২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বয়ঃসন্ধিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রভাব সিরাজুল এহসান


বয়ঃসন্ধিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রভাব সিরাজুল এহসান

পর্যবেক্ষণ:১

তৌহিদুল ইসলাম ব্যবসায়ী। থাকেন রাজধানীর উত্তরায়। ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান মতিঝিলে। উত্তরা থেকে মতিঝিল আসতে কর্মঘণ্টার অনেকটা সময় ব্যয় হয় রাস্তায়। আবার ফিরতেও ওই একই অবস্থা। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা। ফেরেন রাতে। তখন ক্লান্তিতে শরীর টানে বিছানা। দুটি সন্তান। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে বেশ আগে। জামাতা নিয়ে থাকে দেশের বাইরে। ছোট ছেলে। পনেরো বছরের কিশোর। বয়ঃসন্ধিক্ষণ চলছে তার। পড়ছে ক্লাস নাইনে। সুখের সংসার। ঘরে আদর্শ স্ত্রী। রাতে ফিরে দেখতে পান ছেলে পড়ার টেবিলে। ছেলের ঘর আলাদা। তার জন্য সব ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি নিশ্চিত করেছেন তৌহিদ সাহেব। ফোর জি মোবাইল, কম্পিউটার আবার ট্যাবও দেয়া হয়েছে। একমাত্র পুত্রসন্তান বলে কথা! ছেলের এখন বায়না তাকে গাড়ি কিনে দিতে হবে। বন্ধুরা গাড়ি চড়ে স্কুলে আসে, ঘুরে বেড়ায়। বাবার কথাÑ এসএসসিতে ভাল রেজাল্ট করলে উপহার হিসেবে তাকে গাড়িই দেয়া হবে।

ইদানীং স্ত্রী ছেলে সম্পর্কে হাল্কা কিছু অভিযোগ করে আসছিলেন। ছেলের পড়ালেখায় আগের মতো মন নেই। বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে, দীর্ঘ সময় নিয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলে, ট্যাব বা কম্পিউটারে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ, অনেক রাতেও তার ঘরে আলো জ্বলে, ঘর থেকে ভেসে আসে কথোপকথন বা কম্পিউটারে চলতে থাকা গান বা ছবির উচ্চ শব্দ। এসব ব্যাপার খুব একটা আমলে তিনি নেননি। স্ত্রীর ওপর ছেড়ে দিয়ে বলেছেন এ বয়সে ও রকম একটু-আধটু হয়। কিন্তু তিনি বিষণœ হলেন তখন, যখন ছেলের স্কুলের বার্ষিক ফল বের হলো। প্রথমান্ত পরীক্ষার চেয়ে বার্ষিক পরীক্ষার ফল দেখে তিনি হতাশ, বিস্মিত। ফল যে এতটা খারাপ হবে তা ভাবতেও পারেননি।

পর্যবেক্ষণ:২

রংপুরের তারাগঞ্জের ইকরচালি। রাজধানী থেকে প্রায় আধাদিনের সড়কপথ। এক কথায় দূর মফস্বল। প্রত্যন্ত এলাকা। আর্থ-সামাজিক অবস্থা অগ্রসর বলার সময় এখনও আসেনি। এ গ্রামেরই সাধারণ কৃষক আদুল মিয়া। কৃষিজীবী সংসার। অসচ্ছলতার কারণে নিজে লেখাপড়ায় বেশি দূর এগোতে পারেননি। খেটেখুটে এখন মোটামুটি সচ্ছলতা আনতে পেরেছেন সংসারে। নিজের অপূর্ণ সাধ-স্বপ্ন পূরণ করতে চান সন্তানের মাধ্যমে। উচ্চশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে চান সন্তানদের। যথাসাধ্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন তিনি। সাধ্যের মধ্যে থাকা প্রায় সব আবদার রক্ষা করেন তিনি। গ্রামের কাছে হাইস্কুল। ছেলে তার দশম শ্রেণীর ছাত্র। বাবা আদুল মিয়া গত এক বছর ধরে ছেলের কিছু ‘ব্যতিক্রম’ আচরণ দেখে একটু অবাক হচ্ছেন, মাঝে মাঝে বিরক্তও হন। লেখাপড়ায় সহায়ক হবে বলে ছেলে অনেক অনুরোধ করে তার কাছ থেকে আদায় করেছে মোবাইল ফোন। বলতে গেলে প্রায় সারাদিনই ওটা নিয়ে ব্যস্ত। কানে দিনে-রাতে ইয়ার ফোন লাগানোই থাকে। গুনগুন করে আবার গাইতেও থাকে। ইদানীং তার নজরে আসে ছেলে গভীর রাতেও মোবাইলের ইয়ার ফোন কানে নিয়ে শুয়ে আছে। আলো জ্বলছে ফোনের কিপ্যাড কিংবা স্ক্রিনে।

