২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

প্রতিষ্ঠিত হোক নারীর অধিকার


ভিন্নমাত্রায় নারী নির্যাতনের ঘটনা আমাদের এখন কেবলই হতবাক করছে না, বিমূঢ়ও করে দিচ্ছে। এ ধরনের ঘটনার কথা আগে কেউ ভাবতেই পারত না, অথচ এখন হরদম ঘটে চলেছে অবর্ণনীয় ন্যক্কারজনক সব ঘটনা। অসভ্য, বর্বর কিছু মানুষ নামের প্রাণীর পাশবিকতা, জান্তব লালসা, জিঘাংসার শিকার হচ্ছে অসহায় নারী। আমাদের সমাজে নারী নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে বাড়তে ্এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যা দেখে যে কোন বিবেকবান, সহৃদয় মানুষ স্বাভাবিকভাবে অসহনীয় যন্ত্রণায় ভুগছেন। হালে দেশজুড়ে গণধর্ষণের ভিডিও চিত্র ধারণ করে মোবাইল ফোন কিংবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। প্রায়ই পত্রিকার পাতায় এ ধরনের ঘৃণ্য সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক পত্রিকায় প্রকাশিত তেমনি একটি সংবাদের বিবরণ এখানে তুলে ধরছি। ঝিনাইদহের কালিগঞ্জে এ ধরনের অপরাধের শিকার এক তরুণী লজ্জা ও অপমানে আত্মহত্যা করত বাধ্য হয়েছে। চার বছর আগে তরুণীটির বিয়ে হয় মিঠুন নামে এক লোভী যুবকের সঙ্গে। দুই দফা যৌতুক আদায়ের পর তৃতীয় দফায় না পেয়ে তরুণীকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় তার স্বামী। তারপর থেকে শিশুপুত্রকে নিয়ে সে বাপের বাড়িতেই থাকত। তিন মাস আগে নিজের ভুল স্বীকার করে তরুণীকে ফিরিয়ে নেয় তার স্বামী। এর দুই মাস পর হতভাগ্য তরুণীকে আবার বাপের বাড়ি ফেরত পাঠানো হয়। তার আগে মেয়েটি ধর্ষিত হয় তার স্বামী ও স্বামীর সহযোগীদের দ্বারা। ধর্ষনের দৃশ্য ভিডিও চিত্রে ধারণ করে তা পরিচিতজনদের মোবাইলে ছড়িয়ে দেয়া হয়। বাপের বাড়ি এসে এক মাস হতভাগ্য তরুণী প্রায় নির্বাক হয়েই ছিল। চারদিকে তার ধর্ষণের ভিডিও চিত্র ছড়িয়ে পড়েছে শুনে লজ্জা-অপমানে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এ নিয়ে স্থানীয় থানায় মামলা হলেও, পুলিশ নাকি অপরাধী কাউকে খুঁজে পায়নি। পুলিশের এ বক্তব্যের পর তারা মামলার প্রধান আসামী আত্মহননকারী তরুণীর সাবেক স্বামীর বাড়িতে গিয়ে তাকে বহাল তবিয়তে দেখেছেন। দলবেঁধে সাবেক স্ত্রীকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করলেও প্রশ্নবাণের মুখে সে দৌড়ে পালিয়ে যায়।

