ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১

পাবনা-১ আসন

দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর প্রচারে ভোটের মাঠ উত্তপ্ত

হারুনার রশিদ, বেড়া

প্রকাশিত: ০০:৪১, ৪ জানুয়ারি ২০২৪

দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর প্রচারে ভোটের মাঠ উত্তপ্ত

শামসুল হক টুকু, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ

পাবনা-১ সাঁথিয়া-বেড়ার (আংশিক) আসনের আওয়ামী লীগ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক ও নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রচারে বাধা, সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, হামলা-মামলায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রতীক বরাদ্দের পর শুরুতে ভোটের মাঠ কিছুটা শান্ত থাকলেও সময়ের ব্যবধানে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনই হানাহানিতে লিপ্ত হচ্ছেন প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর কর্মী-সমর্থকরা। তবে প্রশাসন বলছে, নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখতে সার্বক্ষণিক তারা মাঠে কাজ করছে।
জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত এই আসনটিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াই হবে আওয়ামী লীগের (নৌকা) প্রার্থী ডেপুটি স্পিকার ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু এবং ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সংবিধান প্রণেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদের মধ্যে। সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আবু সাইয়িদ বর্তমানে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি। তিনি সংস্কারপন্থি হিসেবে দল থেকে ছিটকে পড়লেও সাঁথিয়া ও বেড়ায় আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী এখনো তার অনুসারী। আবার প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর বাড়িও একই গ্রামে, বেড়া উপজেলার বৃশালিখা।
প্রতীক বরাদ্দের পর প্রায় দিনই সংঘর্ষে জড়িয়েছে প্রধান এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর কর্মী-সমর্থকরা। প্রথমদিকে অধ্যাপক আবু সাইয়িদের লোকজন হামলা-বাধায় কোণঠাসা থাকলেও দিন দিন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। গত ১৮ ডিসেম্বর সাঁথিয়ার বোয়ালমারী বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু সাইয়িদ গণসংযোগে গেলে আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা প্রায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে ইউএনও পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। সর্বশেষ গত শুক্রবারও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে উভয়পক্ষের লোকজন।

এতে উভয়পক্ষের ২০ নেতাকর্মী আহত হয়। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে তিনটি। এর আগে প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকে দুপক্ষ ১০ বারেরও বেশি মুখোমুখি হয়েছে। তবে বেশিরভাগ সময়ই অধ্যাপক আবু সাইয়িদের সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে নৌকার সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও শামসুল হক টুকুর ছেলে বেড়া পৌর মেয়র আসিফ শামস্ রঞ্জন বিভিন্ন জনসভায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের হুমকি-ধমকি মূলক বক্তব্য এবং ৭ তারিখের পর সবাইকে দেখে নেবেন বলে হুমকি দিচ্ছেন যাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গত রবিবার দুপুরে পাবনা প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে নির্বাচনী এজেন্টদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার অভিযোগ করে, প্রতিবাদ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। 
সাঁথিয়া উপজেলা এবং বেড়া উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত পাবনা-১ আসন থেকে ১৯৭০, ১৯৭৩ ও সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আবু সাইয়িদ। ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত হয়ে তিনি তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আবু সাইয়িদকে বাদ দিয়ে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক টুকুকে নৌকার প্রার্থী করা হয়। সেই নির্বাচনে টুকু জয়ী হয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

পরে দশম জাতীয় নির্বাচনেও আবু সাইয়িদকে বাদ দিয়ে এ আসনের নৌকার মাঝি করা হয় টুকুকে। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবু সাইয়িদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালে গণফোরাম থেকে মনোনীত হয়ে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হন। আর শামসুল হক টুকু ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে এ আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়ে ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া এই আসন থেকে ১৯৯১ সাল ও ২০০১ সালে জামায়াতের শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

