১ এপ্রিল ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

প্রধানমন্ত্রীকে নতুন করে ভাবতে হবে

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০
  • ফনিন্দ্র সরকার

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছে নানা ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে। ঘটনাবহুল সে ইতিহাস কমবেশি সকল বিজ্ঞজনেরই জানা। অতি সাধারণ মানুষ, যারা লেখাপড়া জানেন না এবং সহজ সরল জীবন যাপন করে আসছে, মাঠে ঘাটে কলে কারখানায় কাজ করছে, তারা ইতিহাস সেভাবে না জানলেও ইতিহাসের জন্ম হয়েছে তাদেরকে ঘিরেই। আমাদের মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরাধীন বাঙালী জাতির অধিকার আদায়ে সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাঁর সংগ্রামী জীবনের সার্থক পরিণতি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নযাত্রাকে থামিয়ে দেয়া হয় তাঁকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে। মহান নেতাকে হত্যা করে যে গোষ্ঠী ক্ষমতার মসনদে বসে, তারা বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছিল। তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছেন। যতই দিন যাচ্ছে তিনি ততই অনেক বেশি করে প্রতিটি বাঙালীর অন্তর্নিহিত ভাবের মধ্যে বিকশিত হচ্ছেন।

আজ শতবর্ষে বঙ্গবন্ধু। এ বছরটি রাষ্ট্রীয়ভাবে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। গোটা বাংলাদেশ বাঙালী জাতি যেন নতুনভাবে জেগে উঠেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের শক্তিকেন্দ্র। একটি আবেগের নাম শেখ মুজিব। প্রত্যেকটি আবেগই এক একটি শক্তিকেন্দ্র। প্রত্যেকটি মানসিক অভিজ্ঞতাই এক একটি শক্তিকেন্দ্র। নানা তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার বাঁক ঘুরে বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা টানা তৃতীয় বারের মতো সরকারপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। শেখ হাসিনা তার মানসিক অভিজ্ঞতায় অর্জিত যে শক্তিকেন্দ্রে অবস্থান করছেন, সেখান থেকে তাকে আবার নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। তিনি কী ভাবছেন তা সহজে সবার পক্ষে জানা সম্ভব না হলেও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে গবেষণালব্ধ জ্ঞান দ্বারা অনুমান করা ভুল হবে না বলেই বিশ্বাস করি। দীর্ঘ প্রায় ১১ বছরেরও বেশি সময় টানা ক্ষমতায় থেকে তিনি এ জাতির ‘মোড়’ ঘুরিয়ে দিয়েছেন; উন্নয়নের মহাসড়কে ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশটিকে টেনে তুলেছেন। উন্নয়নের এই জোয়ারে অবলীলায় কিছু দুর্বত্তের দৌরাত্ম্যও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শেখ হাসিনার বিচারবুদ্ধি, তার প্রজ্ঞা সেই সঙ্গে ধী-শক্তি আগলে রেখে চলেছে সাধারণ মানুষকে। সতর্কতার সঙ্গে তাকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। ‘সজাগ থাক’, তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এ ভাষা ব্যবহার করছেন। এ রকম সাবধান বাণী উচ্চারিত হচ্ছে আমাদের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রেও। প্রত্যেকটি মানুষের একটি স্বাতন্ত্র্যবোধ রয়েছে। এই স্বাতন্ত্র্যবোধ গড়ে ওঠে মানুষের জীবনের বিশেষ গতি, প্রবণতা, প্রতিক্রিয়া, পছন্দ ও অপছন্দকে ভিত্তি করে। মানুষের উচিত এটির প্রতি শ্রদ্ধাবান হওয়া, অন্যের স্বাতন্ত্র্যকে নকল না করে। আমাদের পক্ষে আত্মবিশ্বাস, আত্মনির্ভরতা আপন মানসিক বিন্যাসের ওপর যে আমাদের নিজস্ব আস্থা থাকা দরকার, তা শেখ হাসিনা তার মৌলিক ভাবনার জগতে সকলকে টেনে নেয়ার চেষ্টায় অব্যাহত রেখেছেন। কিভাবে এ জাতিকে উন্নততর অবস্থার পরিবর্তিত করা যেতে পারে, সে ভাবনা তাকে করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু তার ভাবনাকে কতটা শ্রদ্ধা করা হচ্ছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যাচ্ছে, তার দল আওয়ামী লীগে, সেই সঙ্গে সরকারের অভ্যন্তরে কারও কারও মনে হঠাৎ করে অশুভ কর্মপ্রক্রিয়া জেগে ওঠে। একজন নেতা কিরূপ প্ররোচনায় অপরাধমূলক কাজ করে? কেনই বা সাধারণ মানুষ অপরাধ বা মন্দ কাজ করে? হিংসা, রক্তপাত, খুন, ধর্ষণ প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। তাই জানা দরকার এ অপরাধের উৎস কোথায়? কিভাবেই বা একে সমাজ থেকে নির্মূল করা যায়। এই একবিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষত বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। তাতে ঐ সাক্ষী বা কর্তা বা বিষয়ী ধীরে ধীরে আধুনিক বিজ্ঞানের দৃশ্যপটের দিগন্তে দেখা দিচ্ছেন। কোয়ান্টাম সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো বুঝতে চেতনার খানিকটা কাজ রয়েছে- একজন বৈজ্ঞানিক এ ভাবেই ব্যাপারটা তুলে ধরেন। তাই ভৌত বিজ্ঞানের সামনে চেতনার এক নতুন মাত্রা, সত্যোপলব্ধির এক নতুন মাত্রা খুলে যাচ্ছে। বর্তমানে পাশ্চাত্যে মনস্তত্ত্বে চেতনা বিষয়ক পর্যালোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। এতকাল ওখানে তার স্থান ছিল না। এখন বিষয়টি দিন দিন গুরুত্ব পাচ্ছে নানা দিক থেকে। তাত্ত্বিক দিক থেকে পদার্থবিদ্যা বা জীববিদ্যা পর্যালোচনার সময় মানব সত্তায় নিহিত কিছু নিগূঢ় বস্তুর সত্যতা সম্বন্ধে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কার্যকারিতার দিক থেকে মানবীয় পরিস্থিতি নজরে পড়ে। মানবীয় মনস্তত্ত্বও সম্প্রতি বিকৃত রূপ নিয়েছে, প্রযুক্তিবিদ্যার প্রভূত উন্নতির কারণে। ভৌত বিজ্ঞান এই সমস্যাকে বেশিদিন উপেক্ষা করে চলতে পারে না। যদি মানুষ শান্তি চায়, জীবনে পূর্ণ সাফল্য চায় তার নিজের মন ও চেতনা নিয়ে পর্যালোচনা করা দরকার। কিন্তু মানুষ সেটা ভালভাবে করছে না বলেই এত অশান্তি, এত অনাচার এই বিশ্ব সমাজে।

