সোমবার ৪ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

সুন্দরবনের কোনঠাসা জলদস্যুরা এখন সাগরে

সুন্দরবনের কোনঠাসা জলদস্যুরা এখন সাগরে
  • গ্রেফতারে র‍্যাবের চতুর্মুখী উদ্যোগ
  • গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি
  • হেলিকপ্টারযোগে টহল

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল ॥ সুন্দরবন এলাকায় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-৮) অভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হওয়ায় কোনঠাসা হয়ে পরেছে জলদস্যুরা। যে কারণে দস্যুরা সুন্দরবনের ভেতরে ডাকাতি কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারায় সমুদ্রে এখন ডাকাতি কার্যক্রম শুরু করছে। বলেশ্বর নদী থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে সমুদ্র এলাকায় জলদস্যুরা ডাকাতি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

তবে ইতোমধ্যে এ দস্যু গ্রুপকে শনাক্তের পাশাপাশি র‍্যাব-৮ এর সদস্যরা ছয়জনকে অস্ত্র, নৌকা ও ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত মালামালসহ গ্রেফতার করায় উপকূলীয় এলাকার জেলেদের মাঝে অনেকটাই স্বস্তি ফিরে এসেছে। র‍্যাব-৮ এর দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, দস্যুগ্রুপের পালিয়ে থাকা সদস্যদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী আমরা জানতে পারি, সুন্দরবনে আমাদের আভিযানিক সক্ষমতা অনেক বেড়েছে এবং আমরা সুন্দরবনে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। তাই দস্যুরা সুন্দরবনের ভেতরে ডাকাতি কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পেরে সমুদ্রে ডাকাতি কার্যক্রম শুরু করছে। দস্যুদের অধিকাংশ সদস্যকে ইতোমধ্যে আমরা গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। বাকি সদস্যদের গ্রেফতারের জন্য আমাদের অভিযান চলছে।

সূত্রমতে, সম্প্রতি সময়ে বরিশাল বিভাগের পাথরঘাটা, বরগুনা ও পটুয়াখালী সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে দূরবর্তী বঙ্গোপসাগরের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। ওইসব এলাকায় দস্যুরা মাছ ধরার ট্রলারে হামলা চালিয়ে জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করেছে। এছাড়া সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে সীমান্তবর্তী এলাকায় গুলিতে একজন নিহতের ঘটনা ঘটে।

সর্বশেষ গত নবেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিভাগের পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও বরগুনা থেকে জেলেরা বোট নিয়ে মাছ শিকারের জন্য গভীর সমুদ্রে যায়। এরপর ২০ নবেম্বর সকাল সাতটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার অভ্যন্তরে (পাথরঘাটা, বরগুনা ও পটুয়াখালীর বলেশ্বর এবং পায়রা মোহনা) পর্যায়ক্রমে সাতটি নৌকায় ডাকাতি করে মোবাইল ফোনসহ মূল মাঝি ও সাতজন জেলেকে অপহরণ করে জলদস্যুরা। এরপর লুন্ঠিত মালামাল বিক্রিসহ অপহরন করা সাত জেলের পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জলদস্যুরা মুক্তিপন আদায় করতে চাঁপ প্রয়োগ করে।

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, এসব ঘটনাগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন পূর্বক র‍্যাব চতুর্মুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে আভিযানিক ও গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে।

র‍্যাব-৮ এর আভিযানিক দল বঙ্গোপসাগরের অভ্যন্তরে ও সমুদ্রের নিকটবর্তী চরাঞ্চল যেমন-ঢালচর, সোনারচর, চরমোন্তাজসহ বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশী অভিযান পরিচালনা করে। পাশাপাশি হেলিকপ্টারযোগে টহল পরিচালনা করা হয়। র‍্যাবের গতিবিধি ও তৎপরতা আঁচ করতে পেরে সর্বশেষ অপহৃতদের গত ২৩ নবেম্বর নৌকায় রেখে দস্যুরা পালিয়ে যায়। তবে পালানোর সময় দস্যুরা স্থানীয় জেলে নৌকাকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিয়ে এসে অপহৃতাদের ওপর হামলা চালিয়ে কৌশলে স্থান ত্যাগ করে।

