ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

টাঙ্গাইল জেলা

নির্বাচনে সিদ্দিকী পরিবারের ৩ ভাই, উৎফুল্ল সমর্থকরা

ইফতেখারুল অনুপম, টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ০০:৩১, ৫ ডিসেম্বর ২০২৩

নির্বাচনে সিদ্দিকী পরিবারের ৩ ভাই, উৎফুল্ল সমর্থকরা

 লতিফ সিদ্দিকী, কাদের সিদ্দিকী ও মুরাদ সিদ্দিকী

টাঙ্গাইলের প্রভাবশালী সিদ্দিকী পরিবারের তিন ভাই এবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আলোচনায় রয়েছেন। এই পরিবারের দুই সন্তান জাতীয় রাজনীতির হেভিওয়েট প্রার্থী আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী (বীরউত্তম) গত নির্বাচনে অংশ নেননি। এবার টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী (বীরউত্তম)।

এ ছাড়া তাদের ছোট ভাই মুরাদ সিদ্দিকী টাঙ্গাইল-৫ (সদর) ও টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের যে কোনো একটি আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তিনি এই দুটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। যাচাই-বাছাই শেষে তিন ভাইয়ের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। এতে করে তিন ভাইয়ের কর্মী-সমর্থকরা বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে।
একসময় টাঙ্গাইলে সিদ্দিকী পরিবারের ব্যাপক আধিপত্য ছিল। টাঙ্গাইলের রাজনীতি ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মন্তব্য করে বিগত ১৯৯৯ সালে দল ছেড়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। এরপর হজ ও তবলিগ নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন লতিফ সিদ্দিকী। হারান মন্ত্রীত্বও। তাদের ছোট ভাই মুরাদ সিদ্দিকীও কয়েকবার টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন। এরপর থেকেই সিদ্দিকী পরিবার রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। 
গত ২৩ ডিসেম্বর কাদের সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে স্বপরিবারে গণভবনে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন। তারপর থেকেই রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে যাচ্ছেন। পাল্টে যায় টাঙ্গাইলের রাজনৈতিক দৃশ্যপটও। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে বক্তব্য দেন। ফলে তিনি আবারও দলীয় মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তৃণমূল আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীরা তাঁকে দলে নেওয়ারও দাবি জানান।

প্রধানমন্ত্রী যে তাদের দুই ভাইয়ের প্রতি নমনীয় হয়েছেন তা বিভিন্ন বক্তব্য ও বিবৃতিতে বুঝিয়েছেন। এবার কালিহাতী-৪ ও সখীপুর-বাসাইল-৮ আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্যরা মনোনয়ন পাননি। কালিহাতী-৪ আসনে লতিফ সিদ্দিকী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ও সখীপুর-বাসাইল-৮ আসনে কাদের সিদ্দিকী সহজেই জয় পাবেন এমনটাই প্রত্যাশা করছেন তাদের সমর্থিত নেতাকর্মিরা। সংসদ নির্বাচনের স্বার্থে এবার দুই ভাই সংসদে যাবেন এমনটাই আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়েছেন আওয়ামী লীগের সমর্থকরা। 
কাদের সিদ্দিকী ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে টাঙ্গাইল-৮ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ হয়। পরে তিনি পদত্যাগ করে উপনির্বাচনে অংশ নেন। বহুল আলোচিত সেই নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। পরে তিনি কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করেন। এই দলের প্রার্থী হিসেবে ২০০১ সালে কাদের সিদ্দিকী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে লতিফ সিদ্দিকী টাঙ্গাইল-৪ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সাতবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

বিগত ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একটি অনুষ্ঠানে হজ, তবলিগ জামাত ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। এজন্য তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার ও মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়। সংসদ থেকেও তিনি পদত্যাগ করেন। গত সেপ্টেম্বরে তিনি কালিহাতীতে আনুষ্ঠানিক গণসংযোগ শুরু করেন। তাঁর কর্মসূচিতে কাদের সিদ্দিকীসহ পরিবারের সবাই-সহায়তা করলেও ছোট ভাই মুরাদ সিদ্দিকী বিরোধিতায় নামেন। ছোট ভাই মুরাদ সিদ্দিকী টাঙ্গাইল-৪ ও টাঙ্গাইল-৫ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। মনোনয়ন না পেয়ে দুই আসনেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর বহিষ্কৃত সদস্য এবং সাবেক পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, ১৯৭৩, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মন্ত্রিত্ব পান আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েই এমপি নির্বাচিত হন তিনি। সর্বশেষ ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লতিফ সিদ্দিকী টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় তাঁর গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে তিনি অবস্থান ধর্মঘট করেন।