প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে এক বক্তৃতায় ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলেছেন। এ রূপ মূল্যবোধ বিকশিত হবার পথটা কী, তা তিনি ব্যাখ্যাও করেছিলেন। কিন্তু নেতাকর্মীরা কী সে পথে হাঁটছে? দেশে ক্ষমতাধিকারীর ক্ষমতা অপ-প্রয়োগের ফলে সমাজে কতই না অন্যায় হয়ে চলেছে। দেশের প্রত্যেক নাগরিকেরই রাষ্ট্রীয় সেবা পাবার অধিকার রয়েছে। কেননা, জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। সরকারের যে সকল প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোর কাজই হচ্ছে রাষ্ট্র ও জনগণকে সেবা প্রদান করা। সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দ সেবাদানে আশানুরূপ আন্তরিক নয়। বিভিন্ন সরকারী দফতরে ন্যায়সঙ্গত সেবা প্রত্যাশী নাগরিকদের ঘুষ দিতে হয়। অনেক সময় এ ঘুষের পরিমাণ নাগরিকের সামর্থ্যরে বাইরে চলে যায়। এসব ঘুষ চাওয়ার ব্যাপার সাধারণ নাগরিককে খুবই কষ্টের মধ্যে ফেলে দেয়। সরকারী উঁচু নিচু স্তরের অসংখ্য কর্তা ব্যক্তি বা ক্ষমতাধিকারীদের অন্যায়-অবিচারের শত শত দৃষ্টান্ত রয়েছে। বহুকাল থেকেই ঘুষ সংস্কৃতি চালু রয়েছে। সমাজে অন্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ে। সমাজে দারিদ্র্য থাকতে পারে, অজ্ঞান থাকতে পারে, ওগুলো রাষ্ট্রকে দুর্বল করে না। কিন্তু যদি অবিচার থাকে, আর তার মাত্রা যদি বৃদ্ধি পেতেই থাকে- তবে তা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে নড়বড়ে করে দেয়। গণতান্ত্রিক কাঠামো নড়বড়ে হয়ে গেলে সামাজিক অশান্তি বাসা বাঁধে। ক্ষমতাধিকারী লোক যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তখনই অন্যায়-অবিচার সমুপস্থিত হয়। ক্ষমতা অপব্যবহারকারীদের মধ্যে কোন আধ্যাত্মিক শক্তি নেই, যার সাহায্যে সে ক্ষমতাকে হজম করে তা দিয়ে জনহিতকর কাজ করতে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি ও লাখ লাখ লোকের সমস্যা সমাধানের জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে সাহায্য করতে প্রয়োজন একটি তত্ত্বনির্ধারক দর্শনের। সেরূপ দর্শনের কথাই শেখ হাসিনাকে ভাবতে হচ্ছে। ক্ষমতা লাভের প্রয়োজন আছে। কিন্তু জানতে হবে কিভাবে রাষ্ট্রের কল্যাণে, জনগণের কল্যাণে করা যায় এর প্রকৃষ্ট ব্যবহার। ক্ষমতা হজম শক্তির যোগ্যতা তৈরি হয় সাধনার দ্বারা। ক্ষমতাধিকারীদের হজম শক্তি আসে তাদেরই অন্তর্নিহিত এক গভীরতর উৎস থেকে, যা মানব সত্তার আধ্যাত্মিক প্রকৃতি। ক্ষমতাধিকারী সেই শক্তির বিকাশ যখন ঘটাতে পারবে তখন সবকিছুই সহজ হয়ে যাবে। তখন কোন অবিচার নয়, কোন দলন নয়, কোন শোষণ নয়, কেবল মানবিকতার ভাব, সেবার ভাবই অনুপ্রাণিত করতে থাকবে সারা কর্মজীবন ধরে। যদি প্রশাসনে নিযুক্ত ব্যক্তিদের অন্তত ১০ বা ১৫ শতাংশকেও এই দর্শনের ভাবাদর্শে শিক্ষিত করে তোলা যায়, তবে রাষ্ট্র মানবিক পরিস্থিতিতে এক প্রচ- পরিবর্তন সাধিত হবে। কিন্তু এখনও এমনটি ঘটছে না। যদিও এর প্রতিকার আমাদের জানা আছে। যেহেতু প্রতিকার আমাদের হাতেই আছে তাই ভয় পাওয়ার কারণ নেই। অনাচার, অত্যাচার একটি ব্যাধি। এ ব্যাধি খুবই খারাপ। এর বাইরেও ব্যাধি আছে, যে ব্যাধির কোন প্রতিকার নেই। ব্যাধি খারাপ, কিন্তু প্রতিকারহীন ব্যাধি আরও খারাপ। যে ব্যাধির প্রতিকার সহজলভ্য সে ব্যাধি একদিন না একদিন দূর হবেই। আশা করি বাংলাদেশের মানুষ এমন ভাবনার আলোকে বিকশিত হবে, যে ভাবনায় দেশপ্রেম, মানব প্রেম ও জনসেবায় উদ্বুদ্ধ হবে। শেখ হাসিনা এই ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন।

