শনিবার ২০ আষাঢ় ১৪২৭, ০৪ জুলাই ২০২০ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

গল্প ॥ প্রায় কাছাকাছি

  • পূরবী বসু

আজ বত্রিশ বছর ধরে একই সংলাপ দিয়ে আমাদের প্রতিটি কথোপকথন শেষ হয়। ডেভিডের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়েছে ক্রিসমাসের ঠিক আগে আগে। আমাদের দু’জনের সেই চিরাচরিত প্রথানুসারে সে জিজ্ঞেস করেছে ‘যিশুকে গ্রহণ করার ব্যাপারে কী ঠিক করলে? প্রশ্নটি উত্থাপন করতে ওর উৎসাহ ও আগ্রহ দেখে মনে হয় জীবনে প্রথমবারের মতো যেন প্রস্তাবটা পেশ করল আমায়।

‘আমাকে একটি জোরালো যুক্তি দাও কেন আমি তা করব।’ আমি হেসে বলি। প্রশ্নের মতো উত্তরটাও প্রতিবার ঠিক একই রকম হয়।

একটি শব্দও এদিক-ওদিক নয়।

‘অনেক অনেক যুক্তি আছে।’ তর্কে পিছিয়ে যেতে রাজি নয় সে।

‘একটাই যথেষ্ট। তোমার সবচেয়ে ভাল ও বড় কারণটা বলো। যিশুকে আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য আর জীবন্ত করে তোল।’

‘ঠিক আছে। পরে এ ব্যাপারে কথা বলব। কেমন?’

‘ঠিক আছে।’

এভাবেই কেটে গেছে তিরিশ বছরেরও বেশি। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে সাড়ে বত্রিশ বছর।

ঠিক সহকর্মী নয়, ডেভিড আমার সুপারভাইজারই ছিল শুরুতে। পরে আমি প্রমোশন পেয়ে যখন তার সমকক্ষ পদে অভিষিক্ত হলাম, ততদিনে আমাদের ডিভিশন ভাগ হয়ে আমার অংশ অন্য বিল্ডিংয়ে চলে গেছে। কিন্তু ডেভিডের সঙ্গে আলাপচারিতা শেষ হয়নি কখনও।

যিশুর হয়ে সেই সব জোরালো যুক্তি আর জীবন্ত সব সাক্ষীর বিবরণ নানা সময় বিভিন্ন কথা সূত্রে টুকরো টুকরো করে মাঝে মধ্যে আমায় বলত ডেভিড। কিন্তু এই বিশেষ প্রসঙ্গে, মানে আমার জীবনে যিশুকে গ্রহণ করা সম্পর্কে আমার সম্মতি আদায়ের জন্য যিশুর প্রতি ভক্তির ইতিবাচক দিকগুলো কখনও বিস্তৃতভাবে উত্থাপন বা উপস্থাপন করেনি ডেভিড। তবু আমি জানি, সে প্রকৃতই চেয়েছে ওর জীবনে যেমন রয়েছে, আমার কাছেও যিশু থাকুক সত্যে অনির্বাণ হয়ে। যিশু থাকুক আমার বিপদে আপদে রক্ষাকারী হিসেবে, আমার বিশ্বাসের ঘরে চির অম্লান হয়ে, ধ্রুব তারার মতো স্থায়ী হয়ে, আমার গতি বা পথপ্রদর্শক হিসেবে। কিন্তু কার্যত তা ঘটেনি।

তবু একই প্রসঙ্গ প্রতিবার এসেছে ঘুরেফিরে, প্রতিটি সংলাপ বিনিময়কালে। সেটা টেলিফোনের বাক্যালাপে হোক, অথবা কোন এক দূরের শহরে প্লেন বদল করার কালে এক রাতের জন্য হোটেলে থেকে যাওয়ার জন্য থামলে আরেকজন কাছাকাছি শহর থেকে ড্রাইভ করে গিয়ে মিলিত হওয়ার কারণেই হোক। অথবা কচিৎ বেশ কয়েক বছর পর পর এ ওর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া উপলক্ষেই হোক। আমি জগত-সংসারের স্রষ্টা ও নিয়ামকের শূন্যস্থানে যিশু বা অন্য কাউকে আজ পর্যন্ত বসাইনি। আমার সেই স্থানটি বুঝি খালিই থেকে যাবে চিরকাল। এর ফলে জীবনের অর্ধেক সময় পার করে দিলেও আমাদের মধ্যে একই প্রশ্ন এখনও বৈধ রয়েছে। বার বার করে একটিই অনুরোধ বা প্রস্তাব করে যাবার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ডেভিডের জন্য। ডেভিডও তাই অতি অনায়াসে নির্দ্বিধায় প্রতিবার সে প্রশ্ন করে যেতে ভোলে না আমায়। তার অতি প্রিয় প্রশ্ন, একই ভঙ্গিতে, একই শব্দে , একইভাবে উচ্চারিত হয় যতবার আমরা কথা বলি। তা বছরে অন্তত তিন চার বার তো হয়ই।

