শান্তনুর অহঙ্কার
এক রাতে আব্বা এসে বললেন- দেশের অবস্থা খুব খারাপ। পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ মনে হয় ঠেকানো গেল না।
এর কয়দিন পর সত্যি সত্যি দেশে যুদ্ধ শুরু। শান্তনু তখন খুবই ছোট। আক্কাস মামার কাছে লেখাপড়ার হাতেখড়ি। অ, আ, ক, খ পড়ায় যতো না মনোযোগ, তার চেয়ে বইয়ের পাতায় আঁকা ছবি দেখায় মনোযোগ বেশি। পিংপং বল আর টেনিস বল নিয়ে খেলা করায় মনোযোগ বেশি।
যুদ্ধ শুরু হলো। আব্বা শান্তনুদের মামাবাড়ি সুন্দরপুর পাঠিয়ে দিলেন। কখনো মামাবাড়ি, কখনো মেজো বোনের শ্বশুরবাড়ি এই করে দিন কাটে। মেজোবু নিজের হাতের গোসল করিয়ে দিতেন। গা মুছে দিতেন। মায়ের স্নেহ দিয়ে আগলে রাখতেন। মন তবু ভরতো না শান্তনুর। মার জন্য কান্নাকাটি করতো। আব্বার জন্য কান্নাকাটি করতো।
ওই সময় অনেক নতুন নতুন খেলার সাথী পেয়েছিল শান্তনু। ঢাকা, খুলনা, যশোর থেকে অনেক আত্মীয় সুন্দরপুর এসে আশ্রয় নেয়। বড়লোক আত্মীয়দের গাড়িগুলো কাছারি বাড়ির পেছনে বাগানে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। রেডিওতে নিয়মিত খবর শুনতো সবাই।
ওই সময় একদিন মুক্তিবাহিনীতে সদ্য যোগ দেয়া রজব আলীর সাথে শান্তনুর পরিচয় হয়। রজব আলী শান্তনুকে কাছে নিয়ে আদর করেছিল। বলেছিল- তোমার দুলা ভাইয়ের সাথে আমিও দেশ স্বাধীনের জন্য যুদ্ধ করছি। তার এতোসব কথা শান্তনু অতো বোঝেনি। শুধু বুঝেছিল, রজব আলী মেজো দুলা ভাইয়ের বন্ধু।
শান্তনুর ছোট মামার ঘরে রাতে ঘুমাতেন শান্তি মামা। উনার বাড়ি যশোরে। সারাদিন কোথায় কোথায় থাকতেন। একদিন শান্তি মামার বিছানার নিচে শান্তনু পিস্তল দেখেছিল। মামাতো ভাই অপু বলেছিল, শান্তি মামা মুক্তিযোদ্ধা। মাঝে মাঝে উনি তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আর এ পিস্তল দুঃসময়ে ব্যবহার করার জন্য।
দুঃসময় কি, সুসময় কি অতো বুঝার বয়স শান্তনুর তখনো হয়নি। শুধু বুঝেছিল, মেজোবু শান্তনুকে মার কাছে নিয়ে যাবে বলেও নিচ্ছে না। আব্বার কাছে নিয়ে যাবে বলেও নিয়ে যাচ্ছে না।
একদিন শান্তনুর মেজো ভাই কামাল আর মেজো দুলাভাই শহিদুল ইসলাম সুন্দরপুর এলে মেজোবু বলেছিল- দাদুকে তোমরা মার কাছে নিয়ে যাও, আব্বার কাছে নিয়ে যাও। ওকে আর কতো ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখবো। মেজো দুলাভাই বলেছিল- আর ক’টা দিন সবুর করো।
এরপর এক সকালে ঘুম ভেঙে শান্তনু দেখে, সে তার প্রিয় মেজো বোনের কাছে নেই। সে তার মায়ের কাছে। মা যেখানে ছিল সে গ্রামটার নাম জিতেরপুর। মাকে কাছে পেয়ে খুব ভালো লাগছিল শান্তনুর। আরো ভালো লাগছিল প্রতিবেশী খেলার সাথী মিন্টু, ভুট্টো, আকবরকে পেয়ে।
কিন্তু কয়েকদিন যেতেই আর এক সমস্যা। আব্বার জন্য বুক চিন চিন করছিল শান্তনুর। আব্বার কাছে যাবো, আব্বার কাছে যাবো বলে হু হু করে কাঁদছিল। আরো কিছুদিন অপেক্ষার পর এক দুপুরবেলা আব্বা এলো। সুখের খবর নিয়েই এলো। আব্বা এসে শান্তনুকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। বললেন, পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ। চল বাজান বাড়ি যাই। তোর মাকে গুছিয়ে নিতে বল। এখন বাড়ি ফিরলে আর অসুবিধে নেই।
ওইদিনই বিকেল নাগাদ নদী পার হয়ে জিতেরপুর থেকে সলেমানপুর। সলেমানপুর শান্তনুদের বাড়ি। বসবাস না করায় বাড়িটাতে একটা ভূতুড়ে ভাব। আগাছায় ভরে গেছে পুরো বাড়ি। মা এসে সারা দিনরাত কাজ করে বাড়ির চেহারা আগের মতো ফিরিয়ে আনলেন। ফিরে এলো শান্তনুর বাকি সব ভাই-বোন। শুরু হলো এতোদিনের জমে থাকা আনন্দ-বেদনার গল্প। মা কতো খুশি। এই সময় বড় শহরের কিছু আত্মীয় শান্তনুদের বাড়িতে ভিড় জমায়। মার কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে দু-একটা বড় শহরে যুদ্ধ তখনো থামেনি।
শান্তনুর আবছা আবছা মনে আছে পাঞ্জাবি সৈন্যরা, শিখ সৈন্যরা বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়া- আসা করতো। পাঞ্জাবিরা এলে আব্বাদের মুখে কালো ছায়া দেখতো শান্তনু। মুক্তি বাহিনীরা এলে আব্বাদের খুশি খুশি লাগতো।
১৬ ডিসেম্বর অনেক রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হলো দেশ। রেডিওতে, মানুষের মুখে, হাইস্কুল মাঠে শান্তনু শুনলো বিজয়ের ধ্বনি। শান্তনু লাল সবুজের মাঝে স্বাধীন বাংলাদেশের হলুদ রঙের মানচিত্র আঁকা পতাকা নিয়ে বাড়ির ছাদে উঠলো। কারো মুখে বিজয়ের হাসি, কারো মুখে স্বজন হারানোর বেদনা। ওই সময় এক সন্ধ্যায় মায়ের কান্না শুনে শান্তনু। মার বড় ধরনের কোন ক্ষতি হয়ে গেছে।
শান্তনু পরে শুনেছিল তার প্রিয় হেনা খালার স্বামী মনিরুজ্জামান দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে সৈয়দপুরে শহীদ হয়েছেন। মার দুঃখ, হেনা খালার দুঃখ সেই ছোট্ট বেলায় শান্তনু বোঝেনি। আজ বোঝে। আর বোঝে বলেই মাকে নিয়ে, হেনা খালাকে নিয়ে, প্রিয় খালু শহীদ মনিরুজ্জামানকে নিয়ে শান্তনুর অহঙ্কারের শেষ নেই। আনন্দের শেষ নেই।
প্যানেল হু








