যাপিত জীবনে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
সময় থেমে থাকে না। ঘড়ির টিক টিক শব্দে চলতে থাকে বহমান নদীর মতো। চলার পথে থাকে নানা চড়াই-উতরাই। তবু সময় আর জীবনের প্রয়োজনে আমরা ছুটে চলি। আর প্রত্যাশা করি- আগামী দিন যেন থাকে নির্ভেজাল, সুন্দর ও আলোকিত। আর নতুন বছরের প্রাক্কালে আমরা একান্তই চাই- বিগত বছরের কোনো কষ্ট, হারানো আর না পাওয়ার বেদনা যেন কখনো ফিরে না আসে। কিছু না কিছু পরিবর্তন তো সমাজ, দেশ ও জীবনে ঘটেই যায়। চোখে পড়ার মতো পরিবর্তনগুলোর মধ্যে কিছু আলোকপাত করা হলো-
জীবনযাত্রার মান ॥ জীবন যাত্রা অনেক ব্যয়বহুল হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে অনেকগুণ। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর নাভিশ^াস উঠে যাচ্ছে তাল মিলিয়ে চলার। আর নি¤œ মধ্যবিত্তরা যতটুকু না হলেই নয়Ñ ততটুকুতে অভ্যস্ত হওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে আবার বিয়ে-শাদিতে বেড়েছে জাঁকজমক। যার যার সামর্থ্যমত চাকচিক্যময় করে তোলে বিয়ের অনুষ্ঠান।
স্কুলের পড়াশোনা ॥ বিগত সময়ে সিলেবাস পরিবর্তন হওয়ায় পড়ায় যে বিঘœ ঘটেছিল, তা এখন ছেলেমেয়েরা অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে। তবু এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকরা কিছুটা শংকিত- সন্তান ভালো রেজাল্ট করবে তো! অনেকেরই ধারণা দীর্ঘদিন পড়া থেকে দূরে থাকার ফলে, এখনো তারা পড়ায় সেভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠেনি। তাছাড়া শিক্ষা উপকরণসহ যাবতীয় সবকিছুর মূল্য এত বেড়েছে, অভিভাবকরা চিন্তিত সন্তানকে সুন্দর একটা শিক্ষাজীবন দিতে পারবে কিনা।
সাজসজ্জায় সোনা ॥ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে সোনার দাম। সর্বসাধারণের হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছে স্বর্ণ নামক নারীদের সবচেয়ে পছন্দের সাজের এই অলংকার। একটা সময় মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে বা নিকট আত্মীয়ের বিয়েতে স্বর্ণ উপহার দিত। কিন্তু এখন নিজেদের বিয়েতেও একটুখানি সোনা কিনতে মানূষকে হাজারবার ভাবতে হচ্ছে।
যানবাহন ॥ যানবাহন জগতে নতুন এক নাম টেসলা, যা রিক্সার চেয়ে দ্রুত গতিতে চলে। অনেকেই দ্রুত চলাচলের উদ্দেশ্যে রিক্সা সদৃশ্য এই বাহনে চড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আর এর সংখ্যাও অত্যধিক পরিমাণে বেড়েছে। তবে এতে ঝুঁকিও অনেক বেশি। এদের বেপরোয়া চলাচলে ঘটছে অনেক দুর্ঘটনাও।
ভোজনবিলাসী মন ও স্বাস্থ্যসচেতনতা ॥ ভোজন বিলাসী হয়ে উঠেছে দেশের মানুষ। এক সময় স্কুল/কলেজ/বিশ^বিদ্যালয়গামী ছেলেমেয়েরাই শুধু বাইরের খাবারে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে অবসরে বা ছুটির দিনে বাইরে বেড়ানো মানেই কোথাও খেতে যাওয়ার সংস্কৃতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এমনকি গ্রামে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েদের মাঝেও এ বিষয়টি খুব প্রভাব ফেলেছে। সঙ্গে বেড়েছে স্বাস্থ্যসচেতনতাও। ঘরোয়া প্রাকৃতিক উপকরণে স্বাস্থ্য ধরে রাখার পাশাপাশি একদল ঝুঁকেছে জিম এ গিয়ে ফিটনেস ধরে রাখার প্রতি।
নারী উদ্যোক্তা ॥ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বেড়েছে উদ্যোক্তা শ্রেণি। স্বকর্ম সংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন অনেক পরিবার। তবে আশার বিষয় হচ্ছে- গৃহিণীদের উদ্যোক্তা হওয়া। তারা যেমন ঘরে বসে কিছু করার চেষ্টা করছেন। তেমনি যারা কখনই কিছু করার কথা ভাবেননি, তারাও অন্যদের দেখে আয়ের চেষ্টা করছেন। তাতে যেমন সন্তানদের দেখভাল করে সংসার সামলাতে পারছেন, তেমনি উপার্জনও করতে পারছেন। তাতে তারা মানসিকভাবেও স্বস্তি পাচ্ছেন। তাছাড়া গত বছরের তুলনায় এ বছরে কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা স্ট্রিট ফুডের ব্যবসার প্রতি আরও বেশি পরিমাণে ঝুঁকেছে। এতে তারা নিজেদের খরচ নিজেরা চালানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে পরিবারেও কিছুটা সহযোগিতা করতে পারছে। অভিভাবকরাও এখন সন্তানদের এসব কাজ সহজভাবে নিচ্ছেন। তাদের ভাষায়- আর যা-ই হোক, খারাপ পথে যাওয়ার টেনশন মুক্ত থাকা যাচ্ছে।
ফ্যাশন ॥ ফ্যাশন সচেতনতা বেড়েছে ছেলে-বুড়োসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের। ইন্টারনেটের মাধ্যমে কখন কোন ট্রেন্ড চলছে খুব দ্রুত সবাই তা জেনে যাচ্ছে। তাই এখন বিভিন্ন দিবসে মূল রঙের ছোঁয়া রেখে নানা রঙে রাঙিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। শীত পোশাকেও এসেছে পাশ্চাত্য ঢং- এ। রাউন্ড ও লং জামার ট্রেডিশনের পাশাপাশি ইদানীং শর্ট জামার ফ্যাশনও চোখে পড়ছে। তরুণ-তরুণীরা পাশ্চাত্য ফ্যাশনে অনেক বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।
ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ॥ ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে এখন শুধু বিনোদন বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজই নয়, ঘরে বসে উপার্জনের চেষ্টা করছেন সব শ্রেণির মানুষ। ব্লগিং করেও অনেকে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করছেন। যারা ধৈর্য ধরে কাজটি করতে পারছেন, তারা টিকে যাচ্ছেন। একটা সময় ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে তরুণরা ঝিমিয়ে পড়েছিল। নানা নিষিদ্ধ কন্টেন্ট দেখে তারা বিপথগামী হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন তারা এর সঠিক ব্যবহার করে খুঁজে নিচ্ছে নিজেদের আত্মপরিচয়। অনেক ধরনের স্বকর্ম সংস্থানের সূত্র মিলছে তাতে। মিলছে নানা রকম প্রশিক্ষণ। অনেকেই সেই লক্ষ্যে সফলও হচ্ছে।
তারুণ্যের জয়জয়কার ॥ দেশের কোনো বড় শংকটে তরুণরাই সব সময় উদ্যোগী হয়েছে। তাদের প্রতিবাদই এনেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। এবার তারা আরও বেশি সোচ্চার হয়েছে ন্যায্য দাবিতে। যে কোনো অন্যায়ে তারা প্রতিবাদের ঝড় তুলছে। এসব কিছুই তাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও দায়বদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ। ভবিষ্যতে যে কোনো খারাপ পরিস্থিতিতে যে তারা দেশ ও দেশের মানুষের পাশে দাঁড়তে পারবে তার কোনো সন্দেহ নেই। তবে তাদের আরও সজাগ থাকতে হবে সিংহভাগ মানুষের সুযোগ-সুবিধার দিকে। প্রতিবাদ আর আন্দোলনে যেন সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ না হয়। জনগণ যেন কারো রোষানলের শিকার না হয়, সেদিকেও তাদের খেয়াল রাখতে হবে।
ঋতুর পরিবর্তন ॥ দীর্ঘদিন বাংলাদেশ শীত ঋতু থেকে প্রায় বঞ্চিতই হয়ে পড়েছিল। পৌষ-মাঘ এসে চলে যায়। কিন্তু ‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে’- প্রবাদটি প্রায় হারিয়েই যাচ্ছিল। গত শীতকালে কিছুদিন দেশের মানুষ শীত উপভোগ করেছে। এ বছরও শেষ প্রান্তে এসে শীত ছুঁয়ে গেল সবাইকে। নতুন বছরেও প্রবল শীত ও শৈত্যপ্রবাহ ‘কনকন’ আসছে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে। মার্কেট আর শপিং মলগুলোতে উঠেছে বাহারি ডিজাইনের শীতের কাপড়।
আমার দেশ আমার ভালোবাসা ॥ বিভিন্ন কারণে এ বছর বেশির ভাগ সময়ই সারাদেশ ছিল উত্তাল। নানা ধরনের প্রতিবাদ-সমাবেশের কারণে বিভিন্ন রাস্তা ব্লক থাকায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। যানজটে নাকাল হতে হয়েছে। কোথাও যাওয়ার জন্য রওনা হলে নির্দিষ্ট করে বলার কোনো সুযোগ ছিল না যে, কতক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে। তাছাড়া বছর শেষে দুজন মানুষের পৃথিবী থেকে বিদায়- পুরো দেশের মানুষের মাঝে বিষাদ ছড়িয়ে দিয়েছে। একজন সম্ভাবনাময় তরুণ আর একজন জনপ্রিয় প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তরুণরাই এক সময় দেশের হাল ধরবে। আর প্রবীণরা পথ দেখাবেন, শক্তি জোগাবেন। তাই এ দুজনের বিদায়ে শোকে মুহ্যমান সারাদেশ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও ঢাকায় মানুষের ঢল নেমেছিল তাদের জানাজায়।
যা কিছু হারিয়েছি তার শোক কাটিয়ে উঠার শক্তি দিক আল্লাহ সবাইকে। আগামী বছর দেশ ও জনগণের জীবনযাত্রা সহজ হোক- এটাই কাম্য সবার। ইন্টারনেটের এই যুগে আমরা অনেক বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি পাশ্চাত্য সভ্যতার দিকে। দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতিও। তাই খেয়াল রাখতে হবে যেন সেই ¯্রােতে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বদলে না দেই। শুধু বিশেষ দিনেই যেন আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে মনে না করে সব সময় মনে রাখি, পালন করিÑ নতুন বছরে এই প্রত্যাশা।
প্যানেল হু