আধুনিক সভ্যতায় পরম ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকেই ক্ষত্রিয় চিহ্নিত করা হয়। ক্ষত্রিয় একটি সম্প্রদায়, একটি গোত্র। ক্ষমতার বিচারে ক্ষত্রিয় সবার ওপরে। সে হিসেবে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ক্ষত্রিয়, রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ক্ষত্রিয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষত্রিয়, আমাদের প্রধানমন্ত্রীও ক্ষত্রিয়। কারণ তারা পরম ক্ষমতাশালী। মুকুটধারী না হয়েও পরম ক্ষমতাধিকারী। যাদের ক্ষমতা আছে তাদের সকলেরই একটা নতুন ধরনের সামর্থ্য চাই। যার দ্বারা তারা ক্ষমতাকে হজম করতে পারেন। ক্ষমতা হজম করে সকল মানুষের কল্যাণে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাধিকারী ব্যক্তিকে মহৎ হতে হবে। তারা যেন ক্ষমতার স্পর্শে নিজেকে মহৎ বোধ করার সামর্থ্য অর্জন করতে পারে। এরূপ সামর্থ্য অর্জনকারী শাসকের রাষ্ট্রকে লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হয়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সংশর্স্পে এসে নিজেদের মহৎ বোধ করবেন, ক্ষুদ্র হবেন না। ক্ষুদ্র হয় সামন্ততান্ত্রিক প্রশাসনে। সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতা নর-নারীকে স্পর্শ করে তাদের খর্ব করার জন্য। গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতি ক্ষমতা জনগণকে স্পর্শ করে তাদের আত্মসম্মানবোধ ও স্বাধীন চেতনা জাগিয়ে তাদের আরও বড়, আরও মহৎ করে তুলতে। আজ সমাজের মধ্যে অন্তবিক্ষোভের আভাস মিলছে। এ ক্ষুব্ধভাবাপন্ন মানুষগুলোকে সত্যোপলব্ধি করার সুযোগ তৈরিতে শাসন ব্যবস্থায় নতুনত্ব আনতে হবে। শক্তিশালী অনৈতিক আমলাতান্ত্রিক অচলায়তন ভাঙতে হবে। সে ভাবনা কী শেখ হাসিনা ভাবছেন? নিশ্চয়ই তিনি নতুন করে ভাবছেন। এ বিশ^াস দেশবাসীর রয়েছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

অনিবার্য কারণে আজ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর নির্ধারিত লেখাটি প্রকাশ করা গেল না। বি.স.

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০

১৯/০২/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: