণের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় মেট্রোরেলের ভাড়া এখনো পর্যন্ত বৃদ্ধি করেনি। এই অবস্থা যদি আবার ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয় তাহলে এটা যাত্রীদের ওপর জুলুম হয়ে যাবে।’ 
আলোচনা ছাড়াই ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে- ডিএমটিসিএল ॥ জানা গেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভ্যাট মওকুফে অপারগতা প্রকাশ করায় আগামী অর্থবছর অর্থাৎ  চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে মেট্রোরেলের টিকিটে ভ্যাট বসছে। গত ৪ এপ্রিল এই আদেশ জারি করেছে এনবিআরের ভ্যাট বিভাগ। ভ্যাট সাধারণত ভোক্তাকেই দিতে হয়, সেজন্য মেট্রোরেলের ভাড়া ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে।

মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর বর্তমানে ভ্যাট মওকুফ আছে, যার সময়সীমা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড অব্যাহতির মেয়াদ শেষে মূল্য সংযোজন কর আরোপ না করার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অনুরোধ করেছিল; কিন্তু এনবিআর এই মওকুফ সুবিধা আর অব্যাহত রাখতে আগ্রহী নয়। 
ভ্যাট বিভাগের আদেশে বলা হয়েছে, রূপকল্প-২০৪১ অনুযায়ী উন্নত দেশের কাতারে যাওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে দেশে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চলছে।

সেজন্য সরকারকে প্রতিনিয়ত অর্থের জোগান দিতে হচ্ছে, যা মূলত আহরিত হচ্ছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মাধ্যমে। দেশীয় শিল্পের বিকাশ, আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশ ইত্যাদি লক্ষ্য সামনে রেখে সময়ে সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে। উন্নয়নের বিপুল কর্মযজ্ঞে অর্থের জোগান অব্যাহত রাখাসহ দেশের এলডিসি উত্তরণ এবং কর-জিডিপি অনুপাত কাক্সিক্ষত মাত্রায় উন্নীত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন খাতের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে প্রদত্ত অব্যাহতি সুবিধা ক্রমান্বয়ে প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

অর্থাৎ অব্যাহতির ক্ষেত্র সংকুচিত করা হচ্ছে। এই বাস্তবতায় মেট্রোরেল সেবার ওপর ২৮ ডিসেম্বর, ২০২২ থেকে ৩০ জুন, ২০২৪ পর্যন্ত যে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, মেয়াদ শেষে তা আবারও অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অপারগতা জানিয়েছে।
উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত আংশিক মেট্রোরেল চালু হয়েছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে। গত বছর থেকে মতিঝিল অংশ পর্যন্ত চলছে মেট্রোরেল। এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পটি উত্তরা থেকে রাজধানীর কমলাপুর পর্যন্ত ২১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে কমলাপুর অংশটি এখনো নির্মাণ কাজ চলছে। বর্তমানে মতিঝিল পর্যন্ত প্রতিদিন কমবেশি আড়াই লাখ যাত্রী পরিবহন করে এই নগর পরিবহন ব্যবস্থা।

২০২৩ সালের শুরু থেকেই মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর ভ্যাট আরোপের উদ্যোগ নেয় এনবিআর। ওই বছরের ২২ জানুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার শওকত আলী সাদী ভ্যাট আরোপের আহ্বান জানিয়ে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডকে (মেট্রোরেল কোম্পানি) চিঠি দেন। পরে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও হয়।

তবে ভ্যাট আরোপ থেকে এনবিআর শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসে। ২০২৩ সালের মে মাসে এনবিআর প্রজ্ঞাপন জারি করে জানায়, ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর ভ্যাট মওকুফ থাকবে। কিন্তু এখন আর তার সীমা বাড়াচ্ছে না এনবিআর।
তবে আলোচনা ছাড়াই ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালন এমএএন ছিদ্দিক। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের জানা মতে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ভ্যাটের বিষয়টি স্থগিত আছে। এরপর যদি ভ্যাট আরোপ করা হয়, তাহলে আমাদে সঙ্গে আলোচনা করা দরকার ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো আলোচনা ছাড়াই গত ৪ এপ্রিল একটি চিঠি দেওয়া হয় আমাদের।’

