শনিবার ১৫ মাঘ ১৪২৮, ২৯ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

বিশ্ব শক্তিধর আমেরিকা ক্রমেই হীনবল হয়ে পড়ছে

  • এনামুল হক

বিশ্বজুড়ে আমেরিকার প্রভাব প্রতিপত্তি কমে আসছে। আমেরিকা হীনবল হয়ে পড়ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে তো আরও বেশি। এই প্রভাব ও শক্তিকে পুনর্প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে না। শত ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা ছিল বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি যা উদ্ধার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রেখেছিল। এবার ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প ‘সবার আগে আমেরিকা’কে স্থান দেয়ার নামে যা করছেন তাতে আমেরিকা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর অনেকে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বিপর্যয় ঘটবে। সেটা এই মুহূর্তে ঠিক অতটা না হলেও তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নিয়ে সবাইকে হতাশ করেছেন। ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ পরিত্যাগ করেছেন। ন্যাটো ত্যাগ না করলেও আগের মত এ জোট নিয়ে উচ্চকণ্ঠ নন। নতুন যুদ্ধ শুরু না করলেও আফগানিস্তানে সৈন্য সংখ্যা বাড়িয়েছেন। তার কথাবার্তায় মনে হচ্ছে তিনি আমেরিকার পেশীশক্তি প্রদর্শনের আশ্রয় নেবেন এবং সেই শক্তিকে এমনভাবে হাজির করবেন যাতে উত্তর কোরিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ধসে পড়ে। একদা তিনি হুমকি দিয়েছিলেন যে তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের সঙ্গে তিনি একটা দফারফা করে ছাড়বেন। বরং উত্তর কোরিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তিনি চীনকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করিয়েছেন।

ইরান প্রশ্নে ট্রাম্পের হাবভাব দেখে মনে হয় শীঘ্রই তিনি ইরানের পরমাণু চুক্তি বাতিল করবেন। তিনি মনে করেন ইতিহাস থেকে তার কিছুই শিক্ষা নেয়ার নেই। পুতিন ও শি জিন পিংয়ের মতো লৌহমানবদের তার পছন্দ। জেনারেলদেরও তিনি পছন্দ করেন। তবে কূটনীতিকদের প্রতি তার একটা তাচ্ছিল্যভাব আছে। পররাষ্ট্র দফতর থেকে অনেক অভিজ্ঞ রাষ্ট্রদূত বিদায় নিয়েছেন।

আমেরিকার শক্তির প্রধান দুটি উৎস হলো ভয়-ভীতির প্রদর্শনের ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টির ক্ষমতা। ট্রাম্পের আমলে প্রথম ক্ষমতাটি এখনও আছে বটে, তবে দ্বিতীয় ক্ষমতাটি মারাত্মকভাবে লোপ পেয়েছে। ন্যাটোকে বলিষ্ঠ সমর্থন দিতে না পারা, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা, উত্তর কোরিয়াকে যুদ্ধংদেহী হুমকি প্রদর্শন করা এবং দেশটিকে ‘এমন রুদ্ররোষ নিয়ে আঘাত করা হবে যা বিশ্ববাসী আগে কখনও দেখেনি’ এমন উক্তি করার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প আসলে আন্তর্জাতিক পরিম-লে আমেরিকার মর্যাদা যথেষ্ট খর্ব করে ফেলেছেন। বিশেষ করে আমাদের সময়কার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু জলবায়ু প্রশ্নে তার ভূমিকা আমেরিকাকে একঘরে করার পথে ঠেলে দিয়েছে।

ওবামার আমলে এক জরিপে দেখা গিয়েছিল যে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ইউরোপীয় মনে করে যে আমেরিকার শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। এখন ট্রাম্পের আমলে ৫২ শতাংশ ইউরোপীয় তাই মনে করে। যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের এক নম্বরের অর্থনৈতিক শক্তি বলে মনে করে অতি সামান্য সংখ্যক দেশ। আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতার ব্যাপারে বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশই ্ট্রাম্পের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেছে। তা থেকে অনেকেই ইতোমধ্যে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল সেটাই সত্য বলে প্রমাণিত হলো যে ট্রাম্প আমেরিকার মৌলিক স্বার্থকে রক্ষা করতে বা এগিয়ে নিতে অনিচ্ছুক বা অসমর্থ।