পরে নির্বাচন থেকে সরে যান। এ ঘটনার পর থেকে কালিহাতীতে তিনি নিস্ক্রিয় ছিলেন। প্রায় পাঁচ বছর পর তিনি কালিহাতীতে গণসংযোগ করেছেন। এ বিষয়ে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সৈনিক। আমি আওয়ামী লীগার। বিএনপি ঘোষণা দিয়েছে, তারা শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করবে। আমি মনে করি এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা আমার দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই আমি নির্বাচনে এসেছি। 
মুক্তিযুদ্ধে কাদেরীয়া বাহিনীর প্রধান ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। তিনি টাঙ্গাইল-৮ আসন থেকে দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন। তবে ইতোপূর্বে ১৯৯৬ সালে কাদের সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সখীপুর ও বাসাইল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৯ সালে দল থেকে বেরিয়ে উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রয়াত শওকত মোমেন শাহজাহানের কাছে পরাজিত হন। বিগত ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনেও ওই আসন থেকেই পুনরায় নির্বাচিত হন শওকত মোমেন শাহজাহান। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে কালিহাতী আসন থেকেও কাদের সিদ্দিকী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন তার বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী আর বিএনপির প্রার্থী ছিলেন শাহজাহান সিরাজ। তবে সিদ্দিকী পরিবারের ওই দুই ভাইকে এ নির্বাচনে পরাজিত করে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক শাজাহান সিরাজ নির্বাচিত হয়ে জোট সরকারের মন্ত্রিত্ব পান। গত তিনটি নির্বাচনে ঋণ খেলাপির কারণে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়ন বাতিল হয়। বিগত ২০১৮ সালে এ আসন থেকে তাঁর মেয়ে কুঁড়ি সিদ্দিকী বিএনপি জোটের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে হেরে যান।  
এ বিষয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীকে সাথে নিয়ে মনোনয়ন পত্র জমা দিয়ে নির্বাচনের মাঠে রয়েছি। কালিহাতীতে আমার কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ লতিফ সিদ্দিকীকে সমর্থন দিবে। প্রধানমন্ত্রী কথা দিয়েছেন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট হবে। এবার ভোট ডাকাতি হবে না। তাই আশা করছি লতিফ ভাই অবশ্যই জয়ী হবে। এ ছাড়া নিজ আসন নিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন অনুপম শাহজাহান জয়। আমি তার বাবার সাথে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করেছি। কোন প্রার্থীর ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই।   
বড় ভাই বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের মনোনীত প্রার্থী হয়ে ২০০১ ও ২০০৮ সালে টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরেছিলেন। আবার ২০১৪ সালে আয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে সামান্য ভোটে পরাজিত হন। অভিযোগ রয়েছে ওই নির্বাচনে কারচুপি করে মুরাদ সিদ্দিকীকে হারানো হয়েছিল। এরপর থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদানের চেষ্টা করছেন। সখ্যতা বাড়িয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গী। 
গত বছর মুরাদ সিদ্দিকী তার কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে যোগদান করেন। মুরাদ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগে পদ পাচ্ছেন এ নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নেতাকর্মীরা উৎসাহ-উদ্দীপনায়। কিন্তু চলতি বছরে আগস্ট মাসে জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। সেখানে মুরাদ সিদ্দিকী স্থান পাননি। এরপর তার কর্মী সমর্থকরা হতাশ হয়ে পড়েন। এদিকে তিনি নির্বাচনকে ঘিরে সভা, সমাবেশ, উঠান বৈঠক ও জনসভা করেন। দলীয় হাইকমান্ডের ইচ্ছায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম তোলেন। কিন্তু মনোনয়ন বঞ্চিত হন। 
এসব বিষয়ে মুরাদ সিদ্দিকী বলেন, আমি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছি। আমি আওয়ামী লীগের বাইরের কেউ নেই। দল থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলাম। আবার দলীয় হাইকমান্ডের ইচ্ছায় দুটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। দলীয় হাইকমান্ডের ইচ্ছায় যে কোনো একটি আসনে নির্বাচন করব।

×