ভাড়া থেকে সর্বোচ্চ ৬৫ শতাংশ আয় হতে পারে ॥ মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানায়, দ্রুতগামী, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, সময় সাশ্রয়ী, বিদ্যুৎচালিত, পরিবেশবান্ধব ও দূরনিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক প্রযুক্তির স্মার্ট গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরী ও তৎসংলগ্ন পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট নিরসনের জন্য ঢাকায় ছয়টি ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এ জন্য গঠন করা হয় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।

এই কোম্পানি ঢাকা মহানগরী ও তৎসংলগ্ন পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট নিরসনে ও পরিবেশ উন্নয়নে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট গণপরিবহন হিসেবে ফাস্ট ট্রাকভুক্ত ৬টি মেট্রোরেলের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য ২০৩০ পর্যন্ত একটি কর্ম পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-৬, এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের নির্মাণ কাজ চলছে।

এ ছাড়া এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুটের ডিপিপি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। পাশাপাশি এমআরটি লাইন-২ ও এমআরটি লাইন-৪ মেট্রোরেল প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডিজের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার খোঁজা হচ্ছে। তাই এখনো কোনো প্রকল্প পরিপূর্ণভাবে শেষ হয়নি। এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পের মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার অংশ নির্মাণ কাজ লছে। এই পর্যন্ত এই পূর্ত কাজের অগ্রগতি ৩০ দশমিক ০৫ শতাংশ।
বিভিন্ন দেশের মেট্রোরেল পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, শুধু ভাড়ার আয় থেকে লাভজনকভাবে মেট্রোরেল পরিচালনা করা যায় না। মেট্রোরেল পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলো ভাড়া থেকে সর্বোচ্চ ৬৫ শতাংশ আয় করে থাকে। অবশিষ্ট ৩৫ শতাংশ আয় সরকার ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করে থাকে। উন্নত দেশসমূহে ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) ও স্টেশন প্লাজা নির্মাণ করে এই আয়ের সংস্থানও করা হয়ে থাকে। তবে ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো টিওডি এবং স্টেশন প্লাজা নির্মাণের কাজ শুরু করেনি।
পুরো কাজ শেষ হবে ২০২৫ সালে ॥ গত ২৮ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখ উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশ এবং গত ৪ নভেম্বর ২০২৩ তারিখ আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশ প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় এখন শুক্রবার ব্যতীত প্রতিদিন নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী উত্তরা উত্তর হতে মতিঝিল পর্যন্ত ১৩ ঘণ্টা মেট্রোরেল বাণিজ্যিকভাবে চলাচল করছে। প্রত্যুষ থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ৩ মিনিট ৩০ সেকেন্ড হেডওয়েতে ১৮ ঘণ্টা মেট্রোরেল বাণিজ্যিকভাবে চলাচল এখনো শুরু হয়নি।
এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পটির কমলাপুর পর্যন্ত পুরো অংশটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে। প্রকল্পটি এখনো চলমান থাকায় ডিএমটিসিএল পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, এমআরটি লাইন-৬ এর সম্পূর্ণ অংশ পরিপূর্ণভাবে চালু হওয়ার পর মেট্রোরেল পরিচালনাকালে দৈনিক যাত্রার সময় বাবদ প্রায় ৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং যানবাহন অপারেশন ব্যয় বাবদ প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা সাশ্রয় হবে।

এই সাশ্রয়কৃত অর্থ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তাই ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক বাস্তবায়িত হলে ঢাকা মহানগরবাসীর জীবন যাত্রায় ও গতি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু এখনই মেট্রোরেলের ওপর ভ্যাট আরোপ করলে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
ভ্যাট দিতে হলে স্বল্প আয়ের মানুষ মেট্রোরেলে উঠবে না ॥ মেট্রোরেলে ভ্যাট আরোপে এনবিআরের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবী জানিয়েছেন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। জুলাই মাস থেকে মেট্রোরেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক ভ্যাট আরোপের তীব্র বিরোধিতা করে সংস্থা জানায়, এর ফলে মেট্রোরেলে ১৫ শতাংশ ভাড়া বেড়ে যাবে, মেট্রোরেল ব্যবহারকারী ঢাকার স্বল্পবিত্ত ও মধ্যবিত্তের অনেকেরই জন্য মেট্রোরেলের নিয়মিত ব্যবহার সাধ্যের বাইরে চলে যেতে পারে।

×