২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

৫ হাজার আলোকচিত্র সাড়ে ৪ হাজার বই অসংখ্য নথি


৫ হাজার আলোকচিত্র  সাড়ে ৪ হাজার বই  অসংখ্য নথি

মোরসালিন মিজান

বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে বড় কোন ইতিহাস নেই। কত রকমের কথার ফুলঝুড়ি এখন! তবে দেশপ্রেমের প্রকৃত পাঠ নিতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকেই। আত্মপরিচয়ের সন্ধানে একাত্তরে ফিরে যেতে হয়। অস্ত্র হাতে নয় মাসের লড়াই। নয় মাসের বটে। বিপুল-বিশাল এর ক্যানভাস। কত শত দিক! অল্প স্বল্পই সামনে এসেছে। অনলাইনে পাওয়া যায় তারও কম। সে জায়গা থেকে দেখলে প্রশংসনীয় উদ্যোগ মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ। ইন্টারনেটভিত্তিক এই সংগ্রহশালায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ দলিল, পত্রপত্রিকা, বই, তথ্যচিত্র, ভিডিও ফুটেজ, চলচ্চিত্র, অডিও, আলোকচিত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকাসহ বহুবিধ তথ্য উপাত্ত। গবেষণার কাজে ডিজিটাল এই সংগ্রহশালা দারুণ কাজে আসছে। বিশেষ করে আজকের ইন্টারনেটের যুগে তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক জ্ঞান দিতে এর কোন তুলনা হয় না। দুনিয়ার যে কোন প্রান্তে থেকে চাওয়া মাত্রই নিজের প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ই আর্কাইভ।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অনলাইনে কাজ শুরু হয়েছিল বেশ আগেই। নানা দিক নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ হয়েছে। এখনও হচ্ছে। তবে মুক্তিযুদ্ধ ই আর্কাইভটি স্বতন্ত্র অবয়ব নিয়ে সামনে এসেছে। এটি খুঁজে নেয়ার লিঙ্কÑ িি.ি ষরনবৎধঃরড়হধিৎনধহমষধফবংয.ড়ৎম. ওয়েব পোর্টালটি ঘুরে দেখা যায়, এটি বেশ সমৃদ্ধ এবং গোছালো। প্রায় ১৫ টেরাবাইট জায়গা নিয়ে গড়া সংগ্রহশালায় বাংলার পাশাপাশি রয়েছে ইংরেজী বিভাগ। ইংরেজী ভাষায় লেখা বই-প্রবন্ধ ইত্যাদি রাখা হয়েছে এই বিভাগে। ফলে আন্তর্জাতিক দুনিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে পড়তে পাড়ছে। এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ব্যবহার করেছেন ১৫ লাখ পাঠক। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইক্সেটারের হিউম্যানেটিস কলেজের ‘দ্য ইক্সেটার সাউথ এশিয়া সেন্টার’ তাদের একাডেমিক রিসোর্স ম্যাটেরিয়াল সেকশনে মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

আর্কাইভে ৩০ ক্যাটাগরিতে ভাগ করে তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে এখানে। বিভাগগুলোর নাম দেখে ভেতরের বিষয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এই যেমনÑ চিরায়িত বাঙলা, ’৪৭-পূর্ব বাঙলা, পাকিস্তান আমল। ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা ও ’৬৯-এর অভ্যুত্থান। ’৭০-এর নির্বাচন ও অসহযোগ আন্দোলন, অপারেশন সার্চলাইট, স্বাধীনতার ঘোষণা, বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধের ইতিহাস এবং বিশ্লেষণ। গণহত্যা-যুদ্ধাপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধী ও তাদের বিচার, যুদ্ধশিশু এবং মুক্তিযুদ্ধে নারী ও শিশু, বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-, উদ্বাস্তু। বাঙালী, বিদেশীদের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গি। সময়ক্রম এবং স্মৃতিকথা, শিল্প-সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, ব্যক্তিবিশেষের ভূমিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের নামীয় তালিকা, স্বাধীন বাংলা বেতার। ৭১-পরবর্তী বাংলাদেশ, মৌলবাদ ও সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাজনীতি, বিতর্ক ও ভিন্নমত, পাকিস্তান ও দোসরদের ভাষ্য। অর্থাৎ, মুক্তিযুদ্ধ ও এর আগে পরের ইতিহাসের মোটামুটি ধারাবাহিক একটি উপস্থাপনা। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

