ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০২ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০

আয়ান ও ইলিশ ভাজা

মনিরা মিতা

প্রকাশিত: ২২:১৪, ১ ডিসেম্বর ২০২৩

আয়ান ও ইলিশ ভাজা

.

আয়ান খুব শান্ত ছেলে। বাবা-মাকে একেবারেই বিরক্ত করে না সে। সব সময় নিজের মতো করে সময় কাটায়। পাঁচ বছর বয়স হলে কি হবে, সবাই তার বুদ্ধির প্রশংসা করে। এই তো সেদিন তার বাবার এক বন্ধু তাদের বাসায় এসেছিল। বেল বাজতেই দৌড়ে গিয়ে দরজার কাছে গেল কিন্তু দরজা খুলল না। বেল বাজলেই দরজা খুলতে হয় না এটা সে জানে। পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে দরজা খোলা মোটেও ঠিক না। ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছোটখাটো একটা ইন্টারভিউ নিয়ে তবেই দরজা খুলল আয়ান। তার এমন বুদ্ধি দেখে তো অবাক মেহমান। আয়ানের মা যখন মেহমানের জন্য নাস্তা নিয়ে এলো তখন আয়ান চুপ করে বসে রইল। নিজ থেকে কোনো খাবারে হাত দিল না।  আঙ্কেল অনেক বলার পর একটি বিস্কুট নিল। আর আঙ্কেল যখন কতগুলো প্রশ্ন করল সে তখন গটগট করে সব উত্তর দিল। তিনি চলে যাওয়ার সময় ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেনমাশাআল্লাহ তুমি খুব ভালো ছেলে, তোমার অনেক বুদ্ধি আঙ্কেল যখন ওর প্রশংসা করছিল আয়ান তখন বাবার মুখে মিষ্টি একটা হাসি দেখেছিল। ওর খুব আনন্দ হচ্ছিল। আয়ানের কিন্তু একটা বন্ধু আছে, ওর নাম লিও।

ওদের দুজনের মধ্যে খুব ভাব। সবসময় একসঙ্গে থাকে দুজন। একজন আরেকজনকে দেখতে না পেলেই ডাকা শুরু করে। এই যেমন সেদিন দুপুরে ঘুমিছে আয়ান কিন্তু প্রায় সন্ধ্যা লেগে গেছে তবুও উঠছে না সে। ওর মা বারকয়েক ডেকেও গেছে কিন্তু ওঠেনি। এমন সময় লিও এসে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে মিউ... মিউউ... মিউউউ... বলে ডাকে। লিও এর ডাক শুনে আয়ানের ঘুম ভাঙে। কখনো আয়ান খুব মন খারাপ করে থাকলে ওর কোলে উঠে ওকে জড়িয়ে ধরে লিও। ওর কা- দেখে মন ভালো হয়ে যায় আয়ানের। লিও মাছের কাঁটা আর মাছ খেতে খুব ভালোবাসে। তাই মাছ খাওয়ার সময় আয়ান কাটাতে কিছুটা মাছ রেখে দেয় ওর জন্য। মা আয়ানকে দুধের গ্লাস দিয়ে অন্য ঘরে গেলে নিজের ভাগের অর্ধেক দুধ লিও এর বাটিতে ঢেলে দেয় সে। এভাবেই চলতে থাকে আয়ান আর লিওর বন্ধুত্ব। সন্ধ্যায় আয়ানের বাবা বাসায় আসার সময় ওর জন্য কিছু না কিছু খাবার নিয়ে আসে। সারাদিন এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করে। বাবা এলে যেমনি মজার মজার খাবার পাওয়া যায় তেমনি শোনা যায় বাবার গল্প। ওর বাবা গল্প বলতে পছন্দ করেন। তিনি আয়ান আর লিওকে দারুণ সব মজার গল্প শোনায়। লিও আর আয়ান চুপ করে গল্প শুনে। গল্পের মাঝে লিও মিউ করলে বাবা বুঝতে পারে লিও গল্পটা বোঝেনি। সে আবার বুঝিয়ে বলে। বাবার এমন গল্প বলার জন্যই আয়ান বাবাকে বেশি ভালোবাসে। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে আয়ানের মা এসেও গল্পে  অংশ নেয়। তবে সব গল্পের ভিতর আয়ানের  সবচেয়ে ভালো লাগে ওর বাবার ছোটবেলার গল্প। ঘুড়ি ওড়ানো, মাছধরা, ডাংগুলি খেলা, ভোঁ দৌড়গাছে ওঠা, আরও কত কী! ঢাকা শহরে এমন দুই রুমের মধ্যে তার বাবার ছেলেবেলা কাটে নেই। গল্প শুনতে শুনতে বাবার জায়গায় নিজেকে ভেবে আনন্দ পায় আয়ান। ওর মনে হয় ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, সবার সঙ্গে হৈচৈ করে মাছ ধরছে, ভেলা চালাচ্ছে। কিন্তু চোখ খুলে এসব কিছু না পেয়ে মন খারাপ হয়ে যায় ছোট্ট আয়ানের। অবশ্য তার বাবা-মা তাকে মাঝে মাঝে পার্কে নিয়ে যায় কিন্তু লিওকে নেয় না। ঘুরতে গেলে সারাদিন মজা করে বেড়ায় আয়ান। তবে তখন লিও এর জন্য খুব মায়া হয় তার।

আশপাশের সব ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়। আয়ানের ইচ্ছা করে স্কুলে যেতে কিন্তু বাবা বলে আরেকটু বড় হও। স্কুলে অনেক বই- অনেক পড়া। এত পড়ার চাপে তোমার শৈশব হারিয়ে যাবে। তবে মা বলেছে আগামী বছর ওকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবেন। তাই এখন থেকেই মায়ের কাছে পড়া শিখে আয়ান। ওর গল্প শুনতে যেমন ভালো লাগে তেমন ভালো লাগে পড়তে। আরও ভালো লাগে পাখি দেখতে, ফড়িং, প্রজাপতি, ফুল এগুলো দেখতে। এই তো সেদিন একটা ডানা ভাঙ্গা ফড়িং উড়ে এসে ওদের বেলকুনিতে পড়েছিল তখন ওকে উঠিয়ে কত যত্ন করে ছিল সে! ফড়িং এর কষ্ট দেখে আয়ান দৌড়ে গিয়ে বেলকনি থেকে একটা ফুল ছিঁড়ে নিয়ে আসে। ফুলটা ফড়িং-এর মুখের কাছে ধরে রাখে। পাশ থেকে ওর মা বিষয়টা লক্ষ্য করে বলে- এটা কি করছো সোনা?

-ফড়িংকে সুস্থ করছি

-কিন্তু ফুলের সঙ্গে ফড়িং-এর কি সম্পর্ক?

-কেন তুমি জানো না!

-না তো! বল তো বিষয়টা খুলে।

- আরে ফুলের মধু আছে। দেখ না মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। মধুর ভিতর অনেক শক্তি আছে। অসুস্থ ফড়িং ফুলের মধু খেলে সুস্থ হয়ে যাবে। ওর ডানা ভালো হয়ে যাবে। উড়তে পারবে। তাই ফুলের ভিতর ওর মুখ রেখে দিয়েছি মধু খাওয়ার জন্য।

আয়নার কথা শুনে মা তো হেসেই খুন। ওর বাবা বাড়িতে  এলে মা তাকে বিষয়টি বললে দুজন মিলে বিষয়টি নিয়ে হাসতে শুরু করল। আয়ান বুঝতে পারল না এটা নিয়ে এত হাসির কি আছে! তবে বাবা-মাকে এভাবে হাসতে দেখে ওর নিজেরও হাসি পেল।

