ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

ঐতিহ্যের ফ্যাশন পাতা

জলি রহমান

প্রকাশিত: ২৩:২৯, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ঐতিহ্যের ফ্যাশন পাতা

ফ্যাশনপ্রেমীদের কাছে ফ্যাশন পাতার চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বাড়ছে ক্রমান্বয়ে

দেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকা ৩৪ বছরের দ্বারপ্রান্তে। নীতির প্রশ্নে আপোসহীন এ পত্রিকা শুরুতে পাঁচটি বিভাগীয় শহর (ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বগুড়া ও সিলেট) থেকে একযোগে প্রকাশিত হতো। দৈনিক জনকণ্ঠের প্রয়াত সম্পাদক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ স্যার প্রতিটি পাতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন তার দূরদৃষ্টি। বাংলা ভাষা, মুক্তচিন্তা ও গণমানুষের আকাক্সক্ষাকে বুকে ধারণ করে পথচলা এক সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেবল আনুষ্ঠানিক স্মরণ নয়, ভবিষ্যতের পথরেখা নির্মাণের মুহূর্ত।

২১ ফেব্রুয়ারির চেতনায় প্রতিষ্ঠিত দৈনিক জনকণ্ঠ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সংবাদপত্র ন্যায়বোধ ও মানবিকতার এক চলমান যাত্রা। গত কয়েক দশকে দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, অর্থনৈতিক রূপান্তর, সামাজিক পরিবর্তন ও সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার প্রতিটি বাঁকে এই পত্রিকা নিজস্ব অবস্থান থেকে কথা বলেছে। কখনো কঠোর সমালোচনায়, কখনো মানবিক সহমর্মিতায়, আবার কখনো আশার দীপ জ্বালিয়ে-জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর সেই ধারাবাহিকতা আজও এর প্রধান শক্তি।
আজকাল বিভিন্ন সংবাদপত্রে ফ্যাশন নিয়ে পাতা সাজানো হচ্ছে নিত্যনতুন আঙ্গিকে। তবে এ পথের কর্ণধার জনকণ্ঠ। হাল ফ্যাশনে কখন কি এলো এসবের খবর জানতে আজও মানুষ চোখ রাখে ফ্যাশন পাতায়। ঈদের মতো বড় বড় উৎসবেও সচেতন মানুষ কেনাকাটার আগে প্রচার মিডিয়া থেকে দেখে নেয় নতুন কি এলো এ বছরে। তাই ফ্যাশনপ্রেমীদের কাছে ফ্যাশন পাতার চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বাড়ছে ক্রমান্বয়ে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে দেশ-বিদেশের ফ্যাশন ধারার খবর। তৈরি হয়েছে ফ্যাশন সাংবাদিকতায় একদল সংবাদকর্মী। যারা পোশাক-আশাকের নানা খবর জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন পোর্টালে প্রকাশ করছে। পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালেই পাওয়া যাচ্ছে ফ্যাশন নিয়ে নান্দনিক ফিচার।