আর্কাইভটিতে পাওয়া যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ দলিল। নথিপত্র। দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে সংগ্রহ করা এসব দলিল দস্তাবেজের স্কেন কপি প্রচলিত অনেক বিভ্রান্তি দূর করতে ভূমিকা রাখছে। ই আর্কাইভে, অনেকে জেনে অবাক হবেন, বই আছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার! মুক্তিযুদ্ধের ওপর যত বিখ্যাত স্মৃতিকথা গবেষণাগ্রন্থ, পিডিএফ আকারে রাখা আছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকাশিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র।’ ১৫ খ-ের কোনটি আপনার চাই? এখানে সুন্দর সাজানো আছে। পাওয়া যাচ্ছে দীর্ঘকাল আগের পুরনো পত্রিকার কপি। ১৯৪৭ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত পত্রপত্রিকার বহু দুর্লভ সংখ্যা রাখা হয়েছে আর্কাইভে। স্থান পেয়েছে অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ। ভিডিও ফুটেজ আছে ১ হাজারের বেশি। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট এসব ভিডিও বিশেষ দিবসগুলোতে দেখা যায় বটে, এখানে পাওয়া যাচ্ছে একসঙ্গে। যেটি দরকার শুধু খুঁজে নিলেই হলো। একই কথা প্রযোজ্য প্রামাণ্যচিত্রের বেলায়। ১শ’র বেশি প্রামাণ্যচিত্র সংগ্রহভুক্ত করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আছে আলোকচিত্র। সংখ্যায় ৫ হাজারের মতো! দেশীয় আলোকচিত্রীদের তোলা ছবি আছে। আছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া আলোকচিত্র।

এত যে সংগ্রহ, কী করে সম্ভব হলো? কৌতূহল হতেই পারে। উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের দলিলগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে বিভিন্ন সংগ্রাহক, ব্রিটিশ লাইব্রেরি, যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন লাইব্রেরিসহ দেশী-বিদেশী সংগ্রহশালা থেকে। এছাড়া ‘মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভে’ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক যেসব কনটেন্ট পাওয়া যাচ্ছে, তা সংগ্রহে ও ডিজিটাইজেশনে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেয়া হয়েছে।

এবার উদ্যোক্তাদের কথাটি বলতে হয়। মূল উদ্যোক্তা, জেনে একটু অবাকই হতে হয়, দুইজন তরুণ-তরুণী। আজকের প্রজন্ম শেকড় থেকে দূরে। বই পড়ে না। নিজ জাতি সত্তার ইতিহাস থেকে বিস্মৃত হয়ে সময় কাটায়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গৌরব করা শেখেনি। আরও কত কত অভিযোগ। আর এর ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে সাব্বির হোসাইন ও শান্তা আনোয়ার। তারা প্রথমে গড়ে তুলেন মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট। সাব্বির এই ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং শান্তা সভাপতি। এই ট্রাস্টের নানা কর্মকা-ের অন্যতম একটি মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ। শুরুটা হয়েছিল ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র’ নামে। এটি ২০০৭ সালের কথা। এই নামে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন তারা। ৭ বছর পর ২০১৪ সালে চালু করেন পরীক্ষামূলক ওয়েবসাইট। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের মার্চ মাসে মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের নিবন্ধন হয়। নবেম্বরে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ডিজিটাল গণগ্রন্থাগার মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভের। বর্তমানে এখানে কাজ করছেন ১২ জন কর্মী ও গবেষক।

কেন এমন চিন্তা? কোন তাড়নায়? জানতে চাইলে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি সাব্বির বলেন, একাত্তরের পরে জন্ম নিলেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সব সময়ই আগ্রহ ছিল আমার। সেখান থেকেই ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলার চিন্তা মাথায় আসে। মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ আসলে সময়ের দাবি। আমরা এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইতিহাসের উপাদানগুলোকে একত্রিত করেছি। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য উপাত্ত পাওয়া অনেক বেশি সহজ হয়েছে। ইতিহাস বিকৃতি দূর করতে সাহায্য করবে আর্কাইভ।

প্রায় একই কথা বলেন শান্তা আনোয়ার। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রয়োজনীয় বইপত্র, দলিল দস্তাবেজ আমাদের হাতের কাছে থাকে না। চাইলেই খুঁজে পাওয়া যায় না। এছাড়া বই বা অন্য অনেক নথি সংগ্রহ করতে প্রচুর টাকার প্রয়োজন হয়। যাদের সামর্থ্য নেই তারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে পারে না। আমাদের আর্কাইভটি তারা বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু উদ্যোক্তারা কোথায় পান টাকা? জানতে চাইলে শান্তা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের যাবতীয় ব্যয় ট্রাস্টিরা নিজেরাই বহন করার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি দেশী-বিদেশী অনেকের সহায়তায় এগিয়ে যাচ্ছে কাজ।

বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশপ্রেম সততা পরিশ্রম আর গবেষণার মন নিয়ে উদ্যোক্তারা এগিয়ে যেতে পারলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চর্চা ও গবেষণা নতুন গতি পাবে। বিশেষ করে ইন্টারনেটে ডুবে থাকা আজকের প্রজন্ম খুব সহজে জানতে পারবে ইতিহাসের আলোকোজ্জ্বল ইতিহাসটি সম্পর্কে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: