ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

তিনশ’ আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে জাপা 

আওয়ামী লীগ-জাপার রুদ্ধদ্বার বৈঠক

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৩:৪৩, ৬ ডিসেম্বর ২০২৩; আপডেট: ০২:০২, ৭ ডিসেম্বর ২০২৩

আওয়ামী লীগ-জাপার রুদ্ধদ্বার বৈঠক

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে কোন পথে হাঁটছে জাতীয় পার্টি (জাপা)

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে কোন পথে হাঁটছে জাতীয় পাটি (জাপা)। মহাজোটে না এককভাবে নির্বাচন করবে তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। জাপা মুখে এককভাবে নির্বাচনের কথা বললেও  গোপনে সমঝোতার চেষ্টা চলছে।  ছাড় দিয়ে সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি চলছে।  আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বুধবার রাতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাতীয় পার্টির নেতারা। গুলশানের এক হোটেলে অনুষ্ঠিত এই গোপন মিটিংটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক সূত্র জানায়, অনেক গোপনীয়তা রক্ষা করে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিম-লীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম অংশ নেন। 
অন্যদিকে জাতীয় পার্টির পক্ষে দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু, ও কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল হক মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। তবে বৈঠকের বিষয়ে কোনো নেতাই মুখ খুলতে রাজি হননি। তবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 
তবে অনেক অনুরোধের পর বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির দু’জন নেতা জনকণ্ঠকে বলেন, অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের বৈঠক হয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবে এবং এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন জাপার নেতারা। বঠকে জাপা নেতারা জানান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সর্বশক্তি নিয়ে অংশ নেবে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে জাতীয় সংসদে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন জাপার নেতারা।
বৈঠক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে কিছু আসনে সমঝোতার ব্যাপারে আলোচনা হলেও এ ব্যাপারে কোনো পক্ষই মুখ খুলতে রাজি হয়নি। তবে বৈঠকে নিশ্চিত করা হয়েছে, জাতীয় পার্টি তিনশ’ আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেবে, নিজেদের সাংগঠনিক  ও সমর্থনকে পুঁজি করে বিজয়ী হতে সর্বাত্মক ভোটযুদ্ধে অংশ নেবে।
সূত্র মতে  জাতীয় পার্টির এককভাবে নির্বাচন করার শক্তি  নেই। এককভাবে নির্বাচনে  গেলে পার্টির ভরাডুবি হবে। সে কারনেই সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচননের কথা বললেও তারাও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করার পক্ষেই এগোচ্ছে।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এবারের নির্বাচনে জোট-মহাজোট নয়, নিজস্ব দলীয় প্রতীকে অংশ নেবে । ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের কোনো সমঝোতা হলে সেটা ‘মনে মনে’ হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বুধবার  জাপার সঙ্গে আ. লীগের বৈঠক নিয়ে  দিন ভর চলে ‘লুকোচুরি’।   কোথায় ও কখন এ  বৈঠক হবে তা নিয়ে মুখ  খোলেনি  দুদলের কেউই। জাতীয় পার্টির সঙ্গে কখন ও  কোথায় বসবে আওয়ামী লীগ এমন প্রশ্নের জবাবে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, এটা  তো আমি বলব না। বসব,  যেখানেই বসি বসব। বসলে আপনারা খবর পাবেন। এটা গোপন থাকবে না।
জাতীয় পার্টি ৫০ থেকে ৬০টি আসন চায় আওয়ামী লীগের কাছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ  থেকে ২৫ থেকে ৩০টির মতো আসনের বিষয়ে গ্রিন সিগন্যাল  দেওয়া হয়েছে। জাতীয় পার্টি আসন সংখ্যার পাশাপাশি শীর্ষ  নেতাদের আসনও চূড়ান্ত করতে চায় আগে ভাগেই। জাতীয় পার্টির কো- চেয়ারম্যান সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, কো-চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, কো-চেয়ারম্যান সালমা ইসলাম এমপি ও সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপির আসন নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। কাজী ফিরোজ রশীদ ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হন। এ বছর আর কাজী ফিরোজ রশীদকে আসনটি ছেড়ে দিতে নারাজ আওয়ামী লীগ।

