ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসের চিঠি ॥ প্রভাব পড়বে না- টিপু মুনশি

শ্রম অধিকার ইস্যুতে মার্কিন পদক্ষেপ রাজনৈতিক

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৩:৫৩, ২৯ নভেম্বর ২০২৩

শ্রম অধিকার ইস্যুতে মার্কিন পদক্ষেপ রাজনৈতিক

 টিপু মুনশি

শ্রম অধিকার ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের পেছনে রাজনীতি রয়েছে বলে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাস। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে এই রাজনৈতিক অভিপ্রায় ব্যবহার করতে পারে। শ্রম ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য জরিমানা ও ভিসা বিধিনিষেধের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। এ কারণে বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে তাগিদ দেওয়া হয় চিঠিতে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ নভেম্বর চিঠিটি পাঠানো হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ জানিয়েছেন, চিঠি তিনি পেয়েছেন। তবে এটি কোনো সতর্কবার্তা নয়, এটি স্বাভাবিক যোগাযোগ মাত্র। চিঠিতে বিভিন্ন দেশে শ্রম অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনের মন্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে শ্রম অধিকার পরিস্থিতি উন্নতির প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে এবং শীর্ষ আমলারা এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিবৃতি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। এ ছাড়া এ সংক্রান্ত যেসব বিষয়ে আলোচনা করা হবে সে বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। ব্যবসায়ী সমাজ বিশেষ করে গার্মেন্টস খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, সংকট তৈরি হলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে। 
এদিকে, এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আমেরিকা-ইউরোপ মিলে পোশাক রপ্তানি বন্ধে যে পাঁয়তারা করছে, তা বাস্তবায়ন হবে না। তিনি বলেন, রাজনীতি ও ব্যবসা আলাদা জিনিস। এই দুটি দেশ এমন কিছু করবে না, যার প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে পড়ে। বাংলাদেশ সবচেয়ে কম মূল্যে সারা বিশ্বে ভালোমানের পোশাক রপ্তানি করছে যা অন্য কোনো দেশ পারবে না। কমপ্লায়েন্স ও শ্রম অধিকার ইস্যুতে তিনি আরও জানান, সম্প্রতি গার্মেন্টস খাতে নতুন মজুরি ঘোষণা করা হয়।

এতে এন্ট্রি লেবেলে সাড়ে চার হাজার টাকা মজুরি বেড়েছে যা প্রায় ৫৬ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া রানা প্লাজা ধসের পর ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্স কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নতিতে দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে কাজ করেছে। বিশ্বমানের পোশাক কারখানাগুলো এখন বাংলাদেশে রয়েছে। এ কারণে পোশাকখাত নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। 
এ প্রসঙ্গে কর্মসংস্থান সচিব মো. এহছানে এলাহী সম্প্রতি জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি লেবার ওয়ার্কিং গ্রুপ আছে, তারা প্রতি সপ্তাহে শ্রম মন্ত্রণালয়ে এসে দেখা করেছে। শ্রম অধিকার নিয়ে তাদের এমন কোনো সমস্যা নেই যা সমাধান করা হয়নি। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের শ্রম অধিকার নিয়ে স্টেটমেন্ট দিয়েছে। সেখানে কল্পনা আক্তার নামে একটি মেয়ের নাম বলা হয়েছে। আমরা কোনোদিন দেশ থেকে শুনিনি তার জানমালের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি আরও বলেন, দেশে ৫৮টি লেবার সংক্রান্ত সংস্থা আছে, কোথাও সে অভিযোগ করেনি। এক্ষেত্রে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে এ ইস্যুতে সরকারের অবস্থান ঠিক করা হবে। 
এদিকে, শ্রম অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতির বিষয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো, এদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে পোশাক রপ্তানিতে তৃতীয় শীর্ষ দেশ বাংলাদেশ। পোশাক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত মৎস্য, চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক পণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৯৭০ কোটি মার্কিন ডলারের বাংলাদেশী পণ্য রপ্তানি হয়েছে। যার মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮৫১ কোটি ডলার। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চলতি বছর পোশাক রপ্তানি কিছুটা নেতিবাচক ধারায় রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ জনকণ্ঠকে বলেন, শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। শ্রম অধিকার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এরপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো কোনো অবস্থান নেই। এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শ্রম নীতির ফলে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিখাত যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি, শ্রম অধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার দেশের ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে পোশাকের ন্যায্যমূল্য দিতে অনুরোধ জানানো হবে। 
এদিকে, দেশের শীর্ষ কয়েকজন ব্যবসায়ী সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শ্রম অধিকারবিষয়ক নীতি নিয়ে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে জানা। ওই বৈঠকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি একে আজাদ, পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে সালমান এফ রহমান বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শ্রম অধিকারবিষয়ক নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এটি সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের জন্য নয়। তিনি বলেন, শ্রম পরিস্থিতির উন্নয়নে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করে যাচ্ছি। কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তাদের ঘোষিত নতুন শ্রম অধিকারবিষয়ক নীতির বিষয়ে আমাদের আগ বাড়িয়ে জানার কিছু নেই। অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা কল্পনা আক্তারের ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, শ্রমিক নেতা কল্পনা আক্তার তার ঝুঁকির কথা কখনোই আমাদেরকে  জানাননি। তাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া মন্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, কল্পনা আক্তার এ ধরনের কথা আদৌ বলেছেন কি না, এ বিষয়ে আপনারাও তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।
দূতাবাসের চিঠিতে যা বলা হয়েছে ॥ ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, শ্রম ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য জরিমানা ও ভিসা বিধিনিষেধের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘স্মারকলিপিটি’ বৈশ্বিক নীতি বলে মনে হলেও বাংলাদেশ অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে বলে বিশ্বাসযোগ্য কারণ আছে। এ ছাড়া স্মারকলিপির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উদ্বিগ্ন হওয়ার অনেক কারণ আছে।

স্মারকলিপিতে শ্রম অধিকার নিয়ে যা বলা হয়েছে তার পেছনে রাজনীতি আছে এবং যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে। সুতরাং এই ‘স্মারকলিপি’ বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা, কারণ যুক্তরাষ্ট্র শ্রম ইস্যুর অজুহাতে স্মারকলিপিতে বর্ণিত যে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে। এই স্মারকলিপি বাংলাদেশের পোশাক খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের তাই অগ্রাধিকার দিয়ে এটি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (বাণিজ্য) মো. সেলিম রেজার লেখা চিঠিটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে গত ২০ নভেম্বর। ওই চিঠির সঙ্গে মার্কিন  প্রেসিডেন্টের ‘বিশ্বব্যাপী শ্রমিক ক্ষমতায়ন, অধিকার ও উচ্চ শ্রমমান এগিয়ে নিতে স্মারক সংক্রান্ত একটি সংকলিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন শ্রমিকদের ক্ষমতায়ন, শ্রম অধিকার ও শ্রমিকদের মানসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওই প্রেসিডেনশিয়াল মেমোরেন্ডাম সই করার পর ১৬ নভেম্বর পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে বলেন, যারা শ্রমিকদের অধিকারের বিরুদ্ধে যাবেন, শ্রমিকদের হুমকি দেবেন কিংবা ভয় দেখাবেন, তাদের ওপর প্রয়োজনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। শ্রম অধিকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এ নীতির বিষয়ে জানাতে গিয়ে অ্যান্টনি ব্লিনকেন বাংলাদেশের পোশাক খাতের শ্রমিক আন্দোলনের নেতা কল্পনা আক্তারের নামটিও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কল্পনা জানিয়েছেন, ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস তার পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং এজন্য তিনি (কল্পনা) এখনো বেঁচে আছেন।

×