ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অজানা ইতিহাস

শাহেদ কায়েস

প্রকাশিত: ২২:৫৫, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫; আপডেট: ০৬:২২, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অজানা ইতিহাস

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অনুচ্চারিত কিন্তু দীপ্তিময় অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধ কেবল বাহুবলের যুদ্ধ ছিল না, ছিল আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক অন্তর্গত যাত্রাÑ যেখানে পুরুষের পাশাপাশি সমান দৃঢ়তায় দাঁড়িয়েছিলেন অসংখ্য নারী, যাদের কণ্ঠ আজও ইতিহাসের প্রান্তে মৃদু প্রতিধ্বনির মতো শোনা যায়।

পুরুষদের পাশাপাশি অসংখ্য নারী অস্ত্র হাতে লড়েছেন, কেউ হয়েছেন বার্তাবাহক, কেউ বা পাড়ি দিয়েছেন শত্রু-ঘেরাটোপের ভয়াবহ পথ। অনেকেই নিজের ঘরকে পরিণত করেছেন গোপন আস্তানায়, রক্তাক্ত যোদ্ধাদের সেবা করেছেন মায়ের মতো মমতায়, আবার  কেউ কেউ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন নিঃশব্দে, নিঃস্বার্থে। কেউ সহ্য করেছেন অমানুষিক নির্যাতন, কেউ হারিয়েছেন পরিবার। তাদের সাহস, ত্যাগ ও নীরব প্রতিরোধ মুক্তিযুদ্ধকে দিয়েছে গভীরতম শক্তি।
তবুও স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও তাদের অসংখ্য ত্যাগচিহ্ন ইতিহাসে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হয়নি।  অনেকের নাম ধুলো জমা স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। বিজয়ের মাস এলেই তাই নতুন করে মনে হয়Ñ আমাদের স্বাধীনতার নেপথ্যে যে বীর নারীরা নিঃশব্দ আলো জ্বেলে রেখেছিলেন, তাদের প্রত্যেককে জানানো প্রয়োজন গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। কারণ এই ভুলে যাওয়া সাহসী নারীরা শুধু ইতিহাসের প্রান্তিক চরিত্র নন, তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রাণস্পন্দন, আমাদের জাতিসত্তার অন্তর্লীন শক্তি।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাদের গল্প পৌঁছে দেওয়া তাই কেবল ইতিহাসচর্চা নয়, বরং আমাদের নৈতিক দায়িত্বÑ যাতে আমরা কখনো ভুলে না যাই, স্বাধীনতার মূলে এইসব নারীযোদ্ধাদের নীরব কিন্তু অদম্য আত্মত্যাগ জড়িয়ে আছে।
স্বাধীনতার জন্য কত প্রাণ ঝরেছে, কত পরিবার ত্যাগ স্বীকার করেছেন- তার সামান্য অংশই আমাদের জানা। সেই অগণিত বীরের মধ্যে উজ্জ্বলতর হয়ে আছেন চারজন অসাধারণ নারী মুক্তিযোদ্ধা- দুঃসাহস ও দৃঢ়তার প্রতীক বীর তারামন বিবি, নির্যাতন ও প্রতিরোধের মহাকাব্য শহীদ ভাগীরথী সাহা, সংগ্রামের দীপ্তিময় আলো শহীদ লুৎফুন্নাহার হেলেন এবং পুরুষের ছদ্মবেশে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়া বীর শিরিন বানু মিতিল। এরা প্রত্যেকেই প্রমাণ করেছেন- বাংলার নারী শুধু ঘরের আলো নন, জাতির মুক্তিরও অগ্নিশিখা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি ॥ তেরো 
বছরের এক অগ্নিশিখা
তেরো বছরের এক অগ্নিশিখা- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অধ্যায়। কুড়িগ্রামের শংকর মাধবপুরের নরম সবুজভরা গ্রামটিতে তখনো যুদ্ধের আগুন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি, কিন্তু বাতাসে ছিল অশান্ত সময়ের পূর্বাভাস। ঠিক সেই সময় মাত্র তেরো বছরের এক কিশোরী মেয়ের জীবনে ঘটে যায় এক অভূতপূর্ব বাঁক। বাড়ির কাছে রান্নার জন্য কচুরমুখি তুলতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়লেন মুক্তিযোদ্ধা মুহিব হালদারের, আর সেই মুহূর্তে যেন তারামনের ভাগ্য এক অন্য পথে যাত্রা শুরু করল।
প্রথমে তাকে রাখা হলো ক্যাম্পের রান্নার কাজেÑ কিন্তু আগুনে হাঁড়ি চাপানোর সময় তার চোখে যে অদম্য দীপ্তি ফুটে উঠত, মুহিব হালদার তা লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, এই মেয়ের মনে লুকিয়ে আছে প্রতিরোধের এক লৌহদৃঢ় সত্তা। তাই রান্নার ফাঁকে ফাঁকে তিনি তারামন বিবিকে শেখাতে শুরু করলেন অস্ত্র চালনা, গেরিলা কৌশল, আত্মরক্ষার উপায়। আশ্চর্যের বিষয়, তারামন প্রথম দিন থেকেই ছিলেন মনোযোগী, সাহসী এবং বিচক্ষণ।
ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন সম্মুখযোদ্ধাÑপুরুষ যোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নেন একাধিক যুদ্ধে। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিটি অভিযানে তার নিখুঁত ভূমিকা তাকে পরিণত করে এক কিংবদন্তিতে। স্বাধীনতার বহু বছর পর তাকে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব দেওয়া হলেও তার দীর্ঘদিনের অজ্ঞাত জীবন মনে করিয়ে দেয়Ñ যুদ্ধের সত্যিকারের নায়করা প্রায়ই ইতিহাসের আলো থেকে দূরে থাকেন।