সূত্রে আরও জানা গেছে, অপহৃতদের ছেড়ে দেয়ার পরেও র‍্যাব সদস্যরা জলদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখে মোবাইল ব্যাংকিং ট্রান্সফারের মাধ্যমে মুক্তিপণের অর্থ প্রবাহের ওপর গোয়েন্দা নজরদারী শুরু করে। ফলশ্রুতিতে র‍্যাবের গোয়েন্দারা গত ৩০ নবেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকা থেকে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমায় জেলেদের নৌকায় ডাকাতির মূল মুক্তিপণ সংগ্রহকারী ইলিয়াস হোসেন মৃধাকে পাঁচ লাখ টাকাসহ গ্রেফতার করেন।

পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাবের গোয়েন্দা অনুসন্ধান বৃদ্ধি করে শুক্রবার (৩ ডিসেম্বর) সকালে আগ্নেয়াস্ত্রসহ জলদস্যুদলের মূল সমন্বয়কারী খলিল জমাদ্দারসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়। খলিল তালতলী, আমতলী ও পটুয়াখালীতে দোকান পরিচালনার ছদ্মবেশে ডাকাতি কার্যক্রমের সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে আসছিলো।

একটি একনালা বন্ধুক, দুটি ওয়না শুটার গানসহ তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র, আট রাউন্ড গুলি, চারটি দেশী ধারলো অস্ত্র, নগদ টাকা, ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত মালামাল উদ্ধারসহ গ্রেফকৃত দস্যুরা হলো-বরগুনার তালতলী এলাকার বাসিন্দা ও জলদস্যু দলের মূল সমন্বয়কারী খলিল জমাদ্দার, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মাহাতাব প্যাদা, জামাল আকন্দ, মাছুম ওরফে মানছুর খলিফা ও পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার মিনাজ খান। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‍্যাব-৮ এর সদস্যরা ৩ ডিসেম্বর সকালে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার একটি পরিত্যাক্ত বাড়ির চারিপাশ ঘিরে ফেলে। এসময় র‍্যাব ও জলদস্যু ডাকাত দলের সদস্যদের সাথে গুলিবিনিময় হয়। পরবর্তীতে র‍্যাব সদস্যরা উল্লেখিতদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত দস্যুরা জানিয়েছে, তারা বঙ্গোপসাগরের সংঘবদ্ধ জলদস্যু দলের সদস্য। তাদের দলের সদস্য সংখ্যা ১৮ জন। সর্দারের নেতৃত্বে বিগত চার বছর আগে দলটি সংঘবদ্ধ হয়। বিভিন্ন সময়ে তারা মাছ ধরার মৌসুমে সমুদ্রে জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি ও মালামাল লুণ্ঠন করে থাকে। তারা চট্টগ্রাম,সন্ধীপ, কক্সবাজার ও ভোলাসহ পটুয়াখালী, বরগুনা এলাকার দূরবর্তী বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুতা করে থাকে।

র‍্যাব-৮ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি জামিল হাসান জানান, ১৮ জনের জলদস্যু এই দলের সদস্যরা কয়েকটি (৩/৪) ভাগে ভাগ হয়ে ডাকাতি করে থাকে। একটি উপদল অস্ত্রসহ অপহরণ ও লুটতরাজে অংশগ্রহণ করে। সর্দারের নেতৃত্বে এই উপদলে সাধারণত ১০ জন সদস্য থাকে। অপর তিনজনের একটি উপদল, মূল দলের সহযোগি হিসেবে ডাকাতিকালীন সময়ে কাজ করে। যারা প্রয়োজন অনুযায়ী লুণ্ঠিত মালামাল সাগর থেকে উপকূলে নিয়ে আসে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থানরত পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়কারী দলের নিকট হস্তান্তর করে। তিন থেকে চারজনের সমন্বয়ে গঠিত এ দলটি বিভিন্ন মৎসব্যবসায়ীদের কাছে সেই মালামাল বিক্রি করে। এছাড়া এরা সাগরে গমনাগমনকারী মৎসজীবিদের ব্যাপারে গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে।

এছাড়া সার্বক্ষনিক বিভিন্ন গ্রুপের ভেতর সমন্বয় এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি ও সংগঠিত ডাকাতির পর ভূক্তভোগী পরিবার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। এছায়া মুক্তিপণ সংগ্রহ করার জন্য ভিন্ন আরও একটি তিনজনের উপদল রয়েছে। যারা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় অবস্থান পরিবর্তন করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মুক্তিপণ সংগ্রহ করে থাকে। র‍্যাব-৮ এর অধিনায়ক বলেন, দস্যুগ্রুপের পালিয়ে থাকা সকল সদস্যদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

শীর্ষ সংবাদ: