একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া বাংলাদেশের শ্রেণিপেশা নির্বিশেষে কমবেশি সকলেই অংশগ্রহণ করেছে। যদিও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রণের নানারকম পদ্ধতি ও উপায়-কৌশল ছিল।
একাত্তর সালের মার্চ থেকেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্মণগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। মার্চ মাসের দুই তারিখ তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা ও ডাকসু ভিপি আ স ম আবদুর রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে ছাত্র সমাবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করেন। ৩ তারিখ পল্টন ময়দানে বিশাল ছাত্র-গণসমাবেশে ছাত্রলীগ নেতা শাহজাহান সিরাজ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন।
ধারাবাহিকভাবে ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসকে প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন এবং ক্যান্টনমেন্ট ও গভর্নর হাউজ ব্যতিত প্রদেশের সর্বসাধারণ বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হানাদার বাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ঢাকা শহরে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। ২৬ মার্চ বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।
৪ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি ঊর্ধ্বতন সেনাকর্মকর্তারা সিলেটের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি পরামর্শ সভা আহবান করেন। সেখানে সমগ্র বাংলাদেশকে চারটি সামরিক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়। অঞ্চল চারটি ও দায়িত্ব নি¤œরূপ : ১. চট্টগ্রাম অঞ্চল : মেজর জিয়াউর রহমান ২. কুমিল্লা অঞ্চল : মেজর কে এম শফিউল্লাহ ৩. সিলেট অঞ্চল : মেজর খালেদ মোশাররফ ও ৪. যশোর অঞ্চল : মেজর কে. এম আবু ওসমান চৌধুরী। তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্ব ১০ এপ্রিল অস্থায়ী প্রবাসী সরকার গঠিত হয়।
এই সরকারে শেখ মুজিবুর রহমান অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দীন আহমদ। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অস্থায়ী প্রবাসী সরকার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার ঐতিহাসিক আম্রকাননে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে।
কার্যত এর পর থেকে অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করতে শুরু করে। এর অংশ হিসেবে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হন জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী। মুক্তিবাহিনীর চিফ অব স্টাফ নির্বাচিত হন জেনারেল এম এ রব। মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। অবশেষে দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় তথা স্বাধীনতা অর্জন করে।
এই হলো মহান মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এর অংশগ্রহণ ছিল সর্বব্যাপ্ত। দীর্ঘদিন যাবৎ মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক অংশগ্রহণের গৌরবকে অত্যন্ত সুকৌশলে দুই একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও স্বাধীনতাকামী সেনাবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ বাহিনীসহ সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক ও পেশাজীবীগণ অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মার্চ মাসের ২৬ তারিখ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। ঢাকায় গণহত্যার শিকার সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ইপিআর বাহিনীর সদস্যগণ সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। এসকল বাহিনীর সদস্যরা সারা দেশের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থানীয়দের সহযোগিতায় প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।
’৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ভারতের পশ্চিম সীমান্তে হামলা করে। তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে মিত্রবাহিনী গঠিত হয়। মূলত ৪ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিবাহিনী সর্বাত্মক হামলা চালায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ময়মনসিংহ অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ময়মনসিংহ অঞ্চল হানাদার বাহিনী মুক্ত করে। এই বিজয়ের অগ্রাভিযানে বিভিন্ন নদী পারাপারের ক্ষেত্রে সাধারণ জনতা যেভাবে পারে সাহায্য করেন।
পুরো নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা-খাওয়া এবং আশ্রয় দিয়ে সাধারণ জনগণ মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করে। মুক্তিবাহিনী ও সাধারণ জনগণ একাত্ম হয়ে যায়। এরকম বহু উদাহরণ আছে মুক্তিবাহিনীর সদস্যগণ কৃষক-শ্রমিকের বেশ ধরে সাধারণ জনপদের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিলেন যে, কে মুক্তিযোদ্ধা, কে সাধারণ জনতা তা বোঝার কোন উপায় ছিল না। এমনকি সাধারণ জনগণ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অনুগত ও বশংবদ সেজে বিভিন্ন সামরিক তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করতো।
যার ভিত্তিতে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা করে অবিশ্বাস্য ও স্মরণীয় বিজয় অর্জন করেছে। তৎকালীন টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও গাজীপুরের একাংশে মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি ছিল কাদেরিয়া বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনীর ভূমিকা ও অবদান ছিল অতুলনীয়। একইভাবে ভালুকার আফসার বাহিনী, টাঙ্গাইল বাতেনিয়া বাহিনী, মুক্তাগাছার রেফাজ বাহিনী ও দক্ষিণবঙ্গে হেমায়েত বাহিনীসহ ছোট বড় অনেক স্থানীয় মুক্তিবাহিনীর গ্রুপ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় থেকে সাহসী ভূমিকা পালন করে। এই সকল বাহিনীর মূল ভিত্তি ছিল স্থানীয় জনগণের নিঃশর্ত সমর্থন ও সহযোগিতা। তাঁরা মূলত সাধারণ জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়ে নিজস্ব এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা ট্রেনিং গ্রহণ করেছিলেন।
এলাকার রাস্তাঘাট, খালবিল, নদীনালা, হাওড় বাঁওড়, বন-জঙ্গল, ফসলের মাঠ, ঝোপঝাড় থেকে এই ভূমির অবস্থানই তাদের প্রতিরক্ষা শিবির। এমনকি অনেক সময় দেখা গেছে মানুষের দৈনন্দিন উপকরণ, কৃষি উপকরণ, জেলেদের মাছ ধরার উপকরণ ও শ্রমিকদের যন্ত্রপাতিই মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক জুলাই-আগস্ট মাসের দিকে গফরগাঁওয়ের পাইথল গ্রামে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী হামলা চালায়।
ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ আত্মরক্ষার জন্য জীবন নিয়ে যে যেদিকে পারে পালিয়ে যেতে থাকে। এমন অবস্থায় একজন কৃষক নদীর অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে গরুর জোয়াল মেশিন গানের মতো তাক করে ঠেঁরো বলে চিৎকার দেন। হানাদার বাহিনী এই জোয়ালটা দেখে হতচকিত হয়ে ওঠে। তারা এটাকে অপ্রচলিত ও ভয়ানক অস্ত্র মনে করে পিছু হটে যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এরকম বহু উদাহরণ আছে। মুক্তিযুদ্ধের এ সকল অনিয়মিত পদ্ধতিই এতবড় প্রশিক্ষিত বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল।
মূল কথা হলোÑ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জন শুধু ২ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬৭ জন মুক্তিবাহিনীর একক অর্জন নয়। নিঃসন্দেহে মুক্তিযোদ্ধাগণ সময়ের সাহসী সন্তান ও হাজার বছরের বীর পুরুষ। তাদের সাহসী ভূমিকা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে সফল হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তাদের আত্মত্যাগ, সাহসিকতা ও দূরদর্শী ভূমিকা কেবল ইতিহাসের বিষয়বস্তু নয়, বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে বেঁচে থাকার প্রেরণা।
আর এটি অর্থবহ ও সফল হয়ে ওঠে ব্যাপক গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে। মুক্তিযুদ্ধের অপর নাম বাঙালির গণযুদ্ধ। বাঙালির সাহস ও আত্মত্যাগের মহাকাব্য। বাঙালির বিজয়ের দিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী গণমানুষকে। তাদের অংশগ্রহণ মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধকে গৌরবান্বিত করেছে।
প্যানেল হু








