ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১

বাড়াল দুই দিন ক্ষতি পোষাবে তো?

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ২৩:৪৪, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

বাড়াল দুই দিন ক্ষতি পোষাবে তো?

শেষ পর্যায়ে মেলায় ভিড় বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে বইয়ের বিক্রি

এবার লিপইয়ার। অর্থাৎ, ২৮ দিনের ফেব্রুয়ারি ২৯ দিনে গড়াবে। সঙ্গত কারণে একদিন আয়ু বেশি পেয়েছিল অমর একুশে বইমেলা। সে অনুযায়ী, ২৯ ফেব্রুয়ারি মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল। এমনকি সমাপনী অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র বিতরণের কাজও সেরে রেখেছিল মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি। এখন আমন্ত্রণপত্র ফেরত নেওয়ার অবস্থা হয়েছে। সেটি যেহেতু সম্ভব নয় সেহেতু নতুন করে ছাপানো হচ্ছে! কারণটি ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেছেন, মেলার সময় বাড়ানো হয়েছে আরও ২ দিন।

মঙ্গলবার রাতে তথ্যকেন্দ্রের মাইকে সময় বাড়ানোর এই ঘোষণা দেন একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। ‘ব্রেকিং নিউজ’ হয়ে মুহূর্তেই সে খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্রই। 
আয়োজনের ২৮তম দিনে মেলা ঘুরে দেখা গেছে, সময় বাড়ানোর প্রসঙ্গটি আলোচনায় আসছে ঘুরে ফিরেই। কেন সময় বাড়ানো হলো, এতে কার কী লাভ হবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে দিনভর। ক্ষতি কী হলো সে কথাও বাদ যায়নি। তবে লেখক পাঠক প্রকাশকদের বড় অংশটি খুশি। বিশেষ করে প্রকাশকরা সময় বাড়ানোকে স্বাগত জানিয়েছেন। আরও ভেতরের খবর এই যে, প্রকাশরা নিজেরাই সময় বাড়ানোর জন্য সরকার ঘনিষ্ঠদের কাছে আবেদন নিবেদন করে আসছিলেন। অতঃপর সরকারি সিদ্ধান্তে সময় বাড়ানো হয়।  
কেন দুদিন বাড়াতে হলো মেলা? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, মেলায় মানুষের ভিড় বেশি হলেও, বই বিক্রি সে অনুযায়ী অনেক কম হয়েছে এবার। ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রকাশকরা। শেষদিকে সবাই বই সংগ্রহে মন দেন। তাই তারা শেষ মুহূর্তটাকে আরেকটু লম্বা করার পক্ষে ছিলেন। 
এ প্রসঙ্গে প্রকাশক নেতা ও অন্যপ্রকাশকের কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম বলনে, আমাদের বিক্রি তো খুব খারাপ। সত্যি বলছি। এত দোকানদার মেলায়, প্রকৃত পাঠক তো নিজের পছন্দের স্টল প্যাভিলিয়ন খুঁজেও পাচ্ছে না। অপাঠককে উৎসাহিত করায় তারা এসে ভিড় বাড়িয়েছে শুধু। বই কেনেনি। কিন্তু শেষদিকে বেড়ানোর প্রবণতা কমে যায়। ব্যস্ত হয়ে বই কেনেন পাঠক। তাই শেষ দিকে দুদিন সময় বাড়ানোয় তারাও উপকৃত হবেন। 
বিশেষ করে শেষ দুই দিন ১ ও ২ মার্চ শুক্র ও শনিবার হওয়ায় সবার জন্যই ভালো হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সরাকারি ছুটির দিনে ঢল নামবে মানুষের এবং এই মানুষেরা বই কিনবেন বলেই সবার বিশ্বাস। 
অবশ্য বইমেলার সময় বাড়ানোর বিরোধিতা একেবারে নেই তা নয়। বাংলা একাডেমিও মেলার সময় বাড়ানোর পক্ষে ছিল না বলে জানা যায়। কারণ হিসেবে একাডেমির কর্মকর্তা কর্মচারীরা বলছেন, আমরা ক্লান্ত শ্রান্ত। স্টল প্যাভিলিয়নের কর্মীরাও উদ্যম ধরে রাখতে পারছে না। এ নিয়ে কোনো কোনো স্টল প্যাভিলিয়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। 
বিদগ্ধজনদের একাংশ আবার বলছেন, অমর একুশের বইমেলা এটি। বর্ধিত সময় মেলার বৈশিষ্ট্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাছাড়া বাঙালি নির্দিষ্ট কোনো কাঠামোতে থাকতে চায় না। একই কারণে মেলার সময় সীমার যে কাঠামো সেটি বার বার ভাঙা হচ্ছে। এক মাস সময় অনেক। এর পরও সময় বাড়ানোর মানে, অলসতাকে বিশৃঙ্খলাকে প্রশ্রয় দেয়া বলে মন্তব্য করেছেন তাদের কেউ কেউ। সে যাই হোক, বাড়াল দুই দিন- ক্ষতি পোষাবে তো? এটিই এখন বড় প্রশ্ন। 
৮০ নতুন বই ॥ অমর একুশে বইমেলার ২৮তম দিনে মেলায় এসেছে ৮০টি নতুন বই। মেলার বিভিন্ন দিনে আসা নতুন বইগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ‘মুহম্মদ জাফর ইকবালের স্মৃতি সমগ্র।’ জার্নিম্যান থেকে এসেছে সুলেখক আলমগীর সাত্তারের ‘কিলো ফ্লাইট।’ নিজেই তিনি আলোচিত কিলো ফ্লাইটের সদস্য। ফলে তার লেখা বইটি আলাদা গুরুত্ব দাবি রাখে।

