বিদায়ী বছরজুড়েই আলোচনার শীর্ষে ছিল রাষ্ট্র সংস্কার তথা জুলাই জাতীয় সনদ
বিদায়ী বছরজুড়েই আলোচনার শীর্ষে ছিল রাষ্ট্র সংস্কার তথা জুলাই জাতীয় সনদ। জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিল আলোচিত এই ইস্যুটি। ২০২৫ সাল জুড়ে এই সংস্কার প্রক্রিয়া দেশের রাজনীতিতে ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, যা একটি নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভবিষ্যতের দিকে দেশকে পরিচালিত করবে। প্রায় ৯ মাসব্যাপী ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা শেষে প্রণীত হয় ‘জুলাই চার্টার’, যা সংবিধানের প্রায় অর্ধেক সংশোধনীসহ প্রায় ৮০টিরও বেশি প্রস্তাবকে একত্রিত করে একটি ঐতিহাসিক চূক্তিতে পরিণত হয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটের মাধ্যমে জুলাই চার্টারের ভাগ্য নির্ধারিত হবে।
গণ-অভ্যুত্থানের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর প্রধান লক্ষ্যই ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার সাধন। বিদায়ী বছরের শুরুতেই সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দেয়, যা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের একটি বড় ধাপ। মূল সংস্কার কমিশনগুলোর চেয়ারম্যানরা একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে, যার কাজ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সাংবিধানিক ও অন্যান্য সংস্কারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা।
দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়, যা সংবিধান, নির্বাচনী ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ এবং দুর্নীতি দমন কাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনে রূপরেখা দেয়। আর আলোচনার ভিত্তিতেই এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়, যা ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সামগ্রিকভাবে, ২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের জন্য পুরানো ব্যবস্থা ভাঙ্গাগড়া এবং নতুন একটি গণতান্ত্রিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির প্রস্তুতির বছর, যা ‘জুলাই সনদ’-এর মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। আর ৩০টি রাজনৈতিক দল বছরজুড়ে দফায় দফায় আলোচনার টেবিলে বসে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্রীয় সংস্কারে উপনীত হওয়ার বিষয়টিও ছিল দেশের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা।
বিদায়ী বছরের শুরুতে নির্বাচনী ব্যবস্থা, সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রশাসন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন- এই প্রধান ছয়টি সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশমালা সরকারের কাছে জমা দেয়। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য, শ্রম, গণমাধ্যম, নারী বিষয়ক ও স্থানীয় সরকার সংস্কারে আরও পাঁচটি কমিশন গঠন করা হয়, যারা মে মাসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে বিদায়ী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়।
দীর্ঘ আলোচনার পর গত ১৭ অক্টোবর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো (বিএনপি ও অন্যান্য ২৪টি দল) ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ স্বাক্ষর করে, যেখানে ৮০টিরও বেশি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। তবে দীর্ঘ আলোচনায় অংশ নিলেও সুনির্দিষ্ট কয়েকটি দাবিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাসদ ও বাংলাদেশ জাসদ জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি।
যেভাবে শুরু এবং শেষ ॥ রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত ঐকমত্য কমিশন ছয়টি সংস্কার কমিশনের কয়েকটি সুপারিশকে তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে, যেগুলো আইনগত বা প্রশাসনিক উপায়ে বাস্তবায়ন করা হবে। পরে ১৬৬টি মূল প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে কমিশন। প্রথম পর্যায়ে, কমিশন ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে প্রায় তিন মাস ধরে আলাদাভাবে বৈঠক করে, এবং পরে ২০টি অমীমাংসিত মৌলিক প্রস্তাব নিয়ে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা শুরু করে।
আলোচনার টেবিলে ৬২টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়, যার বেশির ভাগই বিচার বিভাগ সংস্কার এবং দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে, পাশাপাশি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ছয়টি প্রস্তাব। সংবিধান সংস্কার কমিশন ১৮টি প্রস্তাব জমা দেয়, যার মধ্যে একটি [দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ] গঠনের প্রস্তাবও ছিল, যা ৩০টি দলের সমর্থন পেলেও এর কাঠামো নিয়ে মতবিরোধের কারণে অমীমাংসিত থাকে। দ্বিতীয় পর্যায়ে, আরও ১৪টি বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত সাত সদস্যের জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ১১টি সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের একটি ঐকমত্যভিত্তিক রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে তিন দফায় মোট ৭২ দিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ চালায়; প্রথম ধাপে উত্থাপিত ১৬৬টি বিষয়ের মধ্যে ৬৪টিতে ঐকমত্য গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে ২৮ দফা প্রতিশ্রুতিসংবলিত ‘জুলাই সনদ ২০২৫’-এর ভিত্তি নির্ধারণ করে। সনদের খসড়া গত বছরের ২৮ জুলাই চূড়ান্ত করে দলগুলোর কাছে মতামতের জন্য পাঠানো হয়, আগস্ট-সেপ্টেম্বর জুড়ে বাস্তবায়নপদ্ধতি নিয়ে সংলাপের পর ১১ সেপ্টেম্বর খসড়া চূড়ান্ত হয় এবং ১৪-১৫ অক্টোবর চূড়ান্ত অনুলিপি দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়।
