ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২০ মে ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

জড়িত বন বিভাগ ও কোস্ট গার্ডের অসাধু কর্মকর্তারা

সুন্দরবনের গহিনে খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকার

তপন বিশ্বাস, খুলনা থেকে ফিরে

প্রকাশিত: ২৩:৪৩, ২ অক্টোবর ২০২৩

সুন্দরবনের গহিনে খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকার

সুন্দরবনে খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার দিন দিন বাড়ছে

সুন্দরবনে খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার দিন দিন বাড়ছে। বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অসাধু জেলেরা। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অভিযোগ আছে, প্রশাসনের ছত্রছায়ায় অবাধে চলছে বিষ দিয়ে মাছ শিকার। একই সঙ্গে উজাড় হয়ে যাচ্ছে সুন্দরবন। বন বিভাগ এবং কোস্ট গার্ডের উদাসীনতায় পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের জীববৈবিত্র্য হুমকির মুখে। এভাবে বিষ দিয়ে মাছ শিকার অব্যাহত থাকলে এক সময় সুন্দরবন মৎস্যশূন্য হয়ে পড়বে এবং জীববৈচিত্র্যসহ উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।

জেলেরা সুন্দরবনের খালে জোয়ারের সময় চিড়া, ভাত বা অন্য কিছুর সঙ্গে কীটনাশক, বিষ ইত্যাদি মিশিয়ে খালের পানিতে ছিটিয়ে দেয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিভিন্ন ধরনের মাছ পানিতে ভেসে ওঠে। জেলেরা ওই মাছ ধরে স্থানীয় আড়তসহ বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করে। এই বিষ মিশ্রিত পানি পান করে মারা পড়ছে হরিণ, বানর, শূকরসহ বিভিন্ন প্রাণী। পানি থেকে বিষ গাছের পাতায়ও পৌঁছে যাচ্ছে। সেই পাতা খেয়ে হরিণের গায়ে বসন্তের মতো ফোঁসকা পড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, এক শ্রেণির অসাধুু বনরক্ষীদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে জেলেরা খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করছে।