আগামী থেকে এসেছে ‘একাত্তরে রাজশাহী উপশহর গণহত্যা, নির্যাতন ও গণকবর।’ বইয়ের লেখক তালিকায় রয়েছেন মেসবাহ কামাল হারুন অর রশীদ সিদ্দিকী সাপলু, ,শাহীন তন্দ্রা। একই প্রকাশনী থেকে এসেছে ‘আহমদ সফা গরিবের রবীন্দ্রনাথ।’ সলিমুল্লাহ খানের বই। সাংবাদিক খান লিটনের বই ‘জগাখিচুড়ি তিন’ প্রকাশ করেছে পারিজাত।    
মূল মঞ্চের আলোচনা ॥ বিকেল বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ : মুনীর চৌধুরী এবং স্মরণ : হুমায়ুন আজাদ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যথাক্রমে অধ্যাপক ফিরোজা ইয়াসমীন এবং অধ্যাপক হাকিম আরিফ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অধ্যাপক আবদুস সেলিম, অধ্যাপক ইউসুফ হাসান অর্ক, ওসমান গনি এবং মৌলি আজাদ। সভাপতিত্ব করেন নাট্যজন ফেরদৌসী মজুমদার। 
অনুষ্ঠানের শুরুতে কাজী জাহিদুল হক সংকলিত এবং ঐতিহ্য প্রকাশিত ‘মুনীর চৌধুরীর দুষ্প্রাপ্য রচনা’ বই-উন্মোচনে অংশ নেন অনুষ্ঠানের সভাপতি ফেরদৌসী মজুমদার, প্রাবন্ধিকদ্বয়, আলোচকবৃন্দ, বিশিষ্ট নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার এবং গ্রন্থটির সম্পাদক কাজী জাহিদুল হক।  
প্রাবন্ধিকদ্বয় বলেন, মুনীর চৌধুরী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি স্বল্প সময়ের জীবনে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্বীয় নাম স্মরণীয় করে গেছেন। তিনি আজীবন সততা ও সাহসের সঙ্গে বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য ও বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

অন্যদিকে, হুমায়ুন আজাদের অন্যতম বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় হচ্ছে, তিনি একাডেমিক জগতে ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ে আধুনিক ও প্রাগ্রসর ধারণা ও তত্ত্বচিন্তার সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। পেশাগত জীবনে বাংলা ও ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক হওয়ার কারণে ভাষাবিজ্ঞানের তাত্ত্বিকবিশ্বে তাঁর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়েছে পরম পা-িত্য ও অভিনিবেশ সহযোগে।

আলোচকরা বলেন, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মুনীর চৌধুরী শোষিত ও মুক্তিকামী মানুষদের জন্য সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন। আমাদের সামনে তিনি বিপ্লবী জীবনের আদর্শ স্থাপন করে গেছেন। বাংলা ভাষা চর্চা ও গবেষণার আধুনিকায়নে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। অন্যদিকে, বাংলা ভাষার অন্যতম গবেষক হুমায়ুন আজাদ সৃষ্টিশীল ও সাহসী একজন মানুষ ছিলেন। সৃষ্টিশীল লেখক হিসেবে কবিতা, উপন্যাস, শিশুতোষ রচনা, প্রবচন, আত্মজীবনী সবক্ষেত্রেই তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ।

সভাপতির বক্তব্যে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি মুনীর চৌধুরী ও হুমায়ুন আজাদের ভালোবাসা ছিল সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁদের জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে।  
লেখক বলছি ॥ ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন গবেষক, ড. মোহাম্মদ হাননান, কবি তারিক সুজাত, কথাসাহিত্যিক সমীর আহমেদ এবং শিশুসাহিত্যিক আবেদীন জনি। 
বই-সংলাপ ও রিক্সাচিত্র প্রদর্শন মঞ্চের আয়োজন : এই মঞ্চে বিকেল ‘সংস্কৃতি ও সদাচার’ বই নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. মো. হাসান কবীর এবং সম্পাদকীয় পর্ষদের সদস্যরা।   
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ॥ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি প্রদীপ মিত্র, তাহমিনা কোরাইশী, চঞ্চল শাহরিয়ার, হাসান মাহমুদ, আসাদ আহমেদ, মীর রেজাউল কবীর, লোকমান হোসেন পলা, কাজী বর্ণাঢ্য, দীপন দেবনাথ, গোলাম মোর্শেদ চন্দন, কৌমুদী নার্গিস, ফারজানা ইসলাম এবং বোরহান মাসুদ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী জ্যোতি ভট্টাচার্য, মোহাম্মদ সেলিম ভূঁইয়া, মছরুর হোসেন, ফারজানা নি¤িœ এবং সিদ্দিকুর রহমান পারভেজ। এছাড়া ছিল সংগীত ও নৃত্যায়োজন।

×