ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১

রেকর্ড ঋণ প্রতিশ্রুতি

তবে অর্থছাড়ে ধীর গতি ॥ বেড়েছে ঋণ পরিশোধের চাপও

কাওসার রহমান

প্রকাশিত: ২৩:২৯, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

তবে অর্থছাড়ে ধীর গতি ॥ বেড়েছে ঋণ পরিশোধের চাপও

রিজার্ভ সংকটের মধ্যে এ বছর দেশে রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রতিশ্রুতি এসেছে

রিজার্ভ সংকটের মধ্যে এ বছর দেশে রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রতিশ্রুতি এসেছে। ইতোমধ্যে  বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতির পরিমাণ গত অর্থবছরের চেয়ে ছয়গুণ বেড়েছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই সময় পর্যন্ত বিদেশী  ঋণদাতাদের কাছ থেকে ৭২০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। আশা করা হচ্ছে, এ বছর বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতির পরিমাণ এক হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এর সুফল অর্থনীতি পাবে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন। তবে বিদেশী ঋণের প্রতিশ্রুতি বাড়লেও অর্থছাড়ে নেই সুসংবাদ। উল্টো বেড়েছে ঋণ পরিশোধের চাপ।  
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য বলছে, জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ৭১৭ কোটি ২১ লাখ ডলার। যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রতিশ্রুতি ছিল মাত্র ১৭৬ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। এক অর্থবছরের ব্যবধানে প্রতিশ্রুতি বেড়েছে ৫৪০ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের হিসাবে গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ছয়গুণ বেশি অর্থসহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
বিদেশী ঋণ প্রাপ্তির সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে বাংলাদেশ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ১০ বিলিয়ন বা এক হাজার কোটি ডলারের বেশি বিদেশী ঋণ পেয়েছিল। চলতি অর্থবছর বিদেশী ঋণ প্রাপ্তির ওই রেকর্ডও ছাড়িয়েছে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন। তারা বলছেন, নতুন করে বিদেশী ঋণ পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০০ কোটি ডলার। ইতোমধ্যে সেই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। আশা করা হচ্ছে, চলতি অর্থবছরে বিদেশী ঋণের পরিমাণ এক হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে এবং এই ঋণ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের চলমান রিজার্ভ সংকট দূরীভূত হবে। যার সুফল পাবে দেশের অর্থনীতি। 
তবে প্রতিশ্রুতি বাড়লেও বৈদেশিক ঋণ ব্যবহারে হতাশাজনক অবস্থা বিরাজ করছে। ফলে বিদেশী ঋণ ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক হাজার ১২৪ কোটি ডলারের ঋণ ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্থবছরের সাত মাসে মাত্র ৪৪০ কোটি ডলার ব্যবহার করা গেছে।

এতে পাইপলাইনে বিদেশী ঋণের মজুত আরও স্ফীত হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত অব্যবহৃত বিদেশী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৭০০ কোটি ডলারে। অথচ গত ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত এর পরিমাণ ছিল চার হাজার ৩৭৬ কোটি ডলার।  
পাইপলাইনে মজুতের চেয়েও বড় বিষয় হলো, চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে বিদেশী ঋণ ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন। চলতি অর্থবছরে বিদেশী ঋণ ব্যবহারে লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে এক হাজার ১২৪ কোটি ডলার। বাকি পাঁচ মাসে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সরকারকে ৬৮৪ কোটি মার্কিন ডলার খরচ করতে হবে। নির্বাচনী বছরে প্রকল্প বাস্তবায়নের যে ধীরগতি তাতে পাঁচ মাসের মধ্যে এই অর্থ ব্যয় করা খুবই কঠিন হবে। 
কারণ চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ। যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। মূলত এই উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সরকার বিদেশী অর্থ খরচ বা ব্যবহার করে থাকে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এডিপির আওতায় দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকার যে বরাদ্দ দিয়েছে, জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে তার ২৭ দশমিক ১১ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ৭৪ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরের জন্য সরকার মোট দুই লাখ ৭৪ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। 
কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে এডিপিতে অর্থ ব্যয়ের এত কম হার গত ১৩ বছরের মধ্যে আর দেখা যায়নি। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই সময়েও এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছিল ২৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ছাড় বা খরচ করেছে মাত্র ২৫ শতাংশ। আর প্রকল্পে বিদেশী অর্থায়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ৩০ শতাংশ। দুই ব্যয়ের গড় দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ১১ শতাংশ।
বাস্তবায়ন অগ্রগতি কম হওয়ায় সরকার বরাবরের মতো এবারও এডিপি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এডিপি সংশোধনের মাধ্যমে এর আকার ১৮ হাজার কোটি টাকা কমানো হচ্ছে। বিদেশী সহায়তা থেকে এডিপি কমবে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। ফলে সংশোধিত এডিপিতে বিদেশী সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৮৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, আর দেশজ উৎসের অর্থ কমছে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে দেশজ উৎসের অর্থের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে এক লাখ ৬১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

