পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ শক্তি হচ্ছে তারুণ্য
পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ শক্তি হচ্ছে তারুণ্য। তারুণ্যের রয়েছে পারমাণবিক ক্ষমতা। যা বিস্ফোরিত হলে সবকিছু ভেঙেচুরে নতুন আলো উদ্ভাসিত হয়। পৃথিবী বদলের কথা তরুণরাই বলতে পারে। জাতিকে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সভ্যতার আলোয় আলোকিত করবার জন্যে তারুণ্যের শক্তিকে দরকার। তারুণ্য প্রয়োজন রাজপথে, মিছিলে, স্লোগানে, যুদ্ধের ময়দানে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সবকটি মুক্তির সংগ্রামে তরুণরাই ছিল অগ্রগামী।
দেশ স্বৈরশাসকের কবলে পড়লে, গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়লে এই তরুণরাই বুক পেতে দেয় স্বৈরশাসকের বুলেটের সামনে। অস্ত্রের ঝনঝনানি পরাজিত হয় তারুণ্যের গর্জনে। তরুণরা ঐক্যবদ্ধ হলে, একটি জাতি এগিয়ে যেতে খুব বেশি সময় নেয়না আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আপামর জনগণের পাশাপাশি প্রাণ হারিয়েছেন লাখো তরুণ, তরুণী। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই পেয়েছি আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান কিংবা তিউনিসিয়ার জেসমিন বিপ্লব, প্রতিটি বিপ্লবেই রয়েছে তারুণ্যের রক্তক্ষয়ী অবদান। ক্ষুদিরাম, নুর হোসেন, আসাদ কিংবা আজকের আবু সাঈদ সবাই তরুণ ছিলেন। সবার বুকের ভেতরেই ছিল মুক্তির অদম্য অভিপ্রায়। এই তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করলে যে কোনো দেশ ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য।
আজকের বাংলাদেশ তরুণদের বিজয় গাঁথা বাংলাদেশ। এই তরুণদের বাংলাদেশ ভ্রান্ত পথিকের পেছন পেছন হেঁটে কালের গহ্বরে হারিয়ে যেতে পারে না। তারা স্বপ্ন দেখে এক বৈষম্যহীন বাংলাদেশের। যে দেশে শ্রমিক তাঁর ন্যায্য মজুরি পাবে, মেধাবি তার মেধা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। ঘুষ, চাঁদাবাজি, মববাজি ও সকল অন্যায়ের বিপক্ষে তারুণ্যের কণ্ঠস্বর থাকবে প্রতিবাদী সিংহের মতো।
তারা অন্ধকারের গহিন থেকে ছিনিয়ে আনবে কোমল কুসমিত ভোরের আলো। যে আলোয় উন্মোচিত হবে আগামির পথ। দলে দলে কাঁধেকাঁধ মিলিয়ে দেশ গঠনের দৃঢ় প্রত্যয়ে যারা সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। যারা ইতিহাস গড়বে কিন্তু ইতিহাসকে ভুলে যাবে না, ইতিহাসকে বিকৃত করবেনা, ইতিহাসকে সংরক্ষণ করবে তার স্বীয় মর্যাদা অক্ষুণœ রেখে।
যতবারই স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু তাকে চোখ রাঙাবে ততবারই সে গর্জে উঠবে। এই তরুণ প্রজন্ম কখনো নিজেই স্বৈরশাসক হয়ে উঠবে না। যদি তারা স্বৈরশাসকের মতোই আচরণ করে তবে তাদের এ বিজয়গাঁথা মলিন হবে। আমরা হারাবো স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ। তারা মুক্ত পাখির মতো ডানাঝাপটাতে জানে। তাদেরকে উড়তে দাও বাংলার আকাশে, তাদেরকে গাইতে দাও গানগলা ছেড়ে। এই তারুণ্য সব অপশক্তির বিপক্ষে রুখে দাঁড়াবে। তারা হবে যৌক্তিক, বুদ্ধিমান ও আবেগ প্রবণ অথচ বাস্তববাদী।
বিজয়ের স্বাদ তো তখনই আসে যখন আলোর মশাল সঠিক পথে সঠিক পথিককে পথ দেখায়। ভুল মানুষের হাতে এই তারুণ্যের শক্তিতে ছেড়ে দেয়া যাবে না। তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এই তারুণ্যের শক্তি ভেঙে পড়বে, পথ হারাবে। তাদেরকে গ্রাস করবে মোহ, লোভ ও একনায়কতন্ত্রের বাসনা। অথচ তারুণ্য কোনো মোহে আটকায়না, কোনো বাঁধা মানেনা। এটাই তারুণ্যের ধর্ম। তারুণ্যের ধর্ম নতুনত্ব সৃষ্টি করা, ভ্রান্তকে দূর করে সত্যকে সামনে আনা।
