২০২৫ সাল বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল
২০২৫ সাল বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল। বিভিন্ন ইস্যুতে রিট ও চাঞ্চল্যকর রায়ের কারণে মানুষের দৃষ্টি ছিল আদালতের দিকে। রাজনীতিবিদ, নি¤œ আদালতের বিচারক, আইনজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের পদচারণায় ছিল উচ্চ আদালত সরগরম। এ সময় নি¤œ আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালতে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর মামলার রায় আদেশ এসেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির অঙ্গন ছিল উক্তপ্ত। সেই ধাক্কা আদালতেও লাগে।
আদালত সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদ- প্রদান করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কয়েকটি মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে। মামলার রায় ও ঘটনাগুলো হাইকোর্ট আপিল বিভাগ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
এই বছরেরই ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে খালাস। বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে কয়েকজন বিচারপতিকে অপসারণ করা হয়েছে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে এটিএম আজহারুল ইসলামকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আপিল বিভাগ। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদ- প্রদান করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহাল ১৪ বছর আগের দেয়া রায় বাতিল ঘোষণা করেছে আপীল বিভাগ। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তার ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সব আসামিকে খালাস দিয়েছেন আপীল বিভাগ।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ॥ দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের (বিচার শাখা-৪) প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। ২৪ ডিসেম্বর প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশ করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফার ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীকে দেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেছেন। এই নিয়োগ শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে কার্যকর হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে ২২ ডিসেম্বর ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে আপিল বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নিয়োগ চূড়ান্ত করেন রাষ্ট্রপতি। সংবিধান অনুযায়ী ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়ায় ২৭ ডিসেম্বর অবসরে গেছেন দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ১৯৬১ সালের ১৮ মে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা প্রয়াত এএফএম আবদুর রহমান চৌধুরীও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি অনার্স ও এলএলএম ডিগ্রি নেওয়ার পর যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক আইনের ওপর আরেকটি মাস্টার্স করেন।
জুবায়ের রহমান চৌধুরী ১৯৮৫ সালে জজ কোর্টে ও ১৯৮৭ সালের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট জুবায়ের রহমান চৌধুরী অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে হাইকোর্ট বিভাগে নিয়োগ পান। দুই বছর পর হাইকোর্ট বিভাগে তার নিয়োগ স্থায়ী। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন এবং ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট তিনি শপথ পাঠ করেন।
২২ জনকে হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি নিয়োগ॥ নিয়োগ পাওয়া হাইকোর্টের ২২ অতিরিক্ত বিচারপতিকে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তবে বাদ পড়েছেন বিএনপি নেতা নিতাই রায় চৌধুরীর ছেলে বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী। ১১ নবেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ২২ জনকে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগের নিম্নবর্ণিত ২২ জন অতিরিক্ত বিচারককে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগদান করেছেন।
তারা হলেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার, বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেন, বিচারপতি মো. মনসুর আলম, বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুর, বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজা, বিচারপতি মো. যাবিদ হোসেন, বিচারপতি মুবিনা আসাফ, বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলাম, বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকা, বিচারপতি মো. আবদুল মান্নান, বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদী, বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ, বিচারপতি মো. হামিদুর রহমান, বিচারপতি নাসরিন আক্তার, বিচারপতি সাথীকা হোসেন, বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেন, বিচারপতি মো. তৌফিক ইনাম, বিচারপতি ইউসুফ আব্দুল্লাহ সুমন, বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী, বিচারপতি ফয়েজ আহমেদ, বিচারপতি মো. সগীর হোসেন, বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী। এর আগে ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর ২৩ জনকে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। ২৩ জনের মধ্যে বিএনপি নেতা নিতাই রায় চৌধুরীর ছেলে দেবাশীষ রায় চৌধুরী ছিলেন।
১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলা ॥ প্রায় সাড়ে ১৭ বছর আগে গ্রেপ্তার বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ৫ জনকে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। লুৎফুজ্জামান বাবরের এটিই ছিল তার বিরুদ্ধে সর্বশেষ মামলা। ১৪ জানুয়ারি বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরিন আক্তারের হাইকোর্ট (এরপর ৮ পৃষ্ঠায়)
বেঞ্চ এ রায় দেন।
খালাস পাওয়া অন্য ব্যক্তিরা হলেন- রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, নুরুল আমিন, মহসীন তালুকদার ও এনামুল হক। এছাড়া যাবজ্জীবনের পরিবর্তে উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়াকে ১৪ বছর এবং ১০ বছর করে সাজা দেওয়া হয়েছে আকবর হোসেন, লিয়াকত হোসেন, হাফিজুর রহমান ও শাহাবুদ্দিনকে। আর মৃত্যুজনিত কারণে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, দীন মোহাম্মদ, আব্দুর রহিম ও হাজী আব্দুস সোবহানের আপিল বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এবার অস্ত্র আইনের মামলায় খালাস, বাবরের মুক্তিতে বাধা নেই।