শহীদ ভাগীরথী সাহা ॥ পোশাকে ভিক্ষুক, মনে অকুতোভয় এক যোদ্ধা 
শহীদ ভাগীরথী সাহার জীবন মুক্তিযুদ্ধের এমন এক বেদনাময় ইতিহাস, যা শুনলে আজও শরীর শিউরে ওঠে। ফিরোজপুরের সাধারণ এক নারী হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ সাহসের প্রতীক। ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে দিনের পর দিন পাক সেনাদের শিবিরে ঘোরাফেরা করেছেন, কৌশলে সংগ্রহ করেছেন অস্ত্রের অবস্থান, টহলের সময়সূচি, হামলার আগাম ইঙ্গিতÑ এসবই পৌঁছে দিতেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল মৃত্যুর ছায়া, তবু দেশের প্রতি ভালোবাসা তাকে থামাতে পারেনি।
বিশ্বাসঘাতক রাজাকারদের ফাঁদে পড়ে একদিন ভাগীরথী পাক সেনাদের হাতে ধরা পড়েন। তারপর শুরু হয় অমানবিকতার এক নিষ্ঠুরতম অধ্যায়। পিরোজপুর শহরের দুই কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক রঞ্জিত হয় তাঁর রক্তে। মুক্তিযোদ্ধাদের হয়ে গুপ্তচরের কাজ করার অভিযোগে তাকে মিলিটারি জিপের পেছনে বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে ঘোরানো হয় পুরো শহরজুড়েÑ পাথর, ধুলো আর রোদে ক্ষতবিক্ষত হতে হতে তাঁর শরীর হয়ে ওঠে পাকিস্তানি বর্বরতার জীবন্ত সাক্ষ্য।
শহীদ লুৎফুন্নাহার হেলেন ॥ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল প্রতীক
মাগুরায় জন্ম নেওয়া লুৎফুন্নাহার হেলেনের পৈত্রিক নিবাস ছিল মোহাম্মদপুর উপজেলার হরেকৃষ্ণপুর গ্রামে। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সক্রিয় ছিলেন শিক্ষা আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও প্রগতিশীল রাজনীতিতে। মাগুরা কলেজে ছাত্র সংসদের মহিলা সম্পাদক এবং পরে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভানেত্রী হিসেবে তিনি নেতৃত্বের পরিচয় দেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে হেলেন ভাইদের সঙ্গে প্রতিরোধযুদ্ধে যোগ দেন। মোহাম্মদপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে উঠলে তিনি স্থানীয় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, তথ্য সংগ্রহ, আহতদের সেবা ও নারীদের সংগঠিত করার দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষদিকে রাজাকাররা শিশুপুত্রসহ তাঁকে আটক করে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। শিশুকে ফেরত দেওয়া হলেও হেলেনকে বন্দি রেখে ৫ অক্টোবর নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। তাঁর দেহ টেনে নিয়ে ফেলা হয় নবগঙ্গা নদীর ক্যানেলেÑ যা আর কখনো উদ্ধার করা যায়নি। শহীদ লুৎফুন্নাহার হেলেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ১৯৯৫ সালে তাঁর প্রতিকৃতি সংবলিত একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল ॥ পুরুষের বেশে যুদ্ধ করা দুঃসাহসী এক যোদ্ধা
শিরিন বানু মিতিলের জন্ম পাবনা জেলায়। পাবনায় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ শুরু হয় ২৫ মার্চ থেকেই, আর সেই আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বহু নারী, যাদের মধ্যে শিরিন বানু মিতিল ছিলেন সবচেয়ে উজ্জ্বল এক নাম। পুলিশের বিদ্রোহ জনযুদ্ধে রূপ নিলে ঘরে ঘরে নারীরা গরম পানি, অ্যাসিড বাল্ব, বটি-দা হাতে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। 
মিতিল পুরুষের পোশাক পরে কিশোর যোদ্ধা সেজে সামনের সারিতে যোগ দেন। ২৮ মার্চ টেলিফোন ভবনের যুদ্ধে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই নজর কাড়ে। পরে কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গার পথে ভারতীয় সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকারে তাঁর পরিচয় প্রকাশ পায়। সন্দেহের মুখে পড়েও স্থানীয় প্রতিরোধযোদ্ধাদের একজন তাঁর মাথায় হাত রেখে বলেন, ‘মা, যখন মেয়েরা অস্ত্র হাতে দাঁড়ায়, বিজয় তখন নিশ্চিত।’

এরপর মিতিল ভারতের গোবরা ক্যাম্পে যান প্রশিক্ষণে, যেখানে নারীদের নিয়ে গড়ে ওঠে একটি বড় বাহিনী, যার সদস্য সংখ্যা একসময় ২৪০ ছাড়িয়ে যায়। অস্ত্রের অভাব সত্ত্বেও এই নারীরা চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও সরাসরি যুদ্ধে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন। ২০১৬ সালের ২১ জুলাই আমাদের ছেড়ে চলে যান এই কিংবদন্তি যোদ্ধা, যাঁর সাহস ও ত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনির্বাণ শিখা হয়ে রয়ে গেছে।

প্যানেল হু

×