ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

ভৌগোলিক নির্দেশক জিআইয়ের গুরুত্ব

ড. মো. আইনুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২১:০৬, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ভৌগোলিক নির্দেশক জিআইয়ের গুরুত্ব

বাংলাদেশে প্রবাদ আছে ‘এ দেশে জীবদ্দশায় গুণীর কদর হয় না

বাংলাদেশে প্রবাদ আছে ‘এ দেশে জীবদ্দশায় গুণীর কদর হয় না’, ‘সময় মতো হুঁশ হয় না’, ‘চারদিকে শোরগোলে টনক নড়ে’, ‘যোগ্য লোক যথাস্থানে বসেন না’ ইত্যাদি। এসব প্রবাদের ব্যতিক্রম যে হয় না তা নয়। তবে হাতে গোনা। প্রবাদগুলোর কথা মনে পড়ে গেল সম্প্রতি বাংলাদেশের ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ ভারতের জিআই বা জিওগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন অর্থাৎ ভৌগোলিক নির্দেশক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার খবর প্রকাশিত হওয়ায় পর এ নিয়ে নতুন করে শোরগোল শুরু হওয়ার পর থেকে।

রাজশাহীর ‘ফজলি আম’ আর আবহমান গ্রামবাংলার ‘নকশীকাঁথা’ জিআই স্বীকৃতি ভারত পেয়ে যাওয়ার পরও এ রকম আলোচনা-সমালোচনা-শোরগোল শুরু হয়েছিল। এরপর কিছু কাজ হয়েছিল, বাংলাদেশের কিছু পণ্য জিআই তালিকায় ঢুকেছিল। তারপর যথারীতি সব শান্ত। কিন্তু ফজলি আম, নকশীকাঁথার অধিকার তার প্রকৃত মালিক বাংলাদেশ আর ফিরে পায়নি। টাঙ্গাইল শাড়ির ভাগ্যও তেমনটাই হতে পারে। কারণ, ব্যাপক সুযোগ থাকলেও ফজলি আমের স্বত্ব বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়ে গেছে।

নকশীকাঁথাও বাংলাদেশের জিআই তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ ছিল। কিন্তু সচেতনতা, অবহেলা ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বুঝতে না পারা এবং যথাযথ আইনের অভাব অথবা সব বুঝেও উদ্যোগী না হওয়ার কারণেই হয়েছে এমনটা হয়েছে। 
জিআই বিষয়ে পূর্বাপর, গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও বিস্তারিত তুলে ধরার আগে একটি উদাহরণ দেওয়া প্রয়োজন। ২০০৮-২০০৯ সময়কালে ভারত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় মালদা জেলার ফজলি আমের জন্য ভৌগোলিক সূচক লাভ করে। পশ্চিমবঙ্গ যখন ফজলি আমকে জিআই তালিকায় নেয় তখন থেকে বলা শুরু হয়, ‘১৮০০ খ্রিস্টাব্দে মালদহের কালেক্টর র‌্যাভেন সাহেব ঘোড়ার গাড়ি চেপে গৌড় যাচ্ছিলেন। পথে তার জল তেষ্টা মেটানোর জন্য গ্রামের এক মহিলার কাছে জল খেতে চান।

ফজলু বিবি নামে সেই মহিলার বাড়ির আঙিনায় বড় একটি আমগাছ ছিল। ফজলু বিবি সেই আম দিয়ে ফকির-সন্ন্যাসীদের আপ্যায়ন করতেন (এ জন্য এই আমের আর এক নাম ফকিরভোগ)। ফজলু বিবি তাকে জলের বদলে একটি আম খেতে দেন। আম খেয়ে কালেক্টর সাহেব ইংরেজিতে তাকে আমের নাম জিজ্ঞেস করেন। বুঝতে না পেরে ওই মহিলা তার নিজের নাম বলে বসেন। সেই থেকে ওই আমের নাম হয়ে যায় ফজলি।’ (সূত্র : উইকিপিডিয়া) অথচ বাংলাদেশের বিখ্যাত ফজলি নামের সঙ্গে অবিভক্ত বাংলার জাতীয় নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাম এবং বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থা, জলবায়ু ও মৃত্তিকার বিষয়গুলো গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