সারা বিশ্বের ৭০টি দেশে প্রায় ৮শ’ সামরিক ঘাঁটির এক নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে এবং সেই সঙ্গে নানা ধরনের জোট ও বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা ইউরোপ ও এশিয়ায় কয়েক দশক ধরে তার প্রভাব মজবুত করে এবং সকল অনুন্নত এলাকায় প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছিল। এটা ছিল অ-ঔপনিবেশিক স্রামাজ্য সম্প্রসারণ যা ছিল মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসন, ক্ষুব্ধ, সম্পদের অসম বণ্টন ইত্যাদি নানা সমস্যায় জর্জরিত হওয়ায় বিশ্বকে আগের মতো আর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিতে পারছে না। বলা যায় তখন থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যের পতনের প্রক্রিয়া শুরু। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন নতুন শক্তির উত্থান ও আমেরিকার ভ্রান্ত কিছু পদক্ষেপ। ইতোপূর্বে ব্রিটিশ ও ফরাসী সাম্রাজের পতনের পূর্ববর্তী পরিস্থিতির সঙ্গে আমেরিকান সাম্রাজ্যের পতন পূর্ব পরিস্থিতির কিছু সাদৃশ্য টানা যেতে পারে, যার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আমেরিকার প্রভাবাধীন এলাকাগুলোতে স্থানীয় এলিট শ্রেণীর সমর্থন হারানো। দৃষ্টান্ত হিসেবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও ফিলিপিন্সের কথা বলা যেতে পারে। অন্যদিকে জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মার্কিন মিত্ররা বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় আমেরিকার নেতৃত্বদান অব্যাহত রাখার ক্ষমতা নিয়ে উত্তরোত্তর প্রশ্ন তুলছে।

আরব বসন্ত ছিল একটা বিশ্ব শক্তি হিসেবে আমেরিকার বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবসানের মন্থর সূচনা। সে সব দেশের গণঅভ্যুত্থানগুলো মূলত পরিচালিত হয়েছিল মার্কিনপন্থী একনায়কদের বিরুদ্ধে। অনেক ক্ষেত্রে এই গণঅভ্যুত্থানের পরিণতিতে উদার গণতন্ত্র কায়েম না হলেও তিউনিসিয়া ও মিসরে দীর্ঘকালের মার্কিন মিত্ররা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। কিছু কিছু উপসাগরীয় আরব দেশের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্ক চাপের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে সন্ত্রাস দমনের নামে কা-জ্ঞানহীন যুদ্ধ চালাতে গিয়ে আমেরিকার সম্পদের বিশাল অপচয় ঘটেছে। এসব চাপকে বাড়িয়ে তুলে আমেরিকার আধিপত্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নবোল্লিখিত চীন এই চীন এখন আমেরিকার গড়া বিশ্ব ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে উদ্যত হয়েছে। সামরিক শক্তির দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনও চীনের ওপরেই রয়েছে এবং সেই শক্তি রাতারাতি উঠে যাবে তেমন হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তবে যুদ্ধের নতুন নতুন পরিম-লে চীন আমেরিকার প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করার দিকে এগিয়ে চলেছে। একবিংশ শতকে চীনের অগ্রগতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ক্ষেত্র হবে সাইবার স্পেস এবং মহাশূন্য অভিযান। আমেরিকা যখন ঘরে-বাইরে নিজের সমস্যা মোকবেলায় ব্যস্ত চীন তখন ইউরেশিয়া ও আফ্রিকাকে নয়া সিল্ক রোড দিয়ে যুক্ত করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রচার বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রবল প্রতাপে।