‘যিশুকে গ্রহণ করার ব্যাপারে কী ঠিক করলে?’

কথার ধরন শুনে মনে হতে পারে ডেভিড রসিকতা করছে। আমাকে নিয়ে মজা করছে। কিন্তু আসলে তা নয়। অতি কাছে থেকে ওকে দেখেছি বলেই জানি, ডেভিডের জীবনে দুটি জিনিসের চাইতে বেশি জরুরী, বেশি প্রিয়, বেশি মূল্যবান আর কিছু নেই– ১) যিশুখ্রিস্ট, ২) একমাত্র পুত্র পল। বড় বেশি সিরিয়াস সে, বড় স্পর্শকাতর, বড়ই অন্ধ এই দুই ব্যাপারে। আমি ডেভিডকে বলতাম, তোমার যুক্তি, বুদ্ধি, তোমার বিজ্ঞান, বিশ্লেষণ সব মার খেয়ে যায়, হেরে যায়, এই দুটো জায়গায় এসে। ডেভিড হাসে, তবে স্বীকার করতে চায় না, সে অযৌক্তিক অথবা একেবারেই অন্ধ যিশু কিংবা পলের ব্যাপারে।

যা ভাবা যায়, স্থির করা হয়, পরিকল্পণা করা যায়, সব কিছু সর্বদা ঠিক সেভাবে চলে না। হয় না। জীবনে কিছু হয়ত থেকেই যায় যা স্বয়ংক্রিয়, স্বাধীন, চলে বা ঘটে কারও নিয়ন্ত্রণের তোয়াক্কা না করে। সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ তারা। তা নইলে আটষট্টি বছরের টান টান স্বাস্থ্য আর নীরোগ, উপসর্গহীন দেহ নিয়ে কোন দিন কি আমি ভেবেছিলাম, কখন কি চিন্তা করেছি এটা মেনে নিতে হবে যে আর মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাস বাঁচব আমি! এতটা ঘটে গেল কখন? আমি তখন কী করছিলাম? একজন নয়, এক শহর নয়, এক বা দুই দেশ নয়, তিন তিনটি মহাদেশ আর অসংখ্য শহর, ডাক্তার, হাসপাতাল অতিক্রম করলাম আমি, যদি কোথাও থেকে কেউ বলে ভিন্ন কথা। যদি কেউ বলে, আছে, আছে কিছু, নতুন কিছু আবিষ্কৃত হয়েছে ঠিক তোমার পরিস্থিতির জন্যই। কিন্তু না। কেউ বলেনি সে কথা। তার মানে, আমার কোন বিকল্প চেষ্টারও সুযোগ নেই আর।

অনেক ভেবেচিন্তে আমি আজ ডেভিডকে ফোন করি। ভাবি ডেভিড ওর সেই পুরনো প্রসঙ্গ আনার আগেই আমি বলব, ঐড়ি ধনড়ঁঃ ধপপবঢ়ঃরহম তবংঁং রহ সু ষরভব উধারফ?