একদিন পথে দেখা হতেই স্কুলের এক শিক্ষক আদুল মিয়াকে জানালেন ছেলের লেখাপড়ায় অমনোযোগিতার কথা। একটু খেয়াল ও শাসনের কথাও বলতে ভুললেন না। আদুল মিয়ার মনে শঙ্কা জেঁকে বসে সন্তান উচ্চশিক্ষিত হতে পারবে তো? তিনি সজাগ হলেন। ছেলের মধ্যে দেখতে পেলেন ‘ড্যাম কেয়ার’ ভাব। প্রথমে সতর্ক, রাগারাগি পরে একদিন ধৈর্যচ্যুত হয়ে গায়ে হাতও তুললেন। দেখা গেল ওইদিন ছেলে বাড়ি ফেরেনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেল বড় মেয়ের বাড়ি সৈয়দপুরে গেছে। পরদিন ছেলের মামাবাড়ি তার পরদিন ছোট মেয়ের বাড়ি। এ রকম ৩-৪ দিন বাড়ির বাইরে থাকায় তিনি লেখাপড়া নিয়ে চিন্তিত। কেননা টেস্ট পরীক্ষায় ভাল ফল করতে না পারলে সামনে এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করাটাও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এসএসসি পরীক্ষার ভাল ফল তো আরও দূরের ব্যাপার। যথাসময়ে টেস্ট পরীক্ষা হলো। ফলও বের হলো। আদুল মিয়া যা ভেবেছিলেন তাই। বরাবর সব বিষয়ে পাস করা ছেলে এবার এক বিষয়ে হয়েছে অকৃতকার্য। মৌখিক মুচলেকা দিয়ে ফরম ফিলাপের সুযোগ পেলেও অভিভাবক হিসেবে অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি পরীক্ষার ফল কী হবে সে শঙ্কা তাঁর মনে এখনও জাগরূক।

দুটি পর্যবেক্ষণ পাঠ শেষে পাঠকের মনে হতে পারে উদ্ভূত সমস্যা সঙ্কটের মূলে আধুনিক প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবহার্য সামগ্রী। আসলে কিন্তু তা নয়। দিন যত যাবে, মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা যতদিন থাকবে ততদিন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন নতুন উপহার সমাগ্রীর সুযোগ এবং সেবা মানুষ গ্রহণ করবে এটাই স্বাভাবিক। বলা যেতে পারে এটা নিয়ম বা প্রক্রিয়া। বড়জোর প্রশ্ন করা যেতে পারে বিজ্ঞানের প্রযুক্তির যে নেতিবাচক ব্যবহার আছে তার কুপ্রভাব কিনা? একবিংশ শতাব্দীর এ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানকে ‘অভিসম্পাত’ করা, দোষ দেয়াÑ দায়ী করা বোকামি চাইকি আত্মঘাতী কথা বলার শামিল।

টেলিভিশন সম্প্রচারের শুরুর অব্যবহিত পরেই একটি ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীসহ কিছু রক্ষণশীল অভিভাবক ‘গেল গেল, সব গেল, সন্তানরা বখাটে হয়ে গেল বলে হৈচৈ করেছিল। কিন্তু একসময় সব থেমে যায় বরং উল্টো টেলিভিশন হলো তথ্য জানা, জ্ঞান আহরণ, বিনোদন, শিক্ষা বা চরিত্র গঠনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। অর্থাৎ নতুন প্রযুক্তির নতুন সদ্ব্যবহার আমরা করতে পারলাম। যা কিছু ভাল তার করায়ত্ত আমরা পেরেছি করতে। প্রযুক্তিকে নিজের মতো করে অর্থাৎ সদুদ্দেশ্যেই ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দাবি করে। এটা অনেকটা পানির মতো। যে পাত্রে রাখা যাবে সে পাত্রের রং ধারণ করবে। বিষেও মিশতে পারে অমৃতেও তাই।

এখানে বর্ণিত দুটি পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে বয়সের ব্যাপারটি। দুটি চরিত্রেরই বয়স কৈশোরোত্তীর্ণ হয়নি, বলা যায় বয়ঃসন্ধি। মানব জীবনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময়। ঘটনা, দুর্ঘটনা, আবেগ, কৌতূহল জীবনের এসব অনুষঙ্গ এ বয়সে হয় প্রবল থেকে প্রবলতর। এ সময়টাতে মানব জীবনে শরীর, মন ও মননে দ্রুত আমূল পরিবর্তন ঘটে। যে কারণে দুটি চরিত্রই কিন্তু একটু অস্বাভাবিক আচরণ করছে। দেহ ও মনে পরিবর্তনের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ফলে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিবাহিত কিছু বিষয়াবলী। যা কিনা বয়ঃসন্ধিক্ষণের চাহিদা, মনোক্ষুধা, কৌতূহলের বিষয়। অতিরিক্ত হওয়ার ফলে এই দশা। এক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বশীল তা প্রতীকী এ দুটি চরিত্র সব বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর-কিশোরীর সমস্যা নয়; এটা স্বাভাবিক। তবে অতিরিক্ত সব কিছু করা বা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রবল। আর সেখানেই ভূমিকা বাবা-মা, অভিভাবকের।