ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

ঐতিহ্যের ধারক-বাহক দাঁড়িয়াবান্ধা

-

প্রকাশিত: ০১:৪৮, ৯ জুন ২০২৩

ঐতিহ্যের ধারক-বাহক দাঁড়িয়াবান্ধা

ঐতিহ্যবাহী দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা এখন কালেভদ্রে চোখে পড়ে গ্রামাঞ্চলে

ইট-পাথরের বাহিরে গ্রামীণ সহজ সরল ও সাদামাটা জীবনযাপনের দিনগুলোয় ফিরে গেলে দেখা যায়, তা ছিল নির্মল আনন্দের। এ দেশে প্রতিটা গ্রামের চিত্র ছিল প্রায় একই রকমের। সবুজের সমারোহ, পাখির কলতানে ভরা, বিস্তীর্ণ মাঠ, নদীর সঙ্গে গভীর মিতালি- এসবই ছিল সাধারণ চিত্র। বাড়ির উঠান ও মাঠের দিকে তাকালেই ছেলে-মেয়েদের গ্রামীণ খেলাধুলার চিত্র চোখে পড়ত। বিদেশী খেলার দাপট এতটা ছিল না।
এই যেমন- কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা। গ্রামগঞ্জে জাতীয় খেলা হা-ডু-ডুর পাশাপাশি দাঁড়িয়াবান্ধা সকল বয়সী ছেলে-মেয়ের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিল। দাঁড়িয়াবান্ধা ছাড়াও সেসময় গ্রামের কিশোর কিশোরীরা কানামাছি, গোল্লাছুট, ইচিংবিচিং, আতাপাতা, বৌছি, মোরগলড়াই, গোশত চুরি, ডাঙ্গুলি, ধাপ্পা, কুতকুতসহ অনেক খেলায় মেতে থাকত। যারা গ্রামে বড় হয়েছেন তারা এ ধরনের খেলাধুলা বিষয়ে অবগত আছেন। 
অঞ্চল ভেদে দাঁড়িয়াবান্ধা খেলাকে গাদল, বদন, চিবিক, চিড়া-দই-মুড়ি বা গদিখেলা নামে পরিচিত। দাঁড়িয়াবান্ধা কেবল অল্প বয়েসী ছেলে-মেয়েরাই নয় এতে অংশ নিতে পারেন বড়রাও। দাঁড়িয়াবান্ধা খেলায় ছকবাধা ঘর এর আসল বৈশিষ্ট্য। খেলা হয় দুটি দলের মধ্যে। প্রতিটা দলে ৪/৫ থেকে শুরু করে ৮/১০ জন পর্যন্ত খেলোয়াড় থাকে। খেলা শুরু হওয়ার পূর্বে সমতল জায়গায় দাগ কেটে ঘরের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। তবে খেলোয়াড় বেশি হলে ঘরের সংখ্যা বেড়ে যায়। ঘর দেখতে অনেকটা ব্যাডমিন্টন খেলার ঘরের মতো। এই খেলায় ঘরের সীমানা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে বলে দ্রুত দৌড়ের পাশাপাশি কৌশলের কসরত বেশি জানতে হয়।
প্রথম ঘরকে বলে ফুলঘর, বদনঘর বা গদিঘর। দ্বিতীয় ঘরকে নুন কোট বা পাকা কোট বলে। ঘরগুলোর মাঝে বরাবর যে লম্বা দাগটি থাকে তাকে শিড়দাঁড়া বা খাড়াকোট বলে। আর প্রস্ত বরাবর রেখাগুলোকে বলে পাতাইল কোট। সমান্তরাল রেখার মধ্যে এক হাত জায়গা থাকতে হবে যাতে অন্য কোনো খেলোয়াড় এই জায়গা দিয়ে যাতায়াত করতে পারে। যতায়াত করার সময় খেলোয়াড়ের পা যেন দাগে না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। খেলোয়াড়ের দাঁড়ানোর জন্য অন্য ঘরগুলোতেও কমপক্ষে এক হাত পরিমাণ জায়গার লাইন থাকবে। দাগে কারোই পা পড়া চলবে না। 
টসের মাধ্যমে দুইদলের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। খেলা পরিচালনা করার জন্য একজন রেফারি ও স্কোর লেখার জন্য স্কোরার নিযুক্ত করা হয়। একদল প্রথমে খেলার সুযোগ পায় সেই সুযোগকে বলে ঘাই। খেলার শুরুতে ফুলঘরে একদলের খেলোয়াড়রা অবস্থা নেয়। অন্যরা প্রতিঘরের সঙ্গে লম্বারেখা বরাবর দাঁড়ায়। এই খেলায় যেহেতু ছোঁয়াছুয়ির ব্যাপার আছে, কোনো ছোঁয়া বাঁচিয়ে যদি সব কোট ঘুরে ফুলঘরে আসতে পারে তাহলে সেই দল এক পয়েন্ট পায়। পয়েন্ট পেলে ঘাই তাদের দখলে থাকে। তবে সবগুলো ঘর ঘুরে আসার সময় বিপক্ষের কোনো খেলোয়াড়কে যদি ছুঁয়ে দেয় তাহলে পুরো দলই ঘাই হারায়। একজন দুর্বল খেলোয়াড়ের কারণে ঘাই হারিয়ে বিপক্ষ দলের অবস্থানে যেতে হয়। যে দল যতবার ছোঁয়া ছাড়া ঘর ঘুরে আসতে পারবে সেই দল বেশি পয়েন্ট পাবে। এভাবেই চলতে থাকে দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা। সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে এক সময়ের জনপ্রিয় এই খেলা ‘দাঁড়িয়াবান্ধা’। বিদেশী খেলার ভিড়ে এখন গ্রাম্য খেলাগুলো ধুঁকেধুঁকে বেঁচে আছে। তবে উচ্ছ্বাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে এখনো গ্রামের খেলাপ্রেমী মানুষের হৃদয় দখল করে আছে দাঁড়িয়াবান্ধা।

×