দলছুট হলেও সাঁথিয়া ও বেড়ায় আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী এখনো আবু সাইয়িদের অনুসারী। এমনকি তার পক্ষে প্রচারে নেমেছেন নৌকার প্রার্থী শামসুল হক টুকুর ছোট ভাই বেড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র আব্দুল বাতেন। এ ছাড়া সাইয়িদের পক্ষে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ফজলুর রহমান মাসুদ, বেড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রশিদ দুলাল, সাঁথিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ দেলোয়ার, সাঁথিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র মিরাজুল ইসলাম প্রামাণিকসহ অনেকে।
আর শামসুল হক টুকুর পক্ষে কাজ করছেন তার ছেলে বেড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র আসিফ শামস্ রঞ্জন, সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক আবু সাঈদ, বেড়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল মান্নান, সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, সাঁথিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসান আলী খান, সাঁথিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র মাহবুবুল আলম বাচ্চু, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সোহেল রানা খোকন, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আশরাফুজ্জামান টুটুল, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান উকিলসহ অনেকেই।
সরেজমিন দেখা গেছে, নির্বাচনী এলাকায় নৌকা, ট্রাক, লাঙ্গল আর সোনালি আঁশের পক্ষে পোস্টার ঝোলানো হয়েছে। ভোট চেয়ে মাইকিং করা হচ্ছে নৌকা, ট্রাকের। অন্য প্রার্থীদের নেই কোনো পোস্টার, মাইক। বাকি চারজন প্রার্থীকে কেউই চেনেন না। নৌকা আর ট্রাক ছাড়া অন্য কারও পোস্টারও চোখে পড়েনি। সাধারণ ভোটারেরা বলছেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে দুই হেভিওয়েট নৌকা আর ট্রাকের প্রার্থীর মধ্যে। নৌকা সমর্থকেরা প্রথম থেকেই বলে আসছে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকেরা বলছেন অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ট্রাকের বিজয় নিশ্চিত। সাধারণ ভোটাররা বলছেন প্রশাসন সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।
বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেন,  প্রচারে শুরু থেকেই আমাদের ওপর একের পর এক হামলা করা হচ্ছে। আমরা যেখানে যাচ্ছি, সেখানেই সন্ত্রাসী বাহিনী আক্রমণ করছে। এ পর্যন্ত পুলিশ, নির্বাচন কমিশনের কাছে আমি অন্তত দেড় ডজন অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না। আমাদের ওপর হামলা হচ্ছে, আবার আমাদের নেতাকর্মীদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এটা নির্বাচনী পরিবেশ? যদি এমন পরিবেশ থাকে, তাহলে নির্বাচন ভ-ুল হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি।’
তবে উল্টা অভিযোগ করে নৌকার প্রার্থী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বলেন, ‘আমি কাজ করছি ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিত করার জন্য, নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার জন্য। আর আরেক প্রার্থী (সাইয়িদ) নির্বাচনে এসেছেন নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য। গত শুক্রবার আমাদের মিছিলে আক্রমণ করেছে। তারা এখানে উত্তপ্ত-উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়।

কিন্তু আমি আমার নেতাকর্মীদের বলেছি, শান্তশিষ্টভাবে নির্বাচনের নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখতে। সাইয়িদ ঘোষণা দিয়েছেন বেড়া দখল করেছি, এবার সাঁথিয়া দখল করব। কিন্তু পাবনা-১ আসনের জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখবে। এই এলাকার মানুষ নৌকা ছাড়া আর কাউকে বোঝে না।’
নির্বাচনী পরিবেশের বিষয়ে পাবনা-১ আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মোসা. আলপনা ইয়াসমিন বলেন, ‘নির্বাচনী পরিবেশ বজায় আছে। যখন উনারা (স্বতন্ত্র প্রার্থী) বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন, সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ যাচ্ছে এবং আচরণবিধির জন্য আমাদের যে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা আছে, উনিও যাচ্ছেন। এখন তো বিজিবি নেমেছে মাঠে, এরপর আর্মি আসবে। উনি যখন প্রয়োজন মনে করছেন, আমাদের বললেই আমরা উনাকে হেল্প করছি।’
জেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকে জানা গেছে, পাবনা-১ আসনে এবার মোট প্রার্থী ছয়জন। আওয়ামী লীগের শামসুল হক টুকু ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ছাড়াও এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টির সরদার শাহজাহান, তৃণমূল বিএনপির জয়নাল আবেদীন, জাকের পার্টির মকবুল হোসেন ও এনপিপির শামসুল হক। বেড়া অংশে সোয়া এক লাখ আর সাঁথিয়ায় ভোটার সোয়া তিন লাখ। আসনটিতে মোট ভোটার চার লাখ ৩১ হাজার ৬২০ জন।

×