ওই আসনে আওয়ামী লীগ সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনকে প্রার্থী করতে চান। জাপার ডোনার খ্যাত সামলা ইসলাম এমপির আসন ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ) নিয়ে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচন থেকেই রশি-টানাটানি চলছে। ওই নির্বাচনে সালমা ইসলামকে হারিয়ে এমপি নির্বাচিত হন বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান। পরে সংরক্ষিত কোটায় এমপি হয়ে আসেন সামলা ইসলাম। এবার আসনটি ছাড় দিতে নারাজ জাপা। অবশ্য সামলা ইসলাম ঢাকা-১ আসনের পাশাপাশি ঢাকা-১৭ আসনেও মনোনয়ন জমা দিয়ে রেখেছেন।
জাতীয় পার্টি সূত্র জানিয়েছে, আসন ভাগাভাগি নিয়ে জাতীয় পার্টির সঙ্গে সরকারি দলের মধ্যস্থতাকারীদের ইতিমধ্যে কয়েকদফা আলোচনা হয়েছে। জাতীয় পার্টি ৬০টি আসনের প্রস্তাব এবং মন্ত্রিপরিষদে ১০ জন সদস্য চেয়েছেন এবং ডেপুটি স্পিকার পদটি দেওয়ার দাবি করেছেন। জানা গেছে, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে জাপা মহাজোটের হয়ে ২৯টি আসনে লড়েছে। এর বাইরে জাতীয় পার্টি ১৩২টি আসনে লড়াই করে। মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে ২৯টি আসনের মধ্যে ২২ আসনে জয়লাভ করে জাতীয় পার্টির প্রার্থী। পরে উপনির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে একজন জয়ী হলেও সমঝোতা হয়নি। ২০১৮ সালে জাতীয় পার্টি জানায়, মহাজোট থেকে ২৯টি আসন পেয়ে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি মহাজোটের সঙ্গে থেকে পেয়েছিল ২৭টি আসন। এরশাদ ও জাতীয় পার্টি ২০০৮ সালের নির্বাচন থেকেই ভোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের মিত্র হিসেবে ছিল। তবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে এরশাদকে ঘিরে অনেক নাটক হয়েছিল। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও জাতীয় পার্টিকে সেই নির্বাচনে অংশ নিতে হয়েছিল। তবে ওই নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টির তিনজন নেতা আওয়ামী লীগ সরকারে মন্ত্রী হয়েছিলেন। একই সঙ্গে সংসদে বিরোধী দলের আসনেও বসেছিল জাপা।
নানা নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে নির্বাচনে আসা জাতীয় পার্টি ২৯৪ আসনে দলীয় মনোনয়ন দেন। দলীয় টিকিট পেলেও ৬ জন প্রার্থী শেষ পর্যন্ত  মনোনয়নপত্র দাখিল করেননি। ছেলে সাদ এরশাদের আসন নিয়ে টান দেওয়া এবং অনুসারীদের মনোনয়ন নিশ্চিত না হওয়ায় ২৯ নভেম্বর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান রওশন এরশাদ। দলীয় কোন্দলের পাশাপাশি সরকারের ওপর আস্থার সংকটে ভুগছে জাতীয় পার্টি। ২০১৪ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মনোনয়ন দাখিলের পর নির্বাচন বর্জণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে রওশনের নেতৃত্বে ৮৭ জন প্রার্থী মাঠে থেকে যায়। এবার মনোনয়ন প্রত্যাহারের দিন, এমনকি নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত  অনিশ্চয়তা থাকবে বলে মনে করেন কেউ কেউ। যে কোনো সময় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন বলে একাধিক সিনিয়র নেতা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। 

×