ফলে সময়োপযোগী করে নিজেকে সাজায় ফ্যাশনপ্রেমীরা। জনকণ্ঠের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পত্রিকায় দিয়েছে নান্দনিকতা। এতে মোবাইল, কম্পিউটার অথবা ল্যাপটপ যে কোনো ডিভাইজে জনকণ্ঠ লিখে সার্চ দিলেই পাওয়া যায় দেশের সকল খবরাখবর, যা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের আশীর্বাদও বটে। চলতি মাসে তিনটি উৎসব পহেলা ফাল্গুন, ভ্যালেন্টাইনস ডে এবং ভাষা শহীদ দিবস। এ কারণে ব্যস্ত সময় কাটায় দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো। তৈরি করে নিত্যনতুন বৈচিত্র্যময় পোশাক। ঋতু অনুযায়ী পোশাকে থাকে ভিন্ন ভিন্ন রঙের সমন্বয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি বসন্তের বাসন্তী ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের লাল রং পোশাকে থাকে নজরকাড়া। আর একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটিতে থাকে সাদা-কালো রঙের একচ্ছত্র আধিপত্য। বাঙালিরা বরাবরই ফ্যাশন সচেতন। আর পত্রিকার ফ্যাশন সংবাদ তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে হাল ফ্যাশনের নান্দনিকতা। এক্ষেত্রে সবসময়ই মুখ্য ভূমিকা পালন করে মিডিয়া বা সংবাদমাধ্যম।
অন্যদিকে সমাজ-সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটে ফ্যাশন ও জীবনধারায়। গত পাঁচ বছরে ফ্যাশন পৃষ্ঠার কাজ প্রমাণ করেছেÑ পোশাক কেবল রুচির প্রকাশ নয়, বরং সময়ের ভাষা। দেশীয় ঐতিহ্য, টেকসই উৎপাদন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীলতা-সব মিলিয়ে ফ্যাশন এখন অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধ। একটি জাতির আত্মপরিচয় যেমন ভাষায় গড়ে ওঠে, তেমনি দৃশ্যমান হয় তার সংস্কৃতিতে। এ জায়গায় সংবাদপত্রের ভূমিকা কেবল প্রদর্শন নয়, সচেতনতা তৈরি করাও সমান দায়িত্ব।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক জটিল সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। উন্নয়নের পরিসংখ্যান যেমন আশাবাদী, তেমনি বৈষম্য, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট ও বৈদেশিক চাপ উদ্বেগও বাড়ায়। এ বাস্তবতাকে নির্ভুল বিশ্লেষণ ও তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপনার মাধ্যমে পাঠকের সামনে তুলে ধরা যে কোনো দায়িত্বশীল পত্রিকার কর্তব্য। দীর্ঘ এক দশক ধরে অর্থনীতি পৃষ্ঠার ধারাবাহিক কাজের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে উদ্যোক্তা শ্রেণির গল্প, অর্থনৈতিক জীবনের বাস্তবতা।  
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মুহূর্তে ফিরে দেখা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সামনে তাকানোও জরুরি। আগামী দিনের সাংবাদিকতা হবে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর, বিশ্লেষণমুখী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা জার্নালিজম ও মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনায় সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলে গিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি যতই অগ্রসর হোক, সাংবাদিকতার মূল শক্তি থাকবে মানবিক বিবেক, নৈতিক সাহস এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকারে। জনকণ্ঠ তাই প্রযুক্তিগত সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি মূল্যবোধের ভিত্তি আরও দৃঢ় করে এগিয়ে যাবে এটাই প্রত্যাশা।
গণতন্ত্রের বিকাশে স্বাধীন সংবাদপত্রের বিকল্প নেই। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সাংবিধানিক অধিকার নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও। 
ভিন্নমতকে স্থান দেওয়া, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরা এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করাÑ এসব ক্ষেত্রেই একটি সাহসী সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিহার্য। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যে স্পষ্ট অবস্থান জনকণ্ঠ ধারণ করেছে, তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা। একুশের চেতনায় দাঁড়িয়ে আজকে আমাদের অঙ্গীকারÑ সত্যের সঙ্গে আপোস নয়, মানবিকতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা নয় এবং জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে নীরবতা নয়। 
যেহেতু সংবাদপত্রের শক্তি অর্জিত হয় পাঠকের আস্থার মাধ্যমে তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেবল উদযাপনের দিন নয়, বরং আত্মসমালোচনার দিন। আমরা কতটা মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি, কতটা ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে পেরেছি, সেই প্রশ্ন তোলার দিন। জনকণ্ঠের প্রতি প্রত্যাশা- অতীতের গৌরবকে শক্তি করে, বর্তমানের চ্যালেঞ্জকে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করে, ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল প্রেরণা। 
লেখক : সহ-সম্পাদক
দৈনিক জনকণ্ঠ

প্যানেল হু

×