এ জন্য বন বিভাগকে  ট্রলারপ্রতি ১০ হাজার এবং নৌকাপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা  দিতে হয় তাদের। কোস্ট গার্ডকে দিতে হয়ে এর দ্বিগুণ পরিমাণ টাকা। কোস্ট গার্ড ও বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে তারা অভয়ারণ্যের খালে বিষ দিয়ে অল্প সময়ে বেশি মাছ শিকার করে। এ ছাড়া জেলেদের শিকার করা মাছ নিরাপদে লোকালয়ে পৌঁছাতেও টাকা দিতে হয় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। মাঝে মধ্যে দুই-একজন ধরা পড়লেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধচক্রটি দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ আছে, বন বিভাগ ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির ছত্রছায়ায় কিছু জেলে এ জাতীয় কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় চলেছে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের কার্যক্রম। বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়েও কাজের কাজ হচ্ছে না।
সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী উপজেলার ইয়াসিন, কামাল, আল আমিন এবং বন বিভাগের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন মৎস্য আড়তদার, দাদনদাতা এমনকি সংবাদকর্মীদের ছত্রছায়ায় অসাধু জেলেরা সুন্দরবনে প্রবেশ করে। তাদের সঙ্গে আছে এক শ্রেণির কীটনাশক বিক্রেতা। চক্রের লোকজন ওই বিক্রেতাদের কাছ থেকে অবাধে কীটনাশক সংগ্রহ করে তা মাছ ধরার কাজে অপব্যবহার করছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে বন বিভাগের কিছু অসাধু বনরক্ষী ও কর্মকর্তা উৎকোচের বিনিময়ে এসব দেখেও না দেখার ভান করে। ফসলের পোকা দমনে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক দিয়ে এসব মাছ শিকার করা হয়। এর মধ্যে ডায়মগ্রো, ফাইটার, রিপকর্ড এবং পেসিকল নামক কীটনাশকই বেশি ব্যবহার হয়।
স্থানীয়রা জানান, সুন্দরবনের কয়রা অংশের তেঁতুলতলার চর, ৬নং কয়রা, ৪নং কয়রা, জোড়সিং, নীলকোমল, মোংলার ঢাংমারী, মরাপশুর, জোংড়া, ঝাপসি, ভদ্রা, নীল কমল, হরিণটানা, কোপিলমুনী, হারবাড়িয়া, শরণখোলা, বটিয়াঘাটা, শ্যামনগর, আশাশুনির বহু জেলে বিষ দিয়ে মাছ ধরছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এ সময় বনের নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরার পাশাপাশি পর্যটক প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। এই নিষেধাজ্ঞা চলাকালে সুন্দরবনে খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে দুই মাসে ১১৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সময় ১২৪ জেলেকে আটক করা হয়েছে।
এ সময় সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে অবৈধ প্রবেশের দায়ে ২৭টি পিওআর মামলা, ৩৪টি ইউডিওআর মামলা ও একটি সিওআর মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সময় ২৩ জন আসামিকে আটক করা হয়। এ ছাড়া একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার, ৬৩টি নৌকা, চারটি মোটরসাইকেল, ১৬ কেজি হরিণের মাংস, ৬৩৯ কেজি চিংড়ি/সাদা মাছ, ৩৫ কেজি শুঁটকি চিংড়ি, ১৯০ কেজি, কাঁকড়া, ৬০০টি হরিণ ধরা ফাঁদ ও ১৪টি বিষের বোতল জব্দ করা হয়।
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে গত দুই মাসে আটটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার, ১৩০টি নৌকা এবং অবৈধ কাঁকড়া পরিবহনকালে একটি পিকআপ ভ্যান জব্দ করা হয়েছে। এ সময় ১০১ জনকে আটক করা হয়েছে। সাতটি পিওআর মামলা, ৩১টি ইউডিওআর মামলা এবং ১৬টি সিওআর মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে অবৈধ ভেসালি জাল, নিষিদ্ধ কীটনাশক, হরিণের মাংস ও হরিণ ধরার ফাঁদ, শুঁটকি চিংড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম। 
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মূলত যে সব জেলে বন বিভাগ ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টাকা না দিয়ে মাছ শিকার করতে যায়, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আর যারা টাকা দেয় তাদের কোনো রকম সমস্যায় পড়তে হয় না। বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত টহল দিলেও তারা তাদের চোখে পড়ে না। অথচ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এরা সুন্দরবন এলাকায় ইচ্ছামতো ঘোরাফেরা করতে পারে।
পশ্চিম সুন্দরবনের কাশিয়াবাদ স্টেশন কর্মকর্তা শ্যামা প্রসাদ রায় বলেন, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মহাজন নামধারী কতিপয় লোক প্রতি বছর নিষেধাজ্ঞার সময় বনের খালে মাছ শিকারের চেষ্টা করে। এলাকার জেলেদের দাদনের ফাঁদে ফেলে বিষ দিয়ে মাছ শিকারে ইন্ধন দেয় তারা। 
আবার কেউ কেউ জেলেদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে সংরক্ষিত বনের খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকার ও পাচারে সুযোগ করে দেয়। তারা বনরক্ষীদের টহলের গতিবিধি লক্ষ্য করে জেলেদের সতর্ক করে দেয়। তিনি বলেন,  বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ বলেন, বিষ দিয়ে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণে বন বিভাগের পাশাপাশি আমরাও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। চারদিনে বিষ দিয়ে ধরা ৩৮০ কেজি চিংড়ি জব্দ করা হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত চারজনকে আটক করা হয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, বিষ প্রয়োগ করলে ছোট-বড় সব ধরনের মাছই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছের পোনা মারা যায়। এ ছাড়া বিষ মিশ্রিত পানি ভাটার টানে যখন গভীর সমুদ্রের দিকে যায়, তখন সেই এলাকার জলজপ্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া আশপাশের মাটিতে মিশে বিষের প্রভাব দীর্ঘ সময় থাকে। ফলে জলজপ্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দিন দিন জলজপ্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পাখি ও বড় যে প্রাণী আছে, যারা এসব মাছ খেয়ে বাঁচে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মাছ, পাখি এবং মাছের ওপর নির্ভরশীল অন্য প্রাণীদের জীবনচক্রেও পরিবর্তন আসছে।
সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার প্রসঙ্গে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার বলেন, আমরা প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের জনবলের অভাব আছে। সরকারের পাশাপাশি সুন্দরবন রক্ষায় জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।

×