২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বাড়ছে হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা


অনলাইন ডেস্ক ॥ ঢাকা শিশু হাসপাতালের ৩নং ওয়ার্ডের পাশ দিয়ে ভেতরে যাবার সময় একজন মাঝবয়সী লোক মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বললো, ‘মুক্তা আর নেই, মারা গেছে।’ মুক্তা তার চার মাস বয়সের একমাত্র সন্তান। নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর এলাকা থেকে মেয়ের চিকিৎসা করাতে এসেছেন এখানে।

জন্মের পর পরই মুক্তার শ্বাসকষ্ট ছিল। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া হলে এক পর্যায়ে সে সুস্থ হয়ে ওঠে। কিছুদিন পর পুনরায় অসুস্থ হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা শিশু হাসপাতালে পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত মুক্তা আর সুস্থ হয়ে ওঠেনি। তার মৃত্যুর কারণ জিজ্ঞাসা করতেই কর্তব্যরত ডাক্তার জানালেন, সে জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত ছিল।

বাংলাদেশে উচ্চ শিশু মৃত্যুহারের অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো জন্মগত হৃদরোগ। জন্মের এক মাসের মধ্যে প্রায় শতকরা ২০ ভাগ শিশু মৃত্যুবরণ করে জন্মগত হৃদরোগের কারণে। সমগ্র বিশ্বে প্রতি হাজারে ৮-১০ জন শিশু এই রোগে ভোগে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। যাদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগ শিশু ৫ বছর বয়সের মধ্যে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করে। দেশের বিপুল জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ হলো শিশু, যাদের সংখ্যা ৬ কোটিরও বেশি।

বিপুলসংখ্যক এই শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করার জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালের সংখ্যা অতি নগণ্য। তাছাড়া অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারণেও অনেক শিশু সঠিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে অকালেই ঝরে পড়ে অনেক শিশু। আন্তর্জাতিক বিচারে আমাদের দেশে নবজাতক শিশু মৃত্যুর হার এখনও উন্নত বিশ্বের চেয়ে অনেক বেশি।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. দিলরুবা ইব্রাহিম দীপ্তির মতে, গর্ভাবস্থায় শিশুর হৃদযন্ত্র তৈরি ও বিকশিত হবার প্রাক্কালেই যদি কোন প্রকার ত্রুটি হয় এবং শিশু সেই হৃদযন্ত্র নিয়েই ভূমিষ্ট হয়, তবে তাকে জন্মগত হৃদরোগ বলে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি হাজার জীবিত শিশুর মধ্যে ৮ জন শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যার উপসর্গ জন্মের ৬ মাসের মধ্যেই প্রকাশ পায়। ঘনঘন ঠান্ডা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট, মায়ের বুকের দুধ টেনে খেতে অসুবিধা ও অল্পতেই হাপিয়ে যাওয়া, হাত পায়ের আঙ্গুল ও ঠোট নীলাভ রং ধারণ করা, ওজন ও শারীরিক বৃদ্ধির অপ্রতুলতা ইত্যাদি লক্ষণ জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে প্রতিভাত হয়।

জন্মগত শিশু হৃদরোগকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় অনীলাভ ও নীলাভ এই দুইভাগে বিভক্ত করা যায়। সাধারণভাবে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৭৫ ভাগই হয় অনীলাভ প্রকৃতির এবং ২৫ ভাগ হয় নীলাভ প্রকৃতির। এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা শিশু হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. মো. আবু সাইদ বলেন, জন্মগত শিশু হৃদরোগের সুনির্দিষ্ট কোন কারণ জানা না গেলেও গর্ভাবস্থায় ও গর্ভপরিকল্পনাকালীন সময়ে বিভিন্ন ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্যগ্রহণ, রেডিয়েশনের সংস্পর্শ, মায়ের ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ, গর্ভাবস্থায় মায়ের রুবেলা (ভাইরাসজনিত) সংক্রমন, মায়ের শারীরিক স্থুলতা ও পরিবেশগত কারণের সাথে শিশু হৃদরোগের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এছাড়াও বংশগত কিছু রোগ যেমন : ডাউন সিনড্রোম, টার্নার সিনড্রোম নিয়ে জন্মানো শিশুরা এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

বেশিরভাগ জন্মগত হৃদরোগে শুরুতে তেমন একটা লক্ষণ প্রকাশ করে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় দেরি হয় এবং আক্রান্ত শিশুর অর্ধেকেরও বেশি অকালেই ঝরে যায়। চিকিৎসকদের মতে, যেহেতু জন্মগত হৃদরোগই জন্মগত ত্রুটিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, তাই এ রোগের ধরন সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা থাকা জরুরি। যদিও আমাদের দেশে এ সম্পর্কিত জাতীয় কোন তথ্য নেই।

এ রোগের চিকিৎসা যথাযথভাবে না হলে নানা প্রকার শারীরিক জটিলতা এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। কাজেই যথাসময়ে রোগ নির্ণয় এবং রোগীকে এ রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো অত্যন্ত জরুরি। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই এ রোগ সারিয়ে তোলা সম্ভব। জনগণের মধ্যে এই সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

বিগত তিন দশকে জন্মগত হৃদরোগ সন্দেহে বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্রে রোগী পাঠানোর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সাথে হৃদরোগ চিকিৎসায়ও সাধিত হয়েছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। ঢাকা শিশু হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মঞ্জুর হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা এবং আরো কিছু গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় যে, আমাদের দেশে জন্মের পর প্রথম মাসগুলোতে এই রোগ নির্ণয়ের হার অনেক কম। বেশির ভাগক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় দেরি হয় এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুমূর্ষ অবস্থায় রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়।

শিশু হৃদরোগ চিকিৎসায় আমাদের দেশের অবস্থান এখনও অঙ্কুরেই রয়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসার কিছু সুযোগ থাকলেও তা খুবই অপ্রতুল ও ব্যয়বহুল। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে এ রোগের চিকিৎসা এখনও ধরাছোঁয়ার উর্ধ্বেই রয়ে গেছে। তবে আশার কথা হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ রোগের চিকিৎসার এহেন দুরাবস্থার কথা অনুধাবণ করে ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ দেশের মোট ১৮টি হাসপাতালে এ রোগের বিশেষায়িত কেন্দ্র খোলাসহ সব ধরনের সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

একটি সুস্থ সুন্দর শিশুর জন্ম বয়ে নিয়ে আসে আশার আলো, সৌভাগ্যের দ্বীপশিখা, ঠিক তেমনি জন্মগত বৈকল্য নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশু ক্রমান্বয়ে একটি পরিবার তথা জাতিকে টেনে নিয়ে যায় হতাশার চোরাবালিতে। যা কখনোই আমাদের কাম্য নয়।

সূত্র: বাসস