এটিএম আজাহারুল ইসলাম ॥ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদ- থেকে খালাস দিয়েছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৭ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ ২৭ মে সকালে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য ছয়জন হলেন- বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি ইমদাদুল হক, বিচারপতি মো. আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। বেঞ্চের সাত বিচারপতি সর্বসম্মতিক্রমে এ রায় দিয়েছেন। রায়ে আপিল বিভাগ অবিলম্বে এটিএম আজহারুল ইসলামকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদ- থেকে খালাস পাওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা হয়ে থাকবে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ॥ বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করেছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। গত ১১ ডিসেম্বর বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ সচিবালয় উদ্বোধন করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি কয়েক যুগ ধরে বিভিন্ন মহল থেকে করা হচ্ছিল। এ নিয়ে নানান আলোচনা-সমালোচনা ও সভা-সমাবেশের মধ্যে ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন ও তার সহকর্মীরা বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করার দাবিতে মামলা করেন। ওই মামলায় ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দেয়। সেই রায়ের ২৬ বছর পর বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় করার পদক্ষেপ গত ২০ নভেম্বর সরকারের অনুমোদন পায়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহাল ॥ বহুল আলোচিত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা করেছেন আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ঘোষণা করে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফের পুনর্বহাল করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে আইনি কোনো বাধা নেই। এ রায়ের মাধ্যমে সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে অন্তর্বতী সরকারে অধীনে।
চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যকর হবে। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের আপিল বিভাগ ২০ নভেম্বর সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর ৬ সদস্য হলেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এসএম ইমদাদুল হক, বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করে আনা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে ১৪ বছর আগে দেওয়া রায় বাতিল ঘোষণা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের অতীতের রায় ছিল কলঙ্কিত ও একাধিক ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ। ১৯৯৬ সালে ১৩তম সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে চালু হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এখন ‘পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করা হলো’। আদালত রায় নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, আগের রায়টিতে রেকর্ড অনুযায়ী বেশ কিছু স্পষ্ট ত্রুটি ছিল। এসব ত্রুটির কারণে সেই রায়টি পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে ।
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদ- ॥ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- প্রদান করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের সর্বোচ্চ সাজা কমিয়ে ৫ বছর কারাদ- দিয়েছে। এছাড়া শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্য বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ১৭ নভেম্বর এ আদেশ প্রদান করেছেন। গণ-অভ্যুত্থানের সময় হত্যাকা-সহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা এটিই প্রথম মামলার রায়।
ইনু-মেনন গ্রেপ্তার ॥ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করার পর ১৪ দলীয় জোটের মধ্যে অস্থিরতা চলছে। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। দীর্ঘ নয় মাসেও বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারেনি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো। ঝুঁকি নিয়েই চলতে হচ্ছে এ দলগুলোর নেতাকর্মীদের। অনেকে এখনো আত্মগোপনেই আছেন।
ইসরাকের মামলা ॥ বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে শপথ পড়ানোর ইস্যুতে সাংবিধানিকভাবে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য শুনে ২৯ মে এ আদেশ দেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ। একই সঙ্গে পর্যবেক্ষণসহ আপিল নিষ্পত্তি করা হয়। আদালতে ইসির পক্ষে শুনানি করেন ড. মো. ইয়াছিন খান। রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন। ইশরাকের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ ॥ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আওতায় সংযোজিত কয়েকটি বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকোর্ট ৮ জুলাই ১৩৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে। রায়ে বলা হয়েছে, সংশোধনীগুলো সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তথা গণতন্ত্রের পরিপন্থি। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর যৌথ স্বাক্ষরে প্রকাশিত এই রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদকে বাতিল ঘোষণা করা হয়। রায়ে আদালত মন্তব্য করেছে, এই অনুচ্ছেদদ্বয় সংবিধানের মূল কাঠামো ধ্বংস করেছে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা ॥ দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে চলমান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তার ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সব আসামিকে খালাস দিয়েছেন আপীল বিভাগ। একই সঙ্গে হাইকোর্ট ও বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করা হয়েছে। সব শেষ মামলা হিসেবে জিয়া অরফানেজ (এতিমখানা) ট্রাস্ট মামলাতেও খালাস পেলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এর ফলে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আর কোনও মামলায় দন্ডাদেশ থাকল না। তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও আর কোনও মামলায় দন্ড থাকল না।