অসুবিধা কী? আর তো কয়েকটা মাস। এর পরে ডেভিডও আমায় আর অনুরোধ করবে না, আমিও যিশুর অনুরাগী হওয়ার সুযোগ পাব না আর। জীবনে একজনকে, একটি বন্ধুকে যদি খুশি করে যাই, যে আমার পরম হিতাকাক্সক্ষী, –নিঃশর্তভাবে বরাবর! ক্ষতি কী? বিশেষ করে আমার স্ত্রীর মৃত্যুর পরে, মনে আছে, এই ডেভিড কীভাবে ছুটে এসেছিল পশ্চিম উপকূল থেকে কেবল আমাকে সান্ত¡না দিতে। সবচেয়ে বড় কথা বিশ্বাসের ঘরটা তো এখনও শূন্য আমার। এমন তো নয়, ওঘর থেকে কাউকে ঘাড় ধরে বের করে দিয়ে যিশুকে ঢোকাতে চাইছি।

আমি ডেভিডকে ফোন করি। আমার অবস্থাটা কীভাবে ওকে জানাব, যাতে সে ভেঙ্গে না পড়ে, মনে মনে আমি আমাদের সম্ভাব্য বাক্যালাপের একটা মোটামুটি তালিম দিই। একা ঘরে কয়েকবারই চলে সেই অনুশীলন পর্ব।

তারপর ডেভিডকে ফোন করি।

কিন্তু ফোন বেজেই চলে। ডেভিড ধরে না ফোন। বেলা দশটা বাজে।

আমি আবার রাতে ফোন করি। আবার পরদিন খুব ভোরে। না, ফোন ধরে না ডেভিড।

এটা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। বাড়িতে একাই থাকে ডেভিড। ডিভোর্স হয়নি যদিও (সেটাও হয়ত ধর্মীয় কারণেই) সে স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস করে না আজ প্রায় বিশ বছর। ওর স্ত্রীও শহরের অন্য প্রান্তে একাই থাকে।

বেশ কিছু বছর হয়ে গেল, ডেভিড প্রায় সবটা সময়েই ঘরে থাকে। বেরোয় খুব কম। বাতের ব্যথায় হাঁটতে চলতে খুবই কষ্ট তার।

তৃতীয়বার ফোন করার পরও যখন কোন সাড়া পাওয়া গেল না, একটা লম্বা মেসেজ রাখলাম ফোনে, তাকে না পাবার জন্য দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে। আমার শারীরিক অবস্থার কথা যন্ত্রে ধারণ করে রাখা ঠিক নয়, মনে হলো। তাই ও ব্যাপারে কিছু বললাম না।

পরের দিন বেশ রাত করে ডেভিড ফোন করে আমায়। আমার অদম্য ইচ্ছা, শুরুতেই বলে দেয়া, হেই ডেভিড, আমি তোমার যিশুকে গ্রহণ করতে চাই জীবনে। বলত কী করা দরকার আমায়?’ ভাবার চেষ্টা করি, আনন্দে উত্তেজনায় ডেভিডের চোখ দুটো কী উজ্জ্বলভাবে জ্বলে উঠবে কথাটা শুনে!

ভাবি, এ কথা ডেভিডকে বলা শুধুই কি তাকে তুষ্ট করার জন্যই? নাকি আমার মনের কোথাও, কোন নরম, নড়বড়ে দুর্বল স্থানে বাসা বেঁধেছে কোন অযৌক্তিক বিশ্বাস, এ ধরনের কোন চিন্তা কে জানে, যদি কিছু থেকে থাকে? ডেভিডের কাছে যিশুর কত অলৌকিক গল্পই তো শুনেছি! যদি কিছু আসলেই হয়! না, সজ্ঞানে আমার মনে হয় না তেমন কোন চিন্তা বা আশা মনে বাস করছে আমার। অথবা প্রশ্রয় দিয়েছি আমি তেমন কোন বোধ বা বিশ্বাস। তবু মনে মনে প্রস্তুত হই ডেভিডকে কথাটা বলার জন্য।

ডেভিড এটা সেটা বলে কথোপকথন সংক্ষিপ্ত করে যখন প্রায় ছেড়ে দেবে, আমি উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা করি ডেভিড বলবে এবার, ‘যিশুকে গ্রহণ করার ব্যাপারে কী ঠিক করলে?’

কিন্তু না। পরিবর্তে গম্ভীর গলায়, এই প্রথমবারের মতো যিশুর প্রসঙ্গ না এনে, ডেভিড বলে, ‘গুডনাইট।’

আমি চিৎকার করে উঠি।

‘ডেভিড, প্লিজ ফোনটা ছেড় না।’

ডেভিড কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। আমি বুঝতে পারি না, ডেভিড ওপারে আছে কি নেই।

‘তুমি আছ ডেভিড?

‘হ্যাঁ, আছি। কিছু বলবে?’