বিগত এক দশকে, একটা সময় মনে হচ্ছিল আমাদের তরুণরা ঘুমিয়ে পড়েছে। এরাই কী আমাদের সেই তরুণ যারা বাহান্ন আর একাত্তরে দেশমাতৃকার মুক্তি কামনায় স্বশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমরা বিশ^াস হারিয়েছিলাম তারুণ্যের প্রতি। কিন্তু তরুণরা দেখিয়ে দিল কিভাবে একনায়কতন্ত্রের ভীত নাড়িয়ে দিতে হয়। আমরা এখনো তরুণদের বিশ^াস করতে চাই। তবে বিশ^াস ভঙ্গ হবে যদি তরুণরাও সেই অটোক্রেটিক মানসিকতাকে লালন করে। তাদের ভেতরে যদি ঠাঁই দেয় লোভ, লালসা, মোহ।
যদি তারা মুছে ফেলতে চায় আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের চিহ্ন। আমাদের এই তরুণ সমাজ ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। আমাদের একাত্তরকে তারা ভুলে যাবে না, লালন করবে তার চেতনা। নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে তারা একসাথে কাজক রবে। জাগতিক মোহে তারা নিমজ্জিত হয়ে পাপাচারে লিপ্ত হবেনা। কোনো কালো থাবা তাকে যেন গ্রাস না করে, কোনো অদৃশ্য ফাঁদে তারা যেন পা না দেয়।
নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ত্রিশ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে পেয়েছি আমরা একটি লাল সবুজের পতাকা। এ পতাকা যার হাতেই গিয়েছি সে হয়ে উঠেছে ক্ষমতালোভী স্বৈরশাসক। পতাকার সম্মান ভূলণ্ঠিত হয় যখন দেশে কায়েম হয় স্বৈরশাসন, কায়েম হয় একনায়কতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ, গণতন্ত্রহীনতা। দেশের নাগরিক তার ভোটধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। তাদের দিনের ভোট রাতে হয়ে যায়। অনেক বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে একটি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে।
এই আমজনতার বিপ্লব তারুণ্যের বিপ্লব ও পুনরায় বেহাত ওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যখন দেখি সেই আগের মতোই স্বাধীনতা বেহাত হচ্ছে। মানুষকে বঞ্চিত করা হচ্ছে তার ন্যায্য অধিকার থেকে। আবারও কোটা নামক বিশেষ সুবিধা বিশেষ চেতনায়, বিশেষ রঙে হাজির হচ্ছে কর্মসংস্থানের বাজারে। জনগণ প্রতারিত হয়, ব্যথিত হয়। তাদের বিজয়ের উল্লাস ম্লান হয়ে আসে। এভাবেই কী বারবার বিজয়ের গৌরব বেহাত হবে ভুল মানুষের কাছে। তারুণ্যের শক্তিতে আবারও প্রয়োজন।
আপামরের বিজয়কে বিশেষ গোষ্ঠীর কুক্ষিগত হতে দেয়া যাবেনা। এ বিজয় আঠারো কোটি মানুষের। এ বিজয় এদেশের প্রতিটি মানুষের। কৃষক, কুলি, দিনমজুর, কিশাওয়ালা, পোশাক শ্রমিক, কর্পোরেটকর্মী, নারী, শিশু, যুবক, আবাল, বৃদ্ধ, বনিতা সবার বিজয়। তারুণ্যের আলোয় এ বিজয়কে আলোকিত করতে হবে। দেশকে গঠনের জন্য শিক্ষার আলো ছড়াতে হবে।
এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করার জন্য প্রয়োজন আধুনিক শিক্ষা ও যুগোপযোগী তথ্য-প্রযুক্তি ও জ্ঞানবিজ্ঞানের আলোয় নিজেদের শিক্ষিত করে তোলা। এক টুকরো নিষ্কলুস হাসির জন্য আমাদের সংগ্রাম, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের এ সংগ্রাম। সংগ্রাম চলছে, চলবেই। তারুণ্য পথ হারাবে না, বাংলাদেশ পথ হারাবে না। তারুণ্যের আলোয় উদ্ভাসিত হোক বিজয়ের চেতনা।
প্যানেল হু