শুধু কি চীন? রাশিয়া ও ইরানও ইদানীং আমেরিকার আধিপত্যের প্রতি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। আর সেটা আমেরিকার ভুল পদক্ষেপের কারণে। ট্রাম্প দেখছেন চীনকে মোকাবেলা করা বেশ জটিল। রাশিয়াকেও তাই। সে কারণে শত্রুর পরিধিটা সঙ্কীর্ণ করে তিনি একটিতে নিয়ে এসেছেন এবং সেটা ইরান। এ জন্য তিনি সৌদি আরবকে উস্কে দিয়েছেন লেবাননে গোলমাল পাকাতে। যাতে সেখানে ইরানের প্রক্সি হিজবুল্লাহকে পর্যুদস্ত করা যায়। কিন্তু ইরানের পেছনে রাশিয়াও আছে। কাজেই ট্রাম্প যা চাইছেন তাতে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এখানেও তাকে মার খেতে হবে। ইরানও শেষ পর্যন্ত বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে আমেরিকার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথম বিশ্ব শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। এক হাজার বছরের মধ্যে এই প্রথম একটি দেশ সুবিশাল ইউরেশিয়ার উভয় প্রান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে সযত্ন হয়েছিল। আজ এই ইউরেশিয়া বিশ্ব শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এখানে আছে সম্পদ, বিশাল জনগোষ্ঠী ও সভ্যতা। বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এই বিশাল ভূখন্ড-কে আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র যে স্তম্ভগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে এতদিন এই ইউরেশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল সেগুলো একে একে ধসে পড়ছে। ট্রাম্পের আমলে ন্যাটোর ওপর রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে এই জোট দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রশান্ত মহাসাগর তীরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত দেশগুলো একে একে ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তারা ঝুঁকে পড়ছে চীনের দিকে। ইউরেশিয়া ভুখ-ে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ যত কমছে ততই বাড়ছে চীনের নিয়ন্ত্রণ। অর্থনৈতিক প্রযুক্তিগত ও ভূরাজনৈতিক তথ্য-উপাত্ত থেকে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, বিশ্ব শক্তি হিসেবে আমেরিকার সমস্ত নেতিবাচক প্রবণতা ২০২০ সাল নাগাদ দ্রুত ও ব্যাপক আকারে বেড়ে যাবে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ সেগুলো সঙ্কটজনক অবস্থায় পৌঁছতে পারে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট/টাইম

শীর্ষ সংবাদ:
সামনে কঠিন ২ সপ্তাহ ॥ নিয়ন্ত্রণের বাইরে করোনা         দুই প্রতিষ্ঠানের সাড়ে ১৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা ॥ জালিয়াতি ও অনলাইন প্রতারণা         গণমানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিতে মাইলফলক ॥ কাদের         বাড়িতে ঢুকে গৃহবধূকে গলা কেটে হত্যা         হুন্ডুরাসে প্রথম         উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হলো চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন         চিকিৎসা দিতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত চিকিৎসক-নার্স         আগামী জুনে উৎপাদনে যাবে দেশী-বিদেশী ৬ প্রতিষ্ঠান         সাড়ে ৪ ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে নারায়ণগঞ্জের জাহিন নিটওয়্যার্সের আগুন         করোনা ভাইরাসে আরও ২০ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৫৪৪০         শিল্পী সমিতির নির্বাচন ॥ ভোট দিয়েছেন ৩৬৫ জন, চলছে গণনা         শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগের আন্দোলন চলবে, ঘোষণা শিক্ষার্থীদের         মন্ত্রীর অনুরোধ না রেখে ৬ তারিখের আগেই দাম বাড়লো ভোজ্যতেলের         মাত্র ২ সরকারি হাসপাতালে রয়েছে স্ট্রোক ব্যবস্থাপনার সুবিধা!         বিএনপি দেশের বিরুদ্ধে সারা দুনিয়ায় অপপ্রচার চালাচ্ছে ॥ তথ্যমন্ত্রী         চিকিৎসা পাওয়া আমার মৌলিক অধিকার ॥ মাহবুব তালুকদার         ইসিকে শক্তিশালী করতে সব রকম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ॥ সেতুমন্ত্রী         ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ করার ইচ্ছা রাশিয়ার নেই ॥ লাভরভ         রোহিঙ্গাদের জন্য ২০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা জাপানের         টাঙ্গাইলে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ জন নিহত, আহত ২