সনদটিতে রাষ্ট্র কাঠামো, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ-সংক্রান্ত সংস্কার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ২৫টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এতে স্বাক্ষর করেন। আমন্ত্রিতদের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও কিছু বাম দল সই থেকে বিরত থাকে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে প্রায় ৯ মাস ধরে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করে। আলোচনায় ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো নিয়েই তৈরি হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ, যা সই হয় গত ১৭ অক্টোবর (এনসিপি ও চারটি বাম দল সই করেনি)। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্যই জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি হয়েছে এবং তা নিয়ে গণভোট হবে।
জাতীয় জুলাই সনদের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যেদিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে, সেদিনই গণভোট হবে। নির্বাচনের প্রার্থীকে ভোটের জন্য ভোটারদের যেমন ব্যালট দেওয়া হবে, তেমনি দেওয়া হবে গণভোটের ব্যালট।
গণভোটে প্রশ্ন থাকবে একটি, যেখানে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে হবে। প্রশ্নের অধীন প্রস্তাব থাকবে চারটি। গণভোটের ব্যালটে যে প্রশ্নটি থাকবে তা হলো- ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার-সম্পর্কিত নি¤œলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’
এছাড়া গণভোটের অধীনে একটি প্রশ্নের মধ্যে চারটি প্রস্তাব থাকছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। ২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
৩. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। ৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে। এই চার প্রস্তাবের মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ৪৮টি সংবিধানসংক্রান্ত সুপারিশের সব কটিই রয়েছে। গণভোটে এক প্রশ্নের অধীন চার প্রস্তাব কেন? উত্তর বলা হয়েছে- মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি আমলে নিতে গিয়ে এটা করা হয়েছে।
কোন দলের আপত্তি কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে ॥ (ক) জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারির বিপক্ষে ছিল বিএনপি। তারা চেয়েছিল, প্রজ্ঞাপন জারি করে এটা হোক। তাদের যুক্তি, এ ধরনের আদেশ জারির এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। যদিও জামায়াত সাংবিধানিক আদেশের পক্ষে ছিল। (খ) বিএনপি চেয়েছিল গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ একই দিনে হোক। সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট দিয়েছে। ফলে বিএনপির এ দাবি পূরণ হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে জামায়াতের এই দাবি পূরণ হয়নি। জামায়াত জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোটের দাবি করেছিল।
(গ) সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন পিআর (সংখ্যানুপাতিক) পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির আপত্তি ছিল। বিএনপির চাওয়া ছিল, উচ্চকক্ষে ১০০ আসন বণ্টন হোক নি¤œকক্ষের আসনের অনুপাতে। ধরা যাক, নি¤œকক্ষে একটি দল ১৫০টি আসন পেয়েছে। তাহলে উচ্চকক্ষে তাদের আসন হবে ৫০টি। উচ্চকক্ষ নিয়ে বিএনপির এ ভিন্নমত আমলে নেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে জামায়াত ও এনসিপির দাবি পূরণ হয়েছে। অর্থাৎ সংসদ নির্বাচনে দলগুলো যে অনুপাতে ভোট পাবে, সে অনুপাতে আসন বণ্টন হবে উচ্চকক্ষে। যদি কোনো দল ১০ শতাংশ ভোট পায়, তাহলে উচ্চকক্ষে আসন পাবে ১০টি। সদস্যদের নাম তারা ঠিক করবে।
(ঘ) সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা, অর্থাৎ ১০০ জনের মধ্যে অন্তত ৫১ জনের ভোট দরকার হবে। বিএনপি সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি উচ্চকক্ষে নেওয়ার বিপক্ষে। বিএনপির ভিন্নমত আমলে নেওয়া হয়নি। (ঙ) বিএনপি চেয়েছিল নোট অব ডিসেন্ট, অর্থাৎ ভিন্নমত অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা হোক। অর্থাৎ নির্বাচনে জয়ী হলে তারা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভিন্নমত থাকা প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করবে। এ বিষয়ে বিএনপির দাবি আংশিক পূরণ হয়েছে। মূল বিষয়গুলোতে বিএনপির ভিন্নমত আমলে নেওয়া হয়নি। যেমন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি), মহাহিসাব নিরীক্ষক নিয়োগ ও ন্যায়পাল নিয়োগ।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিএনপি চেয়েছিল দুদকে নিয়োগ আইনের মাধ্যমে সরকার করবে। সেটি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে রাখা হয়নি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে দুদকে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ হবে বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটির মাধ্যমে। এই কমিটি আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতির (প্রধান বিচারপতি ব্যতীত) নেতৃত্বে হবে। কমিটিতে হাইকোর্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান, সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার একজন করে প্রতিনিধি এবং প্রধান বিচারপতি মনোনীত একজন নাগরিক প্রতিনিধি থাকবেন। এই কমিটি নাম প্রস্তাব করবে, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন।