প্রধান বিচারপতি সৈয়ত রেফাত আহমেদ নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ ১৫ জানুয়ারি এ রায় দেন। আপিল বিভাগ তার পর্যবেক্ষণ বলেছেন, এই মামলার বিচারের প্রক্রিয়া ছিল বিদ্বেষপূর্ণ। ঐতিহাসিক এ রায়ে আদালত খালেদা জিয়ার সম্মানহানি ও তাকে হয়রানির উদ্দেশ্যে এ মামলা দায়ের করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন। এ কারণে আপিলকারী এবং যারা আপিল করেনি সকলকে খালাস দেয়া হলো। আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়েছে, সকল আপিল এই বিভাগের (আপিল বিভাগ) সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত দ্বারা মঞ্জুর করা হলো। সে অনুসারে হাইকোর্ট বিভাগ এবং ট্রায়াল কোর্ট উভয়ের রায় বাতিল করা হলো। সকল আপিলকারী তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত না হয়ে তাদের সম্পূর্ণভারে খালাস দেয়া হলো। এই রায় অন্যান্য দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, যারা কোনো আপিল করেননি।
জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন : বিদায়ী বছরের ১ জুন রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাতিল করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে জামায়াতের নিবন্ধনসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিষ্পত্তির জন্য ইসিকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতের করা আবেদনের শুনানি শেষে এ রায় দেন। এই রায়ের ফলে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী নিবন্ধন ও প্রতীক দাঁড়িপাল্লা ফিরে পায়।
এবিএম খায়রুল হকের জামিন আবেদন ॥ জুলাই আন্দোলনে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদলকর্মী আবদুল কাইযুম আহাদ হত্যা মামলাসহ ৫টি মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছেন। ২০ আগষ্ট বিচারপতি এ এস এম আব্দুল মোবিনের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলাগুলো শুনানির জন্য কার্যতালিকায় এসেছে। গত ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদলকর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
বেআইনি রায় দেওয়া ও জাল রায় তৈরির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের একটি মামলায়ও খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গত বছরের ২৫ আগস্ট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল বারী ভূঁইয়া বাদী হয়ে মামলাটি করেন। পরে আরও মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরু ॥ আওয়ামী লীগের শাসনামলে র্যাবের টিএফআই সেলে গুম-নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় আসামি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জন। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলায় বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলো। এদিন আসামিপক্ষে তাদের করা অব্যাহতির জন্য করা আবেদনও ট্রাইব্যুনাল খারিজ করেন।
রাষ্ট্র ও আসামি উভয় পক্ষের শুনানি শেষে নির্ধারিত দিনে ২৩ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেল আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের (ফর্মাল চার্জ) গঠনের আদেশ দেন। মামলার ১৭ আসামির মধ্যে এদিন সকালে গ্রেপ্তার ১০ সেনা কর্মকর্তাকে ঢাকা সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে বাংলাদেশ প্রিজন ভ্যানে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। গুমের মামলায় ১৭ আসামির মধ্যে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন ১০ সেনা কর্মকর্তা।
মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ক্যান্টনমেন্টের বিশেষ কারাগারে থাকা ১০ জন হলেন- কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, কর্নেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, কর্নেল কে এম আজাদ, কর্নেল মো. কামরুল হাসান, কর্নেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল মোমেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারোয়ার বিন কাশেম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন। পলাতক সাত আসামি হলেন- ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি এম খুরশিদ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মো. হারুন অর-রশিদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. খায়রুল ইসলাম।
সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল ॥ বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে কয়েকজন বিচারপতির আচরণ বিষয়ক তথ্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েছে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল। অভিযোগ ওঠায় ১২ বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তাদের হাইকোর্টের বেঞ্চে বিচারকাজ পরিচালনার দায়িত্ব বিরত রাখা হয়। পরবর্তীতে এর মধ্যে কয়েকজন পদত্যাগ করেছেন আর কয়েকজনকে অপসারণ ও অবসরে গেছেন। এর মধ্যে বিচারপতি নাইমা হায়দার, বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি এসএ মনিরুজ্জামানের বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
হাইকোর্ট বিভাগের ১২ জন বিচারপতি হলেন- বিচারপতি নাইমা হায়দার, বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ, বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস, বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার, বিচারপতি আতাউর রহমান, বিচারপতি এসএম মনিরুজ্জামান, বিচারপতি শাহেদ নূর উদ্দিন, বিচারপতি মো. আক্তারুজ্জামান, বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম, বিচারপতি এসএম মাসুদ হোসেন দোলন, বিচারপতি খিজির হায়াত, বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামান।
একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ॥ বিদায়ী বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বহুল আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মৃত্যুদ-প্রাপ্ত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ সব আসামির খালাসের হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা নতুন করে তদন্তে হাইকোর্ট যে পর্যবেক্ষণে দিয়েছিলেন তা বাদ দেন সর্বোচ্চ আদালত। আদালত বলেছেন, নতুন করে তদন্ত করবে কি না, সেটি সরকারের বিষয়।
প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৬ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা আপিল খারিজ করে আপিল বিভাগ এ রায় দেন।
প্যানেল হু