অফিসে বেশি কাজ থাকলে বাবা দেরি করে বাসায় ফেরেন। ওই সময় আয়ান খুব অস্থির হয়ে যায়। বেল বাজার অপেক্ষায় থাকে। নিজের বালিশটাকে গাড়ি বানিয়ে বাবাকে অফিস থেকে আনতে যায়। মাকে বলে বাবা এসেছে জলদি বাবাকে খেতে দাও। ছেলের এমন পাগলামি দেখে মনে মনে হাসে সে। তবে বাবার জন্য ওর ভালোবাসা দেখে মায়ের মনটা অনেক বড় হয়ে যায়। অপলক চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর মনে মনে দোয়া করেতুমি অনেক বড় হবে বাবা

 আয়ান বাজারে যেতে খুব পছন্দ করে। বাবার সঙ্গে তিড়িংবিড়িং নাচতে নাচতে বাজারে যায় সে। গত সপ্তাহে আয়ান যখন তার বাবার সঙ্গে বাজারে গিয়েছিল তখন দোকানে বড় বড় ইলিশ মাছ দেখে দাঁড়িয়ে ছিল সে। অনেকদিন আগে তার বড় মামা বেড়াতে এসেছিল তখন তিনি বড় একটা ইলিশ মাছ এনেছিল। কি যে মজা ইলিশ! লিওন কাঁটা খেতে খেতে চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। বাবা প্রায় বাজার থেকে মাছ কিনে আনেন কিন্তু ইলিশ মাছ আনে না। বাবা বাজার থেকে এলে আয়ান দৌড়ে যায়। ব্যাগে উঁকি দিয়ে দেখে ইলিশ কিনে এনেছে কিনা! কিন্তু ইলিশ আনে নাই দেখে মন খারাপ হয়ে যায় ওর। সেদিন যখন পাশের বাসা থেকে ইলিশ ভাজা গন্ধ এলো তখন আয়ান দৌড়ে সিঁড়ির কাছে গিয়ে বড় বড় নিশ্বাসে ইলিশ ভাজার গন্ধ নেয়।

বাবাকে ইলিশের কথা বললেই বাবার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তাই আয়ান আর ইলিশের কথা বলে না।

দুপুরের রোদে চারদিকে ঝলমল করছে।

ঠিক রুপালি ইলিশের মতো। ইলিশ মাছের কথা মনে পড়েই আয়ানের জিভে পানি এসে যায়। এমন সময় মা টেলিভিশন দেখছিল -খবর হচ্ছিল।

খবরে বলছিল বছর ইলিশের দাম আকাশছোঁয়া, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কথাটা শুনে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল আয়ানের। তার বাবাও কি তাহলে  সাধারণ মানুষ? এজন্যই ইলিশ মাছ কিনতে পারে না! সেদিন রাতে আয়ান ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে খেতে বসল। মা তার পছন্দের আলু ভাজা করেছে, আয়ান তাই দিয়ে মজা করে ভাত খাচ্ছে। হঠাৎ আয়ানের মনে হলো ইলিশ ভাজার থেকে তার মায়ের হাতের আলুভাজা অনেক সাধের।

খেতে খেতে আয়ান ওর বাবাকে বলল, ‘আচ্ছা বাবা ইলিশ মাছের কি অনেক দাম?’ বাবা আমতা আমতা করে বললহ্যাঁ বাবা কিন্তু তুমি চিন্তা করো না আগামী মাসে বেতন পেয়েই তোমার জন্য ইলিশ কিনে আনব।

না বাবা ইলিশ আনতে হবে না, তুমি পাঙ্গাস মাছ নিয়ে এসো। আমার ইলিশের চেয়ে পাঙ্গাস বেশি পছন্দ।

কথায় বাবা-মা দুজনেই ছলছল চোখে আয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।

অলঙ্করণ : প্রসূন হালদার

 

×