এমনকি ২০০ বছর আগে বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার বিশাল আকারের আম পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে পরিচিতি ছিল ‘বাঘা আম’ নামে। আত্মজীবনীকার বি ডি হাবীবুল্লাহর গ্রন্থে শেরেবাংলার ভোজনপ্রিয়তার উল্লেখ আছে। জনশ্রুতি আছে, ১৯২০-২৫ সময়কালে অবিভক্ত বাংলার শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও তৎকালীন কলকাতার মেয়র শেরেবাংলা (পরে ১৯৩৫ সালে প্রধানমন্ত্রী) একবার কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে এক বসায় রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের প্রায় অর্ধশত বিশাল আকারের আম খেয়ে ফেলেছিলেন। সেই থেকে আমটির নাম ফজলি হয়ে যায়।

এই জনশ্রুতি কতটা সত্য তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। যেমন প্রশ্ন থাকতে পারে ভারতের দাবি করা ‘ফজলু বিবি’র নাম নিয়েও। অধিক প্রসিদ্ধ ও সুস্বাদু হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার ফকিরভোগ আমকে কৌশলে ফজলি আম বলে তালিকাভুক্ত করে নিয়েছে, অথচ প্রকৃত ফজলি আমের উৎপত্তিস্থল যে বাংলাদেশের রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকা জুড়ে তা নিয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের দ্বিমত নেই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’য় ১৯২৮ সালে প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত) বাংলাদেশের ফজলি আমের উল্লেখ আছে।

২০২১ সালে বাংলাদেশ সরকার ফজলি আমকে জিআইভুক্ত করতে সক্ষম হয়। তবে ‘ফজলি ম্যাঙ্গো অব রাজশাহী’ অর্থাৎ ‘রাজশাহীর ফজলি আম’ নামে। বাংলাদেশের বাজারে আমরা এখন ‘ফজলি আম’ বলে কেনাবেচা করি। এখন যদি পশ্চিমবঙ্গ সরকার মালদা জেলার আম দাবি করে রাজশাহীর আম নিয়ে আপত্তি জানায় এবং প্রমাণ করতে পারে, সেক্ষেত্রে ডব্লিউটিওর নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশের জরিমানা হতে পারে। এ যেন ‘আমার ঘর, আমার বাড়ি- অথচ আমি থাকতে পারি না’ অবস্থা। নকশীকাঁথার বেলায়ও এমনটা হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশন (ডব্লিউআইপিও) নামে আন্তর্জাতিক সংস্থা সৃষ্টি হয় মূলত শিল্প সম্পত্তি (উদ্ভাবন, ট্রেডমার্ক ও ডিজাইন) এবং কপিরাইটযুক্ত উপকরণসমূহের (সাহিত্য, বাদ্যযন্ত্র, ফটোগ্রাফিক এবং অন্যান্য শৈল্পিক কাজ) বিশ্বব্যাপী সুরক্ষা ও গুরুত্ব নির্ধারণের জন্য। ১৯৬৭ সালে সুইডেনের স্টকহোমে স্বাক্ষরিত একটি কনভেনশনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি ১৯৭০ সালে কাজ শুরু করে। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের একটি বিশেষ সংস্থায় পরিণত হয়, যার সদর দপ্তর জেনেভায় অবস্থিত।

১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন ডব্লিউআইপিও বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে একটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে, তখন মেধা-সম্পদ সুরক্ষা কার্যকর করার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা বৃদ্ধি পায়। বিশ্বের ১৮০টিরও বেশি দেশ ডব্লিউআইপিওর সদস্য, যার প্রধান নীতিনির্ধারণী সংস্থা হলো সাধারণ পরিষদ। ১৭০টির বেশি বেসরকারি সংস্থা এই সংস্থার পর্যবেক্ষক হিসেবে রয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৮৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) সদস্যপদ লাভ করে।

পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশের ২১টি পণ্যকে ডব্লিউআইপিও জিআই সনদ দিয়েছে। আরও ১১টি পেয়েছে প্রাথমিক স্বীকৃতি। এ ছাড়াও এখন আবেদন জমা আছে ১৩টি। এর আগে বাংলাদেশের ১০টি আবেদন যাচাই করে নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। ২০১৬ সালে পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর থেকে দেশের প্রথম পণ্য হিসেবে জিআই সনদ পায় জামদানি।

এরপর স্বীকৃতি পায় বাংলাদেশের ইলিশ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাতি আম, বিজয়পুরের সাদা মাটি, দিনাজপুরের কাটারিভোগ, বাংলাদেশের কালোজিরা, রংপুরের শতরঞ্জি, রাজশাহীর সিল্ক, ঢাকার মসলিন, বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ি, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম, বাংলাদেশের শীতলপাটি, বগুড়ার দই, শেরপুরের তুলসীমালা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া আম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আশ্বিনা আম, বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল গোস্ট, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, কুমিল্লার রসমালাই ও কুষ্টিয়ার তিলের খাজা। তবে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত জিআই পণ্যের মোট সংখ্যা ৩১। পশ্চিমবঙ্গের জিআই স্বত্ব আছে অন্তত ২৪টি। সবমিলিয়ে ভারতের রয়েছে ৫০০-এর বেশি। 
মনে রাখা প্রয়োজন, জিআই সনদপ্রাপ্তি বিখ্যাত কোনো পণ্যের প্রাতিষ্ঠানিক শুধু স্বীকৃতি ও গৌরব বাড়ায় না, এর অনেক বড় অর্থনৈতিক সুবিধাও রয়েছে। কারণ, এতে করে সুনির্দিষ্ট পণ্যটির বিষয়ে মানুষের আগ্রহ, চাহিদা ও বিক্রি বৃদ্ধি পায়। যেমন- বাংলাদেশের বাগদা, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাগঞ্জের ফজলি আম জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। এতে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাইরে এই দুটি জেলার ফজলি আমের অন্য জেলার ফজলি আম থেকে বেশি চাহিদা থাকবে।

জিআই পণ্য হিসেবে বাইরে এই আম রপ্তানি হলে শুধু নামটি ব্যবহারের কারণে এটি থেকে ২০ শতাংশ রয়্যালিটি ফি পাবে সরকার। এ ছাড়া জিআই পণ্য জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বড় ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির প্রসার বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগও বৃদ্ধি পায়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সুন্দরবনের মধু, টাঙ্গাইলের শাড়ি, নকশীকাঁথার জিআই সনদ ভারত আগেই সংগ্রহ করেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘাটতি থাকলেও এখনো সমস্যা নিরসনের কিছু পথ খোলা রয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে এমন সম্ভাব্য জিআই পণ্যগুলোর তালিকা করে সেগুলোকে দ্রুত জিআই পণ্য করে ফেলতে পারলে এবং ভারত যেগুলো করেছে, সেগুলো কিছুটা পরিবর্তিত নামে বাংলাদেশ করে নিলে বেআইনি কিছু হবে না। বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় ফল কাঁঠালসহ আরও কিছু জনপ্রিয় ও বিখ্যাত পণ্য ভারতেও উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশ যদি এ ধরনের পণ্যগুলো ভারতের আগেই জিআই করে নেয় তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে জিআই নিয়ে হতাশ হতে হবে না। আর্থিকভাবেও লাভবান হবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ তার পণ্যের জিআই সুরক্ষা দিতে না পারলে অন্য দেশ এগুলোর মেধাস্বত্ব নিয়ে নেবে। এতে করে বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি পেশা ও বাজার হারানোর সমূহ আশঙ্কা রয়েছে বহির্বিশ্বে।

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদশে অর্থনীতি সমিতি

×