আজকাল গ্রামাঞ্চলে বিপথগামী যুবকের একাংশ অসহায় কিশোরী-তরুণীদের ফাঁদে ফেলে সম্ভ্রমহানির দৃশ্য মোবাইল ফোনের ভিডিওতে ধারণ এবং তা ব্ল্যাকমেলিংয়র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অসহায় কিশোরী বা তরুণীকে জব্দ করার জন্য সম্ভ্রমহানির ভিডিও চিত্র বিভিন্নজনের মোবাইলে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এভাবে অগণিত নারীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা হচ্ছে। আমাদের দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানসম্মানের ভয়ে গোপন রাখা হয়। আত্মহত্যার ঘটনা, কিংবা এ ধরনের কিছু হলে কেবল সে ক্ষেত্রেই তা প্রকাশ পায়। লম্পট-বর্বর-অত্যাচারী পুরুষের লাম্পট্যের, প্রতারণার, বঞ্চনার এবং নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রতিদিন অসংখ্য নারী। যার কথা বাইরে প্রকাশ পায় না। নির্যাতনের, প্রতারণার শিকার অগণিত নারীর চাপাকান্না ঘরের চার দেয়ালের মাঝেই গুমরে ওঠে। বাইরে তা আর কেউ জানতে পারে না। অনেক নির্যাতনের যন্ত্রণা নারী কেবলই মুখ বুঁজে সয়ে যায়।

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের অভিশাপে এখনও অনেক মেয়ের জীবনের উজ্জ্বলতা হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতনতাবোধ সৃষ্টি হলেও আজও বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটছে। কয়েকদিন আগের একটি ঘটনার কথা এখানে তুলে ধরছি। বরিশাল শহরের সদর রোড থেকে আধা কিলোমিটার দূরে কীর্তনখোলা নদীর পোর্ট রোড লাগোয়া জেগে ওঠা চরে গড়ে উঠেছে বস্তি। সেই রসুলপুর বস্তিতে থাকে সনিয়া আক্তার রিমি। তার বয়স ১৩ ছুঁই ছুঁই। রিমি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে বাস করে। তার বাবা ভিক্ষা করে আর মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। রিমির খালাত বোনের স্বামী বিপতœীক জামাল তাদের পরিবারকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে আসছিল। জামাল অপ্রাপ্তবয়স্কা রিমিকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে রিমির পরিবার সম্মতি দেয়। শুরু থেকেই রিমির বিয়েতে আপত্তি ছিল। রিমির ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্প্রতি শহরের একটি কাজি অফিসে তাকে বিয়ের জন্য নিয়ে যায় তার পরিবার। বাল্যবিবাহ বিধায় কাজি বিয়ে পড়াতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়Ñধর্মীয় মতে তাদের বিয়ে হবে। রিমির বয়স ১৮ পার হলেই কাবিন হবে। সে অনুযায়ী রিমিদের বাড়িতে বিয়ের আয়োজন শুরু হয়। কিন্তু বরযাত্রী পৌঁছার আগেই পুলিশ নিয়ে কনের বাড়িতে হাজির হন বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক এ্যাডভোকেট সালমা আলী। এর পর তিনি বিয়ে থেকে রক্ষা করেন কিশোরী সনিয়া আক্তার রিমিকে। এ যাত্রা সে বিয়ের অনাকাক্সিক্ষত শিকার হওয়া থেকে রক্ষা পেলেও, নাম না জানা রিমির মতো এমন অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের কিশোরী অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাকে অসময়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হচ্ছে। বিয়ের পর আনন্দময় সুখী জীবনের বদলে তাদের জীবনে নেমে আসছে ভয়ঙ্কর অভিশাপ। অকালমাতৃত্বের বোঝা বইতে গিয়ে তাদের অনেকেই মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতিবছর ৮ মার্চ ঘটা করে পালন করা হয় নারী দিবস। সারা বিশ্বের মতো এবারও বাংলাদেশে নানা আয়োজনের মধ্যে পালিত হয়েছে নারী দিবস। পৃথিবীতে যা কিছু মহান, চিরকল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতাটি যখনই পড়ি, তখনই নারীদের ভূমিকা নিয়ে ভাবতে আমাদের ভাল লাগে। এর বাইরে বোধ করি নারীর অবদান ও অবস্থানকে মূল্যায়ন করতে আমাদের বড়ই অনীহা। অথচ মানবসভ্যতার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কোন ক্ষেত্রেই নারীর অবদানকে ছোট করে দেখার কোন অবকাশ নেই।

রেজাউল করিম খোকন