‘ডেভিড, আমি খুব অসুস্থ। আমি মারা যাচ্ছি ডেভিড।’

‘সে কী?’ আজকে কথা বলা শুরু করার পর এই প্রথম বারের মতো মনে হলো, আমার সেই পরিচিত ডেভিডের সঙ্গেই কথা বলছি। উষ্ণ, সহমর্মী। এর আগে, আজকে- সারাক্ষণ, বড় নিরাসক্তভাবে কথা বলে গেছে ডেভিড।

‘আমি সব বলব তোমায়। তবে এখন নয়। কিন্তু আমি কি তোমার যিশুকে গ্রহণ করতে পারি এখন? নাকি এ রকম শরীর নিয়ে এই শেষ অবস্থায় যিশুও কাউকে নেন না!’

‘না না তা কেন? তোমাকে আমি আলাপ করিয়ে দেব আমাদের পেস্টারের সঙ্গে। কিন্তু তোমার কী হয়েছে বল। এদিকে তোমাকে তো জানানো হয়নি, ‘ডেভিড একটু থামে। মনে হয় ওর কয়েক মুহূর্ত দরকার কথাটা শেষ করার জন্য।’

একটু থেমে, তারপরে স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে ডেভিড বলে যায় দ্রুত, ‘পল, আমার ছেলে পল, গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে গত মাসে পনেরো তারিখে। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছরের পল। আর নেই। আমি আর চার্চে যাই না আজকাল। আর হয়ত যাবও না।’

আমাদের কথোপকথন প্রায় তেত্রিশ বছর পরে ভিন্নভাবে, সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজে শেষ হলো আজ। ডেভিড শুধু বলল, ‘তোমার সঙ্গে কাল কথা হবে। আর আমি পেস্টারকে তোমার ফোন নম্বর দিয়ে দেব। ফোন করবে সে।’

আমাকে ‘গুডলাক’ জানাল ডেভিড। কয়েকটা উদাহরণ দিল যখন ডাক্তারের ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণ করে গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি আবার ভাল হয়ে উঠেছে। অথবা সুস্থ হয়ে না উঠলেও বেঁচে থেকেছে অনেকদিন। ডেভিডের পরিচিত অনুরূপ রোগীই আছে অন্তত তিনজন। কিন্তু এত কথা বলার পর, এত সুযোগ থাকা সত্ত্বে¡ও, আজ, যিশুর নাম একবারও উচ্চারণ করে না ডেভিড।

শীর্ষ সংবাদ:
বাংলাদেশকে ৫ কোটি ডলার ঋণ দেবে দ. কোরিয়া         প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন কমিটি         রেলে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করা হবে না : রেলমন্ত্রী         আগামী ১৪ জুলাই বগুড়া-১, যশোর-৬ আসনে উপ-নির্বাচন         রাজধানীতে ৮ প্রতিষ্ঠানকে ভোক্তা অধিকারের জরিমানা         জমি ও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন ফি কমিয়েছে সরকার         ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা         দেশে করোনা ভাইরাসে মৃত্যু ২ হাজার ছুঁইছুঁই, নতুন আক্রান্ত ৩২৮৮         ঈদের আগেই শ্রমিকের বেতন-ভাতা পরিশোধের আহ্বান কাদেরের         এক কোটি ৬৮ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে সরকার         বিএসএমএমইউতে করোনা ভাইরাসের রোগী ভর্তি শুরু         ওয়ারীতে লকডাউন কার্যকর         করোনা ভাইরাস ॥ চবি ক্যাম্পাস লকডাউন         মুগদা হাসপাতালে মারধরের ঘটনায় দুই আনসার প্রত্যাহার         বিমানের সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া ফ্লাইট ৩১ আগস্ট পর্যন্ত স্থগিত         ফ্রান্সের নতুন প্রধানমন্ত্রী জ্যঁ ক্যাস্টেক্স         গাজীপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় গার্মেন্টসের দুই নারী শ্রমিক নিহত         করোনা ভাইরাসে পিআরএলে থাকা যুগ্মসচিবের মৃত্যু         লক্ষ্মীপুরে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে দুই চালক নিহত         করোনা ভাইরাস পরীক্ষার ফি তুলে দেওয়ার দাবি বিএনপির        
//--BID Records