ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

মাদারীপুর জেলা

আওয়ামী লীগকে আসন ধরে রাখতে বেগ পেতে হবে না

সুবল বিশ্বাস, মাদারীপুর ও জাফরুল হাসান, কালকিনি

প্রকাশিত: ০০:১৫, ১২ ডিসেম্বর ২০২৩

আওয়ামী লীগকে আসন ধরে রাখতে বেগ পেতে হবে না

পদ্মা  সেতুর দক্ষিণপাড়ের জেলা মাদারীপুর

পদ্মা  সেতুর দক্ষিণপাড়ের জেলা মাদারীপুর। এ জেলায় সংসদীয় আসন তিনটি। আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকখ্যাত সব কয়টি আসনই দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দখলে রয়েছে। এবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনটি আসনে আওয়ামী লীগের তিন হেভিওয়েট প্রার্থীসহ বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র মিলে ১৫ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মারুফুর রশিদ খান। আওয়ামী লীগ সরকারের স্বপ্নের পদ্মা সেতুসহ বহুমাত্রিক উন্নয়নে সংসদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন, তাতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন তিনটি ধরে রাখতে তেমন একটা বেগ পেতে হবে না।

তবে মাদারীপুর-৩ আসনে নৌকার পাশাপাশি আটজন প্রার্থীর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন শক্ত অবস্থানে। ইতোমধ্যে নানা ঘটনার জন্ম দিয়েছেন আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে উভয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে। 
নৌকার প্রার্থী ও বর্তমান এমপি আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপ সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও কালকিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর স্বতন্ত্র প্রার্থী মোসা. তাহমিনা বেগমের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের লিখিত অভিযোগ করেন ২ ডিসেম্বর। এর আগে ৩০ নভেম্বর নৌকার প্রার্থী আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ করেন স্বতন্ত্র দুই প্রার্থী মোসা. তাহমিনা বেগম ও মো. তৌফিকুজ্জামান। অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির প্রধান যুগ্ম জেলা জজ আদালতের বিচারক মো. শরিফুল হক অভিযুক্ত ও অভিযোগকারীদের সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে জবাব দিতে বলেন। 
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে; ততই নির্বাচনী আমেজ ও উৎসব আনন্দ লক্ষ্য করা যাচ্ছে সর্বত্র। শহর থেকে শুরু করে অজো পাড়াগাঁওয়ের হাটে-মাঠে-ঘাটে এখন শুধু নির্বাচনী আলোচনা-সমালোচনা চলছে। গ্রামগঞ্জের হাট-বাজারে, পথ-ঘাটের চায়ের দোকান, বাসস্ট্যান্ডে, পরিবহনে, রিক্সা স্ট্যান্ডে, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ সর্বত্রই শুধু নির্বাচনী আলোচনা। সব জায়গায় ভোটাররা চুলচেরা বিশ্লেষণে সময় পার করছেন। তবে এখনো কোনো প্রার্থীর কর্মী-সমর্থক কেউ মাঠে নামেনি। ১৮ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পরে তারা জোরেশোরে প্রার্থীর পক্ষে আদাজল খেয়ে মাঠে নামবেন। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি ভোট প্রার্থনা করবেন। সকল প্রার্থীই চাইবেন শতভাগ ভোটারের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে। 
মাদারীপুর-১ (শিবচর) ॥ আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এই আসনে বরাবরই আওয়ামী লীগের একক অবস্থান এবং বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে করেন নেতাকর্মীরা। আসনটি শিবচর উপজেলার ১৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এই আসনে প্রার্থী রয়েছেন চারজন। এরা হলেন আওয়ামী লীগের নূর-ই-আলম চৌধুরী, তরিকত ফেডারেশনের মো. তোফাজ্জেল হোসেন খান, জাকের পার্টির মো. মাসুদ শিকদার ও জাতীয় পার্টির (জাপা) মো. মোতাহার হোসেন সিদ্দিক।

আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী হেভিওয়েট প্রার্থী। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাত ভাই মরহুম ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরীর বড় ছেলে। তিনি এই আসন থেকে একটানা ছয়বার নির্বাচিত এমপি। তিনি তার কর্মকা-ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছেন। শিবচর পৌরসভা ও ইউপি চেয়ারম্যানদের পরিসংখ্যানে এটি আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকা। এ আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য নূর-ই-আলম চৌধুরীর এমপি নির্বাচিত হওয়া শতভাগ নিশ্চিত। তিনিই এই নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী।
অন্যদিকে তরিকত ফেডারেশনের মো. তোফাজ্জেল হোসেন খান, জাকের পার্টির মো. মাসুদ শিকদার ও জাপার মো. মোতাহার হোসেন সিদ্দিক ১৮ ডিসেম্বর প্রতীক পেয়ে নির্বাচনী মাঠে নামবেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
মাদারীপুর-২ ॥ এই আসনটিও আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত। এই আসনে বরাবরই আওয়ামী লীগের একক অবস্থান এবং বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী। আসনটি রাজৈর উপজেলার ১১টি ও সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নসহ ২১টি ইউনিয়ন এবং দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত।

জেলার তিনটি সংসদীয় আসনের মধ্যে এই আসনটি সবচেয়ে বড় এবং ভোটার সংখ্যা বেশি। এই আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন পাঁচজন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান এমপি শাজাহান খান, জাকের পার্টির মো. আসাদুজ্জামান আকন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির ইউসুফ আলী সুমন, জাপার একেএম নূরুজ্জামান ও বাংলাদেশ কংগ্রেস থেকে সুবল চন্দ্র মজুমদার। যাচাই-বাছাইয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির ইউসুফ আলী সুমন ও জাপার নূরুজ্জামানের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। তবে প্রার্থিতা ফিরে পেতে তারা আপিল করেছেন।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনা সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখা এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে আবারও বিজয়ী করতে চান ভোটাররা। এ আসন থেকে শাজাহান খান সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি পরপর দুবার মন্ত্রী ছিলেন। তিনি সব সময়ই নিয়মিতভাবে মাদারীপুরে আসেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিসহ সকল পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। স্থানীয় নেতাকর্মীসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে রয়েছে তার সুসম্পর্ক। মাদারীপুরের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। সংসদীয় এলাকায় বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের উন্নয়ন দৃশ্যমান। এছাড়াও শাজাহান খানের রয়েছে শ্রমিক সংঠনের আকুণ্ঠ সমর্থন। এসব কারণে মনোনয়ন পেতে তাকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। 
মাদারীপুর-৩ ॥ সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন, কালকিনি উপজেলার ১০টি ও নবগঠিত ডাসার উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন ও কালকিনি পৌরসভা নিয়ে মাদারীপুর-৩ আসন। এই আসনটিও আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। এ আসনে নৌকার টিকিট পেলেই জয়- এমনটাই রেওয়াজ রয়েছে। সংসদ সদস্য হিসেবে জনপ্রিয়তার কারণে চারবার নির্বাচিত হয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। তিনি ১৯৯১ সাল থেকে টানা চার দফায় নির্বাচিত হয়ে একবার প্রতিমন্ত্রী ও দুবার পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এমপি-মন্ত্রী থাকাকালে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছিলেন ডাসার উপজেলার রূপকার।
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বর্তমান এমপি মো. আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপকে মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড। এ ছাড়াও স্বতন্ত্র দুজন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আরও পাঁচজন প্রার্থীসহ আট প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন এবং যাচাই বাছাইয়ে আট প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক। এরা হলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান এমপি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী এবং কেন্দ্রীয় প্রচার-প্রকাশনা সম্পাদক মো. আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপ, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রার্থী সংগীত শিল্পী নকুল কুমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির নিতাই চক্রবর্তী, তৃণমূল বিএনপির প্রবীণ হালদার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের শিক্ষক (অব) বর্তমান সংরক্ষিত আসনের এমপি স্বতন্ত্র প্রার্থী মোসা. তাহমিনা বেগম, জাপার মোহাম্মদ আব্দুল খালেক, জাকের পার্টির মোহাম্মাদ ইকবাল হোসেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কালকিনি উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মো. তৌফিকুজ্জামান।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সারাদেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্রিজ, রাস্তা ও কালভার্টসহ সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমাদানের পরে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাল্টপাল্টি অভিযোগ দায়ের করেন।

×