(চ) তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত নেই। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন কীভাবে হবে, তা নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল। তা আমলে নেওয়া হয়নি। (ছ) এনসিপি জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি চেয়েছিল। সেটি অনেকটা হয়েছে। তবে ঐকমত্য কমিশনের একটি বিকল্প সুপারিশে বলা হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময়ে সংসদ সংস্কার প্রস্তাবগুলো অনুমোদনে ব্যর্থ হলে সেগুলো ২৭০ দিন পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে। এটি নিয়ে (এরপর ৮ পৃষ্ঠায়)
আপত্তি ছিল বিএনপির। সরকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশটি আমলে নেয়নি। (জ) এনসিপি চেয়েছিল প্রধান উপদেষ্টা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করবেন। কারণ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে আপত্তি ছিল, যদিও বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আদেশ জারি করতে পারেন রাষ্ট্রপতি। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির নামেই আদেশ জারি হয়েছে।
(ঝ) এনসিপি গণপরিষদ গঠন অথবা আগামী সংসদকে দ্বৈত ভূমিকা দেওয়ার পক্ষে ছিল। জামায়াতও দ্বৈত ভূমিকা দেওয়ার পক্ষে। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে আগামী সংসদকেই সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগামী সংসদ সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। যদিও বিএনপি সংসদকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের ক্ষমতা দেওয়ার বিপক্ষে ছিল।
ঐকমত্য কমিশন মত-দ্বিমত-ভিন্নমত যেখানে ॥ দুই দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ৯৫টি ইস্যুতে ঐকমত্য কমিশন আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে ৬৮টি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নিতে মার্চের মাঝামাঝি থেকেই একে একে রাজনৈতিক দলগুলো হাজির হয় রাজধানীর বিভিন্ন ভেন্যুতে। কেউ মতামত জমা দেয়, কেউ সরাসরি মুখোমুখি বসে আলোচনা করে। কারও কারও বক্তব্য ছিল ক্ষীণ, কেউ আবার দিয়েছেন ১০৮টি পর্যন্ত পরামর্শ। এসব নিয়েই গঠিত হয় একটি বড় রাজনৈতিক নথি- জুলাই সনদ।
তবে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সরকারি কর্ম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে জোরালো আপত্তি জানিয়েছে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের। তারা এ সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে যুক্ত না করে আইনের মাধ্যমে নিয়োগ করার পক্ষে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে দলগুলো একমত হলেও উচ্চকক্ষের নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে মতভিন্নতা শেষ পর্যন্ত কাটেনি। সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ছিল, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে অর্থাৎ সারা দেশে একটি দল যত ভোট পাবে, তার অনুপাতে তারা উচ্চকক্ষে আসন পাবে। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বেশির ভাগ দল এই প্রস্তাবে একমত। তবে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের এতে আপত্তি জানিয়েছে। রাষ্ট্রের মূলনীতি প্রশ্নেও দলগুলো মোটাদাগে বিভক্ত থেকেছে শেষ পর্যন্ত। সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ করার প্রস্তাব নিয়েও এখন পর্যন্ত সেভাবে আলোচনা হয়নি। রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হলেও নিষ্পত্তি হয়নি।
বছরজুড়ে আলোচনার মাধ্যমে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদের ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিত্ব, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সংক্রান্ত বিধান, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, সংবিধান সংশোধন, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট বিশেষত উচ্চকক্ষ গঠন, সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি ও এখতিয়ার, রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতি, ইলেক্টোরাল কলেজ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার সমপ্রসারণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি।
আলোচনায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ রাজনৈতিক দল জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে বিদায়ী বছরের শুরু থেকে যে অনিশ্চয়তা-সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল, তা বছর শেষেও সেই সংশয় বা অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। আর এই গণভোটের নির্ধারিত হবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ভাগ্য। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার। আর ‘না’ জয়যুক্ত হলে নির্বাচিত সরকারের তা বাস্তবায়নের বাধ্যবাদকতা থাকবে না- এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাই দেশবাসীরও অপেক্ষা, গণভোটের ফলাফলের জন্য।
প্যানেল হু