সবমিলিয়ে সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়াচ্ছে দুই লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। অথচ মূল এডিপির আকার ছিল দুই লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরেও সংশোধিত এডিপিতে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছিল।
কর্মকর্তারা বলছেন, অগ্রাধিকার ছাড়া অন্য প্রকল্পগুলোর কার্যক্রমে ধীরগতির কারণেই মূলত বাস্তবায়নের অগ্রগতি কম হয়েছে। অনেক বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পেও ব্যয় সাশ্রয়ী নীতি অনুসরণ করায় চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
বাস্তবায়ন কম হওয়ার বিষয়ে আইএমইডি সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, সারাবিশ্বই এখন আর্থিক সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এখনো আমাদের সেভাবে সংকট না হলেও সতর্কতা হিসেবে অগ্রাধিকার প্রকল্প ছাড়া কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে অর্থছাড় কমানোর সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থায়ন কমিয়ে দেওয়ার কারণেই এবার এডিপি বাস্তবায়ন কম দেখা যাচ্ছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে ঠিকই চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আবার বিদেশী ঋণ ব্যবহার বেশি করতে না পারার কারণে বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপ। ইআরডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ায় বিদেশী ডলার রাখা যাচ্ছে না। ঋণ পরিশোধ করতেই বেশিরভাগ ডলার চলে যাচ্ছে। মূলত বিদেশী ঋণের বেশি প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও বিদেশী অর্থায়নের প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সেই অর্থও সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। যা চাপ বাড়াচ্ছে ঋণ পরিশোধে। 
ইআরডির তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) বৈদেশিক অর্থছাড় হয়েছে ৪৩৯ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। যেখানে একই অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) এসেছিল ৪০৬ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। সেই হিসাবে শুধুমাত্র জানুয়ারিতে দাতা সংস্থাগুলো অর্থছাড় করেছে ৩৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার। অথচ ওই মাসেই ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে ২৮ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ জানুয়ারিতে দাতা সংস্থাগুলো যে অর্থছাড় করেছে তার অধিকাংশই ঋণ পরিশোধেই চলে গেছে।

গত অর্থবছরের চেয়েও এই অর্থবছরে বেড়েছে ঋণ পরিশোধের চাপ। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে যেখানে অর্থছাড় হয়েছিল ৪২৫ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। সেখানে চলতি অর্থবছরে জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত অর্থছাড় হয়েছে ৪৩৯ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অর্থছাড় বেড়েছে ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে প্রথম সাত মাসে দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে নেওয়া বৈদেশিক ঋণের সুদাসলসহ ১৮৫ কোটি ৬৭ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে সরকার। যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছিল ১২৮ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ অর্থবছরের ব্যবধানে সরকারকে ৫৭ কোটি ১৯ লাখ ডলার বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার বেশি অর্থছাড় করেছে দাতা সংস্থাগুলো। একই সময়ে ৫৭ কোটি ১৯ লাখ ডলার বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। সেই হিসাবে অর্থবছরের ব্যবধানে অর্থছাড়ের চেয়ে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৪৩ কোটি ২৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ অর্থছাড়ের চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি ঋণ পরিশোধ বেড়েছে।

একইসঙ্গে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ। গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হয়েছিল ৩৬ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। সেখানে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৭৬ কোটি ৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ, অর্থবছরের ব্যবধানে সুদ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৪০ কোটি ডলার, যা প্রায় দ্বিগুণের বেশি।
চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) থেকে। সংস্থাটি ২৬২ কোটি দুই লাখ ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ২০২ কোটি ছয় লাখ ডলার। বিশ্বব্যাংক দিয়েছে ১৪১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের প্রতিশ্রুতি। তবে অর্থছাড় করলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেও চীন, ভারত ও রাশিয়া থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অর্থছাড়েও এগিয়ে এডিবি। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ১২৪ কোটি ১১ লাখ ডলার অর্থছাড় করেছে সংস্থাটি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থছাড় করেছে জাপান। দেশটির উন্নয়ন সংস্থা থেকে অর্থ এসেছে ৮৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। বিশ্বব্যাংক অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) কাছ থেকে অর্থ এসেছে ৭৬ কোটি ৩২ লাখ ডলার।
একই সময় ৫৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলার দিয়েছে রাশিয়া, আর চীন দিয়েছে ৩৬ কোটি ১৭ লাখ ডলার। এ ছাড়া ভারত ১৬ কোটি ৯৬ লাখ এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে দুই কোটি ৬৯ লাখ ডলার এসেছে। বাকি ৩৬ কোটি ৪৩ লাখ ডলার অর্থছাড় করেছে অন্যান্য দাতা সংস্থা।

×